আমাদের শৈশব আর কৈশরে সবচেয়ে বড় সঙ্গী ছিল গল্পের বই। বাবা মায়ের ভাষায় ‘আউট বই’। আমার গল্প-উপন্যাসের বই পড়ার শুরুটাই হয়েছিল সেবা প্রকাশনীর বই দিয়ে। প্রজাপতির লোগো বসানো পেপারব্যাকের বই, পেছনে লেখা- হ্যাল্লো বন্ধুরা, আমি কিশোর পাশা বলছি…! ভলিউম বারো, প্রজাপতি খামার, পাগল সংঘ আর ভাঙা ঘোড়া গল্পগুলো এখনও মোটামুটি মুখস্তই আছে। 

আমাদের কিশোর মনে তিন গোয়েন্দার প্রভাব ছিল ব্যাপক। সেই বয়সে আমরা শচীন টেন্ডুলকার হতে চাইতাম, হ্যারি পটার হতে চাইতাম, আর চাইতাম কিশোর-মুসা কিংবা রবিনের মতো হতে। মাসুদ রানা তখনও আমাদের কাছে ‘অ্যাডাল্ট বুক’। সেটার সঙ্গেও পরিচয় ঘটে গেল একসময়। তারপর হুড়মুড় করে এই বাঙালী যুবকের প্রেমে পড়লাম। কোমলতা আর কঠোরতার অদ্ভুত মিশেলে গড়া সে যুবক, যে সবাইকে মায়ায় বাঁধে, কিন্ত বাঁধনে জড়ায় না। মাসুদ রানা নামের সেই কল্পিত চরিত্রটাই তখন আমাদের কাছে স্বপ্নের নায়ক। আমাদের সুপারম্যান-ব্যাটম্যান কিছুই ছিল না, কাজী আনোয়ার হোসেনের মাসুদ রানাই ছিল আমাদের সুপারহিরো।

ধান ভানতে এসে শিবের গান গাইছি। জাজ মাল্টিমিডিয়া মাসুদ রানার তিনটা উপন্যাসের স্বত্ব কিনে নিয়েছে সিনেমা বানানোর জন্যে, খবরটা বেশ পুরনো। আরও আগেই এটা নিয়ে লেখা উচিত ছিল, হয়ে ওঠেনি। আমরা সবসময় আফসোস করি, কেন আমাদের দেশে সাহিত্যনির্ভর সিনেমা বানানো হয় না, কেন থ্রিলারের নামে বেশিরভাগ সময় অখাদ্য গেলানো হয় আমাদের দর্শকদের। সিনেমা বানানোর জন্যে আমাদের দেশে গল্পের অভাব নেই, চরিত্রেরও অভাব নেই। মাসুদ রানাকে নিয়ে সিনেমা বানানো হবে, এটা তো খুশী হবার মতোই খবর। কিন্ত খুশীর জায়গায় উল্টো কেমন যেন দুশ্চিন্তা হচ্ছে, অদ্ভুত একটা আশঙ্কা কাজ করছে মনের ভেতরে। 

প্রথমেই বলে নিই, মাসুদ রানাকে নিয়ে এর আগেও সিনেমা বানানো হয়েছে। ১৯৭৪ সালে বিস্মরণ গল্পের ওপরে সিনেমাটা বানানো হয়, সেটার নামই ছিল মাসুদ রানা, এই সিনেমাটা দিয়েই বায়ক হিসেবে অভিষিক্ত হয়েছিলেন সোহেল রানা। তবে এই সিনেমাতে তার অভিনয় করার কথা ছিল না শুরুতে। শোনা গেছে, সিনেমাটা মাসুদ রানা’র স্রষ্টা কাজী আনোয়ার হোসেনের পছন্দ হয়নি, আর তাই এরপরে তিনি আর কখনও মাসুদ রানাকে রূপালী পর্দায় নিয়ে আসার অনুমতি দেননি কাউকে। তবে মাসুদ রানার গল্প নিয়ে ছোটপর্দায় নাটক নির্মিত হয়েছে এরপরে।

সে যাই হোক, নিজের দুশ্চিন্তা আর আশঙ্কার ঘটনায় আসি। প্রথম প্রশ্ন, মাসুদ রানা হিসেবে পর্দায় আসবেন কে? মাসুদ রানার যে ফিজিক্যাল স্ট্র‍্যাকচার, সেটা আমাদের দেশে দুয়েকজন ছাড়া আর কোন নায়কের মধ্যে নেই। বইয়ে পড়া ছয়ফুটের মাসুদ রানার উচ্চতা সিনেমায় পাঁচ ফুট আট ইঞ্চি হয়ে গেলে যেমন অদ্ভুত লাগবে, তেমনই অদ্ভুত লাগবে পেটানো শরীরের জায়গায় থলথলে ভুড়ির অস্তিত্ব খুঁজে পেলে। জাজ বলেছে, তারা নতুন কোন নায়ককে নিতে চায়, যাকে নিয়ে তিন পর্বেই কাজ করা যাবে। সেখানেও নতুন ছেলেটাকে গ্রুমিং করার প্রশ্নটা আসবে। মাসুদ রানা হতে হলে মাসুদ রানাকে জানতে হবে ভালোভাবে, চরিত্রটাকে আত্মস্থ করতে হবে পুরোপুরি। জীবনে মাসুদ রানা পড়েনি, এমন কেউ নিশ্চয়ই এই চরিত্রটা পর্দায় ফুটিয়ে তুলতে পারবে না। এছাড়া মাসুদ রানা সুইজারল্যান্ডের বরফের ওপরে দাঁড়িয়ে হাত-পা ছড়িয়ে গানের সঙ্গে ঠোঁট মেলাচ্ছে, এমন অবাস্তব কোন দৃশ্যও দেখতে চাই না।

তবে সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তাটা পরিচালক নিয়ে। একটা সিনেমার পরিচালক হচ্ছেন ক্যাপ্টেন অফ দ্য শীপ। তিনিই ঠিক করবেন সিনেমাটা কোন পরে এগিয়ে যাবে, সেটার গন্তুব্য কি হবে। জাজ মাল্টিমিডিয়া নাকি মাসুদ রানার পরিচালক হিসেবে ভারতীয় কাউকেই চান। বাবা যাদব, জয়দীপ মুখার্জী, রাজা চন্দ এবং রাজ চক্রবর্তী- এই চারজনের যে কাউকে পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেবে তারা। শুটিং শুরু হবে আগামী বছরের জানুয়ারী নাগাদ।

জাজের রাডারে যে চার পরিচালক আছেন, এদের সবাই কলকাতায় মাসালা টাইপের অ্যাকশন বা রোমান্টিক অ্যাকশন সিনেমার জন্যেই পরিচিত। এদের সবার সিনেমার একটা কমন ফর্মূলা আছে, ধুমধাড়াক্কা মারপিট, একটু ইটিশ পিটিশ রোমান্স, ইউরোপের লোকেশনে দুটো গান, আর মিনিটে মিনিটে হিউমারের নামে লোক হাসানোর ব্যর্থ প্রচেষ্টা। এই চারজনের মধ্যে রাজ চক্রবর্তীকে একটু এগিয়ে থাকবেন, কিন্ত মৌলিক সিনেমা বা মৌলিক গল্পের প্রসঙ্গ এলে তাকেও বাতিলের লিস্টে ফেলে দিতে হবে হয়তো। এই ভদ্রলোক এ পর্যন্ত যতোগুলো সিনেমা বানিয়েছেন, প্রায় সবগুলোই অন্য সিনেমার রিমেক!

মাসুদ রানাকে নিয়ে যখন সিনেমা বানানো হবে, তাহলে পরিচালক বাংলাদেশী নয় কেন? ভারতীয় যে চার পরিচালকের নাম আসছে, তাদের কয়জন মাসুদ রানার কয়টা গল্প পড়েছেন? আমরা যেভাবে মাসুদ রানা, জেনারেল রাহাত খান, সোহানা, সোহেল বা গিলটি মিয়া চরিত্রগুলোকে অনুভব করি, তারা কি সেভাবে করবেন? দুর্দান্ত থ্রিলার বানানোর মতো মেধাবী পরিচালক আমাদের দেশেই আছেন, তারাও হয়তো কৈশরে মাসুদ রানায় মজেছিলেন। কিন্ত তাদের ডিঙিয়ে কলকাতার পরিচালক ডেকে আনা কেন? আর কলকাতার পরিচালক নিয়েই যদি কাজ করতে হয়, তাহলে বাবা যাদব বা রাজ চক্রবর্তীকে কেন দায়িত্ব দিতে হবে, সৃজিত মুখার্জী বা অরিন্দম শীলের মতো থ্রিলারে হাত পাকিয়ে ফেলা মানুষগুলোকে কেন ডিরেক্টর’স চেয়ারটা অফার করা হচ্ছে না? 

টিভি পর্দায় নিয়ে এসেছিল চ্যানেল আই। সেটা দেখে বমি করার উপক্রম হয়েছিল, আমাদের মনের ভেতরে কিশোর-মুসা-রবিনের যে ছবিটা আঁকা ছিল, সেটার ওপরে পানি ঢেলে দিয়েছিল চ্যানেল আইয়ের সেই উদ্যোগ। জাজ মাল্টিমিডিয়া সেরকম কিছু করবে না, এমন স্বপ্ন দেখতে খুব ইচ্ছে হয়। আমাদের দেশীয় চরিত্র মাসুদ রানাকে নিয়ে সিনেমা হচ্ছে, সেই সিনেমা নিয়ে আমাদের গর্ব করার কথা। মাসুদ রানা আমাদের সুপারম্যান, আমাদের জেমস বণ্ড। কিন্ত এখনও পর্যন্ত জাজ যে পথে হাঁটছে, তাতে শেষমেশ গর্বটা থাকবে নাকি লজ্জা যোগ হবে, এই প্রশ্নটা মনের ভেতরে উঁকি দিচ্ছে বারবার…

Comments
Spread the love