খেলা ও ধুলারাশিয়া বিশ্বকাপ ২০১৮

চাইতে হলে শার্ট না তোর বোনকেই চাই…

কিছু খেলোয়াড় দেখবেন বাচ্চা বয়স থেকেই সবার চোখে পড়ে যায়। তাদেরকে দেখা যায় একেবারে সেরা ক্লাব একাডেমীতে। ইন্টারন্যাশনাল ইয়ুথ ফুটবলে খেলে, ফাষ্ট ট্র্যাকড যাকে বলে। এই বিষয়গুলো আমার সাথে ঠিক যায়না। খেয়াল করলে দেখবেন মার্কো মাতেরাজ্জির ক্যারিয়ারে এসব আন্ডার ফোর্টিন, আন্ডার সিক্সটিন, আন্ডার টুয়েন্টি ওয়ান এসব নেই। কিসসু নেই। একেবারে শূন্য।

এ কারণে আমার কৈশোরে মনে হয়েছিলো আর যাই হোক, ফুটবলে আমার কোন ক্যারিয়ার নেই। এমনকি আমার বয়স যখন ১৮ তখনো আমাকে কেউ প্রফেশনাল কনট্র্যাক্টে ডাকাডাকি করেনি। কপালে জুটলো একটা অ্যামেচার দল। ২১ বছর হবার ঠিক আগ দিয়ে নন লিগ ফুটবল ছেড়েছিলাম। তখনও কিন্তু দুর্দান্ত কোন লীগে আমার ডেব্যু হয়নি। ভালো একটা লীগ ডেব্যু হয়েছিলো আমার বয়স যখন ২৪। আর ইতালী জাতীয় দলের জার্সি চাপিয়েছি যখন আমার বয়স ২৮।

ছোটবেলায় খেলোয়াড় হিসেবে খুব একটা মনোযোগ কিংবা আদর না পাওয়ায় সম্ভবত আমি বেশ বাস্তবমুখী। ঠিক কোন কাজটা আমি ভালো পারি তা আমার জানা আছে আর সবার আগে আমার কাছে দল। তাই আমি জানতাম ২০০৬ এ দলে আমার কাজটা কি এবং আমাদের ম্যানেজার মার্সেলো লিপ্পি ঠিক কি চাচ্ছেন আমার কাছ থেকে।

২০০৬ সালের বিশ্বকাপ দলটায় আমি ছিলাম ব্যাক-আপ সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার। আমার ঠিকানা বেঞ্চ। যাদের পেছনে আমাকে বসে থাকতে হতো তারা দুজনেই কিংবদন্তী। একজন ফ্যাবিও ক্যানাভারো আরেকজন অ্যালেসান্দ্রো নেস্তা। এই যে ওদের পেছনে বসে থাকা, তা নিয়ে যে আমি খুব একটা ভালো ছিলাম, তা না। যেমনটাই হই, আমি তো একজন ফুটবলার। একজন ফুটবলার কখনোই বসে থাকতে চায়না। আমি খুব খেলতে চাইতাম। আবার একই সাথে এও জানতাম যাদের জন্যে বেঞ্চ গরম করছি তাদের দুজনেই, বিশেষত নেস্তা আমার চাইতে ভালো খেলে। তাই মাঠে দল হিসেবে ইতালি আমার চাইতে ওদের দুজনকে নিয়ে খেললে ভালো ফল আসার সম্ভাবনা বেশি। মেনে নিয়েছিলাম আসলে।

২০০৬ বিশ্বকাপে আমাদের প্রথম বিপক্ষ দলটা ছিলো ঘানা। ম্যাচটা আমরা জিতলাম ২-০ গোলে। এরপরের খেলাটা আমেরিকার সাথে। ম্যাচ হলো ড্র, ১-১ গোলে। দুই ম্যাচেই আমি বেঞ্চ গরম করেছি, আর খুব মনোযোগ দিয়ে চিয়ারলিডারের ভূমিকা পালন করেছি। এর পরের ম্যাচ চেক রিপাবলিকের সাথে। গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হতে এই ম্যাচ জিততেই হবে।

ম্যাচ শুরুর মাত্র ১৭ মিনিটের মাথায় নেস্তা পড়লো ইনজুরিতে। বেচারাকে স্ট্রেচারে করে মাঠের বাহিরে নিয়ে আসা হলো। ওর অবস্থা যা দেখলাম তাতে মাঠে ফেরার তেমন একটা সম্ভাবনা দেখিনি। লিপ্পি আমাকে নেস্তার জায়গায় খেলতে মাঠে নামিয়ে দিলো। আমাদের দলের জন্যে বিষয়টা একটা বড়সড় ধাক্কা ছিলো বলা যায়।

এই ম্যাচের আগে আমি এক মিনিটের জন্যেও মাঠে নামিনি। আর এরকম একটা গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে আমাকে নামানো হলো নেস্তার জায়গায়। সেন্টার ব্যাক পজিশনে নেস্তা সম্ভবত ইতিহাসে জায়গা করে নেয়ার মতো একজন। মাঠে নেমে হঠাত খুব অস্থির লাগছিলো। সবকিছু আমার চোখের সামনেই হচ্ছিলো, কিন্তু তাও ক্যামন যেন এক ঘোর। অস্থিরতা ছুঁয়ে যাচ্ছিলো আমার অন্যান্য টীমমেইটদেরকেও। একটা কর্ণার কিকে সবটুকু সামর্থ্য দিয়ে লাফিয়ে উঠে হেড করে দেখি পিওতর চেক এর পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে বল।

একটা গোল পেয়ে গেলাম। সবাই স্থির হয়ে গেলো। অস্থিরতা উবে গেলো বাতাসে। পিপ্পো ইনজাঘি স্কোরলাইনটাকে খেলার একেবারে শেষের দিকে ২-০ করে ফেললো। আমরা নক আউট পর্বে উঠে গেলাম।

এর পরের খেলাটা অস্ট্রেলিয়ার সাথে। নেস্তা নেই দলে তাই একেবারে শুরু থেকে আমি নামবো মাঠে। প্রথমার্ধে আমাদের দল বেশ ভালোই খেলে উঠলো। বেশ কিছু সুযোগও আমরা তৈরী করেছিলাম। প্রথমার্ধের খেলাতে আমাদের মনোবল বাড়ছিলো। 

দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হবার ঠিক পাঁচ মিনিট পরের ঘটনা। অস্ট্রেলিয়ার ফ্লিট ফুটেড উইঙ্গার মার্ক ব্রেসচিয়ানো হঠাত করে আমাদের ডিবক্সের দিকে ঢুকে গেলো। পাশে লেপটে আছে জিয়ানলুকা জামব্রোত্তা। মার্কের সাথে খুব একটা সুবিধা করতে পারছিলোনা। আমি হচ্ছি একেবারে শেষের লোকটা। তাই সাত পাঁচ না ভেবে মার্কের সামনে দিয়ে স্লাইড করে গেলাম। খুব কঠিন এবং একই সাথে রিস্কি একটা কাজ। হুড়মুড় করে পড়লো মার্ক, আমার উপরেই। আমি ক্রস করেছি ঠিকই কিন্তু বলে পা ছোঁয়াতে পারিনি। কপালে জুটলো হলুদ না একেবারে লাল কার্ড। দেখতে কান্ডটা খুব বিশ্রী লাগলেও আমি জানি আমি কি করেছি। সেটা আর যাই হোক লাল কার্ড হতে পারেনা। বিশ্বকাপ মাত্র শরীর ঝেড়ে উঠে দাঁড়াচ্ছে সে সময় রেফারিরা একটু সদয় হবার কথা। এই রেফারি দেখলাম একেবারে দুর্বাসা মুনির মতো।

লাল কার্ডটা দেখার পরেই মনে হলো কে যেন আমার ভেতরটা খুব ধারালো একটা ছুড়ি দিয়ে এফোঁড় ওফোঁড় করে দিয়েছে। আমার জন্যে আমার দলটাকে খেলার বাকী ৪০ মিনিট ১০ জন নিয়ে খেলতে হবে! আর খেলা যদি অতিরিক্ত সময়ে গড়ায়, তাহলে তো একেবারে শেষ। মনে হচ্ছিলো, চেকদের বিরুদ্ধে দেয়া গোলটা নিয়ে আমাকে হিমালয়ের চূড়ায় উঠিয়ে দেয়া হয়েছে শুধুমাত্র এই লালকার্ডটার জন্যে ক্রুশে গেঁথে ফেলার জন্যেই। ৯০ মিনিটের পর যোগ হলো অতিরিক্ত পাঁচ মিনিট।

আমাদের কপাল, এই সময় একটা পেনাল্টি পেয়ে গেলাম। ফ্যাবিও গ্রোসো আর লুকাস ও নেইল হচ্ছে এই ঘটনার দুই চরিত্র। ওদের মাঝে আসলেই সংঘর্ষ হয়েছে কিনা বা পেনাল্টি ছিলো কিনা তা নিয়ে বিতর্ক চলতেই পারে। আমি আমার কথাটাই বলি, আমাদের পেনাল্টিটা যদি পেনাল্টি না হয় তাহলে আমাকে দেখানো লালকার্ডটাও বিনা কারনে দেখানো হয়েছে। টট্টি পেনাল্টিটা নেবে, আমি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম। লাল কার্ড পেয়েছি, মাঠে থাকা যাবে না, সোজা ভেতরে ঢুকে যেতে হবে।

কয়েকটা সেকেন্ড। কয়েকটা মাত্র সেকেন্ড কিন্তু আমার কাছে মনে হচ্ছিলো কত কত কাল! টট্টিকে অসংখ্য ধন্যবাদ, পেনাল্টির গোলটা দিয়ে আমাকে বাঁচিয়েছে। ঐ ম্যাচটায় হারলে ইতালিতে আমাকে স্রেফ পুঁতে ফেলতো।

কোয়ার্টার ফাইনালে বিপক্ষ দলের নাম ইউক্রেইন। ম্যাচটায় আমি সাসপেন্ডেড। বেঞ্চ গরম করা ছাড়া আর কোন কাজ নেই। পাশে আছে ড্যানিয়েলে ডি রসি। আমেরিকার সাথের ম্যাচে বিশ্রীভাবে কনুই চালানোর অপরাধে চার ম্যাচ সাসপেনশনের তৃতীয় ম্যাচ চলছে। এরকম শাস্তি ঘাড়ে নিয়ে বেঞ্চ গরম করাটাতেও একধরনের অস্বস্তি আছে। তার মধ্যে আমাদের গায়ে চাপানো হয়েছে সাদা রঙের হাফ ভেষ্ট। বাকী সবার গায়ে আমাদের নীল রঙের জার্সি।

ফিফার অদ্ভুত একটা নিয়ম আছে। কোন খেলোয়াড় সাসপেনশনে থাকলে তার গায়ে চাপাতে হবে ভিন্ন রঙের জার্সি বা ভেষ্ট। যাই হোক, খেলাটা শেষ হলো ৩-০ স্কোরলাইন নিয়ে। আমরা চলে গেলাম সেমিফাইনালে, বিপক্ষ দলের নাম জার্মানী। আয়োজক দেশ।

ফুটবলে জার্মানী বনাম ইতালী খুব বিশেষ একটা খেলা। স্পেশাল রাইভালরি বলতে পারেন। আমাদের কাছে ছিলো ফাইনালের মতো। অবশ্য জার্মানীর বিপক্ষে খেলার অনুভূতিটা সবসময়ে এমনই। প্রচন্ড উত্তেজনা আকাশে বাতাসে। এর মাঝে আবার একটা পত্রিকায় জার্মানীতে দীর্ঘদিন ধরে অভিবাসী হয়ে যাওয়া ইতালীয়ানদের নিয়ে খুব বাজে ধরনের রসিকতা ছেপে দিলো। সেই খবর পড়ে আমাদের মনে হলো আমরা শুধু ইতালীতে থাকা ইতালীয়ানদের জন্যই খেলছিনা, খেলছি জার্মানীতে এসে থিতু হওয়া ইতালীয়ানদের জন্যেও।

আরেকটা ঘটনার কথাও বলতে চাই। খেলা শুরু হবার আগে দিয়ে “দ্য ট্যানয়” ত্রিশ সেকেন্ডের জন্যে “নট্টি ম্যাজিসে” (ম্যাজিকাল নাইটস) শুনিয়ে দিলো আমাদের। পরিস্কার তাচ্ছিল্য বলা যায়।

১৯৯০ বিশ্বকাপের অফিসিয়াল সং ছিলো এই নট্টি ম্যাজিসে। সেসময় আমার বয়স ছিলো ১৭ । আমাদের কাছে এই গানটার একটা আলাদা আবেদন আছে, আবেগ আছে। ১৯৯০ এর বিশ্বকাপে আমরা ছিলাম আয়োজক দেশ। ইতালীতে হয়েছে ঐ বিশ্বকাপ। বিশ্বকাপটা আমরা জিততে পারতাম, অন্তত আমাদের সেই বিশ্বাসটা ছিলো।

সেমিফাইনালে আমরা আর্জেন্টিনার কাছে হেরেছি। আর ফাইনালে কে জিতলো? জার্মানী। গানটা শুনে মনে হচ্ছিলো জোর করে অতীতের সেই ক্ষতে লবন লাগিয়ে দেয়া হচ্ছে। সেই বিশ্বকাপটা হবার কথা আমাদের, আমাদের ঘরে আমাদের ট্রফি। তার বদলে জিতলো জার্মানী। ঠিক আছে, তবে তাই হোক। এবারে ওরা আয়োজক, ওদের ট্রফি! কড়ায় গন্ডায় পুষিয়ে দেয়ার সময় হয়েছে। আমাদের সাথে জার্মানী যা করেছে আমরাও ওদের সাথে ঠিক তাই করবো।

সবাই একেবারে পণ করে ফেলেছিলাম।

গোটা খেলাটা মূলত হয়েছে দুই ম্যানেজার মার্সেলো লিপ্পি আর জার্গেন ক্লিন্সম্যানের মধ্যে। সন্মুখ সমরের দুই সেনাপতি। খেলার প্রথম ৯০ মিনিট আমরা জার্মানদের সাথে সমানে সমানে টক্কর দিয়েছি। অতিরিক্ত সময়ের ৩০ মিনিটে আমাদের গিয়ার পরিবর্তন করলেন লিপ্পি। হঠাত করে বদলিতে দুজন স্ট্রাইকার নামিয়ে দিলেন। ভিনসেনজো ইয়াকুইন্তা আর অ্যালসান্দ্রো দেল পিয়েরো। অতিরিক্ত সময়ে জার্মান দলের বিপক্ষে নেয়া খুব দুঃসাহসী একটা সিদ্ধান্ত। কিন্তু এই সিদ্ধান্তে আমাদের দলের আত্মবিশ্বাস গেলো বেড়ে। মনে হলো ম্যানেজারের অগাধ আস্থা আমাদের উপর, তাই কোন ডিফেন্ডার না নামিয়ে নামিয়েছেন দুজন স্ট্রাইকার। মানে আমাদের ডিফেন্স নিখুঁত। এর মধ্যে আলবার্তো গিলার্দিনোর শট লাগলো পোষ্টে আর জামব্রোত্তার শট লাগলো ক্রসবারে। আমার মনে হয় ঠিক ঐ মুহুর্তেই জার্মানরা বুঝে গিয়েছিলো ওদের পক্ষে আমাদের হারানো সম্ভব না।

জার্মানীর গোলকিপার তখন লেম্যান। পিরলোর একটা শট অবিশ্বাস্য সেইভ করলো লেম্যান। সেই শটেই কর্ণার কিক। কর্ণার কিক থেকে আবার পিরলো, একটা নো-লুক রিভার্স পাস। পাসে বল পেলো আনমার্কড গ্রোসো, একেবারে বক্সের ভেতরে। গ্রোসোর স্মুথ ফিনিশে আমরা লিড পেয়ে গেলাম।

খুব সুন্দর একটা বোঝাপড়া ছিলো গোটা দৃশ্যে। দৃশ্যের রুপকার আন্দ্রেস পিরলো। এই মানুষটা চিন্তা করে দুশো মেইল বেগে আর চোখে দেখে পুরো ৩৬০ ডিগ্রী। খেলার তখনও ৬ মিনিট বাকী। বুঝে গেছিলাম যে আমরা ফাইনালে। অবশ্য এরপর আবার দেল পিয়েরো গোল করলো। স্কোরলাইন হলো ২-০।

ফাইনালে ফ্রান্স। হিসেবে এটাও বিশেষ কিছু। ২০০০ এর ইউরোর ফাইনালের কথা আমরা ভুলিনি। ম্যাচে স্কোরে আমরা এগিয়ে ছিলাম। সুযোগও বেশি তৈরী করেছিলাম। কিন্তু ফরাসী দলটাও ছিলো নাছোড়বান্দা ধরনের। ওদের বিশেষত্ব ও বলতে পারেন। লেগেছিলো শেষ পর্যন্ত। সেই শেষ মুহুর্তের দুই গোলেই ওরা জিতেছিলো ম্যাচটা। ওসময় আমি দলে ছিলাম না সত্যি কিন্তু আমার দলের বেশিরভাগ সদস্যই ঐ ম্যাচটায় ছিলো। বিশেষ করে বলতে গেলে ক্যানাভারোর কথা বলতেই হয়। ইওরোর ফাইনালে ডেভিড ত্রেজেগে আর সিলভিয়ান উইলটর্ডের দেয়া দুই গোল ক্যানাভারোর জীবনে এক দুঃস্বপ্নের নাম।

আমাদের নেস্তা টুর্নামেন্টের সেই শুরু থেকেই নেই, ফাইনালেও থাকছে না নিশ্চিত হবার পর জানলাম আমিই ক্যানাভারোর সাথে মাঠে নামছি।

খেলা শুরু হবার ছয় মিনিটের মাথায় ঘটলো অঘটন। ফ্লোরেন্ট মালাউদাকে যে চ্যালেঞ্জ করেছি তাতে রেফারি পেনাল্টির বাঁশি বাজিয়ে দিলেন। আমি কিচ্ছু করতে চাইনি, বিশ্বাস করুন। মালাউদা যে দৌড়টা দিয়েছিলো আমি সেই রাস্তাটা থেকে সরেই যেতে চেয়েছিলাম। সমস্যা হচ্ছে আমি বড়সড় শরীরের মানুষ। চাইলেই শরীর সরিয়ে ফেলা যায় না, তাই যা হবার তাই হলো। মালাউদা সোজা এসে আমার শরীরে আটকে গেলো। অবশ্য মালাউদা খুব দ্রুত দৌড়াতে পারে এবং আমার শরীরে লাগার আগেও মনে হয়েছে ওর লক্ষ্যটাই হচ্ছে আমার শরীরে আটকে যাওয়া। ওর কোন দোষ নেই, ওরকম পরিস্থিতিতে সবারই মালাউদার মতো চালাকি করার কথা। মালাউদা আটকে যাবার পরেই বুঝতে পারছিলাম ঝামেলা হয়ে গেছে, বাঁশি শোনার পর মনে হয় একটু খানি স্বস্তিও ছিলো। যাক, গোটা ম্যাচ তো পড়ে আছে গোলটা শুধে দেবার জন্যে! ফেরার যথেষ্ট সময় আছে আমাদের হাতে।

তো যাই হোক, পেনাল্টিটা নিলো জিনেদিন জিদান। বাফন এর মাথার উপর দিয়ে স্লো একটা চিপ। মিসই হয়ে গিয়েছিলো প্রায়। ক্রসবারে লেগে বল ভেতরের দিকে ড্রপ করেই বেরিয়ে এলো। বল যে গোললাইন পার হয়েছিলো সে বিষয়ে কোন প্রশ্নই নেই। ক্রেডিট জিদানকে দিতেই হয়, বিশ্বকাপ ফাইনাল ম্যাচে এরকম শট তাও বিশ্বের সেরা একজন কিপারের বিপক্ষে!

এরপরে আরো বড় একটা দুর্ঘটনা প্রায় হয়েই যাচ্ছিলো। উইলি সানোল এর একটা ডায়াগোনাল শট আমাদের গোলের দিকে আসছিলো। মাথা ছুঁইয়ে বলটা ক্লিয়ার করার চেষ্টা করতে গিয়ে দেখলাম সেটা ধুন্দুমার গতি নিয়ে আমাদের গোলের দিকেই যাচ্ছে। বাফন অবিশ্বাস্য সেইভ করলো। সেইভ করে আমাকে যে লুকটা বাফন দিলো, সত্য যুগ হলে একেবারে ছাই হয়ে যেতাম। শ্রাগ করে ঝেড়ে ফেলে দিলাম বিষয়টা, বলে খুব গতি ছিলো তার উপর বিশ্বকাপের বল। এই বলগুলোয় প্রায়ই ফ্লাইট বোঝা যায়না ঠিকঠাক। ওরকম তাই হতেই পারে। হতেই পারে বলে অবশ্য উড়িয়েও দিতে পারছিনা। ভাগ্যিস পেছনে বাফনের মতো মানুষ ছিলো!

এর সামান্য পরেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করার সুযোগ পেলাম। পিরলোর কর্নারে প্যাট্রিক ভিয়েরার চেয়ে বেশি লাফিয়ে হেড করলাম। গোল হয়ে গেলো। টুর্নামেন্টে আমার দ্বিতীয় গোল। গোল করার পর মনে হলো আমার পাপ-পূণ্যের খাতাটা এখন সাদা। তাতে আর কোন দাগটাগ নেই।

খেলার বাকীটা ভালোই চলতে লাগলো। মিলিয়ে মিশিয়ে। ফরাসী দলটা বেশ টাফ, স্মার্ট আর অবশ্যই শক্তিশালী। খেলা অতিরিক্ত সময়ে গড়ালো। জিদানের একটা অসাধারন হেডার অবিশ্বাস্য সেইভ করলো বুফন। জিদানকে হেড করতে দেয়া যাবেনা, এরকম একটা পরিকল্পনা থেকে পরের ক্রসে আমি ছিলাম জিদানের খুব কাছাকাছি। মানে যতটা কাছে থাকলে একটা মানুষকে লাফানো থেকে আটকানো যায়। হাতে বেড় দিয়ে ওর চারপাশে ধরে আমার দিকে টানছিলাম। সব খেলায় এরকম সবসময়ই হয়। ক্রস চলে যাবার সাথে সাথে ক্ষমাও চেয়ে নিয়েছি। জিদান বকবক করতেই থাকলো। তাও কি বিষয়, যে, আমার শার্ট চাইলে খেলার পর নিস। এখন কেন টানাটানি করছিস? একই কথা কয়েকবার। শেষে বলে ফেললাম, চাইতে হলে শার্ট না তোর বোনকেই চাই। এটুকুই, স্রেফ এটুকুই।

এরপর যা হলো তা আমি এখনও ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি। হয়তো অ্যাড্রেনালিন; কিংবা ক্লান্তি আবার ফাইনালের চাপও হতে পারে। চলেই যাচ্ছিলো জিদান, হঠাৎ পেছনে ঘুরে আমার বুকে ঢুষ বসিয়ে দিলো।

এই ঘটনাটি যে ঘটতে পারে তা আমার সুদূরতম কল্পনাতেও ছিলোনা। ঢুষ খেয়ে পড়ার সাথে সাথেই আমি সম্ভবত হাত তুলেছিলাম। আমাদের দুজনেরই লাল কার্ড খাবার যথেষ্ট সম্ভাবনা ছিলো। জানিনা আসলে ওর মনে কি হচ্ছিলো। খালি জানি আমি যা করেছি তাতে খুব একটা অন্যায় কিছু ছিলোনা। যা বলেছিলাম তা হয়তো খুব একটা ভালো কথাও না, এরকম কথা সেই স্কুলের মাঠ থেকে শুরু করে একেবারে বিশ্বকাপের ফাইনালেও চলতে পারে। আমি নিশ্চিত জিদান এর চাইতেও বহু খারাপ কথা তার সারা জীবনে মাঠেই অনেকবার শুনেছে।

কি বলা হয়েছে মাঠে এ নিয়ে বিস্তর জল ঘোলা হয়েছে। মিডিয়া নানারকম তত্ব নিয়ে হাজির হয়েছে। জিদানের মা নিয়ে কুৎসিত কথা বলা থেকে শুরু করে জিদানকে সন্ত্রাসী পর্যন্ত আমাকে দিয়ে বলানো হয়েছে। জিদান তার পক্ষ থেকে কিছু বলেনি। বেশ কিছুদিন পর অবশ্য এটুকু বলেছে যে আমি বর্ণবাদী বা সন্ত্রাসী ধরণের কিছু বলিনি। তাতে আমার একটু হলেও সুবিধা হয়েছে। যেসব মিডিয়া আমার নামে ভয়াবহ ধরণের কুৎসা রটিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে আমার সুবিধা হয়েছে। মায়ের বিষয় নিয়ে যে কথা হয়েছে তার বিষয়ে আমার ক্ষোভ আছে। আমি ১৫ বছর বয়সে আমার মা-কে হারিয়েছি। মা কি, আমি জানি। সারাজীবন মা সম্পর্কিত সমস্ত খিস্তি এড়িয়ে চলেছি।

যা হোক, আগেও বলেছি, এখনো বলছি ফাইনালের গোটা ঘটনাটা আমাকে এখন আর তাড়িয়ে ফেরে না। যা হয়েছে তা হয়েছে। জিদান যদি একটা হ্যান্ডশেইক করে, ফেইস টু ফেইস মিটিং বা যা ইচ্ছা করে ঘটনাটা শেষ করতে চায়, আমি রাজী আছি। এরকম কিছু হয়নি এখনো। হয়তো অনেক অনেক বছর পর জিদান তার রাগটাকে একপাশে সরিয়ে রেখে বিষয়টার যবনিকা টানবে। সেই দিনের অপেক্ষায় আছি।

যাকগে, ঢুষের পর আমি শুধু জানি আমি পড়ে আছি মাঠে আর বুফন দৌড়ে আসছে। চিৎকার করছে রেফারির জন্যে। বল থেকে আমরা বেশ খানিকটা দূরেই ছিলাম। আমার ধারনা খেলোয়াড়দের মধ্যে শুধু বুফনই ঘটনাটা দূর থেকে খেয়াল করেছে। আমার তখন মনে হচ্ছিলো সম্ভবত কোন ম্যাচ অফিসিয়ালই ঘটনাটা দেখেনি।

অবাক হয়ে খেয়াল করলাম, অফিসিয়ালরা ঘটনাটা খেয়াল করেছে। জিদানকে মাঠ থেকে বের করে দেয়া হলো। এসময় আমাদের সবার এমন একটা অবস্থা যে আমরা সবাই পেনাল্টি কিকের জন্যে অপেক্ষা করছিলাম। খুব ক্লান্তি ছুঁয়ে যাচ্ছিলো আমাদের। ফরাসী দল তখন ১০ জনের। তাও শেষ কয়েক মিনিট ওরা দুর্দান্ত লড়াই করেছে, একসময় মনেও হচ্ছিলো ওরা ১১ জনের দলের চেয়ে বেশী উজ্জীবিত হয়ে খেলছে। সে হিসেবে খেলা শেষের বাঁশিটা আমার জন্যে স্বস্তিকর ছিলো।

আমাদের দলের পেনাল্টি শ্যুটার দের মধ্যে আমি একজন। মাঠে এতকিছু হয়ে গেলেও পেনাল্টি নেবো কিনা এরকম দুশ্চিন্তা মাথায় আসেনি। লিপ্পিও কোন কথা বলেননি। ফ্রেঞ্চ দলের ডেভিড ত্রেজেগের শট মিস হলো। আমাদের কোন শট মিস হয়নি। আমরা হয়ে গেলাম বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন!

তখন আমার বয়স ৩৩ হতে মাত্র একমাস বাকী। এর ১২ বছর আগে আমি নন লীগ ফুটবল খেলতাম, ১০ বছর আগে খেলতাম তৃতীয় বিভাগে। আর এখন ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন। মজার বিষয় হচ্ছে কাহিনী এখানেই শেষ না। বিশ্বকাপ জেতার কয়েক সিজন পর হোসে মরিনহোর অধীনে আমি ট্রেবল জিতেছি। সহজ কথায় হচ্ছে আমার শুরুটাই বিশ্বকাপ দিয়ে এবং তারপর সব জুটেছে কপালে। তাও এমন এক বয়সে যখন ফুটবলের দুনিয়ায় সবাই অবসরে যায়।

মাঠের উদযাপনের পর আরেকটা কাজ আমি করেছিলাম। বড় একটা “বুম বক্স ” আগেই কিনে রেখেছিলাম। মিডিয়া এরিয়া থেকে আমাদের বাস পর্যন্ত যেতে যেতে সেই বুম বক্সে সর্বোচ্চ শব্দে বেজেছে একটা গান।

“নট্টি ম্যাজিসে”।

৯০ তে আমাদের দেশ থেকে আমাদের কাপটা যারা নিয়ে এসেছিলো সেই তাদের দেশ থেকে তাদের কাপটাকে এবার আমরা নিয়ে যাচ্ছি। আমাদের জন্যে রাতটা তো অবশ্যই ম্যাজিকাল। নট্টি ম্যাজিসে- ম্যাজিকাল নাইট।

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close