অনুপ্রেরণার গল্পগুচ্ছতারুণ্য

শ্রবণ প্রতিবন্ধিতাও যাকে হার মানাতে পারেনি

মাসুদ সরকার রানা। সদা হাস্যোজ্জ্বল এ লোকটাকে দেখলে বোঝার উপায় নেই তার উপর দিয়ে এত ঝড় ঝাপটা বয়ে গেছে। তার জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপই সংগ্রামের। এত প্রতিবন্ধকতা নিয়েও তিনি আজ একজন সফল মানুষ। তার সংগ্রাম কতটা ভয়াবহ ছিল সেটা বুঝাতে একটি উদাহরণ দিয়েই শুরু করি। ধরুন আপনি একদিন ঘুম থেকে উঠে আবিষ্কার করলেন দুই কানে কিছুই শুনতে পাচ্ছেন না। তখন আপনার অনুভূতি কেমন হবে? নিশ্চয়ই চিৎকার চেঁচামেচি করে পাগলের মত হয়ে যাবেন। আপনার জীবনে এমনটা হয়নি, তাই হয়তো এর ভয়াবহতা বুঝতে পারছেন না। কিন্তু বাস্তবে সেটাই ঘটেছিল তার সাথে।

২০০৪ সালে টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হয়ে শ্রবণ শক্তি হারান মাসুদ। প্রথমে মুষড়ে পড়লেও পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নেন। রাস্তা ঘাটে বের হলেই জুটত মানুষের টিটকারি আর হাসাহাসি। মানুষ তাকে দেন্দা (দেন্দা কুমিল্লার আঞ্চলিক শব্দ যার অর্থ বধির) উপহাস করত। এর সাথে পরিবারও তাকে বোঝা মনে করত। কিন্তু যার রক্তে হার নেই সে কী এত সহজেই দমে যায়? শ্রবণ শক্তি হারিয়েও তাই মাসুদ পুরোদমে পড়াশুনা শুরু করলেন। ধীরে ধীরে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে লাগলেন এই নিষ্ঠুর সমাজের সাথে। ২০০৬ সালে বেশ কৃতিত্বের সাথেই নিজ গ্রামের মাদ্রাসা থেকে দাখিল পাস করেন।

এলাকাবাসীর মুখও থেমে গেল। চারদিকে শুধু মাসুদের জয়ধ্বনি। যারা এতদিন তাকে নিয়ে কানাঘুষা করত তারাই এখন তার প্রশংসা করতে লাগল। এরপর কৃতিত্বের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে আলিম পরীক্ষাতেও উত্তীর্ণ হন। দাখিল পরীক্ষায় মাদ্রাসার মাঝে তৃতীয় হলেও আলিমে প্রথম স্থান অর্জন করেই হার্ডলটা পেরিয়ে যান। সফলভাবে উচ্চ মাধ্যমিক সমাপ্ত করে ভর্তি হন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু বিধি বাম। প্রথম বর্ষে পড়ার সময়েই ভর্তি বাতিল হয়ে যায়। তাতেও তাকে দমানো যায় নি। ২ বছর গ্যাপ দিয়ে ঢাকায় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখান থেকেই সফলতার সাথে অনার্স, মাস্টার্স শেষ করেন।

মাসুদ জানান, “শিক্ষা জীবনে শিক্ষক, ক্লাসম্যাট সবার থেকেই সহায়তা পেয়েছি। তাদের সহায়তা না পেলে আমার শিক্ষা জীবন অসমাপ্তই থেকে যেত। সেজন্য আমি তাদের কাছে কৃতজ্ঞ। তবে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় ছোট মামা আর বন্ধু হাসানের কথা। শিক্ষা জীবনে এ দুজন থেকেই সবচেয়ে বেশি সহায়তা পেয়েছি। দাখিল পরীক্ষায় ভাল রেজাল্টের পিছনে মূল কারিগর ছিলেন ছোট মামা কামরুজ্জামান আল আমিন। বন্ধু হাসান অনার্স মাস্টার্সে নানাভাবে সহায়তা করেছেন। আমি দরিদ্র পরিবারের সন্তান। বাবার সামর্থ্য ছিল না আমাকে ঢাকায় রেখে পড়ায়। তাই ক্লাস করতাম না। কিন্তু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে তো সারা বছরই পরীক্ষা লেগে থাকে। পরীক্ষায় সময়ে বাধ্য হয়েই ভার্সিটিতে যেতে হত। তখন নির্লজ্জের মত বন্ধু হাসানের বাসায় উঠতাম। সে দয়া করে বাসায় আশ্রয় দিত বলেই তো শিক্ষা জীবন শেষ করতে পেরেছি। এ ছাড়া লেকচার শিট দিয়েও সাহায্য করত”।

আত্মপ্রত্যয়ী এই মানুষটি কখনই অন্যের বোঝা হয়ে থাকতে চাইতেন না। তাই শ্রবণ প্রতিবন্ধিতা সত্ত্বেও ছাত্র অবস্থাতেই উপার্জনের চেষ্টা করতেন। কিন্তু যে দেশে সম্পূর্ণ সুস্থ শরীর নিয়েও লাখ লাখ বেকার ঘুরে বেড়াচ্ছে সে দেশে শ্রবণ প্রতিবন্ধীতা নিয়ে কর্ম খুঁজে পাওয়া তো দুরূহ কাজ। তিনি জানতেন তার এই কানের সমস্যা নিয়ে কেউ চাকরি দিবে না। তবুও চাকরির আবেদন পত্র নিয়ে বিভিন্ন কোম্পানির দাঁড়ে দাঁড়ে ঘুরেছেন। কিন্তু যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কেউ তাকে চাকরি দেয় নি। স্বাস্থ্য সহকারি পরীক্ষায় নিজ ওয়ার্ডে প্রথম হয়েও তার কপালে এ সরকারি চাকরিটি জুটে নি ঘুষ দিতে না পারার কারণে। যখন বুঝলেন কানের সমস্যা নিয়ে চাকরি পাওয়া সম্ভব না তখনই ট্র্যাক চেঞ্জ করে ফেলেন।

ব্যবসাটা তিনি খুব ভাল বুঝেন। তার পরামর্শে দেশের বেশ কিছু ইকমার্স কোম্পানি গড়ে উঠে যেগুলো এখনও রানিং আছে। সিদ্ধান্ত নিলেন ব্যবসা করবেন। কিন্তু ব্যবসা করতে তো অনেক টাকা লাগে। যেটা তার নিম্নমধ্য বিত্ত পরিবারের নাই। তিনি জানতেন পরিবার থেকে ব্যবসায় কোন সাহায্য পাবেন না। তবুও পথে নামলে পথ চেনা হয় এ আশায় এ লাইনে নামার সিদ্ধান্ত নিলেন। তার ছিল মাথা ভর্তি বিজনেস আইডিয়া। এক প্রকার বিনা পুঁজিতেই ব্যবসায় নেমে পড়েন। একটু সামনে এগিয়েই বুঝলেন অনেক টাকার প্রয়োজন। সে মুহূর্তটা তার ভাষাতেই ব্যাখ্যা করি, “পুঁজির সমস্যা ওভারকাম করতে পারতাম যদি কান দুটো সচল থাকত। আপনার ভাল কমিউনিকেশন স্কিল থাকলে বিনা পুঁজিতেই অনেক ভাল ব্যবসা করতে পারবেন। আমার একদিকে কানের সমস্যা আরেক দিকে পুঁজির সমস্যা দুটো একসাথে হওয়ায় থেমে যেতে হয়”।

তারপরও তিনি থেমে থাকেন নি। উপার্জন করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন।আইডিয়া চেঞ্জ করে নতুন আইডিয়া নিয়ে কাজ করেন। কিন্তু প্রতিবারই ঐ একই সমস্যা। হয় পুঁজি নয়ত কানের সমস্যার কারণে থেমে যেতে হত। মাঝখানে অবশ্য নিজ এলাকায় খণ্ডকালীন ব্যবসা করে কিছুটা রোজগারের চেষ্টা করেছিলেন। এক আইডিয়াতে ব্যর্থ হলে নতুন আইডিয়া নিয়ে কাজ করেছেন। এভাবে ৪/৫ বার ব্যর্থ হওয়ার পর ভাবলেন তার তো সহজাত লেখনীর ক্ষমতা আছে। সেটাকেই কাজে লাগাবেন। যেই ভাবা সেই কাজ। শুরু করলেন বাংলা কন্টেন্ট রাইটিং। কিন্তু বাংলা কন্টেন্টের মার্কেট খুব বিস্তৃত না হওয়াতে তেমন কাজ পেতেন না। ইংলিশ কন্টেন্টের মার্কেট অনেক বড়। কিন্তু সেটা করতে হলে তো তুখোড় ইংরেজি জানতে হবে। কথাবার্তা বলার মতো টুকটাক ইংরেজি জানলেও কন্টেন্ট রাইটিংয়ের মতো ইংলিশ জ্ঞান তার ছিল না।

যার জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ সংগ্রামের তাকে কী এত সহজে ঠেকিয়ে রাখা যায়? ভাল ইংরেজি জানে এমন একজনকে সাথে নিয়ে শুরু করলেন ইংলিশ কন্টেন্ট রাইটিং। তিনি প্রথমে বাংলায় আর্টিকেল লিখেন। তারপর তার পার্টনার সেটাকে ইংলিশে তর্জমা করেন। ব্যাস তাতেই ঘুরে যায় তার ক্যারিয়ারের মোড়। এখন তিনি সফল একজন কন্টেন্ট রাইটার। আর্টিকেল লিখে বেশ ভাল আয় করেছেন। ফ্রিল্যান্সিং কমিউনিটিতে তার ব্যাপক পরিচিতি থাকায় ক্লায়েন্ট পেতেও তেমন বেগ পেতে হয় না। মাসুদ এখন নিজের খরচ মেটানোর পাশাপাশি সংসারের খরচও যোগান।

সফল হতে পেরেছেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি এগিয়ে চলোকে বলেন, “সফল এখনও হতে পারি নি। যেটা করেছি সেটা আমার স্বপ্ন আকাঙ্ক্ষার ১০% মাত্র। আমার মূল ধ্যান ধারণা ব্যবসাকে ঘিরে। বেশ কিছু আইডিয়া নিয়ে ধীরে ধীরে আগাচ্ছি। ভাল ইনভেস্টর পেলেই ব্যবসা শুরু করে দিব। সম্প্রতি এক পুলিশ সদস্যের সাথে ছোট করে অনলাইনে ব্যবসা শুরু করেছি। আশা করছি আমার আইডিয়াগুলো বাস্তবায়ন করে স্বপ্ন পূরণ করতে পারব”।

এই সংগ্রামী মানুষটি আবার পরোপকারীও। যখন যেভাবে পেরেছেন মানুষকে সাহায্য করেছেন। কখনও শরীর দিয়ে, কখনও বুদ্ধি দিয়ে আবার কখনও বা অর্থ দিয়ে সহায়তা করেছেন। তিনি বলেন “আমি কখনই মানুষকে উপকার করতে গিয়ে স্বার্থ দেখি নি। স্বার্থ দেখলে সেটা আর উপকার থাকে না। বিনিময় হয়ে যায়। আমার নিজের ক্ষতি করে যদি দেশ ও দশের উপকার হয় তাহলে আমি সেটাই মেনে নিব”। তিনি মানুষের জন্য নিজেকে কতটা বিলিয়ে দেন সেটার প্রমাণ পাওয়া যায় www.bncbd.com/bus-route এই ঠিকানায় গেলে। সেখানে তিনি সারা দেশে চলাচলকারী সকল বাস ও ভাড়া নিয়ে একটি ডাটাবেজ তৈরি করেছেন। শুধু মানুষের উপকারের কথা ভেবেই তিনি ২ মাস অবিরাম খেটে এ ডাটাবেজটি তৈরি করেছেন।

তিনি আবার প্রচণ্ড ভ্রমণ-প্রিয় আর আমুদে মানুষ। প্রতি মাসেই নিজের উপার্জিত টাকায় দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ান। ইতোমধ্যেই দেশের অধিকাংশ জেলা ঘুরে ফেলেছেন। ঘুরার পাশাপাশি সারাক্ষণই আমুদে মেতে থাকেন। নানা রকমের উদ্ভট কাজ কারবার আর কথাবার্তা বলে সবাইকে হাসান। নিজেও সর্বদা হাসিখুশি থাকেন। তিনি যেমন পরোপকারী তেমন বজ্র কঠোর সৎ। এ ব্যাপারে মাসুদ এগিয়ে চলোকে বলেন, “কি হবে ভাই অন্যের সম্পদ খেয়ে। দুদিন পরে তো মারাই যাব”।

তার সততা নিয়ে বিসিএস পুলিশ ক্যাডারে সুযোগ পাওয়া বর্তমানে রবি’র কর্মকর্তা হুসাইন মোহাম্মদ ফারাবী বলেন, “সত্যি বলতে কি, মাসুদের মত সৎ লোক জীবনে কমই দেখেছি। মজার ছলেও মিথ্যা বলে না কখনও। চোখ বুজে তাকে বিশ্বাস করা যায়। অনলাইন থেকে পরিচিত বন্ধুও যে এতোটা ঘনিষ্ঠ, এতোটা বিশ্বাসী হতে পারে সেটা তাকে না দেখলে বুঝতাম না। I am so lucky to have him in my life”. গার্মেন্টস ব্যবসায়ী নৌশাদ ইমতিয়াজ বলেন, “আমি মাসুদকে কাছ থেকে দেখেছি। সে একদিকে যেমন প্রচণ্ড সৎ তেমনি কাজ করার অদম্য ইচ্ছা শক্তি রয়েছে। সেই সাথে অসম্ভব দুঃসাহসী। শত প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও কাজ করার অদম্য ইচ্ছা শক্তিই তাকে আজকের পর্যায়ে নিয়ে এসেছে”। সৌদি প্রবাসী বিল্লাল ফকির বলেন, “মাসুদ ভাই এমন এক লোক যাকে চোখ বুঝে বিশ্বাস করা যায়। তার এক কথাতেই আমি তাকে বড় অংকের টাকা দিয়েছিলাম অথচ তখনও উনার সাথে আমার দেখাই হয় নি”।

কানের চিকিৎসা করাতে চান কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “করাতে তো চাই। কিন্তু চিকিৎসা অনেক ব্যয় বহুল। ১৫-১৭ লাখ টাকা ম্যানেজ করা তো আমার পক্ষে সম্ভব না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারিভাবে চিকিৎসার জন্য দুবার আবেদন করেছিলাম। কিন্তু কোনবারই তারা আমাকে ককলিয়ার ইমপ্ল্যান্ট অপারেশনের জন্য ডাকে নি”।

আপনার পেশার সামাজিক মর্যাদা আছে কিনা এমন প্রশ্ন করতেই কিছুটা ঝাঁঝের সাথেই যেন বললেন, “আমার পেশার সামাজিক মর্যাদা নেই। তাতে আমি মাথাও ঘামাই না। আমি হালালভাবে উপার্জন করি। সমাজ কি বলল, কে কি ভাবল এসব নিয়ে ভাবার সময় কই? আমি চলি আমার মতো।”

সত্যিই তো তিনি তার মত চলেন। এ সমাজের কথা মানতে গেলে তাকে থেমে যেতে হত সেই গোড়াতেই। এই সমাজ তো তাকে কানে সমস্যা দেখা দেওয়ার সাথে সাথেই অচল ঘোষণা করেছিল। কিন্তু তিনি সব প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে এসেছেন। সম্পূর্ণ সুস্থ শরীর নিয়েও কত মানুষ বেকার ঘুরে বেড়াচ্ছে। অথচ কোন বাধা-বিপত্তিই মাসুদকে দমাতে পারে নি। এসব মাসুদরাই তো সত্যিকারের নায়ক। সব কিছুতে অতি সাধারণই তাকে বানিয়েছে অসাধারণ।

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close