বাকা ঠোঁটের হাসিতে
হরিণী চোখের ইশারায়
সারা অঙ্গে ঢেউ তুলিয়া
ধামাক ধামাক কোমর দোলাইআআআ
*(অ্যা) মীরাবাঈ ( অ্যা) হেইলা (অ্যা) দুইলা (অ্যা) হেইলা দরবার নাচায়-

জেমসের এই গানটি সবাই শুনে থাকবেন। জেমস এবং মারজুক রাসেল মিলে এই অসাধারন গানটি তৈরী করেছেন। এই গান নিয়ে বাংলাদেশে বড় রকমের মিস-কনসেপশন আছে। অনেকেই এই গানটাকে পছন্দ করেন না, মনে করেন এই গান অশ্লীল, এখানে যৌন উত্তেজনা আছে। তার একটা বড় কারণ, শাবনূর-রিয়াজ অভিনীত ‘নারীর মন’ ছবিতে এই গানের বাজে নির্মাণ। যদিও এই ছবিতে ব্যবহারের পরে এ গানের জনপ্রিয়তা প্রচণ্ড বেড়ে যায়। তাছাড়া নতুন শতাব্দির শুরু থেকেই বাংলাদেশে যে ধর্মীয় রক্ষনশীল সামাজিক অবস্থা বিরাজ করছিল সেই প্রেক্ষিতে এই গান একটা ধাক্কাও বটে। কেন তা এই গানের নায়িকা মীরা বাঈ-এর পরিচয় জানলেই আঁচ করতে পারবেন।

এই কিছুদিন আগে ‘ডেফি’ নামের ব্যান্ডের একটা গানের কথা ছিল,

“তোমায় পেলে- তোমায় পেলে- তোমায় পেলে নেশা ভুলে যাই, ও মীরা বাঈ”

আসলে এই মীরা বাঈ কে! তাকে নিয়েই বা এত আরাধনা কেন! জল্পনা-কল্পনাই বা কেন?

১।

মীরার বাড়ি রাজস্থান। মীরার বাবা যোধপুরের প্রতিষ্ঠাতা সম্মানিত এবং প্রতাপশালী রতন সিং। গ্রামে একদিন এক সন্ন্যাসী ঘন সবুজ অরণ্যের ভেতর থেকে আর্বিভূত হলেন। রতন সিং এর কার্যকলাপে খুশী হয়ে তিনি তাকে একটি কৃষ্ণের মূর্তি উপহার দিলেন। ছোট খাট এই মূর্তিটি গাড় নীল- মাথার চারিদিকে সোনালী আরও বিভিন্ন রঙ এর ছটা। রঙ এবং ছোটখাট গঠনের জন্য মূর্তিটি খুব গভীর লাগে। মীরার বয়স তখন মাত্র তিন বছর। কৃষ্ণের এই মূর্তি নিজের অধিকারে পাবার জন্য মীরা অনুরোধের পাশাপাশী কান্না-কাটি জুড়ে দিল।

ছোট্ট মীরার কাছে কৃষ্ণের অবহেলা হতে পারে ভেবে তার বাবা কিছুতেই তাকে তা দিতে রাজি হলেন না। কিন্তু মীরার যে তা লাগবেই- সে যেন নাছোড়াবান্দা! একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে তার বাবা সেটি তাকে দিয়ে দিলেন। এরপর থেকেই কৃষ্ণ হয়ে উঠলো মীরার পরম বন্ধু। সে সারাদিন কৃষ্ণের সাথে কথা বলে, সময় কাটায়। কৃষ্ণ সম্পর্কে যেকোনো গল্পের প্রতি মীরার তীব্র কামনা। ধীরে ধীরে কৃষ্ণ হয়ে উঠল মীরার প্রেমিক। মীরা কৃষ্ণকে হরি বলে ডাকতো- তাকে ভেবে এমন গান লিখতো যেগুলো ‘ভজন’ নামে পরিচিত।

শ্রীকৃষ্ণ দুজন নারীকে ভয়ানক রকম পাগলিনী করেছিলেন। এর মধ্যে একজন বাংলার রাধা, আরেকজন এই রাজস্থানের মীরা বাঈ। রাধা অবশ্য কবি জয়দেবের কল্পনায় সৃষ্টি। কাল্পনিক চরিত্র। কিন্তু মীরা বাঈ খুবই ঐতিহাসিকভাবে সত্য একজন নারী যে কৃষ্ণপ্রেমে উজাড় হয়ে ছিলেন সারাটা জীবন।

আজ থেকে কম করে হলেও ৫০০ বছর আগের এই ঘটনা বহুদিন পর্যন্ত মানুষের মুখে মুখে বেঁচে থেকেছে। মীরা প্রায় চার হাজার ভজন রচনা করেছিলেন। ভারতের পথে পথে এমনকি বাংলাদেশের রাস্তায়ও এগুলো এখনো শোনা যায়। তাছাড়া ইউটিউবে অনেক মীরার ভজন পাবেন। কি চমৎকার সুরেলা আর লিরিকের প্রচণ্ড আবেদন।

২।

একদিন মীরা আর তার মা সময় কাটাচ্ছিল। মায়ের সাথে পুতুলের বিয়ে-পুতুলের বিয়ে খেলতে মীরার বিষয়টা খুব চমৎকার লাগল। ও আগ্রহ নিয়ে মাকে বলল, “মা, আমার স্বামী কে হবে?” মা খুব একটা অবাক হলেন না। তখন ৯-১০ বছরেই মেয়েদের বিয়ে হয়ে যেত। তখন অল্প বয়সে বিয়ে ভাবনা এখনকার মতো এরকম লজ্জাকর নয়। মা বললেন, “তোমার তো স্বামী আছেই, কৃষ্ণ তোমার স্বামী।”

এরপর থেকেই কৃষ্ণের প্রতি মীরার ভাব বদলাতে লাগল। একথাটাই হয়তো মীরাকে সাবালিকা করেছিল। কিছুদিন পরে মাত্র আট বছর বয়সে মীরার একবার বিয়ে হয়ে গেল মেওয়ারের রাজার সঙ্গে। সে বিবাহের কারণটি ছিল রাজনৈতিক। শেষ পর্যন্ত, সে বিয়ে টেকেনি। মীরা সাবালিকা হতে থাকল।

খুব অল্প বয়সে ভারত বর্ষের হিন্দু মেয়েরা রাধা-কৃষ্ণের কাহিনি জেনে যায়। বিশেষ করে মথুরা-বৃন্দাবনের শ্রীকৃষ্ণের উপাখ্যানটি। আর দশ জনের মতো মীরাও জেনেছিল। কিন্তু মীরার কৃষ্ণের প্রতি যে প্রেম, যে কামনা- তা সে অস্বীকার করতে পারত না। তার মনের মধ্যে ছটফট, সারা দিন শুধু কৃষ্ণের ভাবনা। সে ভজনে ভজনে সুরের তালে জানতে চাইল-

ওরে নীল যমুনার জল
বললে মোরে বল
কোথায় ঘনশ্যাম।

কৃষ্ণের গায়ের রং-কে মীরা ঘনশ্যাম বলেছে। হরি ছাড়াও কৃষ্ণের আরেক নাম শ্যাম। গানে আছে,

শামরে তোমার সনে/শামরে তোমার সনে
একেলা পাইয়াছি রে আজ (২)
এই নিঠুর বনে
আজ পাশা খেলব রে শ্যাম

৩।

মীরার মা মারা গেলে মীরা পড়ে গেল জীবনের গভীর জলে। তার বাবা তাকে রাজা ভোজরাজের সাথে বিয়ে দিয়ে দিল। অবশ্য শ্বশুরবাড়ি গিয়েও মীরা কৃষ্ণচর্চা চালিয়ে যেতে লাগল। এই নিয়ে পারিবারিক ঝামেলাও হলো। রাজা ভোজরাজের মা কিছুতেই মীরার এই অতি ‘কৃষ্ণপ্রীতি’ পছন্দ করতে পারছিলেন না, তিনি ভোজরাজের উপর ক্রমাগত চাপ প্রয়োগ করছিলেন এই ব্যাপারে। ভোজরাজ প্রথমে অনুরোধ করলেন, কৃষ্ণ ছেড়ে কালীর দিকে মনোযোগ দিতে। মীরার উত্তর,  “আমি তো পারিনা”। ভোজরাজ পরে কঠোর হলেন, অন্যায় করলেন। মীরার একই উত্তর, “আমি যে পারি না”।

মীরার মন-প্রান জুড়ে কৃষ্ণ। কৃষ্ণ বন্দনা। এই গাইছে- এই নাচছে। সারাদিন কৃষ্ণকে ভেবে ভেবে হয় না তার কোন কাজ। বিশেষ করে সন্ধ্যা নামলেই যখন সবকিছু চুপচাপ হয়ে যায়। নীরব পরিবেশে মনের উপর নিয়ন্ত্রন করা যায় বেশী, তখন গভীর ধ্যানে কৃষ্ণ ভজন না গাইলে যেন শান্তি আসে না মীরার মনে-প্রাণে। মীরা কৃষ্ণকে পুরো মন দিয়ে, সারা দেহ দিয়ে পেতে চাইত। এই ইরোটিক দিকটি মীরার ভজনে (ভক্তিগীতি) এক বিশেষভাবে উঠে আসে। একটা ভজনে মীরা, শ্রোতাকে নিজের পরিচয় দিয়ে বলে,

“আনন্দের সমুদ্রে ডুবতে ডুবতে মীরা ওকে অভ্যন্তরে নেয়!”

এ অভ্যন্তরে নেওয়া মানসিক নয়, দেহগত। প্রচণ্ড সত্যবাদী ছিলেন মীরা বাঈ। ইতিহাসে এরকম বেশী একটা দেখা যায় না। জীবনে যৌনতার উপস্থিতি অস্বীকার করেনি মীরা কখনো। যৌনতাকে এড়িয়েও যায়নি যেমন, তেমন যৌনতাকে এড়িয়ে তথাকথিত বিশুদ্ধ থাকবার ছলও করেনি। কৃষ্ণের প্রতি মীরার টানটা মানসিক। কারণ সে কৃষ্ণকে ভালোবেসেছিল। ভারতবর্ষের চিরায়ত ভক্তি দিয়েই মীরা কৃষ্ণকে ভালোবেসেছিল। গানে গানে মীরার মন ভরত। 

৪।

কথাগুলো শুনতে মজার মনে হলেও মীরার জন্য এসব করা অতটা সহজ ছিল না। শাশুড়ি মীরার নাচ এবং ভজনে বাধা দিতেন। কয়েকদিন বাকযুদ্ধ চলল। পরে শুরু হল ধারাবাহিক নির্যাতন। ক্রমাগত নির্যাতন।

এদিকে পথে পথে ছড়িয়ে গেছে মীরার গান। মুখে মুখে পৌছে গেছে সে সুর। মীরার জনপ্রিয়তা বাড়ল এবং অবিশ্বাস্যভাবে গুরুত্বও বাড়ল। ওদিকে নানারকম কুৎসা রটনা হল তার নামে। চরিত্রকে নষ্টা মেয়ে হিসাবে উপস্থাপন করা হলো। তাতে অবশ্য মীরার কিছু গেলো-আসলো না। মীরাকে দমাবে সাধ্য কার! মীরা ঘোষনা দিল ‘মীরা মীরাকে কৃষ্ণের মধ্যে বিলীন করে দিয়েছে’। বাইজেন্টাইন সম্রাজ্ঞী ক্লিওপেট্রার মতো মীরাকেও সাপ দিয়ে স্বাভাবিকভাবে মারার চেষ্টা করা হলো। কিন্তু মীরাকে ‘শেষ করে দেয়া’ সম্ভব হলো না।

৫।

উত্তর ভারত ছাড়িয়ে মধ্য ভারতে পৌছে গেল মীরার ভজন। তার খ্যাতি মোগল সম্রাট আকবর পর্যন্ত পৌছে গেল এবং ফলাফলে আকবরও তার কাছে পৌছালেন; এরকম ‘সংশয়ী ইতিহাস’ পাওয়া যায়। নানান শত্রুতার ঝুট ঝামেলা পেরিয়ে আকবর মীরার এলাকায় আসলেন। রাজপোশাক ছেড়ে ভিক্ষুক বেশে তানসেনকে সঙ্গে নিয়ে রওনা দিলেন মীরা বাইয়ের বাড়ির দিকে।

আকবর উপহার দিলেন মীরাকে। আকবরের আসা নিয়ে, উপহার দেয়া নিয়ে, স্বামীর সাথে কাটাকাটি হল মীরার। জাত-পাতের ব্যাপার ছিল তখনকার ধর্মে। মীরার স্বামী মীরাকে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে মারা যেতে বললেন। প্রথমে মীরা রাজী হল, নদীর দিকে গেল। মীরার যা স্বভাব- একটু পরে সিদ্ধান্ত বদলে ফেলে সাথে কিছু ভক্ত নিয়ে সোজা বিন্দাবনের দিকে হাঁটা ধরল।

তারপরে সেখানের মন্দিরে থেকেই কৃষ্ণ ভক্তি করতে থাকল সে। ওর সর্বাধিক গান এখানে বসেই লেখা। মন্দিরে নিশ্চয়ই মীরা সঠিক সুযোগ পেয়েছিল- পেয়েছিল যথেষ্ট স্বাধীনতা। মন ভরে কৃষ্ণনাম জব করতে পেরেছে সে। কৃষ্ণের মূর্তির কাছে বিলিয়ে দিতে পেরেছে নিজেকে। কৃষ্ণ যাতে মীরার প্রতিটা নিশ্বাস শুনতে পাক- সেই চেষ্টা করেছে।

গাইতে গাইতে, অধীর, এক চাঁদ জাগা রাতে,
নাচতে নাচতে, মীরা, সকাল করে পৃথিবিতে।

মীরা লিখেছে- ‘আমি সহমরণে যাব না। আমি গান গাইব কৃষ্ণের। আমি সহমরণে যাব না। কেননা আমার হৃদয়ে যে শুধুই হরি নাম অঙ্কিত।’

৬।

শেষের বছরগুলোতে সন্ন্যাসীনি হয়ে গুজরাটের দ্বারকায় মীরাকে দেখা গিয়েছিল। ১৫৪৭ সাল থেকে মীরা আর নেই। নানা কাহিনি প্রচলিত মীরাকে নিয়ে। অনেকে বলেন মীরা প্রায় ৫ হাজার গান লিখেছে। যদিও পাওয়া যায় ৪০০-৫০০। মীরাকে নিয়ে শুধু গান নয়, হয়েছে সিনেমা-নাটক-সিরিয়াল। লেখা হয়েছে উপন্যাস-কবিতা। আঁকা হয়েছে মীরা আর কৃষ্ণের হাজার হাজার ছবি। ভারতের অসাধারন কবি গুলজার নিজেই মীরা-কে নিয়ে একটা চমৎকার চলচ্চিত্র নির্মান করেছেন। সেখানে মীরা চরিত্রে অভিনয় করেছে হেমা মালিনী। অসাধারন এই মুভিতে ফুটে উঠেছে মীরার একটা দিক।

ফুটনোট

মীরার কথা আমি প্রথম জানতে পারি ব্লগার ইমন জুবায়ের ভাইয়ের কাছে। উনি আমাদের মাঝে নেই কিছু বছর ধরে। এই লেখায় উনি একরম আছেন। আমি তার প্রতি কৃতজ্ঞ।

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-