সাবেক প্রেমিকার বিয়ে হচ্ছে – খবরটা শুনলে মজাই লাগে! তাই না? কিন্তু যদি এমন হয় যে সাবেক প্রেমিকার বিয়ে হচ্ছে আপনার বেস্ট ফ্রেন্ডের সাথে, তাহলে কেমন লাগবে? আমি বলছি কেমন লাগবে! এই অভিজ্ঞতা মোটেও সুখকর নয়! যেকোনো ভয়ংকর দুঃস্বপ্নের চেয়েও বেশি ভয়ংকর!

সৌরভের বিয়ে ঠিক হয়েছে শোনার পর আমি যারপরনাই আনন্দিত হয়েছিলাম। কিন্তু সৌরভের বিয়ে আরিশা নামের একটি মেয়ের সাথে ঠিক হয়েছে শোনার পর আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল! অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ! সৌরভের বাবা ঠিক করেছেন এই বিয়ে। নিজের মন কে বোঝালাম- পৃথিবীতে আরিশা নামে কত মেয়েই তো থাকতে পারে! কিন্তু সৌরভের মানিব্যাগে আরিশার ছবি দেখার পর আমার চমকের মাত্রা বেড়ে গেল তিন গুণ! যা ভেবেছিলাম, ঠিক তাই হয়েছে! এতো সেই আরিশা!

সৌরভের বাবার উপরে প্রচন্ড রাগ হলো আমার। ভদ্রলোক কি দুনিয়াতে আর কোন মেয়ে খুঁজে পেলেন না? আরিশাকেই বেছে নিতে হল ছেলের বউ করার জন্য?

হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন। আরিশা আমার সাবেক প্রেমিকা। বছর দুয়েক চুঁটিয়ে প্রেম করেছি দুজন। কত যায়গায় ঘুরেছি! কত সুন্দর সুন্দর স্মৃতি আছে দুজনের! মেয়েটির জীবনে প্রথম পুরুষ ছিলাম আমি। আমাকে নিয়ে অনেক রঙিন রঙিন স্বপ্ন সাজিয়েছে সে। কয়টা বাচ্চা নেবে, কেমন বাড়ি বানাবে, বাচ্চাদের কোথায় পড়াবে, এমনকি বুড়ো-বুড়ি হওয়ার পর দুজনে কি নিয়ে গল্প করব সেই প্ল্যানও করা হয়ে গিয়েছিল আরিশার। কিন্তু একসময় তার প্রতি আমার আগ্রহ ফুরিয়ে গেল। আর কত? দুই বছর কি এনাফ না!

আমার তখন নাদিয়া নামের এক উদ্ভিন্ন যৌবনা মেয়ের দিকে নজর পড়েছিল! আরিশাকে দেখলেই তাই বিরক্ত লাগতো খুব। দুম করে একদিন সম্পর্ক ভেঙ্গে দিলাম আমি। আরিশা সেদিন অনেক কেঁদেছিল। রাস্তার মধ্যে হাজার মানুষের সামনে আমার পা জড়িয়ে ধরেছিল। আমি শুনিনি। প্রেম আর দয়া দেখানো এক নয়! দয়া দিয়ে সম্পর্ক টেকে না!

প্রথম দিকে একটু ভয় হচ্ছিল – আরিশা বুঝি মনের দুঃখে আত্মহত্যা করে বসবে! কিন্তু ভয়টা অমূলক ছিল। মেয়েটি সামলে নিয়েছিল নিজেকে। খুব বেশিদিন সিঙ্গেল থাকেনি। সজল নামের এক ছেলের সাথে সম্পর্ক গড়ে ফেলল অল্প কদিনের মাঝেই। আমিও হাফ ছেড়ে বাঁচলাম! যাক! আপদ পুরোপুরি বিদায় হয়েছে।

দুই বছর বাদে সেই আরিশার বিয়ে ঠিক হয়েছে আমার বেস্ট ফ্রেন্ড সৌরভের সাথে! তার মানে সজলের সাথেও সম্পর্কটা টেকেনি তার। অবশ্য টেকার কথাও নয়! সজল ছেলেটা বেশ হাইফাই ছিল। আমি দেখেই বুঝেছিলাম এই ছেলেও মধু খাওয়া শেষে খুব তাড়াতাড়ি উড়াল দেবে। বেচারি আরিশা! খুব বেশি সহজ সরল! প্রেম করবি তো নিজের মত একটা বোকা সোঁকা ছেলে খুঁজে নে! আমাদের মত হাইফাই গোছের ছেলের দিকে তোর নজর কেন?

যার কপালে যা থাকে তা খন্ডায় কে? অবশেষে একটা বোকা ছেলেই আরিশার জীবনসঙ্গী হতে চলেছে! আমার বন্ধু সৌরভ! একটা আস্ত গবেট! পড়ালেখা করেছে ঠিকই, কিন্তু মাথায় বুদ্ধি শুদ্ধি বলে কিছুই নেই। আমাদের বন্ধু সমাজে সৌরভ হচ্ছে ব্যাপক বিনোদনের মাধ্যম। তাকে ঘোল খাইয়ে, র‍্যাগিং করে, যা খুশি তাই বলে পচিয়ে আমরা বেশ আনন্দ পাই। গবেটটা রাগও করে না, অভিমানও করে না- শুধু দাঁত বের করে হাসে! ভালই সঙ্গী জুটেছে আরিশার কপালে!

শুরুতে আমার বেশ মজা লাগছিল ওদের বিয়ের কথা চিন্তা করে। কিন্তু যতই বিয়ের দিন ঘনিয়ে আসতে থাকল। ততই নিজের ভেতরে একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম আমি। প্রচন্ড রাগ হচ্ছিল আমার সব কিছুতেই। সব কিছু ভেঙে চুরমার করে দিতে ইচ্ছে হচ্ছে। আমি বুঝতে পারছিলাম না যে সাবেক প্রেমিকার সাথে বন্ধুর বিয়ে হচ্ছে- তাতে আমার সমস্যা কোথায়? তবে সমস্যাটা অবশেষে টের পেলাম আমি! আমি ভালবাসি আরিশাকে! প্রচন্ড ভালবাসি।

কখনও টের পাইনি ব্যাপারটা! কিন্তু এখন যতই ভাবছি, ততই বুঝতে পারছি- আমি কি ভুল করে ফেলেছি! আরিশা আর সৌরভের বিয়ে আমার পক্ষে কিছুতেই মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। আরিশা সৌরভের ঘর করবে, তার সাথে সহবাস করবে, তার ঔরসের বাচ্চা কাচ্চা মানুষ করবে- এই গুলো যতই ভাবছি ততই ভেতর ভেতর প্রচন্ড আক্রোস জন্ম নিতে থাকল আমার। এক সময় সেই আক্রোশের বশে ভয়ংকর একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম আমি- খুন করব! মেরে ফেলব সৌরভকে! তারপর আরিশাকে আমার জীবনে ফিরিয়ে আনব আবার।

সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে গেছে, এখন শুধু সুযোগের অপেক্ষা। অবশ্য খুব বেশিদিন অপেক্ষা করতে হলোনা আমার। সুযোগটা চলে এল সৌরভের গায়ে হলুদের আগের রাতে। আর সঙ্গে সঙ্গে সৌরভকে মারার একটা মাস্টারপ্ল্যান করে ফেললাম আমি। আমি নিশ্চিত – এই প্ল্যান কাজে লাগবেই। যেকোনো বিষয়ে প্ল্যানিং করতে আমি মস্ত বড় উস্তাদ। এই প্ল্যানেও কোথাও কোন ফাক-ফোঁকর রাখিনি।

প্ল্যানটা খুব সিম্পল – গায়ে হলুদের আগের রাতে বন্ধুরা সবাই মিলে ডিংকস করব ঠিক করেছি। সৌরভও সাথে থাকবে বলে রাজি হয়েছে। সৌরভের বিয়েটা গ্রামের বাড়িতে হচ্ছে। ওর বাবা মা তাই আগে ভাগে চলে যাবেন সব আয়োজন ফাইনাল করতে। সৌরভ যাবে একদিন পর। তাই রাতে সৌরভদের ফ্ল্যাটটা রাতে খালি থাকবে। সুযোগ পেয়ে সেখানেই আসর জমাব সবাই মিলে। মাঝরাত পর্যন্ত ফুর্তি করে সৌরভকে রেখে সবাই যে যার বাড়িতে ফিরে যাব। কিন্তু আমার মাথায় আছে অন্য প্ল্যান। অন্য বন্ধুদের সাথে আমিও সৌরভের বাসা থেকে বের হব ঠিকই, কিন্তু কিছুদূর এসে আবার তার বাসায় ফিরে যাব রাতে থাকতে। রাতে সৌরভ ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় ওর মুখে বালিশ চেপে ধরে দম বন্ধ করে মেরে ফেলব। তারপর আবার তার বাসা থেকে বের হয়ে নিজের বাসায় ফিরে যাব। কেউ বলতে পারবে না এই কাজের সাথে আমি জড়িত। কেচ্ছা খতম!

প্ল্যানের প্রথম পার্ট খুব সুন্দরভাবেই সম্পন্ন হল। বন্ধুরা সবাই মিলে ড্রিংকস করে সৌরভের বাসা থেকে বের হয়েছি। তারপর আমি একা ফিরে এসেছি আবার। সৌরভকে বলেছি , রাত হয়েছে দেখে আর বাসায় জেতে ইচ্ছে করছে না। রাতে থেকে সকালে যাব। বোকাটা আমি থাকব শুনে খুশিই হয়েছে! যমের বাড়ি চেনার তার এতই শখ! রাতে দুজনে পাশাপাশি শুয়েছি ওর বেডরুমে। কি অপূর্ব সুযোগ!

কিন্তু প্ল্যানের দ্বিতীয় পার্টে গিয়ে ভেজাল বেঁধেছে! সৌরভ তো শালা কিছুতেই ঘুমায় না! না ঘুমালে একটা মানুষকে বালিশ চাপা দিয়ে দম আটকে মারা কি সহজ কোন কাজ? তাছাড়া গায়ের জোরে সৌরভের সাথে আমি পারব বলে মনে হয় না! আমি যতই ঘুমাতে বলি সে শুধু সুখ দুঃখের গল্প শুনায় আমাকে। বিয়ে তো না! যেন বলি দেয়া হচ্ছে তাকে! এই কাহিনি বুঝি আর কখনও বলার সুযোগ পাবে না! ভোর রাতের দিকে সৌরভের একটা ঘুম ঘুম ভাব চলে এল। আমি প্রমোদ গুনতে শুরু করলাম। কিন্তু হতচ্ছারার বাথরুম পেয়ে বসল হঠাৎ। তারপর টয়লেটে গিয়ে সেই যে ঢুকেছে! আর বের হওয়ার নাম গন্ধ করছে না!

চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছি আমি। সৌরভের অপেক্ষায় আছি। ব্যাটা মনে হচ্ছে ইহকালে আর বাথরুম থেকে বের হবে না! হঠাৎ খুঁট করে একটা শব্দ হল দরজা খোলার। আমি চোখ মেলে দেখলাম বাথরুমের নয়, বেডরুমের দরজা খুলে গেছে। মনে হল কেউ একজন ঘরে প্রবেশ করেছে। অন্ধকারে ঠিক মত বোঝা যাচ্ছে না! আমি ঝটকা মেরে উঠে বসতে গেলাম। কিন্তু আমার চেয়ে দ্রুত গতিতে বেডের উপর আচমকা লাফিয়ে উঠল আগন্তুক। আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক হাতে আমার মুখ চেপে ধরল লোকটা। অন্য হাতে ঝিক করে উঠল একটা ছোট আকৃতির ছুরি। আমি প্রানপণে নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু আমার সমস্ত শরীর কম্বলের নিচে, শুধু মাথাটা বাইরে। তাই সুবিধা করতে পারছি না। কে এই লোক? কেন মারতে চাইছে আমাকে?

মুহূর্তের মধ্যে হাজার চিন্তা ঘুরে গেল আমার মাথায়। ব্যাপারটা বুঝতে অসুবিধা হল না আমার! আসলে এই লোক আমাকে নয়, সৌরভকে মারতে এসেছে! অন্ধকারে আমাকেই সৌরভ ভেবেছে! তবে কি সৌরভ জানত কেউ একজন আসবে তাকে মারতে? এই জন্যই কি সৌরভ ইচ্ছে করেই এতক্ষন ধরে বাথরুমে ঢুকে বসে আছে? যাতে তার বদলে আমি মারা যাই? কিন্তু আমাকে কেন সৌরভ মারতে চাইবে? তাহলে কি সৌরভ আমার প্ল্যানও আগে থেকে আঁচ করতে পেরেছিল?

আমি চিৎকার করে বলার চেষ্টা করলাম, “আপনি ভুল করছেন, আমি সৌরভ নই”। কিন্তু মুখে হাত চাপা দিয়ে রাখায় ঘোঁত ঘোঁত জাতীয় শব্দ ছাড়া আর কিছু বের হল না মুখ দিয়ে। খুব একটা হাত পা ছোরাছোরি করার অবকাশও পেলাম না আমি। তার আগেই আগন্তুক গায়ের জোরে ছুরিটা বসিয়ে দিল আমার বুকে। তারপর মুখে বাঁধা কাপড়টা খুলে নিল। অন্ধকারেও তার মুখে বিশ্বজয়ের হাসি।

তীব্র যন্ত্রণায় সমস্ত শরীর মৃগী রোগীদের মত কাঁপছে আমার… 
চোখের সামনে পৃথিবী অন্ধকার হয়ে আসছে…

আচমকা বাথরুমের দরজা খুলে গেল। সৌরভের হাতে লাঠি। আগন্তুক কিছু বুঝে ওঠার আগেই মাথায় বাড়ি খেয়ে অজ্ঞান হয়ে ঢলে পড়ল। সাথে সাথে সৌরভ বেডরুমের লাইট জ্বালাল। সেই আলোয় দেখলাম- আমার বুকে ছুরি বসিয়ে দেয়া লোকটা আর কেউ নয়! আরিশার দ্বিতীয় প্রেমিক – সজল!

সজল কেন সৌরভকে মারতে এল? তবে কি সজলও আমার মতই আরিশার প্রতি তীব্র ভালবাসা অনুভব করছিল? আরিশাকে ফিরে পাওয়ার আশায় সৌরভকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল? আর সেই সুযোগটাই কত সুন্দর করে কাজে লাগালো সৌরভ! সারা জীবন যাকে বোকা ভেবে এসেছি, শেষমুহূর্তে এসে সেই ভেলকি দেখিয়ে দিল! শত্রুর হাতে শত্রু নিপাত!

আমি মরে যাচ্ছি… 
আমাকে হত্যার অপরাধে সজলেরও ফাঁসি হবে…
আরিশা আজ থেকে সৌরভের…

(সমাপ্ত)

Comments
Spread the love