বছর দুয়েক আগে এই ইকুয়েডরের কাছে হেরেই বাছাইপর্ব শুরু করেছিল আর্জেন্টিনা! সরাসরি বিশ্বকাপে সুযোগ করে নেয়ার জটিল সমীকরণেও আজ ভোরে আর্জেন্টিনার সামনে শেষ ম্যাচে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল ওরাই। সীমাহীন সমালোচনার চাপ, নিজেদের বাজে ফর্ম, স্টেডিয়ামের উচ্চতা, অতীত ইতিহাস- সবকিছুই বিপক্ষে রেখে বিশ্বকাপ খেলতে না পারার শঙ্কায় মাথার ওপরে নিয়েই ম্যাচটা খেলতে নেমেছিল জর্জি সাম্পাওলির আর্জেন্টিনা। কিন্ত সব সমালোচনা, সব আশঙ্কা উড়িয়ে দিলেন ওই একজন। দ্যা গেম চেঞ্জার, দ্যা আল্টিমেট ম্যাচ উইনার- লিওনেল আন্দ্রেস লিও মেসি- দ্য ম্যাজিশিয়ান!

ইকুয়েডরকে ৩-১ গোলে হারিয়ে ল্যাটিন আমেরিকার বাছাইপর্বে তৃতীয় হয়ে সরাসরি বিশ্বকাপের টিকেট কেটেছে আর্জেন্টিনা- এই খবরটা এতক্ষণে বাসী হয়ে গেছে। যারা রাত জেগেছেন তারা জানেন, ইকুয়েডরের এস্তাদিও অলিম্পিয়াকোতে কি দারুণ ফুটবলের পসরা বসেছিল আজ! না, দলীয় সমন্বয় নয়, ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে ভাস্মর এক ম্যাচ দেখেছে ফুটবল বিশ্ব। মেসিময় একটা ম্যাচ, যেটা বার্সেলোনার জার্সিতে দেখা যায় অহরহ, নীল-সাদা কেতনে যে তাণ্ডব অনুপস্থিত বরাবরই, আজ সেই সুনামি এসে আঘাত হানলো ইকুয়েডরে। মেসির বাম পায়ের সর্বনাশা জলোচ্ছ্বাসে বিলীন হলো স্বাগতিকেরা।

ম্যাচের শুরুটা দেখে কে কি ভেবেছিলেন কে জানে, তবে মেসি ভেবেছিলেন অন্যকিছু। চল্লিশ সেকেন্ডেই পিছিয়ে পড়া দলটার ফিরে আসার জন্যে প্রয়োজন ছিল জাদুর পরশ, দলে জাদুকর তো একজন আছেনই! সেই লিওনেল মেসি ঝোলা থেকে একটা দুটো তিনটে করে একে একে বের করলেন গোল নামের পরশপাথরগুলো। প্রথমটা দলকে সমতায় ফেরালো, পরেরটা ম্যাচে লিড এনে দিলো, আর শেষটা দিয়ে তো ইকুয়েডরের কফিনে পেরেক ঠুকে দিলেন জাদুকর। আর সেইসঙ্গে আর্জেন্টিনা দলের জন্যে রাশিয়ার বিমানের টিকেটটাও কেটে ফেললেন মেসি!

মেসি, আর্জেন্টিনা, বিশ্বকাপ ফুটবল

অথচ ভিন্ন মেজাজে শুরু হওয়া ম্যাচটা যে এমন হবে, কে জানতো? জানতেন, একজন ঠিকই জানতেন। লিওনেল মেসি জানতেন। কথাবার্তায় খুব বেশী পটু নন তিনি, মুখটা তার কখনোই চলে না তেমন। তবে চালানোর মতো অস্ত্র তো বিধাতা তার শরীরেই দিয়ে দিয়েছেন, তার বাম পা’টা তো লিওনার্দো ভিঞ্চির মতো নিখুঁত কোন চিত্রপট ফুটিয়ে তোলে ফুটবল মাঠে, মোৎজার্টের অদ্ভুত সুন্দর কোন সিম্ফোনির তাল তলে সবুজ ঘাসের বুকে! ডি মারিয়ার সঙ্গে ওয়ান-টু-ওয়ান পাসে পেলেন প্রথম গোলটা। এর আগে কত পাস দিয়েছেন সতীর্থদের, সেগুলো মেসির কাছে ফিরে আসেনি আর। আজ এলো, ডি মারিয়া পারলেন অতীতের ধারা ভাঙতে। বার্সায় যেগুলো ইনিয়েস্তা করেন, আজ মারিয়া বুঝি ইনিয়েস্তা হতে চাইলেন! আজকের দিনটাই তো অন্যরকম ছিল। আজ মেসির দিন, আজ জাদুকরের অন্যতম সেরা ম্যাজিক শো’য়ের দিন বলে কথা!

ইকুয়েডরের ডিফেন্ডারের পা থেকে বলটা কেড়ে নিয়ে ছুটলেন সামনে, ডি বক্সে আড়াআড়িভাবে ঢুকে জোরালো এক কিক- কার সাধ্যি আছে এই আগুণের গোলায় হাত পোড়াবে! ইকুয়েডরের গোলরক্ষক তবু হাতটা বাড়িয়েছিলেন, কিন্ত বল তার নাগালের অনেকটা বাইরে দিয়েই জড়ালো জালে। লিওনেল মেসি ছুটলেন, দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ করে বাতাসে ছুঁড়ে দিলেন, যেমনটা দিয়েছিলেন পিএসজির সঙ্গে ৬-১ এ জিতে। আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সি গায়ে লিওনেল মেসি, মুখটা হাসিতে উদ্ভাসিত- খুব কমই দেখা মেলে এমনটা। আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির মাঠে নামা মানেই তো অতলান্ত বিষাদের কিছু পংক্তির সমষ্টি ছিল এতদিন!

মেসি, আর্জেন্টিনা, বিশ্বকাপ ফুটবল

ডি মারিয়ার ভলিটা বুকে ঠেকিয়ে মাটিতে নামালেন, তারপর আবার ছুট দিলেন কোণাকুণিভাবে। দু’জন ডিফেন্ডার সামনে, মেসি ঝুঁকি নিলেন না। ডি-বক্সের সীমানা থেকেই চিপ করলেন, তার সেই ট্রেডমার্ক চিপ, ন্যু-ক্যাম্প কিংবা স্পেন যেগুলোর সাক্ষী হয় নিয়মিত, ইউরোপের এক ঝলক ঠাণ্ডা বাতাস বুঝি মেসি আজ নিয়ে এসেছিলেন সঙ্গে করে। গোলরক্ষককে ফাঁকি দিয়ে চর্মগলক জড়ালো জালে। গত ম্যাচে পেরুর বিপক্ষে একটা গোলের জন্যে কত হাপিত্যেশ করেছেন মেসি, দু’বার গোলপোস্টে লেগেছিল তার শট। আজ আর পোস্ট বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারলো না মেসির তাণ্ডবের সামনে! আজ তো মেসির দিন!

এস্তাদিও অলিম্পিয়াকো’তে মেসি যখন নিজের কাজটা করে চলেছেন, ভাগ্যবিধাতা তখন আর্জেন্টিনার পথের কাঁটা দূর করতে ব্যস্ত। ব্রাজিলে চিলি হেরেছে ৩-০ গোলে, গোলশূন্য ড্র হয়েছে আর্জেন্টিনার ওপরের দুই দল পেরু আর কলম্বিয়ার ম্যাচ। ঠিক যেমনটা হলে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপের পথ সুগম হবার কথা, তেমনভাবেই সবকিছু ঘটেছে কাকতালীয়ভাবে। ভাগ্য সাহসীদের পক্ষে থাকে, ভাগ্য বিজয়ীদের পক্ষে থাকে। আজ ভাগ্যের লিওনেল মেসির পক্ষে না থেকে উপায় ছিল না। প্রতিপক্ষ, নিজেদের বাজে ফর্ম অথবা উচ্চতাজনিত ভীতি- কোনটাই আজ রুখতে পারেনি মেসিকে। আজকের মেসি দুর্বার, তাকে রুখবে এমন সাধ্যি কার! 

দলকে রাশিয়ার ভিসা জোগাড় করে দিয়েছেন মেসি, ওয়ান ম্যান আর্মি হয়ে নিজের দেশকে তুলেছেন বিশ্বকাপের মূলমঞ্চে। লিওনেল আন্দ্রেস ‘লিও’ মেসি- সমালোচনার জবাবটা যিনি বাম পায়ে দেন, সব বাধা যিনি বাম পায়ে গুঁড়িয়ে দেন, ফুটবল মাঠে যার পা’জোড়া শিল্পির তুলি হয়ে এঁকে যায় সৃষ্টিশীল আর দৃষ্টিনন্দন এক চিত্রকল্প। সবুজ ঘাসে ঢাকা একশো বিশ বাই আশি গজের মঞ্চে যিনি একটার পর একটা অদ্ভুত সুন্দর জাদু দেখিয়ে চলেন প্রতিনিয়ত! সাধে তো আর তাকে ম্যাজিশিয়ান ডাকা হয় না!

আপনার কাছে কেমন লেগেছে এই ফিচারটি?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-

এই ক্যাটাগরির অন্যান্য লেখাগুলো