পুরো গ্রাম ঘুমিয়ে গেছে। কিন্তু পাড়ার একটি বাড়িতে তখনও জ্বেলে আছে আলো। ঘুমাতে পারছেন না আজগর মিয়া, রুমের লাইট জ্বালিয়ে হাঁটাহাঁটি করছেন তিনি। বাইরে উঠোনে জনা ৫০ লোক গুটুর গুটুর করছে। এই লোকগুলো বসে আছে ভোর হবার অপেক্ষায়। কখন ৫ টা ৩০ বাজবে আর শুরু হবে আর্জেন্টিনার সেই বহুল প্রতীক্ষিত খেলা সেই চিন্তায় মগ্ন তারা। গ্রামে টিভি একটাই, সেটিই আজগর মিয়ার বাড়িতে।

আজগর মিয়া খুব টেনশনে আছেন। জন্মের পর কখনোআর্জেন্টিনা ছাড়া বিশ্বকাপ হতে দেখেন নাই। বিশ্বকাপ এলেই তার ঘরে হইচই লেগে যায়। বাপ-দাদার আমল থেকেই আর্জেন্টিনার ভক্ত, ম্যারাডোনা সেটা সপ্ত আসমানে উঠিয়ে দিয়েছেন। সেই আর্জেন্টিনার এবার বিশ্বকাপ খেলা ভীষণ কঠিন সমীকরণের মাঝে পরে গেছে। শেষ ম্যাচ জিতলেই হবে যদিও কিন্তু ম্যাচটা যে ইকুয়েডরের রাজধানী কিটোতে, যেখানে ২০০১ এর পর জেতেনি আর্জেন্টিনা। তাহলে কি ২০১৮ বিশ্বকাপ চলাকালীন সময়টা নিস্তব্ধই থাকবে গ্রামটা? 

নদীর মাঝখানে নিজের মাছ ধরার নৌকাটার পাটাতনে স্থির শুয়ে আছে তাহের। তার মন চিন্তিত, সারাদিন তেমন মাছ পায় নি, বিক্রিও ভালো হয়নি। কিন্তু তাহেরের চিন্তা সেটা নিয়ে না। শরতের চাঁদ নদীর পানিকে কেমন যেন একটা ঝোঁক লাগানো নেশায় পরিণত করেছে। সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই তাহেরের। সেই কবে থেকে ভাবছে এবার আর্জেন্টিনার পতাকাটা আরো বড় করে বানাবে। কিন্তু বিশ্বকাপ এ আর্জেন্টিনা সুযোগ না পেলে এত ভেবে কি লাভ! ঘুম আসেনা তাহেরের। রেডিওটা কানের আরেকটু সামনে এনে রাখে সে। 

রাজধানীর একটি নামকরা স্কুলে পড়ে জামান। অন্যান্য দিন গেম খেলতে বসলে অন্য দিকে হুঁশ থাকেনা যার সেই জামানই কিনা আজকে গেমে মন বসাতে পারছেনা। প্রিয় দলের বিশ্বকাপ খেলাই যেখানে অনিশ্চিত সেখানে গেম তো বাতুল্য। আজকে ভোরের পর ফুটবল খেলাই আর দেখবে কিনা কে জানে!

ভোর ৫ টা ৩০, ইকুয়েডরের রাজধানী কিটোর ফুটবল স্টেডিয়ামে নিজেদের ফাইনাল ফ্রন্টিয়ারে আর্জেন্টিনা। প্রতিপক্ষ কেবল স্বাগতিক ইকুয়েডর না, তাদের দর্শক এবং ২৮০০ মিটার উচ্চতা! রেফারির ম্যাচ শুরুর বাঁশি হতে না হতেই গোল! আর্জেন্টিনার শিরা ফুটো করে দিল ইকুয়েডর।

রাগে টিভি রিমোট আছাড় মারলেন আজগর মিয়া। “এই দল কইরা কুনুদিন শান্তি পাই নাই, চুতমারানির পুতেরা আমার বাল খেলে, বাল”। টিভি পর্দার সামনে বাকিরাও হতভম্ব। তাহের ভাবে রেডিও অফ করে দিবে, আবার ভাবে মাত্র তো শুরু। জামানের প্রায় কান্না চলে আসে।

চলতে থাকে ম্যাচ। ১২ মিনিটে ডি মারিয়ার সাথে ওয়ান টু ওয়ান খেলে মেসির নিখুঁত ফিনিশ আশা জাগায় সবার মনে। ২০ মিনিটে আবার মেসি, এবার ইকুয়েডরের ডিফেন্ডারের ভুলের সুযোগ নিয়ে বল পাঠিয়ে দিলেন নেটের মাথায়। ১-২! উল্লাসে ফেটে পড়ল আজগর মিয়া ও তার সাথীরা। “হারামির পুতেরা এমবে খেলতারলেই জিতে, আলগা ভাব লইত যা”।

তাহেরের মন কিছুটা শান্ত হয়, সে জানে এখনও অনেক সময় বাকি।

জামান এবার কাঁদে, স্বস্তির কান্না। প্রথমার্ধ শেষ হয় এভাবেই।

দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হয় অনেক আশা আর কিছুটা আশংকা নিয়ে। ইকুয়েডর এর এটাক আতংকের চোরাস্রোত বইয়ে দেয় সবার মনে। ম্যাচের তখন ৬০ মিনিট, সবাই টিভিতে একটা প্রজাপতি দেখতে পেল। মাঠের মধ্যে তিড়িং বিড়িং করে তিনজন ডিফেন্ডারের ফাঁক গলে পড়ে যেতে যেতে এগিয়ে আসা গোলকীপারের মাথার উপর দিয়ে ধাম! কি মোহনীয় পরশ যেন লাগানো আছে ওই বাঁ পায়ে, কোমলতা এত বেশি যেন মনে হয় কেউ মাখন পায়ে ফুটবল খেলছে। মেসির হ্যাটট্রিক হতেই আজগর মিয়ার উঠোন এমনভাবে কেঁপে উঠল যেন ভূমিকম্প হচ্ছে। সবাই জানে ম্যাচের ৩০ মিনিটের মত বাকি, কিন্তু কোনোকিছুই আর আটকাতে পারবে আর্জেন্টিনা কে। আজগর মিয়া জানেন আগামী বছর এই উল্লাস আরো মাত্রা পাবে।

শুয়ে শুয়ে রেডিও শুনতে গিয়ে গিট ব্যথা হয়ে গেছে তাহেরের, এবার উঠে দাঁড়ায় সে, লুঙ্গি টা যেন পড়ে না যায় সেজন্য টাইট করে বেঁধে নেয় সে। যতভাবে পারে হাত-পা ছুঁড়তে থাকে বাচ্চাদের মতো। সে এবার সবচেয়ে বড় পতাকাটা বানাবে। তাহের জানে আজকে অন্য দিনের থেকে অনেক বেশি মাছ পড়বে তার জালে।

জামান তাকিয়ে আছে মেসির চোখের দিকে। ডাগ-আউটের দিকে ছুটছে লিও। তাঁর চোখের কোণায় স্পষ্ট পানি দেখতে পাচ্ছে জামান। দেশের সবথেকে প্রয়োজনের সময়টায় যে নিজেকে মেলে ধরতে পেরেছেন, প্রত্যেকটা সমালোচনার পাই টু পাই হিসাব কড়ায়-গন্ডায় বুঝিয়ে দিয়েছেন লিও।

জামান লিওর চোখের ভাষাটা নিজের চোখের সামনেই ভাসতে দেখল- “Do not criticize me. If you do then I’ll make sure it’s going to be your worst nightmare. You know who I am”.

Russia, be ready. You know who is coming. He is the thunderous storm himself. He is an illusion of seventh sky. He is Lionel Messi.   

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-