ভদ্রলোক কাঁদছেন। একদম হাউমাউ করে কান্না যাকে বলে। লোকজন তাকিয়ে দেখছে, দুয়েকজন মোবাইল বের করে ছবি তুলছে, তাতে মানুষটার কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। গতকাল, এমনই এক বৃষ্টিঝরা দুপুরে তার মেয়েটাকে এখানে পিষে ফেলেছিল একটা বাস। তিনি নিজেও ড্রাইভার, ঢাকা-চাঁপাইনবাগঞ্জ রুটে বাস চালান। তার মেয়েটাকে যে আরেকজন ড্রাইভার এভাবে খুন করে ফেলবে, সেটা তার কল্পনাতেই ছিল না কখনও। তার হাতে একটা সবুজ ছাতা, ভেঙে গেছে সেটা। এই ছাতাটার একটা গল্প আছে। 

দিয়া আক্তার মীম, আবদুল করিম রাজীব, রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজ

মহাখালীর দক্ষিণপাড়ায় বাসা দিয়া আক্তার মিমের। সেখান থেকে রমিজ উদ্দিন কলেজ অনেকটা দূর। এসএসসিতে জিপিএ ফাইভ পেয়ে মেয়েটা ভালো কলেজে পড়তে চেয়েছিল। পাড়ার আরও কয়েকজনের সঙ্গে ভর্তি হয়েছিল ক্যান্টনমেন্টের শহীদ রমিজ উদ্দিন কলেজে। একসঙ্গে আসাযাওয়া করতো সবাই। কখনও মা বাসে তুলে দিয়ে আসতেন। জুলাই মাসের এক তারিখে নতুন শিক্ষাবর্ষের ক্লাস শুরু করেছিল মীম, সবগুলো বইও কেনা হয়নি এখনও। সবুজ রঙের প্রিন্ট করা ছাতাটা মা কিনে দিয়েছিল তাকে।

পরশু দুপুরে হোটেল র‍্যাডিসনের উল্টপাশের রাস্তায় ঘাতক বাসটা যখন প্রবলবেগে মীমকে ধাক্কা দেয়, তখনও ছাতাটা তার হাতে ধরা ছিল। ছিটকে পড়ে গিয়েছিল মেয়েটা, হাত থেকে পড়ে গিয়েছিল ছাতাটাও। মীমের নিথর দেহের পাশে সেটাকেও খুঁজে পাওয়া যায় ছবিতে। ছাতাটা কিনে দেয়ার সময় মীমের মায়ের কল্পনাতেও হয়তো ছিল না, ওকদিন ভাঙাচোরা ছাতাটা ঠিকই ঘরে ফিরবে, কিন্ত তার মেয়েটা আর ফিরবে না! 

দিয়া আক্তার মীম, আবদুল করিম রাজীব, রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজ

মীমের বাবা জাহাঙ্গীর দিনের বেশিরভাগ সময় বাসার বাইরেই থাকেন, তার দিন কাটে রাস্তায়। এরমধ্যেও মেয়েদের খোঁজ নিতে ভোলেন না তিনি। মেয়ে কলেজে গেছে কিনা, ফিরেছে কিনা, সারাক্ষনই সেই খোঁজখবর নিতেন ফোনে। গতকাক দুপুর দুইটায় বাস নিয়ে ঢাকা থেকে চাঁপাই নবাবগঞ্জ যাওয়ার কথা তার, একটার সময় হুট করেই ফোনটা বেজে উঠলো। অপরিচিত নাম্বার থেকে কেউ একজন তাকে জানালেন, আপনার মেয়ে আর নাই, জলদি আসেন। জাহাঙ্গীরের মাথাটা ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল মূহুর্তে। বাস-রিক্সায় করে কোনমতে বনানী পর্যন্ত গেলেন। ছাত্ররা ততক্ষণে রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে। এক মোটরসাইকেল চালককে বললেন, “ভাই আমার মেয়ে অ্যাক্সিডেন্ট করছে, আমারে একটু নিয়া যান।”

ঘটনাস্থলে গিয়ে ছাত্রদের বললেন, আমি মীমের বাবা। ওরাই তাকে নিয়ে গিয়েছিল হাসপাতালে। সেখানে এসে মেয়ের রক্তাক্ত নিথর দেহটাই পেলেন শুধু। যে মেয়েটা রক্ত দেখলেও ভয় পেতো, সেই দিয়া শরীরে রক্ত মেখে শুয়ে আছে চিরতরে! কাঁদতে কাঁদতে জাহাঙ্গীর বলে চলেন-

“আমি ভাবছিলাম হয়তো মেয়েটার অ্যাক্সিডেন্ট হইছে, চিকিৎসা হইতাছে সেইখানে। কতো কতো মানুষ, সবাইরে বললাম, আমি মীমের বাবা, আমার মেয়েটারে একটু দেখান। তারপর সেনাবাহিনীর একজন অফিসার নিয়ে বলেন, আপনি একা আসেন আমার সঙ্গে। সে আমারে নিয়া গেল অন্ধকার একটা ঘরে, তালা মারা ঘরে, ঢাকা দেওয়া। তখন বুঝছি, আমার মেয়ে নাই। তালা খুইলা দিলো, আমি আমার মা রে দেখলাম, তারে বুকে জড়ায়ে ধরলাম, কিন্তু মা আমার আমারে আর আব্বু বইলা ডাকলো না।”

দিয়া আক্তার মীম, আবদুল করিম রাজীব, রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজ

আবদুল করিম রাজীবের গল্পটা একটু আলাদা। ছেলেটা একদম ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছে। তিন বোন আর মা’কে নিয়ে পাঁচজনের সংসার ওদের। মা নিজে কষ্ট করে সবাইকে বড় করেছেন, বোনেদের বিয়ে দিয়েছেন। পড়াশোনায় ভালো ছিল সে, এসএসসি পাশ করে ভর্তি হয়েছিল রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজে। উত্তরার দক্ষিণ আশকোনায় খালার বাসায় মা’কে নিয়ে থাকতো রাজীব। তিন বোনের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পরে মায়ের একমাত্র অবলম্বন ছিল রাজীব, একমাত্র ছেলের মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে বারবার জ্ঞান হারাচ্ছিলেন রাজীবের মা মহিমা বেগম। 

সড়ক দুর্ঘটনা, হত্যা, খুন, নৌ-পরিবহন মন্ত্রী, জাবালে নূর, রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজ

কয়েকটা মূহুর্তের ব্যবধানে দুটো জ্বলজ্যান্ত মানুষ লাশ হয়ে গেল। তাদের ঘিরে স্বপ্নের জাল বুনতে থাকা কতগুলো মানুষের কত স্বপ্নের অপমৃত্যু হয়ে গেল! মানুষ খুনেরই তো বিচার হয় না এদেশে, নির্মমভাবে স্বপ্নগুলোকে গলাটিপে মেরে ফেলার বিচার আর কে করবে! জাহাঙ্গীর অঝোরে কাঁদেন, বারবার মূর্ছা যান আবদুল করিম রাজীবের মা। আর ক্যামেরার সামনে দাঁত বের করে হাসেন আমাদের মন্ত্রীরা। তারা নিহতের সংখ্যা নিয়ে হাসিঠাট্টা করেন, ভারতের সঙ্গে তুলনা দেন। মহিমা বেগম বা জাহাঙ্গীরের কান্না তাদের তেলতেলে হাসির আড়ালে হারিয়ে যায় বারবার।

Comments
Spread the love