১৯৫৯ সালে পেলে তার জীবনের সেরা গোলটি করেন। এবং সেটি সম্ভবত ছিল সর্বকালের সেরা গোলও। ক্যারিয়ারজুড়ে করা মোট ১,২৮৩টি গোলের মধ্যে জুভেন্টাসের বিপক্ষে হেডারের মাধ্যমে করা সেই গোলটিকেই অন্য আর সবার উপরে রাখার কারণ গোলটি করার ক্ষেত্রে যে অসাধারণ বিল্ড-আপ ও অভাবনীয় কৌশল অবলম্বন করা হয়েছিল।

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হলো, সাক্ষ্যপ্রমাণ হিসেবে গোলটির কোন ভিডিও নেই। তাই তখনকার ১৮ বছর বয়সী পেলে কীভাবে চিপ করে তিনজন খেলোয়াড়ের মাথার উপর দিয়ে বলটিকে আগে বাড়িয়েছিলেন, তারপর সেটি মাটিতে পড়ার আগেই আরও একবার গোলকিপারকেও নাস্তানাবুদ করে মাথা দিয়ে আলতো টোকায় বলটিকে জড়িয়েছিলেন প্রতিপক্ষের জালে, সেটির কৃত্রিম ভিডিও প্রস্তুত করার জন্য সাহায্য নেয়া হয়েছে কম্পিউটার সিমুলেশনের, আর তার পুরোটাই করা হয়েছে স্বয়ং পেলে ও সরাসরি মাঠে উপস্থিত থেকে ম্যাচটি উপভোগ করা দর্শকদের মুখের কথার উপর ভিত্তি করে।

ভার্চুয়াল এই গোলটির অসাধারণত্ব নিয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। কিন্তু যখন সর্বকালের সেরা গোল নিয়ে আলোচনা করা হয়, স্বাভাবিকভাবেই এই গোলটিকে সর্বপ্রকার বিবেচনার বাইরে রাখা হয়। কেননা কম্পিউটার সিমুলেশনে বড় ভূমিকা রেখেছেন পেলে নিজেই, এবং তিনি কখনোই একজন বিনয়ী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত নন। তাই তো ২০১২ সালে ফিফা ডট কমকে নিজেই বলেছিলেন, ‘ফুটবল খেলার জন্যই আমার জন্ম হয়েছে। যেমন বেথোভেনের জন্ম হয়েছিল গান রচনার জন্য, আর মাইকেলেঞ্জেলোর ছবি আঁকার জন্য।’

জুভেন্টাস নামের যে প্রতিপক্ষের বিপক্ষে খেলাটি হয়েছিল, সেটির সম্পর্কেও ইউরোপিয়ান ফুটবল অনুসারীরা খুব একটা অবগত ছিল না। এটি ছিল ব্রাজিলের একটি স্থানীয় দল, যাদেরকে সান্তোস খুব সহজেই ১০-১ ব্যবধানে হারিয়ে দিয়েছিল, আর সেখানে পেলে নিজেই করেছিলেন ৫টি গোল।

পেলের সিংহভাগ গোলই মূলত ছিল এরকম দুর্বল প্রতিপক্ষের বিপক্ষে। কারণ এই কিংবদন্তী ক্যারিয়ারের শেষ সায়াহ্নে এসে নিউ ইয়র্ক কসমসে যোগ দেয়ার আগ পর্যন্ত কাটিয়েছিলেন সান্তোসেই। অর্থাৎ ইউরোপীয় ফুটবলে কখনোই পা রাখা হয়নি তাঁর।

যখনই সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় কে তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়, সবার ঠোঁটে আসা প্রথম কয়েকটি নামের একটি হলো পেলে। কিন্তু ব্রাজিলের বাইরে তার সাফল্যের অভাবকে প্রধানতম কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয় যে কেন তাঁর নাম দিয়েগো ম্যারাডোনার সাথে এক কাতারে উচ্চারণ করা যাবে না, যিনি একদম একাই নাপোলিকে রূপান্তরিত করেছিলেন ইতালির চ্যাম্পিয়ন দল হিসেবে; কিংবা এমনকি জোহান ক্রুইফের সাথেও, যিনি আয়াক্সের হয়ে তিনবার ইউরোপিয়ান কাপ জিতেছেন, এবং ঘরোয়া শিরোপা জিতেছেন বার্সেলোনা আর ফেয়েনোর্ডের জার্সি গায়েও।

এই শনিবার লিওনেল মেসি চুক্তি নবায়ন করেছেন বার্সেলোনার সাথে, যার ফলে ২০২১ সাল পর্যন্ত তাঁকে দেখা যাবে ক্যাম্প ন্যুতেই। ততদিনে এই আর্জেন্টাইনের বয়স হয়ে যাবে ৩৪, আর স্প্যানিশ ক্লাবটিতে তাঁর কাটানো সময়ও পেরিয়ে যাবে বিশ বছর।

১৩ বছর বয়সে লা মাসিয়ায় আসেন মেসি। এবং তারপর থেকে তিনি এত এত সাফল্য অর্জন করেছেন যা কেউ হয়ত কোনদিন কল্পনাও করতে পারেনি। এখন পর্যন্ত তিনি আটবার লা লিগা জিতেছেন, চারবার চ্যাম্পিয়নস লিগ, আর পাঁচবার ব্যালন ডি’অর।

মেসি ভালোবাসেন বার্সেলোনাকে, এবং বার্সেলোনাও ভালোবাসে মেসিকে। তাই যে ক্লাবটিকে তিনি নিজের করে নিয়েছেন, সেখানে যদি তিনি আরও তিন বছর কাটানোর সিদ্ধান্ত নেন, তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকে না। বরং এটিকেই তো খুব স্বাভাবিক একটি সিদ্ধান্ত বলে মনে হতে বাধ্য।

তবে, ক্যাম্প ন্যুতে চুক্তি নবায়নের মাধ্যমে মেসি এই বিষয়টিও প্রায় নিশ্চিত করে ফেলেছেন যে কখনোই সর্বকালের শ্রেষ্ঠতম খেলোয়াড় হওয়া হয়ে উঠবে না তাঁর। আর এ বিষয়টি পরিষ্কার তাঁর উত্তরসূরী পেলের কথাতেও। লে মন্ডেকে ২০১২ সালে তিনি বলেছিলেন, ‘আগে মেসি আমার মত ১,২৮৩টি গোল করুক আর তিনটি বিশ্বকাপ জিতুক, তারপর আমরা এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করব।’

ইকুয়েডরের বিপক্ষে দুর্দান্ত একটি হ্যাটট্রিকের মাধ্যমে আর্জেন্টিনার ২০১৮ বিশ্বকাপে খেলা নিশ্চিত করেছেন মেসি, কিন্তু তিনি কখনোই পেলের মত তিনটি বিশ্বকাপ জয় করতে পারবেন না। এমনকি বর্তমান আলবিসেলেস্তেদের স্কোয়াডের যে দুরাবস্থা, তাতে তাঁর পক্ষে ম্যারাডোনার মত একটি বিশ্বকাপ জেতাও আপাতদৃষ্টিতে অসম্ভব বলেই মনে হয়।

‘আমি মেসিকে অনেক পছন্দ করি। সে সেরা খেলোয়াড়দের একজন। কৌশলগত দিক থেকে বিবেচনা করলে, সে মূলত আমার সমকক্ষ একজন খেলোয়াড়,’ বলেন পেলে। ‘সে বার্সেলোনার হয়ে দারুণ সফল। কিন্তু যখন সে আর্জেন্টিনার হয়ে খেলে, তখন সেই সাফল্যের ছিঁটেফোঁটারও দেখা পায় না। মানুষজন আমাকে প্রায়ই জিজ্ঞেস করে, “নতুন পেলের জন্ম হবে কবে?” কখনোই না। আমার বাবা-মা অনেক আগেই তাদের কারখানা বন্ধ করে দিয়েছেন।’

বার্সেলোনায় মেসি বর্তমান প্রজন্মের সেরা কয়েকজন খেলোয়াড়কে পাশে পেয়েছেন। টানা গত ১১ বছর ধরে তিনি ফিফপ্রো বিশ্ব একাদশে জায়গা পেয়ে আসছেন, যেখানে প্রতি বছর বার্সার আরও দুইজন খেলোয়াড় অবশ্যই থাকেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন রোনালদিনহো, জাভি, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, জেরার্ড পিকে, নেইমারের নামও।

যখন মেসি ২০১১ সালে ব্যালন ডি’অর জিতেছিলেন, তিনি সেটি উৎসর্গ করেছিলেন জাভিকে। ‘আমি এটি আমার বন্ধুর সাথে ভাগাভাগি করে নিতে চাই। কারণ আমার দৃষ্টিতে সে-ই এটির প্রকৃত দাবিদার।’

বার্সেলোনার সাথে নতুন তিন বছরের চুক্তিতে স্বাক্ষরের পূর্বে মেসির সাথে জড়ানো হয়েছে ইউরোপের বেশ কিছু বড় ক্লাবের নাম, তার মধ্যে ছিল বিশ্বরেকর্ড ৩০০ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে তাঁর ম্যানচেস্টার সিটিতে নাম লেখানোর সম্ভাবনাও।

মিনো রাইওলা, যিনি পল পগবা ও জলাতান ইব্রাহিমোভিচের মত খেলোয়াড়দের এজেন্ট হিসেবে কাজ করে থাকেন, মেসিকে আহ্বান জানিয়েছিলেন ক্যাম্প ন্যু ছেড়ে চলে আসার। মার্কাকে তিনি বলেছিলেন, ‘মেসির মত একজন খেলোয়াড়ের অবশ্যই উচিৎ নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য ভিন্ন কোন ক্লাবে এসে নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চার করা।’

যেহেতু মেসি বার্সেলোনাতেই থেকে যাচ্ছেন, তাই ফুটবল প্রেমীদের মনে সন্দেহের বীজ রয়েই যাবে। মেসি কি আসলেই তাঁর কারিশমা দেখাতে পারতেন স্টোকে কোন এক সিক্ত মঙ্গলবার সন্ধ্যায়? বার্সেলোনায় তাঁর আশেপাশে থাকা রথী মহারথীদের নাম, আর আর্জেন্টিনায় তাঁর তেমন বড় কোন সাফল্য না পাওয়ার বিষয়গুলি সর্বকালের সেরার আলোচনায় অবশ্যই একটি বড় প্রভাব ফেলবে।

স্রেফ একটি দলের হয়ে খেলেছেন বলেই যে মেসি সর্বকালের সেরা হতে পারবেন না, এমনটি বলা একটু বেশিই সহজ হয়ে যায়। কিন্তু এই বিষয়টিও অবশ্যই উত্থাপিত হবে, বিশেষ করে তাঁর চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর সমর্থকরাই এই বিষয়টি টেনে আনবে, কারণ তাদের পছন্দের তারকা রিয়াল মাদ্রিদে আসার আগেই ইংল্যান্ডে বসে সম্ভাব্য সব ধরণের সাফল্যের স্বাদ পেয়ে গিয়েছিলেন।

কিন্তু বার্সেলোনার সাথে নতুন চুক্তি করার মাধ্যমে মেসি এটিই নিশ্চিত করলেন যে তিনি সর্বকালের সেরা কিনা, এ বিষয়টি সবসময়ই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে থাকবে।

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-