তিনি নিজেই একটা প্যান্ডোরার বাক্স। নিত্যনতুন সম্ভার হাজির করে সবাইকে চমকে দেয়াটাই তার স্বভাব। আজও তেমন কিছুই করলেন। ঢাকা প্রিমিয়ার লীগে আবাহনীর হয়ে অগ্রণী ব্যাংকের বিপক্ষে তিনি আজ শিকার করলেন ছয়টা উইকেট, এরমধ্যে শেষ ওভারেই নিয়েছেন চারটা। ম্যাচশেষে তার বোলিং ফিগারটা দারুণ আকর্ষণীয়- ৯.৫-০-৪৪-৬! চৌত্রিশ বছরের ‘বুড়ো’ এই পেসারের নাম মাশরাফি বিন মুর্তজা, বাংলাদেশ ওয়ানডে দলের অধিনায়ক!

শেষ ওভারে জয়ের জন্যে অগ্রণী ব্যাংকের প্রয়োজন ছিল তেরো রান। স্লগ ওভারের সেই চ্যালেঞ্জটা নিতে এসেছিলেন মাশরাফি। প্রথম বলে স্ট্রাইকিং এন্ডে থাকা আবদুর রাজ্জাক সিঙ্গেল নিয়েছিলেন। পরের চার বলে একে একে মাশরাফি তুলে নিলেন অগ্রণীর চার ব্যাটসম্যানকে। ধীমান ঘোষ, আবদুর রাজ্জাক, শফিউল ইসলাম আর শেষ ব্যাটসম্যান ফজলে রাব্বি, একে একে চারজনই পরাস্ত হলেন মাশরাফির কাছে, তাও টানা চার বলে! লিস্ট-এ ক্রিকেটে প্রথম বাংলাদেশী বোলার হিসেবে দারুণ এই কীর্তির মালিক হয়ে গেলেন নড়াইল এক্সপ্রেস!

ক্রিকেটীয় পরিভাষায় চার বলে চার উইকেট পাওয়াটাকে ডাবল হ্যাটট্রিক। বিশ্বকাপে যেটা মালিঙ্গা করেছিলেন, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে। আজ সেটাই ডিপিএলে আবাহনীর বিপক্ষে করে ফেললেন মাশরাফি। লিস্ট এ ক্রিকেটে এই দুর্দান্ত কৃতিত্ব আছে আর মাত্র সাতজন বোলারের। অ্যালান ওয়ার্ড, শন পোলক, ভাসবার্ট ড্রেকস, লাসিথ মালিঙ্গা, ডেভিড পেইন, গ্রাহাম নেপিয়ার আর শ্রীকান্ত মুন্ধের সঙ্গে এই তালিকার অষ্টম ব্যক্তি হিসেবে নিজের নামটা সংযোজিত করে নিলেন মাশরাফি বিন মুর্তজা।

টি-২০ আর প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট মিলিয়ে বাংলাদেশের হয়ে চার বলে চার উইকেট শিকারের রেকর্ড ছিল আগেই। ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ত সংস্করণে এই নজির গড়েছিলেন আল আমিন হোসেন, আবাহনীর বিপক্ষে ইউসিবি-বিসিবি দলের হয়ে এই দারুণ পারফরম্যান্স দেখিয়েছিলেন আল আমিন। আর প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেটে একই কাজটা করেছিলেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। তবে রিয়াদের কীর্তিটা বেশ মজার, তিনি চার বলে চার উইকেট নিয়েছিলেন দুই ইনিংস মিলিয়ে!

প্রথমে ব্যাট করে স্কোরবোর্ডে ২৯০ রান জড়ো করেছিল আবাহনী। সেই লক্ষ্য তাড়ায় ভালোভাবেই ট্র‍্যাকে ছিল শাহরিয়ার নাফীস-আবদুর রাজ্জাকের অগ্রণী ব্যাংক। শেষ ওভারে তেরো রান আহামরি কোন টার্গেট নয়, হাতে যেখানে চারটা উইকেট পড়ে রয়েছে। দুটো বিগশটেই খেলাটা দফারফা হয়ে যায়। কিন্ত প্রতিপক্ষ দলে যদি মাশরাফি নামের কেউ থাকেন, তাহলে তো জয়ের নিঃশ্বাস দূরত্বে দাঁড়িয়েও স্বস্তি পাবার কথা নয় যেকোন দলেরই। মাশরাফি তো এমনই একজন, একাই যিনি ঘুরিয়ে দিতে পারেন পুরো ম্যাচের মোড়, চোখের নিমেষে পাল্টে দিতে পারেন ফলাফলটা। ফতুল্লার খানসাহেব ওসমান আলী স্টেডিয়াম সেই ‘মাশরাফি ম্যাজিক’ই দেখলো আরেকবার।

ইনজুরির সঙ্গে আজন্ম বসবাস, অজস্রবার সার্জনের ছুরির নীচে যাওয়া, আর সেখান থেকে বীরদর্পে ফিরে আসা, মাশরাফি মানেই অন্যরকম কিছু, অদ্ভুত একটা প্রেরণার নাম। তার ফিটনেস নিয়ে কতবার কতজন কতভাবে প্রশ্ন তোলার চেষ্টা করেছে, বিতর্কিতভাবে তাকে বাদ দেয়া হয়েছে ঘরের মাটিতে অনুষ্ঠেয় বিশ্বকাপের দল থেকেও। টি-২০’তে অচল এমন তকমা সাঁটিয়ে দিয়ে তাকে অবসর নিতে বাধ্য করা হয়েছে আন্তর্জাতিক টি-২০ থেকেও। কিন্ত তিনি প্রতিবারই প্রমাণ করেছেন নিজেকে, নিজের সামর্থ্যকে। সেজন্যেই অভিষেকের সতেরো বছর পরেও তিনি দেশের সেরা বোলার। তরুণ তুর্কীরা এসেছেন দলে, পারফরম্যান্সে রাঙিয়েছেন মাঠ। কিন্ত দিনশেষে বল হাতে দলের অন্যতম সেরা পারফর্মার ওই মাশরাফি বিন মুর্তজাই!

চুয়াল্লিশ রানে ছয় উইকেট শিকারের পথে শাহরিয়ার নাফীসকে আউট করে এবারের ডিপিএলে নিজের বিশতম উইকেটটা শিকার করেছেন মাশরাফি। ম্যাচশেষে তার মোট উইকেট সংখ্যা পঁচিশটি! অন্য যে কারো চেয়েই অনেকটা বেশী। প্রতিটা উইকেট শিকার করতে মাশরাফি খরচ করেছেন ১৪.৩৫ রান। ইকোনোমি রেটটাও লোভনীয়, মাত্র ৪.৫৯! বিশ উইকেট নিয়ে ডিপিএলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেটশিকারী মোহামেডানের কাজী অনিক। অথচ মাশরাফি আর অনিকের বয়সের পার্থক্য প্রায় ষোল বছরেরও বেশী। মাশরাফি যখন প্রফেশনাল ক্যারিয়ার শুরু করেছেন, অনিক তখন পৃথিবীর আলো-বাতাস দেখেছেন মাত্র! অথচ সেই মাশরাফি এইই বয়সেও কি দারুণ ধারাবাহিক, কি দুর্দান্ত ধার তার বোলিঙের!

বিপিএলে তিনি ব্যাট হাতে দানবীয় মূর্তি ধারণ করেন, তার ব্যাটের অত্যাচারে ঢাকা পড়ে যান গেইলও। পঁয়ত্রিশের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা মাশরাফির পেস বোলিং দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে প্রতিপক্ষের ব্যাটসম্যানদের কাছে। বয়স তো তার কাছে একটা সংখ্যার চেয়ে বেশী কিছু নয়। সেই বয়সের ঘড়িকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সমানে কথা বলে চলেছে তার পারফরম্যান্স, কথা বলবে আরও অনেকদিন!

তথ্যসূত্র কৃতজ্ঞতা- আরিফুল ইসলাম রনি এবং সাইফুল্লাহ বিন আনোয়ার।

Comments
Spread the love