দুই বছর আগে শতবর্ষী কোপা আমেরিকার ফাইনালে হারের পরে একবার ঘোষণা দিয়েছিলেন জাতীয় দল থেকে অবসরের। টানা তিনটে ফাইনালে শিরোপার নিঃশ্বাস দূরত্ব থেকে ফেরাটা মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছিল লিওনেল মেসির, সেই হতাশা থেকেই হয়তো দিয়েছিলেন অবসরের ঘোষণা।

সেবার অবসর ভেঙে ফিরেছিলেন তিনি। আর্জেন্টিনার সাধারণ ফুটবল ভক্ত থেকে শুরু করে দেশের প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত তাকে ফিরে আসার অনুরোধ করেছিলেন। দেশের হয়ে একটা আন্তর্জাতিক শিরোপা জেতার জন্যে মরিয়া মেসি আবার ফিরেছিলেন আকাশী-সাদাদের জার্সিতে। কিন্ত সেই ফেরাটা দীর্ঘায়িত হলো কই? বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ৩-০ গোলের হারটাই নাকি ইতি টেনে দিতে চলেছে লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের! অন্তত আর্জেন্টাইন মিডিয়ার তো এমনটাই দাবী।

লিওনেল মেসি, আর্জেন্টিনা, বিশ্বকাপ ফুটবল ২০১৮, মেসির ব্যর্থতা

মুন্ডো আলবিসেলেস্তে নামের আর্জেন্টিনার স্থানীয় একটা ক্রীড়াভিত্তিক ওয়েবসাইট দাবী করেছে, ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে শোচনীয় এই পরাজয়ের পরপরই নাকি নিজের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবতে শুরু করেছেন মেসি। আইসল্যান্ডের বিপক্ষে পেনাল্টি মিস করে এমনিতেই মানসিকভাবে খানিকটা নাজুক অবস্থায় ছিলেন মেসি, মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে এসেছে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে পরাজয়টা। পা জোড়া যেন চলছেই না আর! বাছাইপর্বের শেষ ম্যাচে ইকুয়েডরের বিপক্ষে দুর্দান্ত হ্যাটট্রিকে আর্জেন্টিনাকে রাশিয়ার টিকেট পাইয়ে দিয়েছিলেন লিওনেল মেসি, সেই একই মানুষটা বিশ্বকাপের মূলমঞ্চে এখনও পর্যন্ত একেবারেই অনুজ্জ্বল!

লিওনেল মেসি, অবসর, আর্জেন্টিনা, বিশ্বকাপ ফুটবল, জর্জি সাম্পাওলি

এমনিতে গোল ডটকম বিশ্বকাপের আগেই জানিয়েছিল, মেসির নাকি ইচ্ছে আছে বিশ্বকাপ শেষে আর্জেন্টিনার জার্সিটা তুলে রাখার। এখন তো গ্রুপপর্ব থেকেই বিদায়ের মুখে দাঁড়িয়ে মেসির দল। শেষ ম্যাচে নাইজেরিয়াকে হারাতে না পারলে বিদায় জানাতে হবে রাশিয়া বিশ্বকাপকে। মুন্ডো আলবিসেলেস্তে জানাচ্ছে, আর্জেন্টিনা হেরে গেলে আকাশী-সাদা জার্সিতে সেটাই হয়ে যেতে পারে লিওনেল মেসির শেষ ম্যাচ!

ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে হারের পরে মোটামুটি প্রলয় বয়ে গেছে আর্জেন্টিনা দলের ওপর দিয়ে, ঝোড়ো বাতাস থামেনি এখনও, বইছে সজোরে। ঘরের কথা সবটা হয়তো বাইরে আসছে না। তবে মেসি থাকুন বা না থাকুন, এটা মোটামুটি নিশ্চিত যে, কোচ জর্জি সাম্পাওলি খুব বেশিদিন থাকছেন না আর্জেন্টিনার ডাগআউটে। শোনা গেছে, তার ট্যাকটিকসে নাকি ভীষণ বিরক্ত মেসি সহ দলের সিনিয়র খেলোয়াড়েরা।

লিওনেল মেসি, অবসর, আর্জেন্টিনা, বিশ্বকাপ ফুটবল, জর্জি সাম্পাওলি

আইসল্যান্ডের বিপক্ষে গ্রুপপর্বের প্রথম ম্যাচে সাম্পাওলির ডিফেন্সিভ ট্যাকটিকস পছন্দ হয়নি কারোই। ক্রোয়েশিয়ার সঙ্গেও স্বভাবসুলভ খেলাটা খেলতে পারেননি খেলোয়াড়েরা। ডি-মারিয়াকে না খেলানোয় উইং দিয়ে আক্রমনে উঠতে পারেনি আর্জেন্টিনা। ম্যাচের পরে ড্রেসিংরুমে নাকি মেসির নিস্প্রভ পারফরম্যান্স নিয়ে কথা তুলেছিলেন কোচ, আর তাতেই ক্ষেপে গিয়ে কোচকে দু-চার কথা শুনিয়ে দিয়েছেন সিনিয়র খেলোয়াড়েরা। মেসি নিজেও কোচের ওপর বিরক্ত। গার্ডিয়ানসহ বেশ কয়েকটা সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, সাম্পাওলির অধীনে নাকি আর একটা ম্যাচও খেলতে রাজী নয় আর্জেন্টিনার বেশ কয়েকজন খেলোয়াড়।

ম্যাচ শেষে নাকি ড্রেসিংরুমে আলাদা মিটিং হয়েছে খেলোয়াড়দের। সেখানে প্রায় সবাই একমত হয়েছেন কোচ বদল করার ব্যাপারে। বোর্ডের কাছে এটা নিয়ে নাকি দাবীও তুলবেন তারা। নতুন কোচ হিসেবে মেসিদের পছন্দ হোর্হে বরুচাগাকে, এমন গুজবও রটেছে। তবে আর্জেন্টাইন ফুটবল ফেডারেশনের পক্ষে এখনই সাম্পাওলিকে সরিয়ে দেয়াটা কঠিন, এখানে অনেক টাকার ব্যাপার জড়িত। বিশ্বকাপ শেষ হবার আগে সাম্পাওলিকে বরখাস্ত করলে চুক্তি অনুযায়ী  বিশ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ গুণতে হবে ফেডারেশনকে। আর্জেন্টাইন ফুটবল ফেডারেশনের জন্যে টাকার অঙ্কটা বিশাল। তাই হাত পা আপাতত বাঁধাই থাকছে তাদের।

এদিকে আর্জেন্টিনার বেশ কয়েকজন ফুটবল সাংবাদিকের টুইট থেকে জানা গেছে, সাম্পাওলিকে ছাঁটাই করা না হলে সিনিয়র খেলোয়াড়েরা নাকি নিজেরাই অবসরে চলে যেতে পারেন! এই সিনিয়র খেলোয়াড়দের মধ্যে আছে অধিনায়ক লিওনেল মেসি, গঞ্জালো হিগুয়েইন, সার্জিও আগুয়েরো, অ্যাঙ্গেল ডি মারিয়া, মার্কোস রোহো, হাভিয়ের মাচেরানো, লুকাস বিলিয়া, এভার বানেগার মতো খেলোয়াড়দের নাম। ঝামেলা এবার ভালোমতোই লেগেছে বলে মনে হচ্ছে।

লিওনেল মেসি, অবসর, আর্জেন্টিনা, বিশ্বকাপ ফুটবল, জর্জি সাম্পাওলি

কোচের ওপর যে কয়েকজন বেশ বিরক্ত, সেটা ক্রোয়েশিয়ার সঙ্গে ম্যাচ শেষে আগুয়েরোর কথা থেকেই বোঝা গেছে। গোলরক্ষকের অমার্জনীয় ভুলে প্রথম গোলটা হজম করার পরপরই আগুয়েরোকে মাঠ থেকে তুলে নিয়েছিলেন সাম্পাওলি, নামিয়েছিলেন হিগুয়েনকে। সেই পরিবর্তনটা কেন, এটা অনেক ফুটবলবোদ্ধার মাথাতেও ঢোকেনি। ম্যাচশেষে বৃটিশ দৈনিক দ্য সানের পক্ষ থেকে আগুয়েরোর কাছে তাদের পরিকল্পনা নিয়ে জানতে চাওয়া হয়েছিল। আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকার বেশ চাঁছাছোলাভাবেই জবাব দিয়েছেন- “আমাদের কোচকেই জিজ্ঞেস করুন, তার কি ইচ্ছে, তিনি কি চান!” সাম্পাওলি অবশ্য সংবাদ সম্মেলনে ম্যাচ হারের সব দায় নিজের ঘাড়ে নিয়েছেন।

প্রথম ম্যাচে ড্র, দ্বিতীয় ম্যাচে হাত, সময়টা একদমই ভালো যাচ্ছে না আর্জেন্টিনা দলের। দল হারলে বাজারে হাজারটা গুজব রটবে। এগুলোও শুধু গুজবই কিনা কে জানে, কোনপক্ষই তো এখনও পরিস্কার করে কিছু বলেনি। তবে গুজব হোক আর যাই হোক, আর্জেন্টিনার ড্রেসিংরুম যে শান্ত নেই, সেটা মোটামুটি নিশ্চিত। একটা ম্যাচ যে কত কিছু পাল্টে দিতে পারে, কত ভয়ঙ্কর কম্পন সৃষ্টি করতে পারে, সেটা ক্রোয়েশিয়ার কাছে আর্জেন্টিনা না হারলে হয়তো বোঝাই যেতো না!

তথ্যসূত্র- মুন্ডো আলবিসেলেস্তে, দ্য সান।

Comments
Spread the love