মুনির হাসান:

গৌরাঙ্গ স্যারকে মনে পড়ছে। স্যারকে কিছু আইএমও প্রশ্ন প্রিন্ট করে দিছি, ২৬ জানুয়ারি ২০০২। রাতে ট্রেন থেকেই আমাকে ফোন দিলেন – কাজটা তো ঠিক করলেন না মুনির সাহেব। এ সব প্রবলেম তো আমাদের বড়রাই পারবে না। আর আপনি ভাবছেন আমাদের স্কুল পড়ুয়ারা এগুলো করে ফেলবে। আপনার কী মাথা খারাপ? স্যারকে শুধু বলেছিলাম – স্যার, আপনারা আমাকে একটু দাঁড়ানোর জায়গা দিন। আমি বাংলাদেশটাকে নাড়াই দিবো।

পরদিন সকালে স্যার আবার ফোন করলেন। বললেন – দাঁড়ানোর জন্য আপনার কী লাগবে। বললাম- স্যার, বেসিক বিষয় নিয়ে একটা বই লিখে দেন। বই-এর গল্পটা অন্য গল্প। আর একজন স্যার (নাম বলছি না)। প্রশ্ন দেখে বললেন- এতো কঠিন প্রশ্ন। আমার বিভাগের সিনিয়র ছাত্রদেরই তো খবর হয়ে যাবে। বলেছিলাম- ভয় নেই স্যার। ওরা পারবে। আমার কাজ কেবল পরিবেশ তৈরি করা।

যারা পাওলো কোয়েলোর দ্যা আলকেমিস্ট পড়েছেন, তারা এবার মিলিয়ে নিতে পারেন। এটি গণিত অলিম্পিয়াডরই গল্প। বিশ্বাস হচ্ছে না? ঐ যে ঐ লাইনটার কথা ভাবেন – তুমি যদি একাগ্র চিত্তে তোমার লক্ষ্যে অবিচল থাকো, তাহলে সারা দুনিয়া সেই লক্ষ্য পূরণের জন্য ষড়যন্ত্র করবে!

তাই যদি না হবে, তাহলে কতগুলো পাগলের সঙ্গে এসে কেন যুক্ত হবে ডাচ বাংলা ব্যাংক বছরে প্রায় কোটি টাকা নিয়ে। কেনই বা প্রথম আলো বছর বছর তাদের ১ কোটি টাকার স্পেস আমাদের “পাগলামি’র জন্য ছেড়ে দেবে?

এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না?

মাহবুব মজুমদারের কথা ভাবুন। কোথা থেকে এসে যুক্ত হলো মাহবুব আমাদের সঙ্গে। স্ট্যানফোর্ডের গ্র্যাজুয়েশন, এমআইটির মাস্টার্স আর কেমব্রিজের পিএইচডি। ইমপেরিয়াল কলেজের মাস্টারি ছেড়ে মাহবুব এসে আমাদের সঙ্গে জুটে গেল। এনএসইউ তার চাকরিটা রাখলো না। এখন শুনছি ব্র্যাকও তাকে বিদায় করার ফন্দি খুঁজছে। সৌদি আরবের ম্যাথ অলিম্পিয়াডের চার্জে একজন উপমন্ত্রী ছিলেন। তিনি আমাকে বলতেন – মাহবুবকে এবার আমাকে দিয়ে দাও! বেচারা বছরে যা ছুটি পায় তার একটা অংশ দিয়ে দেয় এখানে! দুনিয়া যদি ষড়যন্ত্র না করতো তাহলে আমরা মাহবুবকে কই পেতাম?

অথবা আমাদের মুভার্সরা। খালেদা জিয়ার আগুনের বছরে আমরা তিনদিনে ২২টা অনুষ্ঠান করেছি। শুধু একদিনেই মোট ৭৩ জন লোক বিভিন্ন শহর থেকে বিভিন্ন শহরে বাসে-ট্রেনে-প্লেনে দৌড়াদৌড়ি করেছে। শুধু টিকেট করার জন্য একটা ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ফার্ম লাগতো! অথচ পুরো ব্যাপারটা আমি পর্যন্তই টের পাইনি! কিংবা প্রথম আলো বন্ধুসভার বন্ধুরা। যদি কোনদিন আমাদের আঞ্চলিক উৎসবের আগের রাতে উৎসব প্রাঙ্গণে যান তাহলে দেখবেন একদল স্বেচ্ছাসেবী কী কাজটা করছে। ওদের কেউ কেউএমন কি মামার বিয়েতেও এতো খাটে না, বিনে পয়সায়!

এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না?

তাহলে আপনাকে নিতে হবে বাংলা বাজারে। সঙ্গে একটি গণিত বই-এর পাণ্ডুলিপি নিয়ে যাবেন। দেখবেন যে কোন প্রকাশক আপনার ঐ বই প্রকাশে আগ্রহী! আমি এ তালিকা আরও বড় করতে পারি। কিন্তু যারা বিশ্বাস করবেন না তারা বলবেন এ আর এমন কী।

সারাবিশ্বের ১০৭ টা দেশের প্রাক বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ৫৯৭ জন সেরা শিক্ষার্থীর মধ্যে মেধানুসারে আমাদের আহমেদ জাওয়াদ চৌধুরীর পজিশন ২৭। এ আর এমন কী! তাই তো। আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম যে, বিশ্বের সব প্রভাবশালী দেশ কেন আইএমওকে এতো গুরুত্ব দেয়? কারণ তারা জানে এরাই একদিন গণিত-বিজ্ঞানে নেতৃত্ব দেবে। তাতে অবশ্য মন ভজবে না।

তারা আরও কিছু শুনতে চাইবেন। কিন্তু আমি আর কিছু যোগ করতে চাই না। আমি কেবল বলতে চাই, আমাদের ছেলে-মেয়েরা জানে, তারা তাদের হৃদয়ের গভীরে বিশ্বাস করে-

হয়তো সেরকম অবকাঠামো নেই, 
হয়তো তাদেরকে সাপোর্ট করার জন্য আমাদের টাকা পয়সা নেই। (আমাদের কাছে হেরে যাওয়ার পর গত বছর থেকে ভারত সরকার তাদের ম্যাথ অলিম্পিয়াড টিমকে প্রশিক্ষণের জন্য আমেরিকা পাঠাচ্ছে) 
আমাদের স্কুলের পড়ালেখাতে কোন চ্যালেঞ্জ নেই।
তারপরও তারা বলতে জানে-
আমরা করবো জয় একদিন।

দুনিয়ার সকল ষড়যন্ত্রকারীকে আমার টুপিখোলা ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা। আপনারা না থাকলে আজ আমার চোখে আনন্দ-অশ্রু থাকতো না।

সবার সেকেন্ড ডিফারেন্সিয়াল নেগেটিভ হোক।

Comments
Spread the love