খেলা ও ধুলারাশিয়া বিশ্বকাপ ২০১৮

নব্বই দশকের নিপ্পন টিভি এবং একজন জাদুকর ম্যারাডোনা!

নব্বই দশকে আমাদের সাদাকালো একটা নিপ্পন টেলিভিশন ছিল। বিশ্বকাপ খেলা দেখবেন বলে আমার ফুটবল ভক্ত আব্বা এই টিভিটা কিনেছিলেন। সে সময়ের অনেক ঘটনা মনে না থাকলেও একটা ঘটনা বেশ স্পষ্ট মনে আছে।

সেবার বিশ্বকাপের অায়োজক ছিলো আমেরিকা। রাত দিনের পার্থক্য থাকায় প্রায় প্রতিটা খেলাই হয় মধ্য বা ভোর রাতে। আমার খেলা পাগল বাবা রাত জেগে জেগে সেই খেলা দেখেন। সাত বছরের আমি আর নানা কাজে ক্লান্ত মা থাকি গভীর ঘুমে।

একরাতে বাবার বিরাট চিৎকারে ঘুম ভাঙল। আমরা মা-ছেলে চোখ কচলাতে কচলাতে তাকিয়ে দেখি, মশারির মধ্যে বসে টিভির দিকে আঙুল তুলে আব্বা চেচাচ্ছেন, ‘ম্যারাডোনা গোল দিয়েছে, ম্যারাডোনা, ঐ যে খাটো লোকটা। দেখ, দেখে রাখো!’

আমরা চরম বিরক্তি নিয়ে কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকলাম টিভির দিকে। কিছুই বুঝলাম না। তারপর আবার ঘুমিয়ে পড়লাম। আব্বার সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। তিনি তখন ফক্সবোরো স্টেডিয়ামের ৬০ হাজার দর্শকের উল্লাসের সঙ্গী হয়ে ফুটবল জাদুকর ম্যারাডোনায় বিভোর! ঘটনা চক্রে সাক্ষী হওয়া গ্রিসের বিপক্ষের ঐ গোলটাই ছিলো নিষিদ্ধের আগে বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার শেষ গোল।

আর্জেন্টিনা, বিশ্বকাপ ফুটবল, ম্যারাডোনা

আব্বা হয়তো জানেনই না ছোট্ট অথচ তাৎপর্যময় এই ঘটনাটা আমার হৃদয়ে কতটা গভীর প্রভাব ফেলেছে। আব্বার ভালোবাসার আর্জেন্টিনা আর ম্যারাডোনা বিপুল দাপটে আমারও পরানের গহীণে ঢুকে পড়েছে।

ম্যারাডোনাকে নিষিদ্ধের ব্যপারটি আব্বা মেনে নিতে পারেননি। এতটাই কষ্ট পেয়েছন যে, খেলা দেখাই ছেড়ে দিয়েছেন। এরপর যতগুলো বিশ্বকাপ হয়েছে আব্বা কেবল জিজ্ঞেস করতেন, ‘আর্জেন্টিনার দলটা এবার কেমন রে?’

বলতাম, ‘দুর্দান্ত। চ্যম্পিয়ন হবার মতো।’ আব্বা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলতেন, ‘কিন্তু ম্যারাডোনা তো নেই!’

ম্যারাডোনা নেই বলে ফুটবল খেলাই আর দেখেননি কোনদিন, ম্যারাডোনা নেই বলে ফুটবল নিয়ে আব্বার মাতামাতিও দেখেনি পরিবারের কেউ। তবে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত আবেগে আমরা দুই ভাই আর্জেন্টিনার পতাকা উড়িয়েছি। বিপুল আবেগে শৈল্পিক ফুটবলের ভক্ত হয়েছি, এতটাই যে, পাড়ার লোকে বলতো, আর্জেন্টিনার ব্রান্ড অ্যাম্বাসেডর।

বহু বছর পর গত বিশ্বকাপের অাগে আব্বা ফোনে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আর্জেন্টিনা দলটা এবার ক্যামন? শুনলাম মেসি না কি খুব ভালো খেলে?’

আর্জেন্টিনা, বিশ্বকাপ ফুটবল, ম্যারাডোনা

আবেগে আমার গলাটা কেমন ধরে এলো। আব্বা ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনাকে ভুলতে পারেননি। যতোই বয়স হোক, যতোই জাগতিক কাজের চাপ ভর করুন, বুকের গহীনে গভীর আবেগে ধারণ করেন আকাশী-সাদাকে। আগলে রাখেন ম্যারাডোনাকে। আব্বার কাছে আর্জেন্টিনা শব্দটাই অমূল্য এক আবেগের নাম।

কেবল আমার আব্বাই নন, একটা গোটা প্রজন্মকে মুগ্ধ করে রাখা দলের নাম আর্জেন্টিনা, ফুটবলের আনন্দ-হতাশায় কেঁদে বুক ভাসানো আবেগের নাম আর্জেন্টিনা, ম্যারাডোনা ম্যাজিকে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের কাছে ফুটবলকে উন্মাদনায় পরিণত করার নামও আর্জেন্টিনা…।

তৃতীয় বিশ্বের এক পিতাকে যে দেশ তাদের শৈল্পিক ফুটবলে আভিমানি আর আপ্লুত করে তোলে আমি সেই দেশটার অপূর্ব ক্ষমতাকে ভালোবাসি। এই ভালোবাসা এতই প্রগাঢ় যে, শত পরাজয়ও তা কেড়ে নিতে পারবে না।

আবারো বলতে চাই, এইসব ভালবাসা মিছে নয়। শুভ জন্মদিন ম্যারাডোনা।

আরও পড়ুন-

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close