সারা ফুটবল বিশ্ব একটা শঙ্কায় কেঁপে উঠেছিলো-তাহলে এবার বিশ্বকাপে দেখা যাবে না লিওনেল মেসিকে!

শঙ্কাটা আরও তীব্র হয়ে উঠেছিলো। এই ম্যাচটা আর্জেন্টিনাকে জিততেই হতো। সেই ম্যাচেই ইকুয়েডরের বিপক্ষে এক মিনিট পার হওয়ার আগেই গোল হজম করে বসলো আর্জেন্টিনা। মেসিভক্তরা শুধু নয়, মেসির প্রবল শত্রুও ভয় পেলেন-এবার বুঝি গ্রহের সেরা ফুটবলারকে ছাড়াই বিশ্বকাপ আয়োজন হয়!

নাহ। শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। সেই মেসি নিজের কাঁধেই তুলে নিলেন সব দায়িত্ব। সারা পৃথিবীর ফুটবল ভক্তদের প্রত্যাশা আর আর্জেন্টিনার প্রবল চাপ জয় করে নিলে বাম পা দিয়ে। একটা নয়, দুটো নয়; রীতিমতো হ্যাটট্রিক করে আর্জেন্টিনাকে তুলে নিয়ে গেলেন রাশিয়া বিশ্বকাপে। বিশ্বকাপ বঞ্চিত রইলো না মেসির খেলা থেকে।

অনেক সমীকরণের রাতে ইকুয়েডরকে মেসির হ্যাটট্রিকে ৩-১ গোলে হারিয়ে লাতিন আমেরিকা অঞ্চল থেকে বিশ্বকাপে গেলো আর্জেন্টিনা। এ যেনো আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপে যাওয়া নয়, মেসির কাঁধে চড়ে আর্জেন্টিনা নামে একটি দেশের ফুটবল সমুদ্র পাড়ি দেওয়া।

মেসির এমন ম্যাজিক বার্সেলোনার হয়ে অনেকবার দেখা গেছে। কিন্তু নিঃসন্দেহে বলা যায়, এটা ছিলো আর্জেন্টিনার হয়ে লিওনেল মেসির সেরা একক শো। হ্যা, এর আগে অনেকবার এমন একক প্রদর্শনীতে ছিড়ে ফেলেছেন প্রতিপক্ষের রক্ষন, অনেকবার এমন ঝলকে-চমকে চমকে দিয়েছেন প্রতিপক্ষকে। কিন্তু এইভাবে চাপের মুখে, প্রত্যাশার মুখে দাড়িয়ে এই হ্যাটট্রিক অবশ্যই এক অতিমানবীয় পারফরম্যান্স।

কিন্তু কী ছিলো এই পারফরম্যান্সের রহস্য?

চাপের অনুপ্রেরণা? হ্যাঁ, সেটা একটা ব্যাপার। সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় যখন এমন চাপের মুখে পড়েন, সেটা তার জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে যেতেই পারে। কিংবা এটাকে বলা যায় দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া মেসির পাল্টা আক্রমন?

বলা যায়।

মেসি আর্জেন্টিনার হয়ে কিছু পারেন না-এই বাক্যটা একটা মিথ্যে মিথে পরিণত হতে বসেছিলো। পরপর তিন বছর বিশ্বের সেরা তিনটি আসরের ফাইনালে তুলেছেন আর্জেন্টিনাকে। প্রতিটি আসরে দলের এবং আসরের সেরা খেলোয়াড় ছিলেন এই মেসি। তারপরও তাকে বারবার ‘ক্লাবের মেসি’ এই গালিগালাজ হজম করতে হয়েছে। সেই গালি গালাজের চূড়ান্ত রূপ শুরু হচ্ছিলো এবার।

অপেক্ষায় ছিলেন ডিয়েগো ম্যারাডোনারা। গতকাল রাতে যদি আর্জেন্টিনা হেরে যেতো, এতোক্ষনে মেসির কুশপুত্তলিকা নয়, আসল দেহটাই হয়তো দাহ হয়ে যেতো। এই দহন থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় ছিলো নিজের কাঁধেই অ্যাটলাসের সমান ভার তুলে নেওয়া। সেটাই করেছেন মেসি।

কিন্তু রহস্য কী এখানেই শেষ হলো?

আমার মনে হয় না। মেসি এমন চাপে আগেও পড়েছেন, মেসির পিঠ এমন দেয়ালে আগেও ঠেকে গেছে। চিলির বিপক্ষে সেই ফাইনাল বা জার্মানির বিপক্ষে ফাইনালের কথা ধরুন। তখন তো মেসির পা থেকে হ্যাটট্রিক বের হয়নি। তাহলে এবার কিভাবে বের হলো।

উত্তর- অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়া।

হ্যাঁ, ঠিক শুনেছেন। মেসির তিন নম্বর গোলটি বাদ দিন। প্রথম দুটি গোল ফিরে দেখুন। প্রথম গোলটি দেখুন। প্রবল গতিতে প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের কাটিয়ে বক্সে ঢুকে মেসি বল দিলেন ডি মারিয়াকে। এখান থেকে এর আগ অবদি ইতিহাসে দেখা গেছে আর্জেন্টিনার হয়ে খেলার সময় ডি মারিয়া বলটা পোস্টের বাইরে মেরে দেবেন। এই প্রথম দেখলাম তা করলেন না সাবেক রিয়াল তারকা।

ডিফেন্ডার একটু এগিয়ে গিয়েছিলেন। তার এক লাইন পেছন থেকে মেসিকে আবার ফিরতি পাস দিলেন ডি মারিয়া। আর এখানেই মেসি পেয়ে গেলেন স্বপ্নের সেই ফিরতি পাস।

২০০৬ সাল থেকে এই পাসটাই খোঁজ করছিলেন মেসি। বার্সেলোনাতে যে পাস তাকে ইনিয়েস্তা দিতেন, সুয়ারেজ দেন; যে পাস বয়সভিত্তিক ফুটবলে এই ডি মারিয়া কিংবা আগুয়েরো দিয়েছেন, সেই ফিরতি পাসের অপেক্ষায় ১১টা বছর কাটিয়ে দিলেন লিওনেল মেসি।

আর্জেন্টিনাতে মেসি আর কিছু চাননি। তাকে ম্যারাডোনার মতো পুজো করতে বলেননি তিনি, এমনকি তেভেজের মতো জনপ্রিয়ও হতে চাননি। দিবালা কিংবা আগুয়েরোকে বলেননি যে, আর্জেন্টিনার হয়ে হ্যাটট্রিক করে দাও। শুধু চেয়েছিলেন ফিরতি পাস। সেই পাসটার অভাবেই এই ১১টা বছর খলায় খরায় কেটে গেলো।

অবশেষে ডি মারিয়া কাজটা করতে পেরেছেন। রাশিয়া বিশ্বকাপ আসছে। আর কয়েকটা ম্যাচে কাজটা করতে পারবেন তো ডি মারিয়া? পারলে বাকীটা মেসি দেখবে।

আপনার কাছে কেমন লেগেছে এই ফিচারটি?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-

এই ক্যাটাগরির অন্যান্য লেখাগুলো