পিংক এন্ড ব্লুবিবিধ

আমি কেন নারী-পুরুষ সমঅধিকারে বিশ্বাসী নই?

“ভাল করে পড়াশুনা কর, ভাল চাকরি-বাকরি কর, ‘মেয়ের’ অভাব হবেনা”- এ জাতীয় কথাবার্তা অধিকাংশ কিশোর প্রেমিক কে শুনতে হয় বাবা মায়ের কাছে ‘প্রেম করে ধরা’ খাওয়ার পর! কিশোর মাথানত করে বাবা মায়ের বাণী শোনে। কিশোর বয়সে প্রেম করে মাথা বিগড়ানো রোধে বাবা-মায়ের এই উদ্যোগ প্রশংসনীয় কিন্তু কথা হল একজন কিশোরীর ক্ষেত্রে কী ঘটে?

কিশোরির বাবা-মা কি বলেন, “ভাল করে পড়াশুনা কর, ভাল চাকরি-বাকরি কর, ছেলের অভাব হবেনা”? আমার ধারণা, না আমার ধারণা না, আমি নিশ্চিত, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বলেন না। মেয়েটিকে বিয়ে দিয়ে দেয়ার ‘ভয়’ দেখানো হয়। একটা ছেলেকে যা শুনতে হয়, সেই কথাটুকুর মধ্যেই মেয়েদের সম্পর্কে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি ফুটে ওঠে। ছেলেটিকে বলা হয়, তুমি পড়াশুনা করে ভাল চাকরি করে যোগ্যতা অর্জন কর। যোগ্যতা হলে যেমন তোমার সুন্দর বাড়ি হবে, দামি গাড়ি হবে তেমনি বউ হিসেবে একটা ‘ভাল মেয়ে’ও হবে। অর্থাৎ বাড়ি, গাড়ির মত ‘মেয়ে’ও একটা যোগ্যতা পরিমাপক ‘আইটেম’ মাত্র। আর শিক্ষিত মেয়ে হল ‘স্ট্যাটাসের’ পরিচায়ক!

নারীদের নিয়ে আমাদের সমাজের ভাবনা, নারীদের কে ছোট করে দেখার মনোভাব কতটা গভীরে প্রোথিত সেটা ক’জন জানেন আমার জানা নেই, তবে সেটা খুবই ভয়াবহ। আমি যখনই নারীদের নিয়ে কিংবা মানুষ হিসেবে ন্যূনতম অধিকারপ্রাপ্তি নিয়ে অথবা তাদের সমস্যা গুলো নিয়ে কোন লেখা বা ছবি পোস্ট করি তখনই সেই লেখা/ছবি তে একদল ‘পুরুষ’ এর আগমন ঘটে। এরা কেউ কিন্তু অশিক্ষিত না। অনেকেই ভাল প্রতিষ্ঠানের ছাত্র, অনেকেই ভাল জায়গায় কাজ করছে। কেউ কেউ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনেও কাজ করে। বেশ কিছুদিন আগে আমি ফেসবুকে একটা ছবি পোস্ট করেছিলাম। সেটা মূলত একটা কার্টুন, যেখানে দেখানো হয়েছে জীবনে একই পথ অতিক্রম করতে একটা মেয়েকে একটা ছেলের তুলনায় কতটা বিপদসংকুল পথ অতিক্রম করতে হয়। ছবিটার ক্যাপশনে লিখেছিলাম-

“মেয়েরা দুর্বল, মেয়েরা ‘অবলা’, মেয়েদের বুদ্ধি কম, মেয়েরা এটা মেয়েরা সেটা। তারা পুরুষের সমকক্ষ হতেই পারেনা”- এগুলো খুব প্রচলিত কিছু কথা বার্তা। অনেকে এমন উদাহরণও দিয়ে থাকেন, ‘ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে দেখ, কজন মহিলা মণীষী আছে আর কজন পুরুষ? ‘জন্ম থেকে খাচায় আটকে থাকা একটা বাঘ কে যদি বলা হয়, এটা একটা বাঘ হইলো, এখন পর্যন্ত একটা শিকার দূরে থাক দৌড়ও দিতে পারে নাই’ – সেটা যেমন শুনাবে, মেয়েদের সম্পর্কে বলা কথা গুলোও তেমনই শুনায়…

এ প্রসঙ্গে রাজা রামমোহন রায়ের চমৎকার একটা কথা আছে, “স্ত্রীলোকের বুদ্ধির পরীক্ষা কোন কালে লইয়াছেন যে অনায়াসেই তাহাদিগকে অল্পবুদ্ধি কহেন? কারন বিদ্যা শিক্ষা এবং জ্ঞান শিক্ষা দিলে পরে ব্যক্তি যদি অনুভব ও গ্রহণ করিতে না পারে, তখন তাহাকে অল্পবুদ্ধি কহা সম্ভব হয়। আপনারা বিদ্যা শিক্ষা জ্ঞানোপদেশ স্ত্রীলোককে দেন নাই, তবে তাহারা বুদ্ধিহীন হয় ইহা কিরূপে নিশ্চয় করেন?”

আমার এই কথাতেই অনেকের ‘পুরুষত্ব’ আঘাত প্রাপ্ত হয়েছিল, উত্তেজিত হয়েছিল। তারা এতে দেশ জাতি ও সমাজের সর্বনাশ-ধ্বংস দেখেছেন। একজন প্রশ্ন করলেন, ‘আমেরিকা ইউরোপে তো নারী খাচায় আটকে নেই, তাহলে এক মাদাম কুরী ছাড়া সেখানে কোন বিজ্ঞানী নেই কেন?’ সমস্যা হচ্ছে এই ব্যক্তি এক মাদাম কুরির নামই শুনেছেন। মাদাম কুরি নোবেল খানা না পেলে তার নামও ইনি শুনতে পেতেন না। প্রথমত, আমেরিকা ইউরোপ যে জন্ম থেকেই নারী স্বাধিনতা দিয়ে ভরিয়ে রেখেছে এমনটি নয়। নারীবাদ, নারী অধিকার আন্দোলনের সূত্রপাত এসকল জায়গাতেই । বর্তমানে সেখানে নারীরা অন্যান্য স্থানের তুলনায় স্বাধীনতা ভোগ করলেও সেখানেও পুরুষ তন্ত্রের থাবা থেকে পুরোপুরি মুক্ত হয়নি। দ্বিতীয়ত, এক মাদাম কুরি ছাড়া আর কোন মহিলা বিজ্ঞানী নেই এটা যারা বলে তারা আসলে না জেনে বলে। অবাধ তথ্য প্রবাহের এই যুগে তারা ঐচ্ছিক ভাবে অজ্ঞ। women scientists লিখে গুগল সার্চ দিলেই গাদা গাদা মহিলা বিজ্ঞানীর পরিচয় ও কাজের বিবরণ পাওয়া যাবে।

এই ব্যক্তিতো তাও ভদ্র ভাবে একটা প্রশ্ন করেছেন, হয়তো জানার জন্যই করেছেন। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে অদ্ভূত বাংলিশ ভাষায় (টাকলা ভাষা) ব্যবহার করে একদল লোক আরও অদ্ভূত সব কমেন্ট করে। যেমন ঐ পোস্টেই একজন নারীদের ‘ইসলামের খাচায়’ বদ্ধ থেকে কাজ করতে বলেছে। তার দাবী খাচায় থেকেই নারীরা যা করছে, খাচা মুক্ত হলে তারা আরও বেশি ‘অ্যাট্রাক্ট’ হবে, এবং ‘অ্যাটাক’ ও হবে! এই ব্যক্তি এবং এর মত আরও অসংখ্য, নিজেদের কে ‘মানুষ’ না ভেবে ‘পুরুষ’ ভাবে। এবং নারীদের কে ভাবে ‘মাংস পিন্ড’। যাদের কে খোলা অবস্থায় দেখলেই ঝাপিয়ে পড়তে হবে। খাচায় থাকলেই নারীরা নিরাপদ থাকবে। কেন? এরা কি তবে নিজেদের কে পশু ভাবে? আর নারীদের কে মাংস পিন্ড? তবে নিজেরা খাচার মধ্যে ঢুকে বসে থাকুক। বেগম রোকেয়া তাঁর ‘সুলতানার স্বপ’- গল্পে ঠিক এই ব্যাপার টার একটা বিবরণ দিয়ে গেছেন। সুলতানা স্বপ্নে এমন একটি জগতে চলে যায় যেখানে পুরুষেরা বন্দী থাকে আর নারীরা বাইরে চলাফেরা করে। সেখানে সব পুরুষ ঘরে বন্দী কেন? সুলতানার এমন প্রশ্নের জবাবে সেই জগতের একজনের সাথে কথোপকথন-

” ‘মনে করুন, কতকগুলো পাগল যদি বাতুলাশ্রম হইতে বাহির হইয়া পড়ে, আর তাহারা অশ্ব গবাদি- এমনকি ভালো মানুষের প্রতিও নানা প্রকার উপদ্রব উৎপীড়ন করে, তবে ভারতবর্ষের লোক কী করিবে?’
‘তবে তাহারা পাগল গুলোকে ধরিয়ে পুণরায় বাতুলাশ্রমে আবদ্ধ করিতে প্রয়াশ পাইবে।’
‘বেশ! বুদ্ধিমান লোককে বাতুলালয়ে (পাগলা গারদে) আবদ্ধ রাখিয়া দেশের সকল পাগলকে মুক্তি দেওয়া কি আপনি ন্যায় সংগত বলে মনে করেন?’
‘অবশ্যই না। কিন্তু শান্তশিষ্ট লোককে বন্দি করিয়া পাগল কে মুক্তি দিবে কে?’
‘কিন্তু কার্যত আপনাদের দেশে আমরা ইহাই দেখিতেছি। পুরুষেরা, যাহারা নানা প্রকার দুষ্টামি করে, বা অন্তত করিতে সক্ষম, তাহারা দিব্যি স্বাধিনতা ভোগ করে। আর নিরীহ অবলারা বন্দীনি থাকে। অশিক্ষিত অমার্জিত রুচি পুরুষেরা বিনা শৃংক্ষলে থাকিবার উপযুক্ত নহে।’ “

কাজেই কেউ যদি নিজেকে ‘মানুষ’ না ভেবে একটি দন্ডের গৌরবে নিজেকে কেবল ‘পুরুষ’ হিসেবে ভাবতেই বেশি গৌরব বোধ করে সে খাচায় বন্দী থাকুক। তার জন্য নারীরা কেন প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে? নারীদের প্রতি এই বিরূপ মনোভাব, ছোট করে দেখার মনোভাব আমাদের জীনে ঢুকে গেছে। আমাদের সমাজ, আমাদের ধর্ম, আমাদের শিক্ষা সব কিছুই পুরুষ তান্ত্রিক এবং এগুলো আমাদের মধ্যে এই শিক্ষা ঢুকিয়ে দিয়েছে। ধর্মের ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ সংবেদনশীল। তাই নারীকে দমন করার প্রধান হাতিয়ার হয়েছে ‘ধর্ম’। এই হাতিয়ার কে সমাজ তথা সমাজের ব্যাপক পুরুষগণ খুব চমৎকার ভাবেই ব্যবহার করছেন। যেখানে নিজ ঘরে মেয়েরা নিজ পরিবারের কাছে নির্যাতিত হয় সেখানে সম-অধিকার, মানুষ হিসেবে স্বাধীনতা আসবে কিভাবে?

আমি ঠিক জানিনা কিভাবে সেটা সম্ভব। লিখে এই অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব কিনা সেটাও জানিনা। তবে বেগম রোকেয়া লিখেছেন, হুমায়ুন আজাদ স্যার লিখেছেন, তসলিমা নাসরিন লিখেছেন- লেখাই তাদের অস্ত্র। এই অস্ত্র তাঁরা যুগ যুগ ধরে অন্ধকারের বিরূদ্ধে প্রয়োগ করে এসেছেন। হুমায়ুন আজাদ স্যারের একটা কথা আছে, “এখনও বিষের পেয়ালা ঠোটের সামনে তুলে ধরা হয়নি, তুমি কথা বল।” আমাদেরকে কথা বলতে হবে। এই অন্ধকারের মূলে কুঠারাঘাত করতে হবে। কাজটা করতে হবে নারীদেরকেই। শৃঙ্খল ভেঙে বেড়িয়ে আসতে হবে নারীদেরই। তাতে সমাজের ‘ব্যাপক পুরুষ’গণ হাহাকার করে উঠবে, কিন্তু এছাড়া অন্ধকার দূর করার আর কোন পথ নেই।

প্রকৃতি নাকি নারীদের কে ‘দুর্বল’ করে সৃষ্টি করেছে। আমার তো উল্টোটাই সঠিক বলে মনে হয়। নারীদেরই রয়েছে সন্তান জন্মদান, নিজ শরীরে ধারণ এবং নিজ শরীর থেকে খাদ্য দানের অসাধারণ ক্ষমতা, যা পুরুষ দের নেই।বলবেন, পুরুষ ছাড়া সন্তান জন্মাবে কিভাবে? আপনার অবগতির জন্যই জানাই আধুনিক বিজ্ঞান পুরুষ ছাড়াই নারী শরীরে সন্তান সৃষ্টি করতে পারে। কাজেই পুরুষ প্রজাতি পৃথিবীতে না থাকলেও ‘মানুষ’ বিলুপ্ত হবেনা! কি ভয়ংকর তাইনা!

কাজেই নারী পুরুষ কখনোই ‘সমান’ নয়। মানুষ প্রজাতির মধ্যে, শুধু মানুষ নয়, প্রাণীকুলের মধ্যেই ‘নারী’রা, পুরুষদের থেকে বেশি এগিয়ে। তাই আমি নারীদের সম-অধিকারের বিশ্বাসী নই , তারা একটু বেশি অধিকারের দাবীদার- এই কথায় বিশ্বাসী!

Comments

Tags

Related Articles