অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্যএরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

মানবসভ্যতাকে চাঁদের বুকে নিয়ে গেছেন যে নারী!

মানবজাতির ইতিহাসে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে ধরা হয়ে থাকে চন্দ্রবিজয়কে। আর প্রথম মনুষ্যসন্তান হিসেবে চাঁদের বুকে পা রাখায় নীল আর্মস্ট্রং চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন এই পৃথিবীর বাসিন্দাদের কাছে। মানুষ ভুলতে পারবে না বাজ অল্ড্রিনকেও। কিন্তু এই দুই ব্যক্তি চাঁদের বুকে পা রাখা প্রথম দুইজন হলেও, চন্দ্রজয়ের জন্য দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে গেছেন নাসার শত শত নিবেদিতপ্রাণ কর্মী।

তবে তাদের সেই সকল পরিশ্রম আর অধ্যাবসায়ও শেষ পর্যন্ত নিষ্ফল প্রমাণিত হতো, যদি না অ্যাপোলো ১১-র ঈগল নামের লুনার মড্যুলকে ঠিক ঠিক কোডিং এর মাধ্যমে চাঁদে অবতরণ করানো যেত। আর সেই কোডিং এর কাজটি করেছেন একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। সুতরাং প্রকৃতপক্ষেই মানবসভ্যতাকে চাঁদে নিয়ে গেছেন কে, এমন প্রশ্নের উত্তরে নীল আর্মস্ট্রং নন, বরং ওই বিশেষ সফটওয়্যারের নাম নেয়াই অধিক যুক্তিসঙ্গত।

এবং আরও বিস্ময়ের ব্যাপার কী, জানেন? সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার শুনলেই আমাদের চোখের সামনে মোটা ও ভারি ফ্রেমের চশমা পরা, আলাভোলা কোনো পুরুষ চরিত্রের মুখাবয়ব ভেসে উঠলেও, মানবসভ্যতাকে চাঁদে নিয়ে যাওয়া সফটওয়্যারটি কিন্তু কোনো পুরুষ ছিলেন না। তিনি ছিলেন ৩৩ বছর বয়সী এক ঘোর সংসারী নারী। রাত জেগে কোডিং এর কাজও তিনি করে গেছেন বাচ্চা সাথে নিয়ে, একজন অপরাজিতা ওয়ার্কিং ওম্যান হিসেবে।

যার কথা বলছি, তার নাম মার্গারেট হ্যামিল্টন। জন্ম ইন্ডিয়ানার এক প্রত্যন্ত গ্রামে, ১৯৩৬ সালে। তার বাবা ছিলেন একজন কবি ও দার্শনিক, আর তার দাদা ছিলেন একাধারে লেখক, স্কুলের হেডমাস্টার ও কুয়েইকার মিনিস্টার। মূলত তাদের উৎসাহ আর অনুপ্রেরণাতেই একেবারে ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞান ও গণিতের প্রেমে পড়ে যান তিনি। 

মার্গারেট হ্যামিল্টন, চন্দ্র অভিযান, অ্যাপোলো-১১, নাসা, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার

মিশিগান ইউনিভার্সিটি আর আর্লহাম কলেজে পড়ালেখা করেন তিনি। দুই জায়গাতেই গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের ক্লাসগুলোতে অধিকাংশ সময়ই তিনি থাকতেন একমাত্র ছাত্রী। তবে সেই পুরুষ অধ্যুষিত বিষয়গুলোতেও আশ্চর্যজনকভাবে তিনি পেয়ে গিয়েছিলেন একজন নারী শিক্ষক। আর্লহাম কলেজে গণিতের অধ্যাপক হিসেবে ছিলেন প্রফেসর ফ্লোরেন্স লং। তিনি যে একজন শিক্ষক হিসেবেই অসাধারণ ছিলেন তা নয়, পাশাপাশি মানুষ হিসেবেও ছিলেন চমৎকার। তাই কলেজের সকল শিক্ষার্থীর প্রিয় ছিলেন তিনি। তবে মার্গারেটের একটু বুঝি বেশিই প্রিয় ছিলেন। তাকে তিনি শুধু পছন্দই করতেন না, নিজের আদর্শও মানতেন। প্রফেসর লংয়ের প্রতি ভালোলাগা থেকেই তিনি চেয়েছিলেন বিমূর্ত গণিত ও গাণিতিক ভাষাবিদ্যায় মেজর করে পরবর্তীকালে একজন গণিতের অধ্যাপক হওয়ার।

কিন্তু মার্গারেটের গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করায় বিলম্ব ঘটে তার স্বামীর জন্য, যিনি নিজেও সেই সময় পড়ালেখা করছিলেন হার্ভার্ডে। কিন্তু সেই বিলম্ব করতে গিয়েই জীবনের মোড় ঘুরে যায় মার্গারেটের। তিনি নতুন করে প্রেমে পড়ে যান প্রোগ্রামিংয়ের। অবশ্য সে-সময়ে প্রোগ্রামিং বিষয়ে একাডেমিকভাবে কোনো শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল না। নিজের আগ্রহ থেকেই এ বিষয়ে মোটামুটি পারদর্শী হয়ে ওঠেন তিনি, এবং এমআইটিতে কাজ নিয়ে নেন প্রফেসর এডওয়ার্ড নর্টন লরেঞ্জের তত্ত্বাবধানে, একটি আবহাওয়া পূর্বাভাস বিষয়ক কম্পিউটার প্রোগ্রামে। 

প্রফেসর নর্টনের অফিসে একটি ডেস্ক সাইজের এলজিপি-৩০ মডেলের কম্পিউটারে বসে নিজেকে আরও শাণিত করতে থাকেন তিনি। তবে শীঘ্রই মার্গারেট চলে আসেন সেইজ প্রোগ্রাম নামের নতুন একটি প্রোগ্রামে সফটওয়্যার লেখার কাজে, যেটি দিয়ে রাশিয়ান বোম্বারদের রাডার ডাটা মনিটর করা হতো। এখানে কাজের অভিজ্ঞতাই পরবর্তীতে তাকে অনেক সাহায্য করে অ্যাপোলো নেভিগেশন সফটওয়্যার টিমের সাথে কাজের সুযোগ পেতে।

১৯৬৩-৬৪ সালের দিকে কোনো এক সময়ে, যখন মার্গারেট ভাবছিলেন নতুন করে ব্র্যান্ডেইসে বিমূর্ত গণিত নিয়ে পড়ালেখা শুরু করবেন, তখনই তার সামনে এসে হাজির হয় জীবনের সবচেয়ে বড় সুযোগটি। তিনি শুনতে পান, তার বর্তমান কর্মস্থল এমআইটির সাথে নাসার একটি চুক্তি হয়েছে সফটওয়্যার নির্মাণের, যেটি দিয়ে ‘চাঁদে মানুষ পাঠানো হবে’, এবং এ কাজের জন্য এমআইটি সঠিক মানুষের সন্ধানে আছে। সুযোগটি লুফে নেন তিনি, এবং হয়ে যান অ্যাপোলো-১১ প্রজেক্টের গর্বিত অংশীদার। 

মার্গারেট হ্যামিল্টন, চন্দ্র অভিযান, অ্যাপোলো-১১, নাসা, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার

এই প্রজেক্টটির বিশালত্ব ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। তবে এটুকু বলা যায়, ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত এই প্রজেক্টে সফটওয়্যার তৈরীর কাজে যুক্ত ছিলেন ৩৫০-রও বেশি ইঞ্জিনিয়ার, এবং অ্যাপোলো-১১ চাঁদের বুকে পা রাখার আগ পর্যন্ত সেটিতে লগ করা হয়েছিল ১৪০০ ‘মানববর্ষ’-এর সমতুল্য সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং। এবং এই গোটা প্রজেক্টটির নেতৃত্ব দিয়েছেন মার্গারেট নিজে।

এই সুবিশাল কর্মযজ্ঞের সাথে এতটাই জড়িয়ে পড়েছিলেন তিনি যে তার জন্য ব্যক্তিজীবনে পরিবারকে সময় দেয়া রীতিমত অসম্ভব হয়ে পড়ছিল। কিন্তু তাই বলে কাজের জন্য নিজের পরিবারকে কখনোই অগ্রাহ্য করেননি তিনি। ছুটির দিনগুলোতে মেয়েকে পুরো সময় দিতেন তিনি। আর যেসব দিন নাইট-শিফট থাকত, মেয়েকে নিয়ে আসতেন সাথে। এভাবেই কাজ ও পরিবার দুই দিকই সমানভাবে সামলেছেন তিনি।

তার প্রজেক্টে কাজ করা বেশিরভাগ ইঞ্জিনিয়ারই ছিল খুবই তরুণ, ত্রিশ ছোঁয়নি যাদের বয়স। সবাই মিলে খুবই ইনফরম্যালি প্রচন্ড সিরিয়াস একটি কাজ করেছেন তারা, আর যোগ্য নেতার মত কাজের পরিবেশকে সবসময় সহনীয় রেখে, সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে গেছেন মার্গারেট।

ইন্টারনেটে মার্গারেটের একটি ছবি খুবই প্রচলিত রয়েছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, নিজের উচ্চতার চেয়েও বড় বইয়ের স্তূপের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। অনেকে অনেকভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছে ছবিটিকে। কিন্তু আসল বিষয়টি হলো, অ্যাপোলো-১১ প্রজেক্টের জন্য তৈরী করা সফটওয়্যারের যাবতীয় কোড সন্নিবেশিত ছিল ওই প্রিন্ট আউটগুলোতে। 

মার্গারেট হ্যামিল্টন, চন্দ্র অভিযান, অ্যাপোলো-১১, নাসা, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার

এবার আরেকটি চমকপ্রদ তথ্য দিই। এখন যে আমরা সবাই ‘সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার’ নামের গালভরা পেশাটির নাম জানি, সেটিও কিন্তু এসেছে এই মার্গারেটের মাথা থেকেই। তার লেখা কোডের কল্যাণে মানুষ চাঁদে যাওয়ার আগ পর্যন্ত কোডিং, প্রোগ্রামিং বিষয়গুলোকে অনেকেই ঠিক সম্মানের দৃষ্টিতে দেখত না। এটিও যে এক ধরণের ইঞ্জিনিয়ারিং এবং এটি ছাড়া আধুনিক যুগের নিত্যনতুন সম্ভাবনাময় আবিষ্কারের ভবিষ্যৎ অন্ধকার, এ সত্যটি প্রতিষ্ঠিত করার জন্যই নিজের কাজকে ‘সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং’ বলে দাবি শুরু করেন তিনি।

প্রথম প্রথম তার এমন দাবিতে কৌতুকবোধ করেছে অন্যান্য ইঞ্জিনিয়াররা, বিস্তর হাসাহাসি করেছে। তবু নিজের পেশার সম্মান আদায়ের জন্য একাই লড়াই চালিয়ে গেছেন তিনি। এবং সে লড়াইয়ের ফল আজ আমাদের চোখের সামনে। অনেকের মতেই বর্তমান বিশ্বে প্রচলিত ইঞ্জিনিয়ারিং ডিসিপ্লিনগুলোর মধ্যে শীর্ষস্থানীয় হলো সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং। এটিই হলো সেই ডিসিপ্লিন যেখানে উন্নতির কোনো শেষ নেই। মানবসভ্যতাকে চাঁদে নিয়ে যাওয়ার মত করে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করছে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং-ই।

মার্গারেটের বয়স এখন ৮২। ১৯৭০ সালেই তিনি নাসা ছেড়ে গিয়ে একাধিক নতুন সফটওয়্যার কোম্পানী প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন। তার নিজের হ্যামিল্টন টেকনোলজিস তার প্রথম কর্মস্থল এমআইটি থেকে মাত্র কয়েক ব্লক দূরে। এখন পর্যন্ত নিজের যুক্ত থাকা ৬০টি প্রজেক্ট ও ছয়টি মেজর প্রোগ্রাম নিয়ে লেখা তার ১৩০টি পেপার, প্রসিডিংস ও রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পথিকৃৎ হিসেবে বিবেচিত এই নারী তার কাজের স্বীকৃতি হিসেবে Augusta Ada Lovelace Award, NASA Exceptional Space Act Award প্রভৃতি পুরুস্কার অর্জন করেন। এছাড়াও ২০১৬ সালের ২২ নভেম্বর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামার হাত থেকে পান Presidential Medal of Freedom।

আমাদের দেশে একটি খুবই হাস্যকর ধারণা বা বিশ্বাস প্রচলিত আছে যে, মেয়েরা অংকে কাঁচা, তাদের দ্বারা ইঞ্জিনিয়ারিং টাইপের কোনো পেশায় নিয়োজিত হওয়া অসম্ভব। তাই তো আজও ছেলে হলে বাবা-মা-আত্মীয়স্বজনের প্রথম আশা থাকে, ছেলে হবে ইঞ্জিনিয়ার, আর মেয়ে হলে বড়জোর ডাক্তার। ডাক্তারি পেশায় রাত-বিরেতে বেরিয়ে যেতে হতে পারে বা নাইট শিফটে কাজ করতে হতে পারে বলে পেশাটিতে পুরুষালি সম্মান থাকলেও, ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের জন্য যেহেতু গণিতে প্রখর মেধা থাকা দরকার, তাই এই পেশা নাকি কোনোক্রমেই মেয়েদের জন্য নয়!

যারা এ ধরণের ভ্রান্ত বিশ্বাসে বিশ্বাসী, মানুষের চন্দ্রবিজয়ের মাধ্যমে প্রায় অর্ধশতাব্দী আগেই তাদেরকে ভুল প্রমাণিত করে ছেড়েছেন মার্গারেট হ্যামিল্টন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমাদের মধ্যে অনেকে আজও মার্গারেট হ্যামিল্টনকে চিনিই না। এতে মার্গারেট হ্যামিল্টনের নিজের কোনো ব্যর্থতা নেই, রয়েছে আমাদের লজ্জা।

আরও পড়ুন-

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close