আমরা সবাই জানি জাপানিরা খুবই পাংচুয়াল। শুধু এখানকার জীব না, সকল জড় পদার্থরাও পাংচুয়াল! বাস ছাড়বে, ট্রেন থামবে, গাছের পাতা কখন নড়বে, বৃষ্টি কখন নামবে, কখন অফিস খুলবে, চিঠি ডেলিভারি হবে, পার্টি শেষ হবে, ধোপার কাপড় হাতে পাব, একাউন্টে টাকা জমা হবে, ডাক্তার রোগী দেখবে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ হবে- আর কত কী- সবই সময়মত।

সমস্যাটা এখানেই। 
এভাবে কতক্ষণ ভালো লাগে?! লোকাল বাসে বইসা যারা ‘সুপারভাইজানরে’ গাইল পারেন আর ট্রাফিক সিগনালের ভিতরে যারা দৌড়াইয়া রাস্তা পার হন- তাগো জাপানে পাঠানো দরকার। টাইট হইয়া যাইতেন। শুকরিয়া করতেন যে, ভাগ্যিস আমাগো দ্যাশে সব সময়মত করা লাগেনা। আরে ভাই, সকালে উঠে ধীরে সুস্থে ফ্রেস হয়ে, একটা রবীন্দ্র সঙ্গীত শুনে, গরম পরোটা আর গরুর মাংস দিয়ে পেট পুরে খেয়ে, আস্তে আস্তে কর্মক্ষেত্রে রওনা হলে সমস্যা কী? আর রাস্তায় দরকার হলে এক কাপ চা খেতে খেতে দৈনিক পত্রিকাটার পাতা উলটানোর চেয়ে পৃথিবীতে আর কোন শান্তি আছে? ঈদের সময় অনিশ্চয়তার ভিতরে রওনা হয়ে পৌঁছানোর পরে প্রিয়জনের কাছে যেতে যে কি শান্তি সেটা সবাই জানেন। ফরমালিন খেয়েও আমরা কত সুন্দর বেঁচে আছি! জীবনের খেলা যেমনই হোক, ক্রিকেট খেলা মিস করছিনা। জাপানিরা কি এই শান্তি জীবনে পাইছে না দেখছে? খালি কাম করলেই হবে?! সব কিছু সময়মত করলেই কি জীবনে বড় হওয়া যায়!

ছোট বেলায় বাংলা রচনা লিখতে লিখতে জানতে পেরেছিলাম ‘সময়ানুবর্তিতা’ বোধ হয় একটা দরকারি জিনিস। স্কুলের স্যার, অভিভাবক এবং অন্যান্য বিনামূল্যে উপদেশদাতাগণ নানাভাবে এই বিষয়ে বাক্যব্যয় করে অমর হবার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত খালি ২টা জিনিস দেখছি যেটা সময়মত (!!) হইছে- তাও সিনেমাতে-

১। সিনেমার শেষ দৃশ্যে নায়ক যখন ভিলেনরে মারবে তখনই পুলিশ হাজির!

২। ট্রেন স্টেশনে যখনই নায়কের সাথে নায়িকার দেখা হবার একটা সম্ভাবনা হইছে তখনই ট্রেনটা ছেড়ে দেবে! 
আরও একটা কাজ আমরা সময়মত করি – সেটা হল, অফিস শেষ হবার টাইমে কোনভাবেই আমাদের আর বসিয়ে রাখা যাবেনা। কারণ অফিস টাইম বলে কথা!

‘সময়মত’ শব্দটাই আপেক্ষিক। প্রত্যেকটা ছোট ছোট কাজ ‘সময়মত’ করার কোন মানে নাই। কারণ সত্যিই সেটা ‘সময়মত’ হয়েছে কিনা সেই উত্তর আসবে জীবনের শেষ দিনগুলোতে। যৌবনে ‘সময়মত’ পড়ালেখা করে, পরিশ্রম করে শেষ বয়সে হয়ত কিছুই পেলেন না – অন্যদিকে একজন সারা জীবন সময়ের খবরও রাখে নাই, কিন্তু দেখা গ্যাল এলাকাবাসীর ঘুম নাই ওই লোকের প্রচার করতে করতে। 
কাজেই, আসুন হাতের ঘড়িটা ফেলে দেই। সময়ের দাস আর নয়। যে যেভাবে আছি সেখান থেকেই জীবনটাকে উপভোগ করি। জাপান না, খাঁটি বাঙ্গালী হই। একটু অনুভব করুন সেই হাউজি, যাত্রা, লালন, নৌকা বাইচ, সার্কাস, বাঁশি, লাঠি বাজি, হাডুডু, মাটির বাসন, শীতল পাটি, বিয়ের গীত, খেজুরের রস, গরম সিঙ্গারা, বাতাসা, সন্দেশ, ঘুড়ি, প্রখর রোদে নৌকার গলুই, নিউজপ্রিন্টের সুগন্ধি মাখা দৈনিক ইত্তেফাক, বিয়ের অনুষ্ঠানে রং-জরি-কাঁদা মাখামাখি, ফুল চুরি করে খালি পায়ে শহিদ মিনার, আষাঢ়ের অন্ধকারে টিনের চালে ঝুম বৃষ্টির শব্দের সাথে ঝাল মুড়ি?

আর তো ফিরে পাবো না। তাহলে ঘড়ি দেখে কী হবে! 


Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-