কেভিন পিটারসেন ভিডিওটা শেয়ার করে টুইটারে লিখেছেন- “ফর ফাক’স সেক!” মাইকেল ভন বলেছেন অবিশ্বাস্য! আর ব্রেন্ডন টেইলর তো সোজাসুজি ঈশ্বরকেই ডেকে বসেছেন! কিন্ত এই তিন ক্রিকেটারের এমন বিস্ময়ের কারণ কি?

কারণটা জানত হলে ভিডিওটা একবার অন্তত দেখতে হবে আপনাকে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটা ভিডিও নিয়েই কথা হচ্ছে। কোন একটা ক্রিকেট ম্যাচের ম ধারণকৃত অংশের খানিকটা দেখা যাচ্ছিল সেটায়। কিন্ত ক্রিকেট না বলে খেলাটাকে আপনি হাডুডু বা কাবাডিও নাম দিতে পারেন, কিংবা ‘যেমন খুশী তেমন খেলো’ নামেও ডাকতে পারেন। বাস্তবে ঘটনাটা ঘটেছেও এমন।

ম্যাচ ফিক্সিঙের কথা তো শুনেছেন সবাই। নমুনাও দেখেছেন অনেক। পাকিস্তানের মোহাম্মদ আমিরের বিশাল সেই নো’ বল কিংবা আমাদের দেশের আশরাফুলের টাকার বিনিময়ে আউট হয়ে আসার ঘটনা চাক্ষুস করেছে সবাই। কিন্ত মিডিয়াগুলো এসব ম্যাচ ফিক্সিং নিয়ে সরব হওয়ার আগে সাধারণ মানুষের বেশীরভাগেরই ধারণা ছিল না যে এসব ম্যাচে স্পট ফিক্সিং করা হয়েছে। শেষমেশ সবকিছু ফাঁস হয়ে গেলেও, ঘটনাগুলো ঘটার সময় অনুমান করা যায়নি তেমন কিছুই।

কিন্ত কয়েকদিন আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আজমান লীগে যে ঘটনাটা ঘটেছে, সেটা ছাপিয়ে গেছে ম্যাচ পাতানোর সব রেকর্ডকেই। টিভি ক্যামেরা, দর্শকের চোখ- সবকিছুর সামনেই বেপরোয়াভাবে ম্যাচ পাতিয়েছে ‘দুবাই স্টারস’ নামের একটা দলের খেলোয়াড়েরা। মাঠে আম্পায়ার ছিলেন, ম্যাচ রেফারি ছিলেন, ব্যাট-বল-স্ট্যাম্প দিয়ে ক্রিকেট নামের একটা প্রহসনের নাটক হয়েছে; কিন্ত খেলার ফলাফল তো আগেই নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল মাঠের বাইরে!

টুর্নামেন্টের নাম আজমান অলস্টার লীগ। শারজা ওয়ারিয়র্সের মুখোমুখি দুবাই স্টারস। প্রথমে ব্যাটিং করে স্কোরবোর্ডে ১৩৫ রান জড়ো করেছিল শারজা। সাধারণ একটা লক্ষ্যমাত্রায় ব্যাটিং করতে নেমে যে নাটক দেখালেন দুবাইয়ের খেলোয়াড়েরা, দর্শক হিসেবে খেলা দেখতে না এসে যদি ভাবেন যে নাটক দেখতে এসেছেন, তাহলেও এমন বাজে আর হাস্যকর অভিনয়ের জন্যে স্টেডিয়াম ছাড়ার আগে আপনার মুখ থেকে অটোমেটিক দু-চারটে গালি বের না হয়েই পারে না!

ম্যাচ ফিক্সিং, ম্যাচ পাতানো, স্পট ফিক্সিং, দুবাই স্টারস, আজমান অলস্টার লীগ

একদম শুরুতেই দুবাইয়ের এক ব্যাটসম্যান পপিং ক্রীজ ছেড়ে উড়াধুড়াভাবে মারতে গেলেন, কিন্ত বল কোথায়, তার ব্যাটের লাইন কোথায়! দুটোর মধ্যে তো আসমান-জমিনের ফারাক! সহজেই বলটা ধরে স্ট্যাম্পিং করলেন শারজা’র উইকেটরক্ষক।

এরপরের আউটটা আরও অদ্ভুত। বলটা শর্ট লেগে ঠেলে দিয়ে একটা রান নিতে ছুটলেন ব্যাটসম্যান, ফিল্ডার দাঁড়িয়ে আছেন সেখানে, দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট। কিন্ত দুবাইয়ের খেলোয়াড়েরা তো সেদিন টিনের চশমা পরে মাঠে নেমেছিলেন, তাদের এতকিছু দেখার সময় কোথায়! ননস্ট্রাইকিং এন্ডের ব্যাটসম্যান এসে পৌঁছার অনেক আগেই স্ট্যাম্প ভেঙে দিলো বল।

আগের রান আউটকে ছাপিয়ে গেল পরেরটা। ব্যাটসম্যান ডিফেন্স করলেন, শর্ট কাভারে গেল বল। রকেটের গতিতে দৌড়ালেও এখান থেকে রান নেয়া সম্ভব নয়, ননস্ট্রাইকে থাকা ব্যাটসম্যান কিনা দেখেশুনে দৌড়ানো শুরু করলেন! অন্যপাশের ব্যাটসম্যান বারবার হাত তুলছেন, ফিরে যাওয়ার সংকেত দিচ্ছেন, কে শোনে কার কথা! সেদিন তো শুধু অন্ধ নয়, দুবাইয়ের খেলোয়াড়দের বয়রা হবার দিনও ছিল! ব্যাটসম্যান অর্ধেকটা পথ দৌড়ে এসে ফিরে যাওয়ার ভান করলেন আবার, স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল, দৌড়ে ফেরার কোন ইচ্ছেই নেই তার, পারলে শামুককে পেছনে ফেলেন আরকি!

যে ব্যাটসম্যানটা তার সতীর্থকে একটু আগে রান না নিয়ে ফিরে যাবার সংকেত দিচ্ছিলেন, তাকে হয়তো ভালোমানুষ মনে হতে পারে, কিন্ত না! সে এদের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অভিনেতা। খানিক পরেই একটা শর্ট বলে তাকে দেখা গেল দাগ ছেড়ে অনেকটা বেরিয়ে এসে ছক্কা হাঁকানোর চেষ্টা করতে। ছক্কা হওয়া তো মুখের কথা নয় বাপু! বলের আধমাইল দূরে ব্যাট চালালে ছক্কা কি আকাশ থেকে আসবে? আউট হয়ে তার সে কি আফসোসের ভঙ্গি! মাথা চাপড়াতে চাপড়াতে মাথা ভেঙেই ফেলেন আরকি!

তবে সবচেয়ে বেশী মজাটা হলো ষষ্ঠ উইকেটটাতে। শর্ট ফাইন লেগে গেছে বল, দুই ব্যাটসম্যানই রান নিতে গিয়ে পিচের মাঝখানে এসে কুশল বিনিময়ে লিপ্ত হলেন যেন! মনে হচ্ছিল যেন পনেরো-কুড়ি বছর বাদে মেলায় হারিয়ে যাওয়া দুই ভাইয়ের হঠাৎ দেখা হয়েছে, বজ্রাহত দৃষ্টিত দুজনে দুজনের দিকে তাকিয়ে আছে, চারপাশের কোনকিছুর দিকেই তাদের কোন খেয়াল নেই! অল্প জলে কই মাছ ধরার মতো একজন এদিকে যায়, আরেকজন সেদিকে যায়, আবার দুজনে একইদিকে ছোটে, তারপর আবার দুজন দুইদিকে! উইকেটরক্ষকের হাতে বল যেতে সময় লাগলো অনেক, আউট নিশ্চিত হওয়ার জন্যে ব্যাটসম্যান তার ব্যাটটা মাটি থেকে তুলে রেখে জগিং করতে করতে পপিং ক্রিজে ঢোকার একটা ভান করলেন শুধু!

ম্যাচ ফিক্সিং, ম্যাচ পাতানো, স্পট ফিক্সিং, দুবাই স্টারস, আজমান অলস্টার লীগ

পুরোটা ম্যাচজুড়েই এমন অদ্ভুত একটা মচ্ছব চলেছে। বলের তিনহাত দূরে দিয়ে ব্যাট চলে যাচ্ছে, ব্যাটসম্যান মানসিক রোগীর মতো সীমানা ছেড়ে বেরিয়ে আসছে, উইকেটকীপার বল ধরতে পারেনি, তবুও ব্যাটসম্যানের ফেরার কোন তাড়া নেই! বড়সড় একটা বাইন মাছ শিকার করার মতো করে উইকেটরক্ষক অনেক কষ্টে বলটা গ্লাভসে বন্দী করে ভেঙে দিয়েছে স্ট্যাম্প, চেহারায় কৃত্রিম হতাশা এনে মাঠ ছেড়েছে ব্যাটসম্যান! দুবাইয়ের ইনিংসের দশটা উইকেটের মধ্যে পাঁচটাই ছিল এমন আজগুবি রানআউট, বাকী চারটা ইচ্ছাকৃতভাবে পপিং ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে আসার পর স্ট্যাম্পিং। এমন অদ্ভুত ম্যাচ ক্রিকেটে আর কখনও হয়েছে কিনা মনে করতে পারছে না কেউই!

টুইটার আর ইউটিউবে এই ভিডিওটা ছড়িয়ে পড়ার পরে অবাক হয়েছে সবাই। ম্যাচ পাতানোটা নতুন কিছু নয়। কিন্ত এভাবে জনসম্মুখে, ক্যামেরার সামনে এরকম কাঁচা অভিনয় আর দেখেনি কেউ। ব্রিফকেসভর্তি টাকার অঙ্কটা নিশ্চয়ই কম কিছু ছিল না দুবাইয়ের খেলোয়াড়-কর্মকর্তাদের জন্যে।

আইসিসির দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা আকসু অবশ্য এই ম্যাচ এবং লীগের অন্যান্য ম্যাচ নিয়ে তদন্ত শুরু করে দিয়েছে। সব ম্যাচের ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। দুই ক্লাবের কর্তাব্যাক্তি এবং ওই ম্যাচের প্রত্যেক খেলোয়াড়ের সঙ্গে আলাদা আলাদাভাবে কথা বলবেন তদন্ত কর্মকর্তারা। ডাকা হবে আরব আমিরাতের ক্রিকেট বোর্ডের কর্তাদেরও। যদিও ক্রিকেট বোর্ড দাবী করেছে, এই টুর্নামেন্টের আয়োজক তারা নয়, কাজেই তাদের দায়ভার নেয়ার প্রশ্নও আসে না। অবশ্য বোর্ডের নাকের ডগায় এমন জঘণ্য পর্যায়ের ম্যাচ ফিক্সিং হয়ে এসেছে, সেসব যখন তারা দেখেও দেখেনি, এখন এই টুর্নামেন্টের সঙ্গে তাদের কোন সম্পর্ক থাকবে না- এমনটাই স্বাভাবিক!

আমিরাতের আজমান লীগের অখ্যাত দুই ক্লাবের এই ম্যাচটা শুধু ক্রিকেটের নিকষ কালো অন্ধকারে ঢাকা কিছু চোরাগলির অস্তিত্বের জানান দিয়ে গেল আরও একবার। যেখানে ক্রিকেটের চেয়ে ব্যবসাটা বড়, খেলার চেয়ে যেখানে জয়-পরাজয় মূখ্য, যেখানে জয়ের সুতীব্র নেশা ম্লান হয়ে যায় অর্থের দর্পের কাছে!

তথ্যসূত্র- হেরাল্ড সান অস্ট্রেলিয়া, নিউজ ডটকম অস্ট্রেলিয়া

ভিডিওটি দেখতে পারবেন এখানে ক্লিক করে।

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-