সিনেমা হলের গলি

‘মি টু’ ও একজন রাখী সাওয়ান্ত

সাবেক মিস ইন্ডিয়া এবং বলিউড তারকা তনুশ্রী দত্ত যখন নানা পাটেকরের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ এনেছিলেন, তখন থেকেই নানা পাটেকরের পক্ষ নিয়ে সরব ছিলেন একজন। তনুশ্রীর অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করে সেই সময়ে যা নয় তা বলে গিয়েছেন তিনি। দশ বছর বাদে যখন সেই প্রসঙ্গটা আবারও উঠেছে, এবং পুরো বলিউডে বেশ ভালোভাবেই মি-টু ক্যাম্পেইন চালু হয়েছে, তখনও সেই নারী স্রোতের উল্টোদিকে হেঁটে একের পর এক কটুক্তি ছুঁড়ে দিয়েছেন অভিযোগকারী মানুষগুলোর দিকে। তাদের মিথ্যেবাদী বা ফেমসিকার বলেও আখ্যা দিয়েছেন একাধিকবার!

তার নাম রাখী সাওয়ান্ত। বলিউডের একসময়ের বি-গ্রেড আইটেম গার্ল তিনি। এখন বয়স হয়েছে, কাজকর্ম নেই তেমন, তাই হয়তো মিডিয়ার হেডলাইন হবার আশায় উল্টোপাল্টা বলে চলেছেন একটানা। একে একে যখন নারীরা তাদের সাথে ঘটে যাওয়া অন্যায় আচরণগুলোর কথা সামনে নিয়ে আসছেন, আঙুল তুলছেন নির্যাতনকারী পুরুষদের বিরুদ্ধে, তখন সেই মহিলা (ভদ্রমহিলা শব্দটি তার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যায় কিনা আমরা জানিনা) বলেছেন, আলোচনায় থাকার জন্যেই নাকি মেয়েগুলো এতবছর পরে অভিযোগ জানাতে এসেছে! এতেই ক্ষান্ত থাকেননি তিনি, এবার তো তনুশ্রী দত্তকে ‘সমকামী’ উল্লেখ করে তার বিরুদ্ধে ধর্ষণের অদ্ভুত এক অভিযোগই এনে বসেছেন রাখী সাওয়ান্ত! এই অভিযোগ শুনে হাসা উচিত নাকি কাঁদা উচিত, সেটাই ভেবে পাচ্ছেন না অনেকে! 

মি টু মুভমেন্ট, যৌন হয়রানি, তনুশ্রী দত্ত, নানা পাটেকর, ফারিয়া শাহরিন

‘হর্ন ওকে’ নামের এক সিনেমায় একটা আইটেম সং- এ পারফর্ম করার কথা ছিল তনুশ্রী দত্তের। এটা ২০০৮ সালের কথা। সেই গানের শুটিঙের সেটেই তনুশ্রীর সঙ্গে বাজে আচরণ করেছিলেন নানা পাটেকর। সেটার প্রতিবাদ করায় তার গাড়িতে হামলা চালানো হয়েছিল, তনুশ্রীর বিরুদ্ধে অপেশাদারিত্বের অভিযোগ তুলে তার ওপর একরকমের অলিখিত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। তনুশ্রীর জায়গায় সেই গানে পরে অভিনয় করেছিলেন রাখী সাওয়ান্ত। তখনই রাখী কয়েকটা বিস্ফোরক মন্তব্য করেছিলেন তনুশ্রীকে নিয়ে, বলেছিলেন, “তনুশ্রী কি এমন সতী সাবিত্রী? অভিনয় করতে এলে কি লোকে গায়ে হাত দেবে না? ও কি মোমের পুতুল, যে ছুঁলেই গলে যাবে?”

সেই ঘটনার দশ বছর পরে যখন আবার সেগুলো নিয়ে কথাবার্তা হচ্ছে, তখনও রাখী সাওয়ান্ত সরব। এই দশ বছরে অনেক কিছুই বদলে গেছে, বলিউডে কাজ করা মানুষগুলোর মানসিকতাও খানিকটা পরিবর্তিত হয়েছে। ২০০৮ সালে তনুশ্রীর কথা কেউ শোনেনি, উল্টো তাকে দোষারোপ করেছে। এখন এই ২০১৮ সালে এসে অনেকেই তার পাশে দাঁড়াচ্ছেন, তনুশ্রীর সাহস দেখে অনেকে সাহস পাচ্ছেন নিজেদের সাথে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনাগুলোর ব্যাপারে মুখ খুলতে। তবে অনেক কিছু বদলে গেলেও, বদলাননি রাখী সাওয়ান্ত। বদলায়নি তার মুখের সেই নোংরা ভাষাও। 

বলা হয়, যাদের কাজ করার মুরোদ নেই নেই, তারা নাকি কাজের চেয়ে মুখে বেশি পারদর্শী হয়। রাখী সাওয়ান্তের হয়েছে সেই অবস্থা। বলিউডে কোন কালেই তিনি অভিনেত্রীর কাতারে পড়েননি, বি-সি গ্রেডের সিনেমাগুলোতে চার মিনিটের আইটেম গানে নাচার জন্যে নেয়া হতো তাকে। সেই সময়টাও এখন গত, কাজ নেই অনেকদিন ধরেই। ক্ষোভ ঝাড়ার একটা জায়গা তো দরকার, তাই হয়তো মনের ক্ষোভ ঝেড়ে দিয়েছেন তনুশ্রীর ওপরে। নানা পাটেকরের পক্ষ নিয়ে তিনি বলেছিলেন-

“গত দশ বছর কি ও কোমায় ছিল? এখন এসেছে নানা পাটেকরের মতো একজন প্রবীণ অভিনেতার বিরুদ্ধে কুৎসা রটাতে। ঘটনা আসলে এসব কিছুই না, যেহেতু তনুশ্রী ভাল ইংরাজি বলতে পারে, তাই সংবাদমাধ্যম ওকে অযথা গুরুত্ব দিচ্ছে। সাহস থাকে তো আমার সামনে আসুক।”

রাখী’র একটানা আজেবাজে কথায় বিরক্ত হয়ে তার বিরুদ্ধে মানহানী মামলা করেছিলেন তনুশ্রী। জবাবে তনুশ্রীর বিরুদ্ধেও মানহানীর মামলা করেছিলেন রাখী সাওয়ান্ত। এবার তো সবকিছুকেই ছাপিয়ে গেলেন তিনি। মুম্বাইতে সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে তিনি দাবী করলেন, ‘সমকামী’ তনুশ্রী দত্ত নাকি তাকে একাধিকবার ধর্ষণ করেছেন! তনুশ্রী শারিরীকভাবে নারী হলেও, মানসিকভাবে তিনি পুরুষদের মতো বলেও দাবী করেছেন রাখী! 

সংবাদ সম্মেলনে রাখী সাওয়ান্ত বলেছেন, “১২ বছর আগে তনুশ্রী আমার প্রিয় বন্ধু ছিল। বিভিন্ন রেভ পার্টিতে আমরা যেতাম। সেখানে তনুশ্রী প্রচুর ড্রাগ নিত। আমাকেও ড্রাগ নিতে বাধ্য করত। ও আমার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় খারাপ ভাবে হাত দিত। বলিউডে অনেক সমকামী রয়েছে। তনুশ্রীও সমকামী।”

বেগম রোকেয়া হয়তো একশো বছর আগে রাখী সাওয়ান্ত বা তার মতো নারীদের উদ্দেশ্য করেই লিখেছিলেন, “নারী স্বাধীনতার প্রধান অন্তরায় কিন্ত নারীরাই।” প্রায় পুরো বলিউড যখন নারী নিপীড়ন নিয়ে সোচ্চার, দোষীদের বিচারের দাবীতে সবাই যখন একজোট, তখন একজন নারী হয়েও শুধু সস্তা প্রচারণার আশায় মিডিয়ার হেডলাইন হবার আকাঙ্ক্ষায় যে কেউ এভাবে সবকিছুর বিরোধিতা করে যেতে পারে তাও এমন নোংরা আর কুরুচিপূর্ণ ভাষায়, সেটা রাখী সাওয়ান্তকে না দেখলে বিশ্বাস করা কষ্টকর হতো।

রাখী সাওয়ান্তের মতো মানুষকে নিয়ে লেখার ইচ্ছে বা রুচি, কোনটাই ছিল না। রাখীর মতো মানুষ কি বলেছে, সেটাও হেডলাইন হবার যোগ্য নয়। কিন্ত সমস্যা হচ্ছে, রাখী সাওয়ান্তের মতো মানসিকতা নিতে আমাদের চারপাশে হাজার হাজার নারী ঘুরে বেড়ায়। হ্যারাসমেন্টের কোন ঘটনা ঘটলে যারা নারীর পাশে না দাঁড়িয়ে উল্টো আক্রান্ত নারীকেই দোষারোপ করে! আমাদের মিডিয়াতেও রাখীর মতো অনেকেই আছে। বছরখানেক আগে ফারিয়া শাহরিন নামের এক মডেল-অভিনেত্রী যৌন হয়রানির অভিযোগ এনেছিলেন, তখন মিডিয়াতে কাজ করা কয়েকজন নারীই তার বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, তাকে নোংরা ভাষায় আক্রমণ করেছেন। 

মি টু মুভমেন্ট, যৌন হয়রানি, তনুশ্রী দত্ত, নানা পাটেকর, ফারিয়া শাহরিন

অভিযোগ ওঠা মানেই যে সেটা সত্যি, তেমনটা নয় অবশ্যই। কিন্ত একটা অভিযোগ উঠলে সেটা খতিয়ে দেখা উচিত, সেই অভিযোগের যথাযথ তদন্ত হওয়া উচিত, সত্যিটা কি, সেটা জানার অধিকার সবার আছে। সেসব না করে যখন একপাক্ষিকভাবে অভিযোগ করা মানুষটাকেই দোষারোপ করা হয়, তাকে নিয়ে নোংরা কথাবার্তা বলে হয়, সেটা খুবই জঘন্য আর নিম্নরুচির কাজ হয়ে দাঁড়ায়। এই লেখাটা যতোটা না রাখী সাওয়ান্তের জন্যে, তারচেয়ে বেশি রাখী সাওয়ান্তের বাংলাদেশী ভার্সন ওই মানুষগুলোর জন্যে… 

আরও পড়ুন-

Comments

Tags

Related Articles