ছেলেটির লম্বা চুল তার চোখ দুটি পর্দার মত ঢেকে দিচ্ছিল। বাকি ছেলেরা মেসিকে খুব একটা নজরে নেয় নি। তাদের দৃষ্টিতে মেসি ছিল আর দশটা সাধারণ ছেলের মত যে বার্সেলোনায় ট্রায়াল দিতে এসেছে। ট্রেনিং গ্রাউন্ডে প্রবেশের আগে ড্রেসিং রুমের বাইরে মেসি কাপড় বদলাতে শুরু করল। ১৩ বছর বয়সী ভবিষ্যতের বিশ্বকাপজয়ী জেরার্ড পিকে এবং সেস্ক ফ্যাব্রিগাস সহ অন্য ছেলেদের সাথে মেসি এক কর্ণারে অপেক্ষা করছিল।

১৮ সেপ্টেম্বর ২০০০, সোমবারের স্নিগ্ধ সন্ধ্যা। রোজারিও থেকে ২৪ ঘন্টার প্লেন জার্নি করে সেদিন দুপুরে মেসি প্রথমবারের মত স্পেনে পৌছায়। ব্যাগপত্র রেখে হোটেলে বিশ্রাম নেয়ার মত সময় তার ছিল না। সমবয়সী দলের সাথে সন্ধ্যা ৬ টার ট্রেনিং সেশনে যোগ দিতে বার্সেলোনা নির্দেশ দিয়েছিল। আর সবার মত মেসিও ছিল একজন যে ট্রায়ালের পরীক্ষা পার হয়ে ক্লাবে ভর্তি হতে চাচ্ছিল। কিন্তু তার আয়তন পার্থক্য গড়ে দিচ্ছিল। সে ছিল খর্বাকৃতির।

‘যেদিন মেসি প্রথমে এখানে আসে আমরা দেখেছিলাম সে কত ছোট ছিল! কত হাড্ডিসার ছিল! আমাদের মনে হল আমরা বোধহয় ওকে খেয়ে ফেলতে পারব। কিন্তু যখন সে বল স্পর্শ করল, তার পা থেকে বল কেড়ে নেয়া অসম্ভব হয়ে গিয়েছিল।’ স্মৃতিচারণ করছিলেন সেদিন ট্রায়াল দিতে আসা মার্ক পেদরাজা। নব্বইয়ের মাঝামাঝিতে ব্রাজিলিয়ান রোনালদো যখন ক্যাম্প ন্যুকে বিকশিত করছিল, তখন মেসি বার্সেলোনা সম্পর্কে ধারনা পায়। বার্সেলোনায় ট্রায়ালের সুযোগ পেয়ে সে রোমাঞ্চিত ছিল, একাডেমিতে সুযোগ পেতে সে সবকিছু করতে প্রস্তুত ছিল।

শুরু হল ১৭ মাসের অগ্নিপরীক্ষা।

জোসেপ মারিয়া মিনগুয়েলা, যিনি ম্যারাডোনা, রোমারিও, রিভালদোদের বার্সায় নিয়েছিলেন, ২০০০ সালের শুরুতে মেসির প্রতিভার খবর তার কানে আসে। রোজারিওতে অনেক আগেই মেসির বিস্ময়ের খবর ছড়িয়ে পরেছে। শহরের কয়েকটি পত্রিকা তাকে নিয়ে লিখেছিল। নয় বছর বয়স থেকে নিউয়েলস ওল্ড বয়েজের মাঠে প্রোফেশনাল ম্যাচ শুরুর আগে বল জাগোল করতে তাকে পাঠানো হত। সেখানে মেসি ১৫ মিনিটের মত নিজের কারিকুড়ি দেখাত। দর্শকরা আনন্দে তার দিকে কয়েন ছুড়ত।

কিন্তু মিনগুয়েলা দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। মেসির বয়স খুব কম, উচ্চতায় অনেক ছোট। শুধুমাত্র সহকর্মীদের বারবার তাড়া দেয়ায় পুরোনো বন্ধু চার্লি রেক্সাসের কাছে মেসির কথা জানান মিনগুয়েলা। রেক্সাস তখন বার্সেলোনার টেকনিক্যাল ডাইরেকটর এবং প্রেসিডেন্টের ডান হাত। রেক্সাস আগ্রহ দেখালেন। তিনি ভেবেছিলেন মেসির বয়স হয়ত ১৮/১৯। কিন্তু মিনগুয়েলা যখন তাকে জানালেন মেসির বয়স ১৩, আশ্চর্য হয়ে রেক্সাস প্রশ্ন করলেন ‘তুমি কি পাগল?’ কিন্তু মিনগুয়েলার জোরাজুরিতে পরে মেসিকে ট্রায়ালের সুযোগ দিতে রাজি হন রেক্সাস।

মিনগুয়েলা, মেসি, আর মেসির বাবা জর্জ ২০০০ এর সেপ্টেম্বরে বার্সেলোনায় আসলেন। ট্রেনিং ভালই হল। খুব দ্রুত ইয়ুথ কোচদের মনোযোগ আকৃষ্ট করতে সক্ষম হল মেসি। কিন্তু বিপত্তি ঘটল অন্যখানে। ইয়ুথ কোচের সবাই মেসিতে মুগ্ধ হলেও ভিন্ন এক মহাদেশ থেকে এত কমবয়সী প্লেয়ারকে নিতে সবাই দ্বিধান্বিত ছিল। এমনটা আগে কখনো ঘটে নি। তাছাড়া নিশ্চয়তা কি যে এই ছেলে সব ইয়ুথ গ্রেড শেষ করে মূলদলে জায়গা করে নিবে? সবাই সিদ্ধান্ত নেয়ার ভার রেক্সাসের উপর ছেড়ে দিলো। কিন্তু রেক্সাস তখন ২০০০ সালের অলিম্পিকের জন্য সিডনীতে ছিলেন। যেখানে তিনি স্যামুয়েল ইতোর ক্যামেরুনের কাছে জাভি হার্নান্দেজ আর কার্লেস পুয়োলদের স্পেনকে অলিম্পিকের স্বর্ণ হারতে দেখছিলেন।

সেপ্টেম্বরের শেষ দিনগুলো গড়িয়ে চলছে। মেসিরা উদ্বিগ্ন হয়ে পরল। রেক্সাসের অপেক্ষায় মেসিদের আর্জেন্টিনায় ফেরার টিকিট পেছাতে হল। অক্টোবরের ২ তারিখ রেক্সাস ফিরলেন।

মেসিকে তার চাইতে দুই বছরের বড় ছেলেদের বিপক্ষে খেলতে দিতে বললেন রেক্সাস। ইয়ুথ টিমের সব কোচ মাঠে চলে এসেছেন। ম্যাচ শুরু হবে এখনই। কিন্তু রেক্সাসের দেখা নেই। হঠাত মাঠের এক প্রান্তে তাকে দেখা গেল। এক সহকর্মীর সাথে কথা বলতে বলতে এদকেই আসছেন তিনি। ম্যাচ শুরু হল। রেক্সাস মাঠের কিনার ধরে হেটে গোলপোস্টের পেছনে গিয়ে থামলেন। কিছুক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে খেলা দেখলেন। তারপর হেটে গিয়ে বেঞ্চে বসা কোচদের বললেন ‘তোমরা ছেলেটাকে সাইন করাতে পারো। সে বিশেষ কিছু।’

রেক্সাস চলে গেলেন। তিনি মাঠে দশ মিনিটের মত খেলা দেখেছেন। কিন্তু যতটুকু দেখার প্রয়োজন ছিল, দশ মিনিটেই দেখে নিয়েছেন।

পরদিন মেসিরা আর্জেন্টিনায় চলে গেল। পরবর্তী পদক্ষেপ এবারে বার্সা নেবে। কিন্তু কোন খবর এল না। বার্সেলোনা কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। এর আগে ভিন্ন মহাদেশ থেকে এত কমবয়সী কাউকে কোন দল সাইন করায় নি। কিন্তু পরবর্তীতে সে গ্রীষ্মেই নিউয়েলস ওল্ড বয়েজের বারো বছর বয়সী লিয়ান্দ্রো দেপেত্রিস্কে এসি মিলান সাইন করিয়েছিল।

‘পুরো বিশ্ব মেসিকে নিয়ে সংশয়ে ছিল। সবচেয়ে বড় সংশয় ওর আকৃতি নিয়ে। টেকনিক্যালি কেউ ওর খেলা নিয়ে সন্দেহ করে নি। সে ছিল অসাধারণ। কিন্তু সবাই বলেছিল অন্য প্লেয়াররা যখন তাকে ট্যাকল করবে, সে স্রেফ কচুকাটা হয়ে যাবে। ওর সমস্যা দৈহিক গঠনে।’ বলছিলেন মিনগুয়েলা।

মেসি বেড়ে ওঠার জন্য চিকিৎসা নিচ্ছিল। রোজারিওর ডাক্তার দিয়েগো সোয়ার্টজস্টাইন বললেন ‘নিউয়েলসের এক লোক এসে আমায় বলল তাদের অসাধারণ প্রতিভার এক প্লেয়ার আছে। কিন্তু সে খুবই ছোট। তারা চাইছিল ওর বেড়ে উঠতে আমি কোন সাহায্য করতে পারব কিনা। মেসির তখন নয় বছর বয়স। স্বাভাবিক ছেলেদের চাইতে সে ছিল ৪ ইঞ্চি খাটো।’

ডাক্তার মেসিকে হরমোন বৃদ্ধির ইনজেকশন নেবার পরামর্শ দিলেন। মেসির ভয় দূর করতে তিনি বলেছিলেন ইনজেকশন ব্যথানাশক, একটা মশার কামড়ের চাইতেও কম ব্যথা অনুভূত হবে। নয় বছরের মেসিকে নিজে নিজে পায়ে ইনজেকশন পুশ করতে হত। সে স্কুলে এবং বেশি সময়ের জন্য বাইরে গেলে কিংবা বন্ধুদের বাসায় গেলে সাথে করে মেডিকেল সামগ্রী নিয়ে যেত। যদিও ডাক্তার বলেছিলেন ইনজেকশন ব্যথানাশক, কিন্তু ইনজেকশন নেবার পর অনেকসময় সে ব্যথায় নড়তে পারত না।

চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ছিল। প্রতি মাসে প্রায় এক হাজার ইউরো। মেসির বাবা প্রথমে চিকিতসার খরচ তার চাকরি এবং হেলথ ইনস্যুরেন্স থেকে বহন করেছিলেন। সেখান থেকে খরচ বহন অসাধ্য হয়ে পরলে নিউয়েলস তাদের সেরা প্লেয়ারের জন্য সাহায্যের হাত বাড়ায়। কিন্তু এত ব্যয়বহন তাদের পক্ষেও সম্ভব ছিল না। হতাশ জর্জ মেসি তার ছেলেকে রিভারপ্লেটে ট্রায়ালের জন্য নিয়ে গেলেন। রিভারপ্লেট মেসিদের শর্তে রাজি হল না। নিউয়েলস মেসিকে ছাড়তে চাচ্ছিল না। অন্যদিকে মিনগুয়েলা বার্সায় মেসিকে সাইন করাতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। মেসিরা জানতেন বার্সা তাকে সাইন করালে ব্যয়বহুল চিকিতসার খরচের একটা সমাধান হবে।

ফিফার নিয়মকানুনের বেড়াজালে পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে হল। এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশে যেতে হলে মেসির সাথে অবশ্যই তার পরিবারকেও সেখানে থাকতে হবে। মেসির বাবার চাকরি খুজে পেতে হবে। খরচের অংকটা আকাশ ছুবে! মেসির বাবা চাননি তার ছেলে লা মাসিয়ার বোর্ডিং হাউসে থাকুক। বার্সার ততকালীন প্রেসিডেন্ট জোয়ান গ্যাসপার্টের ভাষায়: ‘মেসির বাবা বলেছিলেন তিনি চান মেসি তাদের সাথে থাকুক। অন্যান্য স্প্যানিশ ছেলেদের সাথে ১৩ বছর বয়সী আরেক মহাদেশ থেকে আসা অসুস্থ ছেলের জন্য এখানে থাকা সত্যি কষ্টসাধ্য। তাই তাকে তার পরিবারের সাথে থাকতে দিতে হয়েছিল। অ্যাপার্টম্যান্টের ভাড়া বার্সেলোনার বহন করতে হবে, যেটি স্বাভাবিক ব্যাপার না। আমাদের লা মাসিয়ায় থাকার ব্যবস্থা স্বত্তেও আমরা কেনো ওর জন্য আলাদা বাসস্থানের খরচ বহন করব? আমি রাজি ছিলাম না। কিন্তু চার্লি রেক্সাস, যার একজন প্লেয়ারের লুকিয়ে থাকা ট্যালেন্ট আগেই দেখে নেয়ার জন্য দুটি বিচক্ষণ চোখ ছিল, সে আমাকে বলল: প্রেসিডেন্ট আমাদের ব্যতিক্রম কিছু করতে হবে। এই ছেলেটির মধ্যে আমি এমন কিছু দেখেছি, যা আগে কারো মধ্যে দেখিনি।’

রোজারিওতে সপ্তাহের পর সপ্তাহ কেটে যেতে লাগল। ২০০০ এর ডিসেম্বরেও বার্সেলোনা কোন সিদ্ধান্ত জানাল না। মেসির পরিবার আর দেরি করতে পারছিল না। তারা বার্সাকে আলটিমেটাম দিলো। রোজারিওর ব্যবসায়ী রুবেন হোরাসিও গাগিওলি, ১৯৭০ থেকে বার্সেলোনায় বসবাস করে আসছেন, তিনি মেসির প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছিলেন। সে সময় এসি মিলান মেসির ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করে। অ্যাটলেটিকো আর রিয়াল মেসির খবর জানতে পারে। ১৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় গাগিওলি, মিনগুয়েলা আর রেক্সাস বিষয়টির সমাধানের জন্য এক রেস্টুরেন্টে মিলিত হলেন। রেক্সাস ওয়েটারের কাছ থেকে কাগজ কলম নিয়ে মেসিকে সাইন করানোর প্রথম চুক্তি স্বাক্ষর করেন। পরদিন গাগিওলি কাগজটি প্রমাণ হিসেবে রাখার জন্য নোটারী করিয়ে নেন। আজও তিনি সে কাগজটি ব্যাংকের সেফ ডিপোজিট বক্সে রেখে দিয়েছেন। মেসিরা কখনো কাগজটি দেখে নি। সেখানে নামগত এবং অন্যান্য ত্রুটি ছিল। কিন্তু তবুও এটি মেসিদের ভীত নার্ভকে প্রশমিত করতে যথেষ্ট ছিল।

রেক্সাস তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক জোয়ান লাকুয়েভাকে নির্দেশ দেন ন্যাপকিনের কন্ট্রাক্টটির হাড়ের মধ্যে কিছুটা মাংসের ব্যবস্থা করতে। অর্থাৎ কন্ট্রাকটি সঠিকভাবে ত্রুটিমুক্ত করে বানাতে নির্দেশ দেন। বার্সেলোনা মেসির সম্পূর্ন মেডিকেল খরচ বহন করবে, মেসির বাসস্থানের খরচ দেবে এবং জর্জ মেসির চাকরির ব্যবস্থা করবে।

২০০০ এর শীতে ঘটনা ভিন্ন দিকে মোড় নিল। বার্সেলোনা মূল দল তখন লা লিগায় বাজে সময় পার করছিল। লুইস ফিগোর রিয়ালে যোগদান বার্সেলোনা কর্তৃপক্ষ মেনে নিতে পারছিল না। জোয়ান লাপোর্তা ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছিলেন আর ততকালীন প্রেসিডেন্ট জোয়ান গ্যাসপার্টের রাজনৈতিক ভিত শক্ত ছিল না। গ্যাসপার্ট যুগের পতন তখন অনিবার্য। পৃথিবীর আরেক প্রান্ত থেকে আসা ১৩ বছরের ছেলেকে নিয়ে ভাববার তাদের সময় কোথায়?

মেসির অবস্থার আশু সমাধান প্রয়োজন ছিল। রেক্সাস এবং ল্যাকুয়েভার আশ্বাসের ভিত্তিতে ২০০১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি মেসি বার্সেলোনায় পৌঁছায়। যদিও তার সাথে বার্সেলোনার অফিশিয়ালি কন্ট্রাক্ট করা তখনো বাকি। আকাশে মেঘ ঘনীভূত হয়েছে, ঝড় আসছে। ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্ট লাপোর্তা আর তার ডান হাত এভারিস্ট মুর্তরা (যারা পরবর্তীতে মেসির জাদুতে নিজেদের সাম্রাজ্য বিস্তৃত করেছিলেন) দুজনেই মেসির সাইনিং এবং তার পেছনে ক্লাবের খরচের বিরোধিতা করে এটিকে ‘লজ্জাকর সিদ্ধান্ত’ বলে ঘোষনা করলেন।

২৫ বছর যাবত বার্সেলোনার ডেপুটি ডাইরেক্টর জেনারেলের দায়িত্ব পালন করে আসা ধূসর চুলের পেরেরা ন্যু ক্যাম্পের হর্তাকর্তাদের সাথে মেসির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে প্রেসিডেন্ট অফিসে ছয় সদস্যের জরুরী মিটিংয়ে বসলেন। গুমোট এক পরিস্থিতি। অধিকাংশ ব্যক্তি জানালেন এটা স্রেফ পাগলামি। এরকম তরুন একজনের পেছনে এত খরচের কোন মানে হয় না। তাছাড়া মেসির ব্যাপারটা অনেক শর্তযুক্ত। যদি সে হরমোন চিকিৎসা নিয়েও পুরোপুরি সেরে না উঠে? নিউয়েলসের সাথে দর কষাকষির কি হবে? (২০০১ এর জানুয়ারিতে নিউয়েলস আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে মেসিকে রেজিস্টার করতে চেয়েছিল। আর্জেন্টিনাতে ১৩/১৪ বছরের কম বয়সী প্লেয়ার লাইসেন্সের আওতাধীন হয় না।) নিউয়েলসে মেসি উইন্টারের সময়টাতে নিয়মিত খেলেছে। নিউয়েলস মেসিকে রেজিস্টার করে ফেললে বার্সেলোনা ট্রান্সফার ফির ফাদে পরবে। তাছাড়া নিউয়েলসের কাছে কি মেসির সঠিক নথিপত্র আছে কিনা। কেননা তখনকার সময়ে সাউথ আমেরিকা থেকে আগত প্লেয়ারদের দলিলপত্র প্রায় সময়ই সন্দেহজনক ছিল।

ফিফা ডকুমেন্টজনিত ব্যাপারে মীমাংসা করতে এগিয়ে এল। কিন্তু কোন নিষ্পত্তি হবার আগে মেসি বার্সায় কন্ট্রাক্ট সাইন করলেও তাদের হয়ে খেলতে পারবে না। ‘ব্যাপারটি বেশ জটিল ছিল। সত্যি বলতে ক্লাব সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল তারা মেসিকে সাইন করবে না। কিন্তু জোয়ান লাকুয়েভা যেন জেদ করেছিলেন মেসিকে তিনি সাইন করাবেনই। লাকুয়েভা ছিলেন অনড়। তীক্ষ্ণ ভাষায় তিনি বলেছিলেন ফুটবল সম্পর্কে তোমাদের কোন আইডিয়া নেই। ইতিহাস তোমাদের সিদ্ধান্তের বিচার করবে। মিনগুয়েলা রীতিমত হুমকি দিয়ে জানালেন তিনি মেসিকে স্পেনের অন্য ক্লাবে সাইন করাবেন। শেষ পর্যন্ত একগুঁয়ে লাকুয়েভারই জয় হয়েছিল। তিনি এতটা জেদ না দেখালে বার্সা মেসিকে সাইন করত না। মেসির বার্সায় আসার পেছনে মিনগুয়েলা এবং হোরাসিও গাগিওলির অবদান অনেক, কিন্তু বার্সেলোনাতে আসার পেছনে লাকুয়েভার অবদান সর্বাধিক। তিনি বার্সায় মেসির সত্যিকারের পিতৃতুল্য ব্যক্তি। মেসিকে সাইন করানো নিয়ে যখন বার্সেলোনা দ্বিধান্বিত তখন লাকুয়েভা নিজ পকেট থেকে মেসির হরমোন চিকিৎসার খরচ দিয়েছিলেন।

প্রেসিডেন্ট গ্যাসপার্ট তার কাজিন ফ্রান্সিস্কো ক্লোসাকে দায়িত্ব দিলেন মেসিকে পূর্নাংগভাবে সাইন করানোর জন্য। ২০০১ এর মার্চের ১ তারিখ লাকুয়েভা, মেসি, ফ্রান্সিস্কো ক্লোসা এবং একজন আইনজীবি রেস্টুরেন্টে মিলিত হলেন। সেখানেই মেসির প্রথম অফিশিয়াল চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কাতালান ফুটবল ফেডারেশন সেদিনই মেসিকে লাইসেন্স প্রদান করে। লাইসেন্স অনুযায়ী মেসি কাতালান লীগ এবং ফ্রেন্ডলি ম্যাচ খেলতে পারবে কিন্তু স্প্যানিশ প্রতিযোগীতায় খেলতে পারবে না। নিউয়েলস মেসির ট্রান্সফারের পেপার বার্সেলোনার কাছে পাঠাতে অনেক সময় নিচ্ছিল যেটার কারনে মেসির লাইসেন্স প্রাপ্তিতে দেরি হচ্ছিল।

কয়েক সপ্তাহ পরেই নিজের দ্বিতীয় অফিশিয়াল ম্যাচে কাতালান লোকাল ক্লাব এবরের বিপক্ষে ম্যাচে মেসির পায়ে ফাটল ধরল। ইনজুরি থেকে ফেরার কয়েক মাস পরেই তার গোড়ালির লিগামেন্টে সমস্যা দেখা গেল। যদিও ইনজুরি গুরুতর ছিল না। হাড় এবং পেশীর সমস্যা থেকে সে দ্রুতই সেরে উঠল। কিন্তু তার বাসার অবস্থা কষ্টকর ছিল। নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেয়া তার পরিবারের জন্য দুরূহ হয়ে পরেছিল। মেসির বড় ভাই মাতিয়াস আর্জেন্টিনায় তার গার্লফ্রেন্ডের কাছে ফিরে যেতে চাচ্ছিল। মেসির ছোটবোন স্কুলে মানিয়ে নিতে পারছিল না। স্কুলে অনেকে তাকে তাচ্ছিল্য করত।

পরিবার ভেঙে গেল, ২০০১ এর গ্রীষ্মে অর্ধেক সদস্য আর্জেন্টিনায় ফিরে গেল। আর্জেন্টিনায় গ্রীষ্মের ছুটি কাটিয়ে মেসি এবং তার বাবা বার্সেলোনায় ফিরে আসল। মেসি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিল এর শেষ না দেখে সে হাল ছাড়বে না। ‘এখান থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায় মেসির কাছে ফুটবলের প্রতি ভালবাসা বাকি সবকিছুর চেয়ে বেশি ছিল। তার পরিবারের সাথে থাকার চেয়ে ফুটবল তার কাছে অধিক গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এর জন্য সে সবকিছু ত্যাগ করে বার্সেলোনায় চলে এসেছিল। তার সংকল্প কত দৃঢ় ছিল এটা তারই নিদর্শন।’ মেসির সম্পর্কে এভাবেই বলছিলেন লরেন্স।

মেসি আরেকটি পরীক্ষার সম্মুখীন হল ২০০১ এর আগস্টে। রোজারিও থেকে সুস্থ হয়ে ফিরলেও স্প্যানিশ টুর্নামেন্টে সে অংশগ্রহণ করতে পারছিল না কেননা নিউয়েলস তখনো তার ট্রান্সফার অনুমোদন করছিল না। যদিও নিউয়েলসের অননুমোদন ফিফার করিডোরে ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে গিয়েছিল। 

২০০১ সালে হাভিয়ের পেরেজ ফারগুয়েল নতুন ডাইরেক্টর জেনারেলের দায়িত্ব নিয়ে বার্সেলোনায় যোগ দিলেন। বার্সেলোনা মেসির পেছনে প্রতি সিজনে প্রায় ৬ লাখ ইউরো খরচ করছে যদিও মেসি কেবলমাত্র কাতালান লীগ ম্যাচগুলো খেলতে সক্ষম ছিল, এটা জানতে পেরে হাভিয়ের পেরেজ বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন। তিনি মেসির কন্ট্রাক্ট কমিয়ে সিজন প্রতি ১.২ মিলিয়ন ইউরো খরচ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। বার্সা পক্ষ এবং মেসির প্রতিনিধিরা মধ্যস্থতা করতে একত্রিত হলেন। এদিকে তৃতীয় পক্ষ, রিয়াল মাদ্রিদ অপেক্ষা করছিল। যদি দুই পক্ষের মধ্যে দরকষাকষির মীমাংসা না হয় তবে তারা মেসিকে অফার করবে। গিয়েম ব্যালেগের ‘মেসি’ বই অনুযায়ী রিয়ালের স্পোর্টিং ডাইরেক্টর জর্জ ভালদানো সিজন প্রতি মেসির জন্য ২০ মিলিয়ন পেসো/ ১.২ মিলিয়ন ইউরোর চেয়ে বেশি প্রদানের জন্য প্রস্তুত ছিল।

দু’পক্ষের সাক্ষাতে কোন সমঝোতা হল না। মেসির প্রতিনিধিরা নতুন বেতন সীমা মানতে রাজি ছিলেন না। বার্সার প্রতিনিধিরা ছিলেন অনড়। ‘সে নিজেকে কি মনে করে, ম্যারাডোনা? ব্যাপারটা এখানেই শেষ হোক। সে আর্জেন্টিনায় ফিরে যাক।’ বললেন ক্লাবের একজন প্রতিনিধি। ‘আমার মনে হয় আমরা মাদ্রিদে যাব।’ পালটা গুলি ছুড়লেন মেসির এক প্রতিনিধি। শেষমেশ দুই পক্ষই পিছু হটল এবং নতুন ডিল মেনে নিতে সম্মত হল। জর্জ মেসি তার চাকরি থেকে মাসপ্রতি প্রায় ৩৯০০ ইউরো পাবেন। মেসির ম্যাচে অংশগ্রহণ, ফলাফল, পারফর্মেন্সের উপর ভিত্তি করে তার স্যালারির অংক নির্ধারিত হবে। বার্সা বি দলে সুযোগ পেলে তার বেতন নির্ধারিত হবে।

আরেকটি ব্যাপার নিষ্পত্তিহীন রয়ে গেল- মেসির সবধরনের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহনের স্ট্যাটাস। অবশেষে ২০০২ এর ১৫ ফেব্রুয়ারি, মিনগুয়েলার মেইলবক্সে প্রথমবারের মতো মেসির সম্মোহনীয় ভিডিওটেপ আসার ঠিক দুই বছর পর, ফিফা বার্সার পক্ষে রায় দিলো। এর ফলে ক্লাবের হয়ে সব ধরণের ম্যাচে অংশ নিতে মেসির আর কোন বাধা থাকল না।

মেসির ন্যাপকিনের কন্ট্রাক্ট এবং ২০০২ সালে ফিফার প্রদত্ত স্বীকৃতির ফটোকপি ফ্রেমে আবদ্ধ হয়ে এখনো মিনগুয়েলার অফিসের দেয়ালে ঝুলে আছে। দেয়ালের ঠিক পাশেই জানালা দিয়ে দূরের ন্যু ক্যাম্প দেখতে পাওয়া যায়। ২০০২ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশীপে এসপ্লুগুয়েস লোব্রেটগাতের বিপক্ষে মেসির অভিষেক হয়। দ্বিতীয়ার্ধে বদলি প্লেয়ার হিসেবে মাঠে নেমে সেদিন মেসি তিন গোল করেছিল। সত্যিই বার্সেলোনায় মেসি সংগ্রাম করে বেশ কঠিন পথ পাড়ি দিয়েছে। আর এখন ১৪ বছরের সেই ছেলেটি স্থিরচিত্তে তার মহত্ত্বের পথ পাড়ি দিচ্ছে।

Comments
Spread the love