মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কুইজ ‘একাত্তর’ নামে একটা অনুষ্ঠানের উদ্বোধনে এসে তিনি বললেন- “এখন যদি মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে প্রশ্ন করি, আপনারা মোবাইল বের করে উত্তর খুঁজবেন। এটা তো হওয়ার কথা ছিল না। এটা বড় দুঃখজনক।” মানুষটার নাম মাশরাফি বিন মুর্তজা, বাংলাদেশ ওয়ানডে দলের অধিনায়ক, মুক্তিযুদ্ধ ব্যাপারটাকে যিনি অন্তরে লালন করেন প্রকটভাবে।

ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তস্রোতের ওপর দিয়ে হেঁটে অর্জিত হয়েছে আমাদের স্বাধীনতা, এই স্বাধীনতার মূল্য আমাদের কাছে অসীম। মাশরাফি বরাবরই সেটা স্বীকার করেছেন অকুণ্ঠ চিত্তে। দুটো ম্যাচ জিতলেই যারা তাকে কিংবা তার দলকে মুক্তিযোদ্ধা বা বীরশ্রেষ্ঠদের কাতারে তুলে ফেলে, তাদের ধারণা যে ভুল, এমনটা মাশরাফি আগেও বলেছেন, এখনও বলেন। খেলাধুলার সঙ্গে কোনভাবেই মুক্তিযুদ্ধকে মেলানো চলে না, এতে মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বকে চরমভাবে খাটো করা হয়, এই সহজ সত্যিটা ভক্তদের বারবার চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়েছেন মাশরাফি।

মুক্তিযুদ্ধ বা মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে মাশরাফির ভালোবাসাটা নতুন কিছু নয়। ২০১৫ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে কোয়ার্টারফাইনাল নিশ্চিত করার পরে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে তিনি এসেছিলেন মাথায় লাল সবুজের পতাকাটা জড়িয়ে, স্মরণীয় সেই জয়টা উৎসর্গ করেছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের। সেই মাশরাফি ‘কুইজের মাধ্যমে’ মুক্তিযুদ্ধকে জানার ব্যপারটা পছন্দ করেন না মোটেও। একটা প্রজন্ম সেদেশের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্ব্যল কীর্তিটাকে বই না পড়ে, সিনেমা না দেখে শুধু কুইজের উত্তর দেয়ার মাধ্যমে জানবে, সেটা তিনি মানতে পারেন না। নিজের সেই স্বচ্ছ্ব ভাবনাটা পরিস্কার করে তিনি জানিয়েও দিয়েছেন সেই অনুষ্ঠানে।

বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক জানিয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বই-পত্রিকা পড়ে আর চলচ্চিত্র দেখেই বাঙালির এই গৌরবের অধ্যায়টাকে জানার চেষ্টা করেন তিনি। এখনও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কোন সিনেমা দেখতে বসলে সেটা শেষ হবার আগে উঠতে পারেন না, মুক্তিযুদ্ধ ব্যপারটা এভাবেই টেনে ধরে রাখে তাকে। জাতীয় জাদুঘরে আয়োজিত সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবাইকে তিনি বলছিলেন- “পড়ালেখা, ব্যবসা বা আমার খেলাধুলা, যাই বলি না কেন, প্রতিদিন ১ ঘণ্টা সময় বের করতে পারব না, এটা কিন্তু আমরা কেউ বলতে পারব না। ১৫-২০ দিন টানা একটু একটু করে জানুন মুক্তিযুদ্ধকে। ইন্টারনেট থেকে তথ্য নিন। দেখবেন একদিন সবার মনে একটা আবেগের জায়গা তৈরি হয়েছে।”

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন শহীদ বুদ্ধিজীবি ডা. আলীম চৌধুরীর মেয়ে ড. নূজহাত চৌধুরীও। উপস্থিত সবাইকে তিনি শুনিয়েছিলেন শহীদ ক্রিকেটার জুয়েলের গল্প, দেশমাতৃকার টানে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়া যে ছেলেটা স্বপ্ন দেখতো দেশ স্বাধীন হলে বাংলাদেশ দলের হয়ে ইনিংস উদ্বোধন করার। জুয়েল নামের সেই বঙ্গশার্দূল দেশের স্বাধীনতা দেখে যেতে পারেননি, তাদের রক্তের দামে অর্জিত বাংলাদেশে ক্রিকেটটাকে গৌরবান্বিত করেছেন মাশরাফিরাই।

মাশরাফি যখন বক্তৃতা দিতে মঞ্চে এলেন, তখন সবাই ব্যস্ত মোবাইল নিয়ে। মাশরাফিকে নিজেদের মুঠোফোনে ধারণ করার চেষ্টায় রত সবাই। এটা দেখেও হতাশ হয়েছেন মাশরাফি, সেটা গোপনও করেননি তিনি। বলেছেন- “গোটা বাংলাদেশ এখন মোবাইলে ঢুকে গেছে।  আজ আমরা যে আয়োজনে এসেছি, সে আয়োজনে যারা বক্তব্য রাখলেন তাদের বক্তব্য আপনাদের মনে কোনো আবেগ সৃষ্টি করতে পেরেছে বলে মনে হয় না। সবাই এখন মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত।”

এখনকার প্রজন্মের অতিরিক্ত মোবাইল কেন্দ্রিক হয়ে ওঠাটা তার পছন্দ নয় একটুও। আগেও এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, এখন বাইরে কোথাও দেখা হলে লোকজন কুশল বিনিময় না করে একটা সেলফি তোলার জন্যে পাগল হয়ে ওঠে। অথচ বেশীরভাগই ‘কেমন আছেন’- এটা পর্যন্ত জিজ্ঞেস করে না! এটাই ব্যক্তি মাশরাফিকে পীড়া দেয় বেশী।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যারা জানেনা, তাদের কটাক্ষ না করারও অনুরোধ জানিয়েছেন মাশরাফি। নতুন প্রজন্মকে জানানোর ভারটা অগ্রজদের কাঁধে, এখনকার ছেলেমেয়েরা যদি মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে না জানে, সেটাকে অন্তরে লালন করতে না শেখে, সেটার দায়ভার আমাদের নিজেদের ওপরেই বর্তায় বলে তার মত। ওদেরকে জানানোটা আমাদের দায়িত্ব, সেই দায়িত্ব আমরা ঠিকঠাকমতো পালন করতে পারছি কিনা, সেই প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন মাশরাফি। ওদের কঠাক্ষ বা ট্রল না করে সত্যিটা জানালেই বরং উপকার- এই সহজ কথাটা কত সুন্দর করে বলে দিলেন এই মানুষটা।

তথ্য এবং ছবি কৃতজ্ঞতা- বিডিনিউজ২৪ ডটকম

Comments
Spread the love