২০০৩ সালের ঘটনা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী ও অভিনেত্রী বারবারা স্ট্রেইস্যান্ড আদালতে মামলা ঠুকে দেন ফটোগ্রাফার কেনেথ অ্যাডেলমানের বিরুদ্ধে। অভিযোগ ছিল এই যে, অ্যাডেলমান আকাশ থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার মালিবুতে অবস্থিত স্ট্রেইস্যান্ডের ম্যানশনের ছবি তুলেছেন, যার ফলে তার প্রাইভেসি ক্ষুণ্ন হয়েছে এবং ছবিগুলো দেখে মানুষ জেনে ফেলেছে কীভাবে তার প্রাইভেট প্রোপার্টিতে প্রবেশ করা সম্ভব। এজন্য আদালতে স্ট্রেইস্যান্ড অ্যাডেলমানের কাছ থেকে ৫০ মিলিয়ন ডলারও দাবি করে বসেন।

কিন্তু স্ট্রেইস্যান্ডের হিসাবে একটু ভুল ছিল। অ্যাডেলমান বাস্তবে কোন পাপারাজ্জি ছিলেন না, এবং স্ট্রেইস্যান্ডের প্রাইভেসি ক্ষুণ্ন করা ঘুনাক্ষরেও তার লক্ষ্য ছিল না। তিনি মূলত ক্যালিফোর্নিয়া কোস্টাল রেকর্ডস প্রজেক্টের হয়ে কাজ করতেন, এবং তার কাজ ছিল ওই অঞ্চলের সকল এলাকার ছবি তোলা, যা পরবর্তীতে বিজ্ঞানী ও গবেষকদের কাজে লাগতে পারে। এজন্য অ্যাডেলমান শুধু স্ট্রেইস্যান্ডের ম্যানশনের ছবিই নয়, বরং ওই অঞ্চলের প্রায় ১২,০০০ ছবি তুলেছিলেন, এবং সেই সকল ছবিই সংরক্ষিত ছিল প্রজেক্টের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে। 

মিডিয়া ব্ল্যাক আউট, স্ট্রেইস্যান্ড ইফেক্ট, ছাত্র আন্দোলন, জিগাতলায় হামলা, নিরাপদ সড়ক চাই

তবে সেই ওয়েবসাইট সাধারণ মানুষের কাছে খুব বেশি পরিচিত ছিল না। যখন স্ট্রেইস্যান্ড অ্যাডেলমানের নামে আদালতে মামলা করেন, তখন পর্যন্ত তার ম্যানশনের ওই বিশেষ ছবিটি দেখা হয়েছিল মাত্র ছয়বার, যার মধ্যে দুইবার শুধু দেখেছিলেন তার আইনজীবীই, এবং ধারণা করা যায় যে আইনজীবীর দ্বারস্থ হওয়ার আগে তিনি নিজেও এক আধবার ছবিটিতে চোখ বুলিয়েছিলেন। কিন্তু আদালতে মামলা ওঠানোর পর থেকেই বদলে যায় দৃশ্যপট। সকল সংবাদমাধ্যমে খবরটি ফলাও করে ছাপা হয়, এমনকি অ্যাসোসিয়েট প্রেসও ছবিটি প্রিন্টের ব্যবস্থা করে। ফলে যা হওয়ার তাই হয়, মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই ছবিটি পেয়ে যায় দশ লক্ষাধিক ভিউ।

অর্থাৎ আদালতে মামলা করার আগে স্ট্রেইস্যান্ড যে ভয়টি পাচ্ছিলেন, সেটিই সত্য হয়। কিন্তু এতে ফটোগ্রাফারের দায় যতটা, তারচেয়ে শতগুণে বেশি দায় তার নিজেরই। এমনকি আদালতেও মামলাটিতে হেরে যান তিনি। আদালত স্ট্রেইস্যান্ডের ম্যানশনের ছবি তোলায় অ্যাডেলমানের কোন দোষই খুঁজে পায়নি। ফলে অ্যাডেলমানকে অহেতুক এই কেস চালাতে হওয়ায়, আদালতের নির্দেশে তাকে ১,৫৫,৫৬৭.০৪ মার্কিন ডলার জরিমানা পরিশোধ করতে বাধ্য হন স্ট্রেইস্যান্ড। এভাবে আম ও ছালা দুই-ই যায় স্ট্রেইস্যান্ডের।

এই উদাহরণটির একটি বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। এই উদাহরণটি আমাদেরকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখায়, কোন তথ্য স্বাভাবিকভাবে যতটা না প্রকাশ্যে আসে ও সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, সেটি তারচেয়ে শতগুণে বেশি জনপ্রিয়তা পায় ও ছড়িয়ে পড়ে, যখন কেউ সেই তথ্যটিকে ঢাকবার বা লুকাবার চেষ্টা করে। এই উদাহরণের উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে একটি বিশেষ টার্ম, সেটি হলো – স্ট্রেইস্যান্ড ইফেক্ট। 

ছাত্রলীগের হামলা, ছাত্র আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক চাই

স্ট্রেইস্যান্ড ইফেক্ট বলতে বোঝায়, যখন কোন তথ্যকে ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন করতে চাওয়া হয়, তখন সেটি আরও বেশি করে সাধারণ মানুষের নজরে পড়ে এবং খুব দ্রুত চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে, বিশেষত ইন্টারনেটের কল্যাণে। কিন্তু সমস্যা হলো, যেহেতু তথ্যটি গোপন করতে চাওয়া হয়, তাই অনেক সময়ই দেখা যায় যে প্রকৃত তথ্যটির বদলে সেটির বিকৃত সংস্করণ মানুষের সামনে আসে। যেমন ধরুন কোথাও একজন মানুষ আহত হয়েছে, কিন্তু আপনি সেটি লুকাতে চাইলেন। ফলে কথাটি পাঁচকান হয়ে যখন ফের আপনার কাছে যখন ফিরে আসবে, তখন আপনি শুনবেন একজন মানুষ নাকি মারাই গেছে!

এরকমটিই আসলে হয়ে থাকে সবসময়। তথ্য হলো অনেকটা পচনশীল খাবারের মত। সেটিকে টাটকা অবস্থায় আপনি যদি প্রকাশ্যে আনেন, সেটি স্বাভাবিক অবস্থাতেই থাকবে। কিন্তু সেটিকে যদি আপনি লুকিয়ে রাখতে চান, একসময় সেটি পচে-গলে দুর্গন্ধ ছড়াবে। অর্থাৎ তথ্যকে কখনোই লুকিয়ে রাখা যায় না, কেবল সেটির প্রকাশ্যে আসাকে কিছুটা বিলম্বিত করা যায়। আর যতই বিলম্বিত করা হয়, তথ্যটি তার ভিত্তিমূল থেকে সরে গিয়ে বিকৃত হতে থাকে, সত্যের সাথে একগাদা মিথ্যা মিশে যায়, আর তার ফলে ভুগতে হয় সাধারণ মানুষকে। সঠিক তথ্যের বদলে বিকৃত তথ্যলাভের মাধ্যমে পথভ্রষ্ট হয় মানুষ, সমাজে দেখা দেয় হানাহানি, অস্থিরতা, নৈরাজ্য।

দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে এইসব থিওরি কপচানোর কোন ইচ্ছাই আসলে ছিল না। তারপরও এগুলো বলছি আসলে দেশের সাম্প্রতিক অবস্থার সাথে এই থিওরির খুব গভীর যোগাযোগ থাকায়। গতকাল শনিবারই (৪ আগস্ট, ২০১৮) আমরা বাংলাদেশের মানুষেরা সাক্ষী হয়েছি স্মরণকালের সবচেয়ে বড় স্ট্রেইস্যান্ড ইফেক্টটির। হ্যাঁ পাঠক, ধানমন্ডির জিগাতলার অবস্থা নিয়ে দিনভর যে নাটকীয়তা চলেছে, সেটি আসলে স্ট্রেইস্যান্ড ইফেক্টেরই একটি ক্লাসিক উদাহরণ। 

মিডিয়া ব্ল্যাক আউট, স্ট্রেইস্যান্ড ইফেক্ট, ছাত্র আন্দোলন, জিগাতলায় হামলা, নিরাপদ সড়ক চাই

দুপুরবেলা থেকেই আমরা লক্ষ্য করেছি মিডিয়া ব্ল্যাক আউটের। সম্ভবত সরকারের নির্দেশেই, দেশের মেইনস্ট্রিম মিডিয়াগুলো জিগাতলায় স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনে ছাত্রলীগের হামলার পর কী অবস্থা হয়েছিল, তা কাভার করা থেকে বিরত থাকে। ফলে সেখানে প্রকৃতপক্ষে কী হচ্ছিল, তা সাধারণ মানুষের পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না। মেইনস্ট্রিম মিডিয়া যখন অথেনটিক নিউজ পরিবেশন করতে ব্যর্থ হয়, তখন একমাত্র অবলম্বন হয়ে দাঁড়ায় সোশ্যাল মিডিয়া। গতকালও ঠিক সেটিই হয়েছিল।

এমনকি প্রথম আলো, ডেইলি স্টারের মত নামজাদা পত্রিকাগুলোও যখন জিগাতলার সর্বশেষ পরিস্থিতির ব্যাপারে আশ্চর্য রকমের নীরব ভূমিকা পালন করতে শুরু করে, তখন সোশ্যাল মিডিয়াই হয় সাধারণ মানুষের শেষ আশ্রয়। যেহেতু সেখানে কোন সেন্সরশিপ নেই, সত্য প্রকাশের বিন্দুমাত্র দায়বদ্ধতা নেই, তাই যে যেভাবে পারে এক চিমটি সত্যের সাথে এক মুঠো অসত্য মিশিয়ে বিকৃত তথ্য ছড়াতে থাকে, যাকে আমরা অভিহিত করে থাকি ‘গুজব’ বলে। সারাটাদিনই কান নিয়েছে চিলে এই কথা শুনে আমরা আতংকিত হয়ে থাকি, কিন্তু আসলেই চিল কান নিয়েছে নাকি কান কানের জায়গাতেই আছে, তা খতিয়ে দেখার কোন উপায় আমাদের ছিল না। 

ছাত্রলীগের হামলা, ছাত্র আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক চাই

মেইনস্ট্রিম মিডিয়া যদি কোন সংবাদের সত্যতা যাচাই করার দায়িত্ব না নেয়, তাহলে এমনটিই তো হওয়ার কথা! ফলে কোনটি গুজব আর কোনটি প্রকৃত বাস্তবতা, তা ঠাহর করতে ব্যর্থ হই আমরা। আসলেই জিগাতলায় কোন ছাত্র খুন বা ধর্ষণের শিকার হয়েছে কি না সে-ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত হতে পারি না, ফলে বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলাচলে দুলতে থাকি। সবমিলিয়ে একে বলা যায় স্ট্রেইস্যান্ড ইফেক্টের এক ভয়াবহ প্রত্যয়ন। কিন্তু একটিবার ভেবে দেখুন তো, মেইনস্ট্রিম মিডিয়া যদি তাদের দায়িত্বগুলো সঠিকভাবে পালন করত, জিগাতলা বা দেশের অন্যান্য জায়গায় আসলেই কী হচ্ছে না হচ্ছে সে-ব্যাপারে আমাদেরকে ঠিকভাবে অবগত করত, তাহলে কি কোন দুষ্টচক্রের পক্ষে সম্ভব হতো সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব ছড়ানো?

প্রকৃত সত্য জানার অধিকার আমাদের সকলেরই রয়েছে, কিন্তু সেই অধিকার থেকে আমাদেরকে বঞ্চিত করেছে সরকার।হ্যাঁ, গুজবে কান দেয়া খুবই অনুচিত কাজ। আমরা চাই না গুজবে কান দিতে। অথচ সত্যকেও তো আমাদের থেকে আড়াল করা হচ্ছে। তাহলে এখন আমরা কী করব? চোখে টিনের চশমা পরে থাকব? কানে তুলো গুঁজে বসে থাকব? নাকি বিটিভি চালিয়ে দিয়ে দেখতে থাকব দেশের কোথায় বাতাবি লেবুর বাম্পার ফলন হয়েছে?

Comments
Spread the love