আমি আর্জেন্টিনা সমর্থন করি ১৯৯৮ বিশ্বকাপে বাতিস্তুতা আর ওর্তেগাদের দেখে। আমার মতো এমন অনেক আর্জেন্টাইন সমর্থক আছে যারা স্রেফ আবেগের বশে সুন্দর খেলা দেখে আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করেন। আর্জেন্টিনার একজন একনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে বলছি, একেবারে শেষ ম্যাচ পর্যন্ত অপেক্ষা করে বিশ্বকাপ নিশ্চিত করাটা একজন আর্জেন্টাইন সমর্থক হিসেবে খুব গর্বের কিছু না, বরং কিছুটা লজ্জার! এবং আমি অন্তত আমার বন্ধু তালিকায় কাউকে এটা নিয় খুব গর্ব করতে দেখিওনি। ১৯৭০ সালে তো কেউ ব্রাজিল সমর্থক ছিল না। ’৮২-র সুন্দর ব্রাজিলের খেলা দেশের খুব এলিট শ্রেণী বাদে খুব বেশি মানুষ দেখেনি। সুতরাং, অন্তত ১৯৯৪ থেকে বিশ্বকাপ দেখা মানুষেরা ৪ বার অথবা পরে ৫ বারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন; এই সাফল্য দেখে বুঝেশুনে ব্রাজিল সমর্থক হয়েছেন সেটা বলাই যায়। তারা আমাদের মতো অন্ধ আবেগী সমর্থক না। ফুটবল, সাফল্য এগুলো ভালোই বুঝেন এবং লেখা বুঝার মতো সেন্স আছে, এটা অন্তত আশা করাই যায়।

আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ পেয়েছে, এটার মধ্যে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মধ্যে আমি কোন গর্ব দেখিনি। বরং একটা স্বস্তি দেখেছি; আর্জেন্টিনা ছাড়া বিশ্বকাপ হবে; এই ভয় থেকে বের হবার খুশি দেখেছি। অথচ ব্রাজিল সমর্থকেরা দেখছেন “লাফালাফি”!

হ্যাঁ লাফালাফি, আনন্দ-উচ্ছ্বাস, গর্ব প্রত্যেকটাই গতকাল হয়েছে। তবে সেটা আর্জেন্টিনার জয়ের কারণে না। লিওনেল মেসি নামের এক জাদুকরের কারণে। যারা গত ৫-৬ বছর শুধুমাত্র রিয়াল-বার্সা দেখে ফুটবল সমর্থন করে আর মেসি-রোনালদো সমর্থনের কারণে আর্জেন্টিনাকে নিয়ে ট্রল করে তাদের কথা বাদ! তারা আরেকটু বড় হোক!

যারা ফুটবল বোঝেন (ধারণা করি, সাফল্যের দিক দিয়ে সেরা দলের সমর্থকেরা সেটা দেখেই ফুটোবল বোঝেন!), তারা মেসিকে নিয়ে করা প্রশংসার ব্যাপারটা কেন ধরতে পারছেন না, সেটা বুঝি না! তবে গতকাল থেকে আমি আর্জেন্টিনা ফ্যানদের আক্ষেপ করে বলতে দেখেছি যে আর্জেন্টিনা এক মেসি আর ১০ টা কাঠের পুতুল নিয়ে খেলে! এটাই সত্যি। মেসিকে বলা হয় ক্লাব লিজেন্ড! হায়, অথচ মেসি না থাকলে আর্জেন্টিনা গত কয়েক বছরে কী করতো, সেটাই চিন্তার ব্যাপার! বিশ্বকাপ জিততে হলে, বড় টুর্নামেন্ট জিততে হলে দলে এক-দুইজন ম্যাজিক ম্যান থাকতে হবে। সাথে অন্তত গড়পড়তা মানের বাকি দল থাকতে হবে। সমস্যা হচ্ছে, আর্জেন্টিনার সেটা ছিল না। আর্জেন্টিনা গত তিন বছরে তিনটি বড় টুর্নামেন্টে ফাইনাল খেলা দল। একমাত্র এবং শুধুমাত্র মেসির কারণে। কিছুটা ভুল বলা হলো। হয়তো ৯০ ভাগ মেসির কারণে। আর ১০ ভাগের জন্য একটা দল লাগে। ২০১৪ বিশ্বকাপের কথাই মনে করি, প্রথম রাউন্ডে প্রতিটা ম্যাচের ম্যান অফ দ্যা ম্যাচ ছিলেন মেসি। শুধু তাই না, ইরানের সাথে ম্যাচে পর্যন্ত ৯১তম মিনিটে গোল দিয়ে দলকে জিতিয়েছিলেন। গ্রুপ পর্বে বসনিয়া, নাইজেরিয়ার সাথেও তার গোলেই দল পরের রাউন্ডে উঠে। নক আউটে দেখেন। মেসি যত ভালোই খেলুন না কেন, ডি মারিয়া, হিগুয়েন এদের অন্তত একটা করে গোল দেয়া লাগতোই। ফুটবল একা খেলা যায় না। ফাইনালে হিগুয়েন খালি পোস্টেও বল বাইরে মেরেছে বার বার! সেটা ২০১৪ এর বিশ্বকাপ ফাইনাল হোক; বা ’১৫, ’১৬ এর কোপা আমেরিকা ফাইনাল হোক। এইসব কোপা আমেরিকাতেও দলকে ফাইনালে টেনে নিয়ে মেসি। ফ্রিকিকে গোল করে, বা স্ট্রাইকারকে বল বানিয়ে দিয়ে! বিশ্ব ইতিহাসে কোন দলই এক খেলোয়ারের একার নৈপুণ্যে বড় ট্রফি জেতে না।

’৮৬-তে ম্যারাডোনার একজন বুরুছাগা ছিলেন। ‘৯০-তে ছিলেন ক্যানিজিয়া। ম্যারাডোনা ক্যানিজিয়াকে বল বানিয়ে দেয়ার পর ক্যানিজিয়ার কাজ ছিল বলটাকে জালে ঢোকানো। মেসির হিগুয়েন সেটা পারেনি। ’৭০ এর বিশ্বকাপের পেলেকে নিয়ে তো কথা হয়। অথচ সেটাকে ধরা হয় সর্বকালের সেরা দল হিসেবে। পেলে, তোস্তাও, জার্সেন, কার্লোস আল্বার্তো; সর্বকালের সেরা খেলোয়ারদের নিয়ে গড়া একটা দল। কিংবা সর্বজয়ী স্পেনে সবাই ছিল! জিদানের ’৯৮ বিশ্বকাপের দলে ছিলেন বার্থেজ, থুরাম, দেশমেরা। এদের নিয়েই ২০০০ সালে ইউরো জিতেছিলো ফ্রান্স! ২০০২ বিশ্বপকাপের প্রথম দুই ম্যাচে যখন জিদান খেলতে পারলেন না, ফ্রান্স মুখ থুবড়ে পড়লো! আবার ’০৬ বিশ্বকাপে এসে জিদান দলকে ফাইনালে তুললেন! ব্রাজিলের সাথে কোয়ার্টার ফাইনালে জিদানের যেই পারফরম্যান্সকে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম সেরা একক পারফরম্যান্স ধরা হয় সেই ম্যাচেও কিন্তু গোলটা দেবার জন্য থিয়েরী অঁরিকে দরকার হয়েছিলো! আফসোস, মেসিরও হিগুয়েনকেই দরকার হয়! এমনকি পর্তুগাল যে এবার ইউরো জিতলো সেটাতে রোনালদোর কতটা অবদান আর পুরো দল কী করেছে সেটা ভাবুন। রোনালদোর যত অবদানই থাকুক না কেন, ফাইনালে তাকে ছাড়া দলের জয় প্রমাণ করে দলটির শক্তিমত্তা ফেলনা ছিল না।

উদাহরণ অনেক হয়ে যাচ্ছে! মূল টপিকে ফেরত যাই। বিশ্বকাপে সুযোগ পেয়েছে বলে গর্ব করাটা আর্জেন্টাইন ফ্যানদের উচ্ছ্বাসের কারণ হওয়া উচিত না। উচ্ছ্বাসের কারণ লিওনেল মেসি! সেন্সিবল ফ্যান হিসেবে অবস্থাটা চিন্তা করুন। বাঁচা-মরার শেষ ম্যাচে প্রথম মিনিটেই গোল খেয়ে বসলো আর্জেন্টিনা। সেখান থেকে মেসি একাই হ্যাটট্রিক করে দলকে তুলে নিলেন বিশ্বকাপে। নাটক লিখলেও সেখানে প্রথমে গোল খেয়ে হ্যাটট্রিক করে একজন খেলোয়ার একাই দলকে উঠিয়ে নিবেন সেটা ভাবতে চিত্রনাট্যকার কয়েকবার চেষ্টা করবেন। এর সাথে ২০০২ বিশ্বকাপের আগে প্লে অফ ম্যাচে বেকহ্যামের গ্রীসের বিপক্ষে শেষ মিনিটের সেই ফ্রি কিকে দলকে বিশ্বকাপে তোলা, অথবা ২০০৪ ইউরোতে জিদানের শেষ ৩ মিনিটে ২ গোলের একক কৃতিত্বপূর্ণ ম্যাচের তুলনা চলে।

সেন্সিবল ফুটবল ফ্যান হিসেবে চিন্তা করুন! ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার রেষারেষির চিন্তায় না থেকে মেসি কিভাবে একাই দলকে, থুক্কু ‘দেশকে’ টেনে বিশ্বকাপে নিয়ে গেলো সেটা চিন্তা করুন! গ্রেটেস্ট অন দ্যা আর্থের বন্দনা না হোক, অন্তত সাফল্যে বাহবা দেবার মতো মানসিকতা খুঁজে পাবেন! সেরা খেলোয়ারেরা মোক্ষম সময়েই সেরাটা দিয়ে জ্বলে উঠেন! মেসিও তাই উঠেন। তবে ফুটবল তো একার খেলা না! জিদানের যেভাবে অঁরিকে দরকার ছিলো, বা রিভালদো-রোনালদিনহোর দরকারে যেমন রোনালদো সবসময় প্রস্তুত ছিলেন, ফিলিপ লাম-মুলার-শোয়ের্জনেগারদের সামনে যেমন একজন মারিও গোটযে ছিলেন তেমনি মেসিরও মাঝে মাঝে ডি মারিয়া, হিগুয়েনদেরও দরকার হয়! সেটা যেদিন হবে সেদিন আর্জেন্টাইন সমর্থকদের ট্রফির খরা মিটবে সেই আশাই আমরা করতে পারি!

কিন্তু সেটা থাকুক আর না-ই থাকুক, তাতে মেসির গ্রেটেস্ট হবার পথ রূদ্ধ হয় না! আর তাতে মেসিকে নিয়ে মাতামাতিও বন্ধ হবার কোন কারণ নাই! এবং সেটা আপনি যে দলের সমর্থকই হন না কেন।

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-