ইনসাইড বাংলাদেশডিসকভারিং বাংলাদেশ

এই বর্ষায় চলুন মেঘেদের দেশে…

চলতি পথে পাবেন মেঘেদের দেখা। সাদা রঙের ধোঁয়া ধোঁয়া মেঘের ভেতরে ঢুকে পড়বে গাড়ি, শরীর ভিজিয়ে দেবে হিমশীতল জলের ধারা। যেদিকে চোখ যাবে শুধু পাহাড়ের হাতছানিই নজরে পড়বে, আর দেখবেন পাহাড়ের গা বেয়ে ঝরে পড়ছে হাজার বছরের প্রাচীন ঝর্ণাগুলো। ঘন সবুজের বুকে শ্বেতশুভ্র সাদার অদ্ভুত এক মেলবন্ধন রচিত হয়েছে সেখানে। এমন সৌন্দর্য্যের কথা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না, এমন মুগ্ধতার কথা লিখে বোঝানো যায় না। এই সৌন্দর্য্য দেখতে হলে যেতে হবে মেঘালয়ে, মেঘেদের দেশে।

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সেভেন সিস্টার্সের অন্যতম একটা রাজ্য এই মেঘালয়। ছোটবেলায় সাধারণ জ্ঞানের বইতে একটা কমন প্রশ্ন নিশ্চয়ই সবাই পড়েছেন, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত কোথায় হয়- চেরাপুঞ্জিতে। সেই চেরাপুঞ্জি জায়গাটাও মেঘালয়েই অবস্থিত। মেঘালয়ের রাজধানীর নাম শিলং। ছবির মতো সাজানো ছোট একটা শহর। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় দেড় হাজার ফুট উঁচুতে অবস্থিত শিলঙের তাপমাত্রা তাই একটু নীচের দিকেই থাকে, তবে সেটা অসহনীয় মাত্রার কিছু নয়। আর মোটামুটি সারাবছরই বৃষ্টিবাদল লেগে থাকে এখানে, তবে ঝুম বৃষ্টিতে মেঘালয়ের সৌন্দর্য্যটা অন্যরকমের। সেটা দেখতে হলে যেতে হবে জুন থেকে আগস্ট-সেপ্টেম্বরের মধ্যে। 

মেঘালয়, শিলং, চেরাপুঞ্জি, সেভেন সিস্টার্স, মেঘ, পাহাড়, বর্ষা

ঢাকা থেকে মেঘালয়ে যাওয়াটা কঠিন কিছু নয়। পাসপোর্টের মেয়াদ থাকতে হবে, আর ভারতীয় ভিসা থাকতে হবে, সেটার এন্ট্রি পয়েন্ট হবে ডাউকি। সিলেটের তামাবিল বর্ডার দিয়ে ভারতে প্রবেশ করতে হবে আপনাকে, ভারতের সেই অংশটার নামই ডাউকি। ডলার এন্ডোর্সমেন্ট বা ট্রাভেল ট্যাক্সের ফর্মালিটিজগুলো ঢাকা থেকে করে গেলেই ভালো, ঝামেলা কমবে। রাতের বাসে বা ট্রেনে উঠে পড়লে ভোরেই পৌঁছে যাবেন শাহজালালের শহর সিলেটে। সিলেট শহর থেকে জাফলংগামী বাস, সিএনজি বা মাইক্রো, যেকোন উপায়ে যেতে পারেন তামাবিল সীমান্তে। ইমিগ্রেশনের কাজ সেরে ঢুকে পড়ুন ভারতে। 

আরও পড়ুন- দার্জিলিং যখন হাতের নাগালে! 

ভারতীয় ইমিগ্রেশন অফিস থেকে ডাউকি বাজারের দূরত্ব দুই কিলোমিটার। হেঁটে গেলে মিনিট দশেক লাগবে, সঙ্গে ছোট বাচ্চা থাকলে অটো বা ট্যাক্সি ভাড়া করে নিতে পারেন। ডাউকি বাজার থেকে চার সিটের মারুতি ট্যাক্সি আর ৭/৮ জনের জন্যে টাটা সুমো জীপ(বান্দরবানের চাঁদের গাড়ির মতো) পাবেন শিলং যাওয়ার জন্যে। খরচ কমাতে চাইলে বাসও আছে। ট্যাক্সি বা জীপ যেটাই ভাড়া করবেন, দরদাম করতে হবে প্রচুর। তবে এর আগে ডাউকি ব্রীজে নেমে ঘুরতে পারেন, স্বচ্ছ জলের উমেনগট নদী থেকেও ঘুরে আসতে পারেন। ট্যাক্সি বা জীপ ভাড়া করলে ড্রাইভারকে বললেই হবে, তবে সেটার জন্যে গুনতে হবে বাড়তি পয়সা। 

মেঘালয়, শিলং, চেরাপুঞ্জি, সেভেন সিস্টার্স, মেঘ, পাহাড়, বর্ষা

ডাউকি থেকে শিলং যাওয়ার পথে চোখে পড়বে অজস্র ঝরনা। ঝরনা দেখতে দেখতে বিরক্তই হয়ে যাবেন একটা সময়ে। ডাউকি থেকে শিলঙের দূরত্ব আশি কিলোমিটার, যেতে সময় লাগবে আড়াই-তিন ঘন্টার মতো। তবে উমেনগট ঘুরে গেলে আরও বেশি লাগবে সময়। শিলঙে থাকার জন্যে ভালো মানের হোটেল পেয়ে যাবেন হাজার-দুই হাজার রূপির মধ্যেই। শহরের পুলিশবাজার আর বড়বাজার এলাকাতেই হোটেলের সংখ্যা বেশি, চাইলে এর কমেও পাবেন। খাওয়াদাওয়ার জন্যে চিন্তার কিছুই নেই, বাঙালী রেস্তোরা পাবেন শিলঙে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে আছে বার্গার-পিৎজা-মিল্কশেক আর স্যান্ডউইচের দোকান। চাউমিন, নুডলস বা আরও নানা রকমের চায়নীজ খাবারেরও অভাব নেই এখানে।

মেঘালয়ে যতোক্ষণ আছেন, সঙ্গে ছাতা বা রেইনকোট রাখতেই হবে। নইলে কখন হুট করে বৃষ্টির ছাঁট এসে সব ভিজিয়ে দেবে, কেউ বলতে পারে না। মেঘালয়কে বলা হয় ভারতের স্কটল্যান্ড, এখানকার আবহাওয়াকে নাকি একবিন্দু বিশ্বাস নেই! আর এখানে ঘোরার জন্যে সবচেয়ে সহজ মাধ্যম হচ্ছে ট্যাক্সি। যে কয়দিন থাকবেন, সেই কয়েকদিনের জন্যে ট্যাক্সি ভাড়া করে নিলেই কষ্ট অর্ধেক কমে যাবে। লোকসংখ্যা বেশি হলে জীপ ভাড়া করতে পারেন। পর্যটন স্পটগুলো ড্রাইভারেরাই আপনাকে ঘুরিয়ে দেখাবে। শিলঙে একা ঘুরতে গেলেও চিন্তা করতে হবে না, শহরের বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্সি সাধ্যের মধ্যেই অনেকগুলো প্যাকেজ বানিয়ে রেখেছে আপনার জন্যে। ট্যাক্সি বা জীপে করেই তারা আপনাকে ঘুরিয়ে আনবে ট্যুরিস্ট স্পটগুলো থেকে। বেছে নিন আপনার পছন্দমতো। 

মেঘালয়, শিলং, চেরাপুঞ্জি, সেভেন সিস্টার্স, মেঘ, পাহাড়, বর্ষা

ট্যাক্সি ভাড়া করে চলে যেতে পারেন চেরাপুঞ্জি, বাসেও যাওয়া যায় অবশ্য। শিলং থেকে প্রায় ষাট কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই শহরটা। সমুদ্র সমতল থেকে সাড়ে চার হাজার ফুট উঁচুতে অবস্থিত চেরাপুঞ্জি, বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্বতের উচ্চতাও এতটা নয়! শিলং থেকে দিনে গিয়ে দিনেই ফিরে আসা যায়, চাইলে রাতে থাকতেও পারেন পাহাড়ঘেরা এই নিরিবিলি শহরটায়। পাহাড়ী উপত্যকা আর নদীর কারণে এই শহরের সৌন্দর্য্য বেড়ে গিয়েছে বহুগুণে। বেশি ঝামেলায় না গিয়ে মেঘালয় পর্যটন অধিদপ্তরের ট্যুর প্ল্যানের টিকেট কেটেও যেতে পারেন চেরাপুঞ্জিতে, তাদের ব্যবস্থাপনায়। চেরাপুঞ্জি যাওয়ার রাস্তার সৌন্দর্য্য সারাজীবনের জন্যেও ভুলবেন না আপনি, এটা গ্যারান্টি।

আরও পড়ুন- সড়কপথেই ঘুরে আসুন ভূটান থেকে! 

শিলং থেকে ট্যাক্সিতে করেই ঘুরে আসতে পারেন এশিয়ার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রাম মাওলিনং থেকে। সেভেন সিস্টার ফলস আপনার চোখের তৃষ্ণা মেটাবে, কিন্ত মনের তৃষ্ণা যেন বাড়িয়ে দেবে বহুগুণে। খাসি পাহাড়, জৈন্তা পাহাড় আর গারো পাহাড়ের ভেতরের গুহাগুলো এক অমোঘ আকর্ষণ নিয়ে টানবে আপনাকে। শিলং পিকে দাঁড়িয়ে ছবির মতো সাজানো পুরো শিলং শহরটা দেখতে পাবেন এক নিমিষে। এলিফ্যান্ট ফলস, বিশপ বিডেন ফলস বা সুইট ফলসের বিশালত্বের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে বড্ড ক্ষুদ্র মনে হবে আপনার। 

মেঘালয়, শিলং, চেরাপুঞ্জি, সেভেন সিস্টার্স, মেঘ, পাহাড়, বর্ষা

সারাদিনের ভ্রমণশেষে ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঢুকে পড়ুন লেডি হায়দারী পার্কে, বেঞ্চে বসে জিরিয়ে নিন খানিকটা। তারপর ঢুকে পড়ুন পার্কের লাগোয়া চিড়িয়াখানায়। নামে মিনি হলেও, এই চিড়িয়াখানাটা ঢাকার মিরপুর চিড়িয়াখানার চেয়েও বেশি সমৃদ্ধ! গলফ কোর্স বা বারাপানি লেক থেকে ঘুরে আসতেও ভুলবেন না। শিলং থেকে ফেরার রাস্তাটাও একই, ডাউকি এসে তামাবিল সীমান্ত দিয়ে ঢুকতে হবে বাংলাদেশে। অবশ্য কেউ মেঘালয় ভ্রমণের সাথে আসাম-দার্জিলিং লং ট্যুর দিতে চাইলে আলাদা কথা।

মেঘালয়ে ট্যুরিস্ট স্পট প্রচুর, সবগুলোর নাম মনে রাখাও সম্ভব নয়। এজন্যেই ট্যাক্সি বা জীপ ভাড়া করে নিলে বেড়ানোতে সুবিধা পাওয়া যায়। তবে এত প্ল্যান-প্রোগ্রাম যাদের পছন্দ নয়, তাদের জন্যেও মেঘালয় ভ্রমণের ব্যবস্থা আছে। শ্যামলী পরিবহনের ট্যুর প্যাকেজ নিয়ে তারাও ঘুরে আসতে পারবেন মেঘালয় থেকে। ভিসার দায়িত্বও শ্যামলী পরিবহনেরই। এই সুবিধার জন্যে শ্যামলী পরিবহনের অফিসে যোগাযোগ করতে হবে। ঢাকা থেকে প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে এই প্যাকেজের গাড়ি শিলঙের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়।

আরও পড়ুন- মাওলিনং- এশিয়ার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রামের গল্প!

গগনে গরজে মেঘ ঘন বরষা- কবিগুরু লিখেছিলেন। বৃষ্টিবাদলের এই সময়টায় কাজের ফাঁকে খানিকটা অবসর বের করে বৃষ্টির স্নিগ্ধতা অনুভব করতে নাহয় চলুন মেঘালয়ে, মেঘেদের দেশে। আটপৌরে বর্ষা যে কতটা রূপসী আর মায়াবিনী হতে পারে, সেটা এই ঘোর বর্ষায় মেঘালয়ে না গেলে তো বোঝা যাবে না!

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close