সিনেমা হলের গলি

বাংলাদেশে হবে না ‘মি টু’ আন্দোলন?

বলিউডে এখন সবচেয়ে বেশি চর্চিত বিষয় অভিনেতা নানা পাটেকরের বিরুদ্ধে সাবেক মিস ইন্ডিয়া এবং বলিউড অভিনেত্রী তনুশ্রী দত্তের যৌন হয়রানির অভিযোগ। এটা নিয়ে বলিউড মোটামুটি দুই দলে ভাগ হয়ে গেছে। ফারহান আখতার, প্রিয়াঙ্কা চোপড়া, পরিণীতি চোপড়া, অর্জুন কাপুর, রিচা চাড্ডা, টুইঙ্কেল খান্না বা স্বরা ভাস্করের মতো অভিনেতা-অভিনেত্রীরা রাখঢাক না করেই তনুশ্রীর পাশে দাঁড়াচ্ছেন, সাহস যোগাচ্ছেন তাকে। আবার অনেকে এই ঘটনা নিয়ে মন্তব্য করতেও রাজী হচ্ছেন না, সেফ সাইডে থাকতে চাইছেন। কট্টরপন্থী কিছু সংগঠন আবার নানার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলায় তনুশ্রীকে হুমকি দিয়েছে, থানায় জিডিও করেছেন তিনি। তনুশ্রীর বিপক্ষে মামলা করেছেন নানা, লিগ্যাল নোটিশ হাতে পেয়ে তনুশ্রীও পাল্টা মামলা করেছেন নানা পাটেকরের বিরুদ্ধে।

ঘটনাটা ঘটেছিল বছর দশেক আগে। ২০০৮ সালে ‘হর্ন ওকে প্লিজ’ নামের একটা সিনেমার শুটিং চলাকালে শুটিং সেটে তনুশ্রীর যৌন হয়রানি করেছিলেন নানা পাটেকর- এমনটাই তনুশ্রীর দাবী। একটা আইটেম সং- এর শুটিং করার সময় বাজেভাবে তনুশ্রীর গায়ে হাত দিয়েছিলেন নানা। তনুশ্রী সাথে সাথেই সেটার প্রতিবাদ করেন। একারণে সেই সিনেমায় তনুশ্রীকে শুটিং করতে দেয়া হয়নি আর। শুটিঙের সেট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় তনুশ্রীর গাড়িতেও হামলা চালানো হয়। তনুশ্রীর অভিযোগ, সেই হামলা চালানো হয়েছিল নানা পাটেকরের নির্দেশে। সেই হামলার ভিডিও ক্লিপও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে গেছে। 

মি টু মুভমেন্ট, যৌন হয়রানি, তনুশ্রী দত্ত, নানা পাটেকর, ফারিয়া শাহরিন

ঘটনার পরপরই সিনে এন্ড টিভি আর্টিস্ট অ্যাসোসিয়েশনে নানার নামে অভিযোগ করেছিলেন তনুশ্রী। কিন্ত নানা পাটেকর প্রভাবশালী অভিনেতা হওয়ায় তাকে বলা হয়, সবকিছু চেপে যেতে। এমনকি সিনেমার পরিচালকও নানার পক্ষ নিয়ে কথা বলেছিলেন তখন। তনুশ্রী সেই ঘটনার পরে বলিউড থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন ধীরে ধীরে। দশ বছর পরে ফিরে এসে যখন আবার মুখ খুলছেন, তখন পাশে পেয়েছেন অনেককেই। তাদের মধ্যে অন্যতম একজন হচ্ছেন শাইনি শেঠি। এই ভদ্রমহিলা ‘হর্ন ওকে প্লিজ’ সিনেমায় সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করছিলেন। তনুশ্রীর সঙ্গে ঠিক কি হয়েছিল, সেটা তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন। শাইনি জানিয়েছেন,

“ঘটনার পর অস্বস্তি বোধ করেছিলেন তনুশ্রী, সেটা আমি টের পেয়েছিলাম। একজন মেয়ে হিসেবে আমার সেটা বোঝারই কথা। সেটা আমার প্রথম ছবি ছিল, আমি ছিলাম সহকারী পরিচালক। ফলে ওই সময় আমার কিছু করার ছিল না। তনুশ্রী যা করেছেন, সেটার জন্য আজ আমি গর্বিত।”

নানা পাটেকরের বিরুদ্ধে তনুশ্রীর এই যৌন হয়রানির অভিযোগের মধ্যে দিয়েই সবার চোখের সামনে একটা ‘ওপেন সিক্রেট’ উন্মোচিত হলো যেন। সবাই জানে, বলিউডে অভিনেত্রীদের যৌন হয়রানির শিকার হতে হয়। ক্ষেত্রবিশেষে অভিনেতারাও কখনও কখনও বিরূপ পরিস্থিতিতে পড়েন। তবে এসব ঘটনা নিয়ে কেউ কখনও মুখ খোলেননি সেভাবে। কারণ মুখ খুললে কাউকে পাশে পাওয়া যেতো না সেভাবে। দশ বছর আগে যেমন তনুশ্রীও পাননি। তবে যুগ বদলেছে, বলিউডে তো অন্তত বদল ঘটেছে। তাই তনুশ্রীকে সমর্থন জানিয়ে ‘মি-টু’ (Me Too) আন্দোলনের প্রবর্তন ঘটেছে হিন্দি সিনেমা জগতেও। 

মি টু মুভমেন্ট, যৌন হয়রানি, তনুশ্রী দত্ত, নানা পাটেকর, ফারিয়া শাহরিন

মি-টু মুভমেন্ট সম্পর্কে যারা জানেন না, তাদের জন্যে জানিয়ে রাখি, হলিউডি প্রযোজক হার্ভে উইনস্টেইনের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ এনে সব অভিনেত্রীরা এক হয়েছিলেন, একে একে অনেকেই জানিয়েছিলেন, নির্যাতিত হয়েছিলেন তারাও। করেছিলেন প্রতিবাদ। সেখান থেকেই ‘Me Too’ আন্দোলনের সূত্রপাত, এবার যেটা বলিউডেও ছড়িয়ে পড়েছে নানা পাটেকরের ঘটনায়।

এবার একটু বাংলাদেশে আসি। এদেশের মিডিয়াতে কি নারীরা যৌন হয়রানির শিকার হন না? নাকি আমাদের দেশের পুরুষ মানুষেরা সব ফেরেশতা? যৌন হয়রানির ঘটনা তো অহরহই ঘটে। কিন্ত মানসম্মানের ভয়ে সবাই চেপে যান, যেন মিডিয়াতে কাজ করতে হলে এসব মুখ বুজে সয়েই কাজ করে যেতে হবে! শুধু মিডিয়ায় নয়, আমাদের দেশের প্রায় প্রতিটা ক্ষেত্রেই জীবনের কোন না কোন পর্যায়ে নারীদের যৌন হয়রানির শিকার হতে হয়। কিন্ত ক’জন নারী সাহস করে সেসব ঘটনার কথা মুখ ফুটে বলতে পারেন? আমাদের যে সমাজব্যবস্থা, আর যে ভ্রান্ত বিশ্বাস নিয়ে আমরা বাস করি, সেখানে কোন নারী এমন অভিযোগ তুললে উলটো তাকেই খারাপ মেয়ে বানিয়ে দিতে একটুও কার্পণ্য করি না আমরা।

ফারিয়া শাহরিন নামের একজন মডেল-অভিনেত্রী গতবছর মিডিয়ায় নারীদের সাথে হওয়া যৌন হয়রানি নিয়ে মুখ খুলেছিলেন। ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে তিনি জানিয়েছিলেন, কিভাবে একজন ‘নারী হবার অপরাধে’ তাকে ক্রমাগত বাজে ব্যবহার সহ্য করতে হয়েছে। তখন কেউ তার পাশে দাঁড়ায়নি, কেউ নিপীড়ক পুরুষটির বিরুদ্ধে কথা বলেনি। ফারিয়ার সমর্থনে কেউ তখন ‘Me Too’ হ্যাশট্যাগ দেয়নি। 

মি টু মুভমেন্ট, যৌন হয়রানি, তনুশ্রী দত্ত, নানা পাটেকর, ফারিয়া শাহরিন

ফারিয়া অভিযোগ করেছিলেন, প্রযোজকেরা অভিনয়ের বাইরেও অভিনেত্রীদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চান, তাঁরা ভাবেন, তারা টাকা দিচ্ছেন, নায়িকা কেন তাদের সঙ্গে ঘুরবে না! নায়িকাকে বলেন, চলো ক্লাবে যাই, চলো ঘুরি। ঢালাওভাবে কারো নাম উল্লেখ না করেই এক সাক্ষাৎকারে তিনি দাবী করেছিলেন, প্রযোজকেরা নায়িকাদের সঙ্গে বসতে চান, ডিনারে যেতে চান, একান্তে সময় কাটাতে চান। সেসব অভিযোগ তলিয়ে দেখার কথা ভাবেনি তখন কেউ। 

উল্টো ফারিয়াকেই অভিযুক্ত করেছেন অনেকে, তিনি আলোচনায় থাকার জন্যে মিডিয়ার দুর্নাম করছেন বলে মত দিয়েছিলেন কেউ কেউ। তাদের মধ্যে কয়েকজন সিনিয়র অভিনেতা-অভিনেত্রীও ছিলেন! অভিযোগটা সত্যি ছিল নাকি মিথ্যা, সেটা কেউ যাচাই করার দরকার মনে করেনি, সবাই ফারিয়া শাহরিনকেই দোষী বলেছে, কারণ তিনি ‘মিডিয়ার মেয়ে’, আর মিডিয়ার মেয়েদের চরিত্র নাকি খারাপই হয়! 

আমাদের দেশের নারীরা কর্মক্ষেত্রে প্রতিটা পদে পদেই যৌন হয়রানির শিকার হন এখনও। সেটা মিডিয়ায় হয়, কর্পোরেট অফিসে হয়, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও হয়। আমাদের দেশের অনেক পুরুষের মধ্যে এখনও মধ্যযুগীয় মানসিকতা রয়ে গেছে, নারীমাত্রই তারা ভোগের বস্তু বলে মনে করে। কিন্ত নারীরা নির্যাতিত হয়েও মুখ খোলার সাহসটা পান না, কারণ দিনশেষে সেই নারীর ঘাড়েই দোষের বোঝা বেঁধে দেবে পুরুষনিয়ন্ত্রিত এই সমাজ। এখানে তাই নিপীড়কেরা বুক ফুলিয়ে হেঁটে বেড়ায়, আঁচলে মুখ চাপা দিতে হয় নির্যাতিতা নারীকে। এমন একটা মি-টু মুভমেন্ট আমাদের দেশেও এখন খুব দরকার… 

আরও পড়ুন-

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close