আফগানিস্তানের কাছে টি২০ হোয়াইটওয়াশ, এরপর ওয়েস্ট ইন্ডিজে গিয়ে টেস্টেও সেই দশা। স্ত্রীর গুরুতর অসুস্থতায় সিরিজ মিস করার গুঞ্জন ছিল। কিন্তু মানুষটা যে মাশরাফি! দেশে স্ত্রীকে অসুস্থ রেখেই উড়ে গেলে ক্যারিবিয়ান দ্বীপে। বাজেভাবে হারতে থাকা একটা দ যেনো মাশরাফি নামক জাদুর কাঠিতে ধুম করেই বদলে গেলো। বাংলাদেশ দাপটের সাথে জিতলো প্রথম ম্যাচ। ক্যাপ্টেন্সির সাথে বোলিংয়েও নেতৃত্ব দিলেন মাশরাফি নিজেই। ১০ ওভারে ৩৭ রান দিয়ে তুলে নিলেন ৪ উইকেট! জিততে লাগে ৭ বলে ৮ রান, নিশ্চিত জেতা উচিত পরের ম্যাচটা বাংলাদেশ ৩ রানে হারলো সেই পুরানো শেষ ওভারের ‘শনির দশায়’। আর গতকাল তৃতীয় ম্যাচে তো ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং- কোথায় ছিলেন না তিনি! সিরিজের তিন ম্যাচেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ শিবিরে প্রথম আঘাত হেনেছেন ম্যাশ, তিন ম্যাচেই ভয়ংকর হয়ে উঠার আগেই উইকেট থেকে ছেটে ফেলেছেন এভিন লুইসকে! ম্যাশ তো জাদুর কাঠির চাইতেও সরব, কার্যকর।

গতকাল দ্রুত রান তোলার দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে ব্যাটিং অর্ডারে নিজেকে তুলে আনলেন ছয়ে, সাব্বির-মোসাদ্দেক তখনো ব্যাট করা বাকি! কেন তাদের রেখে আগে এসেছেন ক্রিজে, করে দেখালেন সেটাও। বোলার কিংবা ক্যাপ্টেন মাশরাফি খেললেন নিখাদ ব্যাটসম্যানের মত, যেনো তিনিই দলের ফিনিশার ব্যাটসম্যান! রান করলেন ২৫ বলে ৩৬। যেখানে ফিনিশার ব্যাটসম্যান হিসেবে খেলা সাব্বিরের তিন ম্যাচের রান ৩, ১২, ১২- বুড়িয়ে যাওয়া মাশরাফি এক ম্যাচেই ছাড়িয়ে গেলেন তাকে। সাব্বির কি এ থেকে কিছু শিখলেন? কে জানে!

কাল বোলিংয়ে প্রথম স্পেলে কিছুটা খরুচে ছিলেন, ওভার প্রতি ৬ এর একটু বেশী ইকোনোমি তো মাশরাফির জন্য কিছু খরুচেই! দ্বিতীয় স্পেলে যখন বল হাতে এলেন, ওয়েস্ট ইন্ডিজের ইনিংসের তখন বাকী মাত্র ১১ ওভার। রান দরকার ১১৫। ৪০ তম ওভারে দিলেন ৬ রান, ৪২ তম ওভারে ৯। অপর প্রান্তে মোস্তাফিজ যখন মার খাচ্ছিলেন, ৪৪ তম ওভারে হোপের উইকেট সহ মাশরাফি দিলেন মাত্র ৫ রান। ৪৬ তম ওভারে দিলেন ৬। মাশরাফির এই চার ওভারে বাউন্ডারি আসেনি একটিও। যেখানে আগের স্পেলের ৬ ওভারে দিয়েছেন ৩৭, ডেথ ওভারে যখন ব্যাটসম্যান তেঁতে থাকেন, তখন চার ওভারে দিলে মাত্র ২৬! শেষের দিকে রুবেল আর মুস্তাফিজের দুই ওভারের হয়তো অনেকের কাছে ম্যাচজয়ী মনে হতে পারে, কিন্তু মাশরাফির এই চার ওভার? রানের টুঁটি চেপে ধরে ব্যাটসম্যানের উপর প্রেসার বাড়িয়ে দেয়া, ম্যাচজয়ী স্পেল তো আসলে এটিই!

আর ক্যাপ্টেন মাশরাফি? প্রথম স্পেলে দুর্দান্ত বল করলেন মুস্তাফিজ, ৫ ওভারে রান দিলেন মাত্র ১০। কিন্তু ডেথ ওভারের দ্বিতীয় স্পেলে এসে বেধড়ক মার খেলেন পাওয়েলের ব্যাটে, এবার মাত্র ৩ ওভারেই দিলেন ৩৮। মাঝে এক ওভার মোস্তাফিজের বিরতি, কে বল করবে সে আলোচনা মাঠে। সাকিব দূর থেকে দুই হাতকে পাখির ডানার মত উড়িয়ে এগিয়ে আসছেন সেই আলোচনার দিকে। ডানা উড়িয়ে কিছু একটা বোধহয় ইংগিত করলেন, মাশরাফি বল তুলে দিলেন সাকিবের হাতে। সাকিবের পর এলেন রুবেল। সাকিবের দশ ওভার হয়েছে আগের ওভারেই। প্রান্ত বদল করিয়ে আবারও মাশরাফি বল তুলে দিলেন সেই মার খাওয়া মোস্তাফিজের হাতেই। মাশরাফির বিশ্বাসের প্রতিদান দিলেন মোস্তাফিজ, হোল্ডারের উইকেটসহ তিন ডট দিয়ে রান দিলেন মাত্র ৬!

ম্যাচের সবচেয়ে ক্রুশাল ওভার, ৪৯তম ওভার! মাশরাফি বল তুলে দিলেন রুবেলের হাতে। অনেক দিন ধরেই যিনি কিনা ডেথ ওভারে নিজেকে হারিয়ে খুঁজছেন! আগের ম্যাচেই এমন সময়ে এসে রান দিয়েছেন ২২। নিদাহাস ট্রফিতেও গতকালের মতো শেষ ১২ বলে ভারতের রান দরকার ছিলো ৩৩, রুবেল সে ম্যাচেও বল করতে এসেছিলেন ইনিংসের শেষ ওভারের আগের ওভারেই। সেবার রান দিয়েছেন ২২, তবে এবার দিলেন ৬!

৪৮ তম ওভারে আরেকবার ফেরা যাক, ওভারের প্রথম বলে মোস্তাফিজ ফেরালেন হোল্ডারকে। নতুন ব্যাটসম্যান ক্রিজে নামবেন, কিছুটা সময় হাতে। ক্যামেরা তখন মাশরাফির দিকে তাক করা, টিভি স্ক্রিনে দেখালো মাশরাফি এগিয়ে যাচ্ছেন ক্রিজে থাকা পাওয়েলের দিকে। পাওয়েল তখন প্রায় ডাবল স্ট্রাইক রেটে ভয়ংকর রূপে, ওয়েস্ট ইন্ডিজের জয়ের শেষ ভরসা! কথা বললেন খানিকটা, কি জিজ্ঞেস করলেন শোনা গেলো না। তবে হাঁক ডাক দিয়ে মাশরাফিকে বলতে শোনা গেল, ‘মোস্তাফিজ, তোর এই ওভারে নাকি বিশ নিবে!’

আগের ৩ ওভারে ৩৮ রান দেয়া মোস্তাফিজ এই ওভার রান দিলেন মাত্র ৬, তিনটা ডট৷ মাশরাফির ঐ হাঁকেই কি বদলে গেলেন মোস্তাফিজ? হয়তো! এ ওভারে পাওয়েল একটি বাউন্ডারি সহ পাঁচ রান করেছেন ঠিকই, তবে বাউন্ডারিটি এসেছে ভাগ্যগুণে! আর মাশরাফিগুণে নয় বছর পর দেশের বাইরে কোন সিরিজ জিতলো বাংলাদেশ।

ইএসপিএন ক্রিকইনফো বলছে, “Tamim, Mahmudullah set up series win for Bangladesh” আমি দেখছি একজন মাশরাফিতে বদলে যাওয়া বাংলাদেশ। আর আমি ভাবছি, ৪৯তম ওভারেই যে বোলার নিয়মিত খেই হারিয়ে ফেলেন, তার উপরেই আস্থা রেখে বল তুলে দিতে ঠিক কতটা সাহস থাকা লাগে কলিজায়! কিংবা ‘মোস্তাফিজ, তোর এই ওভারে নাকি বিশ নিবে!’ বলে বোলারকে রাগিয়ে দিয়ে তার সেরাটা আদায় করে নেয়া ক্যাপ্টেন বিশ্ব আর ক’জন আছে? কিংবা কেউ কি আগে ছিলো? যদি কেউ থেকেও থাকেন, তিনিও নিশ্চয়ই মুগ্ধ হয়ে মাশরাফিকে দেখেন। আর অবাক হয়ে ভাবেন, কী জাদু জানে মাশরাফি!

Comments
Spread the love