স্বর্গ থেকে পতন – এই কথাটি ফুটবল জগতে সবচেয়ে বেশি যে ব্যক্তিটির সাথে খাটে, তিনি বোধহয় ডিয়েগো ম্যারাডোনা। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে প্রায় একাই নিজের দেশকে বিশ্বসেরা করে যেমন পৌঁছে গিয়েছিলেন সাফল্যের সপ্তম স্বর্গে, তেমনই মাদক কেলেংকারিতে ফেঁসে সেই তাকে খেলোয়াড়ি জীবনের ইতি টানতে হয়েছে একদমই নীরবে নিভৃতে, অনাড়ম্বরভাবে। তারচেয়েও বড় কথা, একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর সামনে খলনায়ক প্রতীয়মান হয়ে।

ঠিকই ধরেছেন পাঠক, কথা বলতে চলেছি ১৯৯৪ বিশ্বকাপ চলাকালীন এই আর্জেন্টাইন কিংবদন্তীর ডোপ টেস্টে ইতিবাচক প্রমাণ হওয়া নিয়ে, যা তাঁর বিশ্বকাপ যাত্রাই শুধু নয়, একই সাথে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারেরও অকাল সমাপ্তি ঘটিয়ে দিয়েছিল।

তবে ১৯৯৪ বিশ্বকাপ চলাকালীন সেই মাদক কেলেংকারীর ব্যাপারে আলোকপাত করার আগে আমাদের ফিরে যেতে হবে আরও বছর তিনেক আগে, ১৯৯১ সালে। কারণ সে বছরই প্রথম জনসম্মুখে আসে ম্যারাডোনার মাদকের সাথে সম্পৃক্ততার প্রমাণ। সে বছরের ১৭ মার্চ দেয়া এক পরীক্ষায় তার শরীরে কোকেনের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়, যার ফলে ২৯ মার্চ ১৫ মাসের জন্য তিনি সবধরণের ফুটবল হতে নিষিদ্ধ হন। ১৯৯২ সালের ১ জুলাই সেই নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষ হয়।

কিন্তু এই কেলেংকারীকেও ছাপিয়ে যায় ১৯৯৪ বিশ্বকাপের ঘটনাটি। সে বিশ্বকাপে মাত্র দুইটি ম্যাচ খেলতে পেরেছিলেন তিনি, এবং দুইটিই বোস্টনের ফক্সবোরো স্টেডিয়ামে। এর মধ্যে গ্রীসের বিপক্ষে ম্যাচে একটি গোলও পান তিনি। কিন্তু এরপরই নেমে আসে তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়টি। তিনি ইফেড্রিন ডোপিং এর একটি ড্রাগ টেস্টে পজিটিভ প্রমাণিত হন। এবং সেজন্য বিশ্বকাপ চলাকালীনই তাঁকে আর্জেন্টিনায় ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হয়।

অবশ্য সে সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছিলেন ম্যারাডোনা। তিনি দাবি করেছিলেন, ড্রাগ টেস্টে পজিটিভ প্রমাণিত হওয়ার কারণ হলো রিপ ফুয়েল নামের একটি শক্তিবর্ধক পানীয় পান, যাকে তাঁকে তাঁর ব্যক্তিগত ট্রেইনার দিয়েছিলেন। তাঁর ভাষ্যমতে, ওই পানীয়ের আর্জেন্টাইন সংস্করণে কোন ক্ষতিকর উপাদান না থাকলেও, আমেরিকান সংস্করণটিতে কিছু নিষিদ্ধ কেমিক্যাল ছিল। আর্জেন্টিনা থেকে নিয়ে আসা তাঁর রিপ ফুয়েলের স্টক শেষ হয়ে যায়, তাঁর ট্রেইনার কিছু না ভেবেচিন্তেই তাঁকে ক্ষতিকর আমেরিকান পানীয়টি দিয়েছিল।

কিন্তু তাঁর এই আত্মপক্ষ সমর্থন তখন ধোপে টেকেনি। ফিফা তাঁকে ১৯৯৪ বিশ্বকাপ থেকে বহিষ্কার করে। তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁর দল আর্জেন্টিনাও বেশিদূর যেতে পারেনি। আগের দুই বিশ্বকাপে একবারের চ্যাম্পিয়ন ও অন্যবারের রানার্স-আপ আকাশী নীল জার্সিধারীরা দ্বিতীয় রাউন্ডেই বাদ পড়ে যায়, লস অ্যাঞ্জেলেসে রোমানিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে হেরে গিয়ে।

১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পর আর কোনদিন জাতীয় দলের জার্সি পরে খেলার সুযোগ হয়নি ম্যারাডোনার। ওখানেই ইতি ঘটে তাঁর জাতীয় দলের হয়ে ১৭ বছরের বর্ণিল ক্যারিয়ার, যে সময়ের মধ্যে তিনি মোট ৯১ ম্যাচে দেশের প্রতিনিধিত্ব করে জালে বল জড়িয়েছিলেন ৩৪ বার, এবং খেলেছিলেন চার-চারটি বিশ্বকাপও। এরপর অবশ্য আরও বছর তিনেক ক্লাব ফুটবলে খেলেন তিনি। ১৯৯৭ সালে নিজের ৩৭তম জন্মদিনে সবধরণের প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলকে বিদায় বলে দেন তিনি।

নিষিদ্ধ হওয়ার পর প্রাথমিকভাবে সবকিছু অস্বীকার করলেও, পরবর্তীতে অবশ্য গণমাধ্যমে বেশ কয়েকবারই নিজের মাদকাসক্ত জীবন নিয়ে মুখ খুলেছেন তিনি। নিজের মুখেই আর্জেন্টাইন ফুটবল ঈশ্বর বলেছেন, ‘যখন আমি মাদক নিতে শুরু করি তখন আমার বয়স ছিল ২৪ বছর। আমি ছিলাম বার্সেলোনায়। আমার জীবনের সবচেয়ে বাজে সিদ্ধান্ত ছিল এটা।’ অর্থাৎ প্রথম মাদকের সাথে সম্পৃক্ততার কথা ১৯৯১ সালে প্রকাশ পেলে কী হবে, ম্যারাডোনা আসলে মাদকাসক্ত আরও অনেক আগে থেকেই। এমনকি যেই ১৯৮৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে চ্যাম্পিয়ন করার বদৌলতে তিনি গোটা বিশ্ববাসীর নিকট ফুটবলের সমার্থক হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন, সেই সময়েও তিনি ছিলেন একজন মাদকাসক্ত।

তবে ২০০৪ সালে দীর্ঘ চিকিৎসার পর সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন তিনি। কিন্তু এখনও তিনি আক্ষেপে পোড়েন মাদকের সাথে জড়িয়ে পড়ার কারণে। কারণ মাদকাসক্ত না হলে তাঁর ক্যারিয়ার হয়ত হতে পারত আরও বর্ণিল, আরও উজ্জ্বল। সেই সাথে ব্যক্তিজীবনেও যত ঝড়ঝঞ্ঝা পোহাতে হয়েছে তাঁকে, সেগুলো থেকে বাঁচতে পারতেন তিনি।

এজন্যই ২০১৩ সালে আর্জেন্টিনার টিভি চ্যানেল টিওয়াইসি স্পোর্টসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তাঁকে সখেদে বলতে শোনা যায়, ‘আমার বয়স ৫৩ বছর (সেই সময়ে) হলেও নিজেকে ৭৮ বছরের বৃদ্ধ মনে হয়। কারণ আমার জীবনটা স্বাভাবিক নয়। অসুস্থতার জন্য প্রতিপক্ষকে অনেক সুযোগ করে দিয়েছি। মাদক না নিলে আমি হয়ত অন্য কোন মানুষ হতে পারতাম।’

এই আক্ষেপ শুধু ম্যারাডোনার নিজের নয়, তাঁর সকল ভক্ত-সমর্থকেরও। কেননা মাদকাসক্ত না হলে তিনি হয়ত ১৯৯০ সালেও আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জেতাতে পারতেন। অথচ সে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে তিনি ছিলেন একদমই ম্লান। আর ফাইনালেও খুব একটা বলার মত কিছু করতে পারেননি। এসবের জন্য পরবর্তী সময়ে অনেকেই মাদককে দায়ী করেছে। আবার ১৯৯১ সালে যখন তিনি ১৫ মাসের জন্য নিষিদ্ধ হলেন, তখন তাঁর বয়স কেবল ৩১। একজন ফুটবলার যেই সময়টায় তাঁর ক্যারিয়ারের সেরা সময় কাটায়, শারীরিক সক্ষমতা, প্রতিভা আর পরিণতবোধ একাট্টা হয়ে তাঁর ভেতরের সর্বোচ্চটা বের করে নিয়ে আসে, সেই সময়টাই তাঁকে কাটাতে হয়েছে মাঠের বাইরে। আর ১৯৯৪ সালে দ্বিতীয় রাউন্ড থেকে তাঁর দলের বিদায়ের দায়ও তো সরাসরি তাঁরই।

অথচ মাদকের বেড়াজালে জড়িয়ে না পড়লে ম্যারাডোনার গোটা জীবনকাহিনীটাই হয়ত ভিন্নভাবে লেখা হতে পারত। সেখানে থাকত শুধুই তাঁর বীরোচিত অর্জন আর সাফল্যগাথা। থাকত না কোন বিতর্ক, এবং এমন কোন কুকীর্তি, যার জন্য আজও অনেকের চোখে তিনি নিছকই একজন খলনায়ক।

*

এখন ঘরে বসেই অনলাইনে কিনুন ক্যাসপারস্কি ল্যাবের সব পণ্য, খুব সহজে। অনলাইনে পেমেন্ট, অনলাইনেই ডেলিভারি!

Comments
Spread the love