মেডিকেলে যেসব ছেলে-মেয়ে পিছিয়ে পড়ে, তাদের চেয়ে বড় বালাই আর নাই। তাদের দিকে সহপাঠীরা বাঁকা চোখে তাকায়, টিচাররা তাদেরকে বাতিলের খাতায় রাখেন, পরিবারে তারা অহরহ মিথ্যা বলে। জানলে পরিবারও আস্তাকুঁড়ে ফেলে দেয় আর ননমেডিকেল বন্ধুদের আড্ডায় এরা নিয়মিত হাস্যরসের জন্ম দেয়। কারণ তারা বদ, তারা পাপী, তারা অস্পর্শী। তারা নিশ্চিতভাবেই পলিটিক্স করে, নেশা করে, প্রেম করে। এরা সমাজের বিগড়ে যাওয়া প্রজন্মের প্রতিভূ। এরা ভবিষ্যত রোগী মারা ডাক্তার। এরাই পেটে ছুরি রেখে সেলাই করে, এরাই ভবিষ্যতে কসাই হয়।

সত্যিকার অর্থে সত্যি চিত্র কি তাই? হয়তো বা অনেকেই নিজের দোষে পিছিয়ে পড়ে। নিজের খামখেয়ালী, নিজের দায়িত্বহীনতা কিংবা অনিয়ন্ত্রিত প্রেম-পলিটিক্স অনেককেই পিছিয়ে দেয়- এটা সত্য। তবে পিছিয়ে পড়া প্রত্যেকেই এমনই এটা ভাবার কোন কারণ নেই।

আমাদের দেশে প্রচুর ছেলেমেয়ে আছে যারা মেডিকেলে ভর্তি হতে চায় না। বায়োলজি সবার প্রিয় সাবজেক্ট হয় না। হাড়, মাংস, রক্ত সবার মাথায় ঢুকে না। পরিবারের চাপে এদেরকে যখন জোর করে মেডিকেলে ঢুকিয়ে দেয়া হয় তখন থেকেই অনেকে পথ হারিয়ে ফেলে। মেডিকেলের প্রাথমিক চাপ ভয়ানক। মেডিকেলীয় টার্ম জানতে, মেডিকেলের সাথে কোপআপ করতে বলতে গেলে যুদ্ধ করতে হয়। ঠিক এই সময়টাতে সবচেয়ে বেশি ছাত্র পিছিয়ে পড়ে। মানসিক হীনমন্যতার শুরু এখান থেকেই।

এর দায় কেবল একটা ছেলে মেয়ের একার নয়। দায় সিস্টেমের। দায় পরিবারের। ইচ্ছার বিরুদ্ধে গতর খাটানো যায়, মাথা না। এমন অনেকেই আছে যারা হাড্ডিকে- ভিসেরাকে, হাসপাতালের ফরমালিন- ফিনাইলের গন্ধকে কখনোই সহ্য করতে পারে না। অনেক চেষ্টা করেও সেখানে কনসেন্ট্রেট করা সম্ভব হয় না।

একটা ছাত্র লম্বা সময়ের জন্য অসুস্থ হতে পারে। মাসখানেকের অসুখ একজনকে ছিটকে ফেলার জন্য যথেষ্ট। একটা ছেলের বাবা অসুস্থ থাকতে পারে, একটা মেয়ের মায়ের অপারেশন থাকতে পারে। থাকতে পারে পারিবারিক নানা জটিলতা। থাকতে পারে দারিদ্র। মেডিকেলের মতো ব্যয়বহুল সিস্টেমে যদি দারিদ্র এসে হাজির হয় তবে একটা স্টুডেন্টের মানসিক অবস্থা ধ্বংস হতে সময় লাগে না। পিছিয়ে পড়ার অসংখ্য যৌক্তিক কারণ আছে…আমি পিছিয়ে পড়ার কারণ বলতে আসিনি। আমি পিছিয়ে পড়া রোধের উপায়গুলো বলতে এসেছি।

আমার প্রথম প্রশ্ন হচ্ছে, মেডিকেলে পিছিয়ে পড়া একটা ছাত্রের জন্য আমাদেদের টিচাররা কি স্টেপ নেন?

উনারা ঝাড়ি দেন। তাঁরা ক্লিয়ারেন্স আটকানোর হুমকি দেন। গার্ডিয়ানকে ফোন করে সব জানিয়ে দেন। তাঁদের চোখ থাকে এটেনডেন্স শীট, রেজাল্ট শীট আর ছাত্রের লাল চোখ, লম্বা চুল- দাড়ি বা ময়লা এপ্রোনে। তাঁরা চুল দাড়ি কাটার জন্য আল্টিমেটাম দেন। আইটেম ক্লিয়ার না করার পরিণাম জানিয়ে দেন। জুতোর তলা ক্ষয় করানোর হুমকি তো নিত্যনৈমিত্তিক।

আচ্ছা তাঁরা কেন কখনোই জানতে চান না ছেলেটা বা মেয়েটা কেন পিছিয়ে পড়েছে? বিনা হিসেবে খারাপ ছাত্র আখ্যা দেয়ার আগে তার অতীত রেজাল্ট কেন শুনতে চান না?

মেডিকেলে পিছিয়ে পড়া ছাত্রদের একটা বড় অংশ ইন্টার পর্যন্ত কলেজে ফার্স্ট হওয়া, বোর্ডে স্ট্যান্ড করা, স্কলারশীপ পেয়ে মাত করা ছাত্র হয়।
দুর্দান্ত একাডেমিক পারফর্ম করে মেডিকেলে আসা ছাত্ররা কেন পিছিয়ে পড়ল এই প্রশ্ন কি একবারও আসে না? একবারও কেন মাথায় হাত রেখে বলেন না, বাপ তোর কি হইছে? সমস্যা কি? কিংবা “মা তুই প্রেমে পড়েছিস? ছেলে ভেগে গেছে না পাত্তা দিচ্ছে না? প্রবলেম কি বল?”

প্রেম তো জীবনেরই অংশ। সেটা নিয়ে ফ্রিলী কথা বলা যাবে না এমন নিষেধাজ্ঞা কি আছে?

মেডিকেলে ছাত্র কয়টাই বা থাকে? কেউ অসুস্থ ছিল কিনা, কারো পরিবারে কেউ অসুস্থ আছে কিনা, কেউ আর্থিক টানাপোড়নে আছে কিনা-এই প্রশ্নগুলো করা কি খুব অন্যায়? ক’জন ছাত্রকে ফোন করা হয়? কয়জন শিক্ষক হুমকি-ধামকি দেয়ার আগে পরে ছাত্রদের এসব প্রশ্ন করেন? ছাত্ররা মন খুলে কথা বলতে পারে এমন শিক্ষক কতজন থাকেন পুরো কলেজে? আমি বলছি না এরকম কেউই নেই। তবে সংখ্যাটা বড়ই নগন্য। যারা আছেন তাঁদের জন্য স্যালুট! বোঝা উচিত। একটু অনুধাবন করা উচিত। জানা উচিত পিছিয়ে পড়া ছাত্রদের সাইকোলজি। কি চলে তাদের ভেতরে সেটা বের করা দরকার।

নিজের ব্যাচমেটদের ডাক্তার হতে যাওয়া দেখে বা সামনে যেতে কতটা পুড়ে কজনই বা জানে। জুনিয়রদের সাথে ক্লাস-ওয়ার্ডে পেছনে বসে বা পেছনে দাঁড়িয়ে করার অপমান কারো বোঝার কথা না। শিক্ষকদের কাছে হাস্যকর বস্তুতে পরিণত হওয়া কিংবা নিজের দুর্দান্ত অতীত রেকর্ড থাকার পরও আজন্ম নিজেকে জঘণ্য ছাত্র হিসেবে মানসিক স্বীকৃতির দেয়ার কষ্ট খুব খারাপ। এই জ্বালা একটা মানুষকে ভস্ম করে দেয়, ছাঁই করে দেয়, নষ্ট করে দেয়। এসব কষ্ট-যন্ত্রণা-অনুশোচনা পিছিয়ে পড়াদের আরো পিছিয়ে ফেলে। হতাশা বাড়তে থাকে জ্যামিতিক হারে। বাড়তে বাড়তে মাঝে মাঝে ওভারলোডেড হয়ে যায়।

আমার জানামতে, প্রতিটা পাবলিক ভার্সিটিতে সাইকোলজি সেন্টার আছে ছাত্রদের মানসিক সাপোর্ট দেয়ার জন্য। মেডিকেল কলেজে সাইকিয়াট্রি বিভাগ থাকলেও সেখানে ছাত্রছাত্রীরা যেতে চায় না। যাওয়ার পরিবেশ থাকে না। থাকে লোকলজ্জা, অপমানবোধ। শিক্ষকরাও পিছিয়ে পড়া কোন ছাত্রকে ধরে সেখানে নিয়ে যান না। হয়তো একবারের কাউন্সেলিং একটা মানুষের জীবন পাল্টে দিতে পারত। মিস্ত্রির যেমন ভাঙা ঘর থাকে- মেডিকেল ছাত্ররাও এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত।

সিস্টেমকে একটু বদলানো উচিত। বিলিভ মি, মেডিকেল ধারণার চেয়েও বেশি অমানবিক হয়ে যাচ্ছে। থাকুক অনেক বড় সিলেবাস, অনেক বেশি চাপ, দিনভর পড়াশোনা.. তাও চাইলে সিস্টেমকে আরেকটু মানবিক বা আরেকটু আনন্দঘন করা যায়।

মেডিকেলের প্রাচীরের ভেতরে প্রচুর প্রতিভার অপমৃত্যু ঘটে। অপমৃত্যু ঘটে একজন শিল্পীর, একজন চিত্রকরের, একজন কবির কিংবা একেকজন দুর্দান্ত লেখকের। এরা সাপোর্ট পায় না, সম্মান পায় না। উল্টো এসব গুণই পথের কাঁটা হয়। খিস্তি শোনতে হয় নিজের প্রতিভার জন্যই। প্রতিভার অপমৃত্যুর সাথে সাথে মৃত্যু ঘটে স্বয়ং মানুষটারই। দিন শেষে একটা সার্টিফিকেট হাতে নিয়ে যখন একজন মানুষ বের হয় তখন সে আর মানুষ থাকে না, আস্তো একটা রোবট হয়ে যায়। অথচ শেষ পর্যন্ত এরা কম্পিউটারের না, মানুষেরই চিকিৎসা করে।

খুব বেশি না। একটু, অল্প একটু মানসিক সাপোর্ট দিন পিছিয়ে পড়াদের। একটু তাদের কথা শুনুন। জানুন কেন? কিভাবে? কি করে? পরিবারে অবাঞ্চিত ঘোষণা করার আগে সত্যটা জেনে নিন। কতটা কঠোর অমানবিক সিস্টেমে একটা মেডিকেল ছাত্র থাকে সেটা সম্পর্কে জানুন।
বন্ধুমহল টিটকারী মারার আগে মেডিকেলে কততে পাশ আর কি করে পাশ করতে হয় তার সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান লাভ করুন। পরীক্ষার সিজনে একবার ঘুরে যান মেডিকেল হোস্টেল, বা মেডিকেল রিডিং রুম।

একটা পিছিয়ে পড়া ছাত্রের পতন ঠেকাতে পারলে কারো ক্ষতি নেই। সিস্টেমকে আরেকটু মানবিক করতে পারলে এই ডাক্তাররাও আরো বেশি মানবিক হতে বাধ্য। বাড়তি প্রতিভার দাম দিতে পারলে কারো কোন ক্ষতি হবে না, বিশ্বাস করুন। আপনারা শ্রদ্ধেয় শিক্ষকেরা ডিফল্ডার ছাত্রদের বা খারাপ ছাত্রদের অবনত মস্তক বা অন্ধকার মুখ দেখতে যতটা পছন্দ করেন, ততটা পছন্দ যদি তাদের মাথা উচু করা মুখ দেখে পান! তবে কসম…বদলে যাবে অনেক কিছুই!

পিছিয়ে পড়াদের আপনারা যতটা খারাপ ভাবেন। বিলিভ মি, তারা ততটা খারাপ নয়, ততটা গাধা নয়, ততটা অমানুষও নয়।

Comments
Spread the love