একটা সময় ছিল যখন ম্যানচেস্টারের ক্লাব বলতে মানুষ কেবল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকেই বুঝতো। গত পাঁচ-ছয় বছর ধরে ম্যানচেস্টার সিটি নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করে ম্যানচেস্টারের রাজত্বে ভাগ বসিয়েছে। গত ছয় বছরে ইউনাইটেডের লিগ শিরোপা যেখানে একটি, সিটির দু’টি। এবারও এখন পর্যন্ত ১৫ ম্যাচ খেলে জিতেছে ১৪ টিতে, ড্র ১ টি। হারেনি একটিও! দ্বিতীয় স্থানে থাকা ইউনাইটেডের থেকে এখনই ৮ পয়েন্টে এগিয়ে সিটি। ব্যতিক্রম কিছু না ঘটলে এবারও সিটিই যে লিগ জিতবে সেটি যে কারো বোঝার কথা।

কিন্তু রাতারাতিই কিভাবে বদলে গেলো ম্যানচেস্টার সিটি? রেলিগেশনের লড়াইয়ে নিয়মিত দেখা যাওয়া দলটি কিভাবে হয়ে উঠল ইংল্যান্ডের অন্যতম ত্রাস? চলুন একটু পেছনে ফিরে যাই।

২০০৮ সালে সিটি ফুটবল গ্রুপের মালিকানাধীন হওয়ার পর থেকেই ইংলিশ ফুটবলে উত্থান শুরু ম্যানচেস্টার সিটির। প্রথম তিন মৌসুম মোটামুটি দল গোছাতেই ব্যয় হয়ে যায় সিটির। এই তিন বছরে দলে আসেন ডেভিড সিলভা, ইয়াইয়া তোরে, ভিনসেন্ট কোম্পানি, সার্জিও আগুয়েরো, সামির নাসরি, কার্লোস তেভেজ, মারিও বালোতেল্লির মতো বড় বড় নাম। কোচ হয়ে আসেন ইন্টার মিলান কে টানা ৩ বার সিরি আ জেতানো মাস্টারমাইন্ড রবার্তো মানচিনি। এর সুফলও পেতে শুরু করে সিটি।

২০১১-২০১২ মৌসুম, ইংলিশ ফুটবলে নিজেদের শক্তিমত্তার জানান দিতে শুরু করে সিটি। ইউনাইটেড, চেলসি, আর্সেনাল, লিভারপুল, টটেনহ্যাম, এভারটনের মতো শিরোপা প্রত্যাশী দলগুলোকে হতাশ করে পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে উঠে আসে সিটি। ৩৭ তম রাউন্ড শেষে পয়েন্ট টেবিল দাঁড়ায়- ম্যানচেস্টার সিটি ৩৭ ম্যাচে ২৭ জয়, ৫ ড্র, ৫ হারে ৮৬ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ৩৭ ম্যাচে ২৭ জয়, ৫ ড্র, ৫ হারে ৮৬ পয়েন্ট নিয়ে ২য় স্থানে। পয়েন্ট সমান হলেও গোলপার্থক্যে সিটি ইউনাইটেডের থেকে এগিয়ে ছিল।

১৩ মে, ২০১২। শুরু হল ৩৮ তম রাউন্ডের খেলা। ম্যানচেস্টার সিটি নিজেদের মাঠ ইতিহাদে খেলবে কিউপিআরের বিপক্ষে, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড যাবে সান্ডারল্যান্ডের স্টেডিয়াম অব লাইটে। সিটি জিতলে তাঁরা গোল ব্যবধানে চ্যাম্পিয়ন, সেক্ষেত্রে ইউনাইটেডকে জিততে হবে কমপক্ষে ১০ থেকে ১২ গোলের ব্যবধানে! সিটি পা হড়কালে আর ইউনাইটেড জিতলে চ্যাম্পিয়ন হবে ইউনাইটেড। এরকম রোমাঞ্চকর সমীকরণ নিয়ে ইংলিশ ফুটবল প্রস্তুত হল নিজের ইতিহাসের সবথেকে উত্তেজনাপূর্ণ এবং নাটকীয় সমাপ্তির অপেক্ষায়।

ইতিহাদ এবং স্টেডিয়াম অব লাইটে একই সময়ে শুরু হল খেলা। ইতিহাদে সেদিন জড়ো হয়েছিল ৪৮ হাজার সিটি সমর্থক, স্টেডিয়াম অব লাইটে সান্ডারল্যান্ডের ৪৯ হাজার সমর্থক উপস্থিত ছিল। সিটির উপর ছিল ৪৪ বছরের দায় মেটানোর তাড়া, সেই ১৯৬৮ সালে সর্বশেষ লীগ জিতেছিল তাঁরা। আর ইউনাইটেডের উপর ছিল প্রতিপক্ষ সমর্থকদের বহুমুখী চাপ। দেখার বিষয় ছিল পাহাড় সমান স্নায়ুচাপ ডিঙ্গানোর লড়াইয়ে শেষ হাসি কে হাসে!

ইতিহাদে শুরু থেকেই হিংস্র বাঘের মতো কিউপিআরের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল সিটি। ৩৮ মিনিট ৩৭ সেকেন্ডে আর্জেন্টাইন রাইট ব্যাক পাবলো জাবালেতার গোল, উল্লাসে ফেটে পড়ল ইতিহাদের সমগ্র জনতা। প্রথমার্ধ শেষে সিটি ১-০ কিউপিআর। অন্যদিকে স্টেডিয়াম অব লাইটে ২০ মিনিটে লিগে নিজের ২৭তম গোল করে ইউনাইটেডকে এগিয়ে দেন ওয়েইন রুনি। প্রথমার্ধ শেষে সান্ডারল্যান্ড ০-১ ইউনাইটেড। ওই মূহুর্তে সিটির পয়েন্ট ছিল ৮৯, ইউনাইটেডের ৮৯, অর্থাৎ এই অবস্থায় খেলা শেষ হলে ৪৪ বছর পর সিটিই হবে চ্যাম্পিয়ন!

কিন্তু কে জানত, এত নাটকীয়তা জমিয়ে রেখেছে ওই দ্বিতীয়ার্ধ! শুরু হল দ্বিতীয়ার্ধ। ৪৭ মিনিট ৩৩ সেকেন্ডে ইতিহাদ স্তব্ধ করে দিলেন জিব্রিল সিসে। সমতায় ফিরল কিউপিআর। ৫৩ মিনিটে কিউপিআরের জোয়ি বার্টন লাল কার্ড দেখে নিজের দলকে ১০ জনে নামিয়ে দিয়ে গেলেন। একটু আশা ফিরে পেল সিটিজেনরা। কিন্তু কোথায় কী! ১০ জনের দলের বিপক্ষে যেখানে সিটির গোলের বন্যা বইয়ে দেয়ার কথা সেখানে উল্টো ৬৫ মিনিট ৮ সেকেন্ডে গোল খেয়ে বসল তাঁরা। ইতিহাদকে মৃত্যুপুরী বানিয়ে দিলেন জেমি ম্যাকি। সিটি ১-২ কিউপিআর! সময় যেতে লাগল, সিটিও গোল করতে পারছে না। স্টেডিয়াম অব লাইটে আস্তে আস্তে ২০ তম লিগ শিরোপার দিকে এগিয়ে যেতে লাগল ইউনাইটেড। ৯০ মিনিট শেষ, স্টেডিয়াম অব লাইটে ইন্জুরি সময়ের খেলাও শেষ, ইউনাইটেড জিতল ১-০ তে। তাঁদের পয়েন্ট ৮৯। অপর দিকে ইতিহাদে ৯০ মিনিট শেষে ৫ মিনিট যোগ করা হয়েছে অতিরিক্ত হিসেবে। আগে শেষ হয়ে যাওয়ায় ইউনাইটেড খেলোয়াড়রা এবং স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন স্টেডিয়ামের বড় পর্দায় দেখতে লাগলেন সিটি-কিউপিআর ম্যাচ।

আর মাত্র কয়েক মূহুর্ত। সিটি ১ গোল দিলেও ইউনাইটেডই চ্যাম্পিয়ন হবে। নখ কামড়াচ্ছেন সিটির সমর্থকরা, ডাগআউটে অসহায় দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন রবার্তো মানচিনি। এতো কষ্ট, এত পরিশ্রম কি তবে বৃথা যাবে! ইতিহাদের রেফারির ঘড়িতে তখন ৯০ মিনিট ১৫ সেকেন্ড, কর্ণার পেল সিটি। ডেভিড সিলভার ক্রসে মাথা ছোঁয়ালেন সিটির মারিও বালোতেল্লি, চোখে অবিশ্বাস নিয়ে তিনি এবং দর্শকরা দেখলেন কি দুর্দান্ত রিফেক্সে নিশ্চিত গোলটি বাঁচিয়ে দিলেন রবার্ট গ্রিন! ৯১ মিনিট ১৫ সেকেন্ড, আবারো কর্ণার পেল সিটি, আবারো ডেভিড সিলভার ক্রস, এবার এডিন জেকোর হেড, এবার রবার্ট গ্রিনের কিছুই করার ছিল না। ২-২! বল জালের মধ্যে থেকে কুড়িয়ে প্রাণপণে দৌড়ালেন এডিন জেকো। আরেকটা গোল দিতে হবে যে! আর মাত্র ২ মিনিট ৩০ সেকেন্ড বাকি। কিউপিআর খেলোয়াড়রা ইচ্ছা করে সময় নষ্ট করছে।

ম্যাচের ঠিক ৯৩ মিনিট, থ্রো পেল কিউপিআর। জোলেওন লেসকটের হেডিং ক্লিয়ারেন্স গিয়ে পড়ল নাইজেল ডি ইয়ংয়ের পায়ে, কিউপিআর তখন বাস পার্কিংয়ে ব্যস্ত। তাই অনেকটা জায়গা পেয়ে গেলেন ডি ইয়ং, কিছুটা এগিয়ে তিনি পাস দিলেন সার্জিও আগুয়েরো কে, আগুয়েরো বল দিলেন মারিও বালোতেল্লিকে, সুপার মারিও পড়ে গিয়েও চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞায় বল ফেরত দিলেন আগুয়েরো কে, আগুয়েরো একজনকে কাটালেন, সামনে শুধুই রবার্ট গ্রিন আর গ্রিনকে পরাস্ত করতে পারলেই ইতিহাস! পাহাড় সমান চাপ নিয়ে শট নিলেন আগুয়েরো। ধারাভাষ্যকার মার্টিন টেইলারের কলিজায় কাঁপন ধরানো বজ্রকণ্ঠ,

আগুয়েরোওওওওওওওওওওওওওওওওওওওওওওওওওওওওওওওওওওও। গোলললললললললললল!!!!!!!!! 

ম্যানচেস্টার সিটি, আগুয়েরো, পেপ গার্দিওলা, ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগ, প্রিমিয়ার লীগ ফুটবল

আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত সিটি সমর্থকদের উল্লাসধ্বনিতে। কে কাকে জড়িয়ে ধরছেন সেদিকে খেয়াল নেই। রবার্তো মানচিনি আর পুরো কোচিং স্টাফ তখন উম্মাদ! খেলোয়াড়েরা সবাই আগুয়েরোর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। স্টেডিয়াম অব লাইটে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের খেলোয়াড়, স্যার অ্যালেক্স আর বাকিরা বিষম খেয়ে কি করবেন বুঝতে পারছেন না। যেন অনুভূতি হারিয়ে গেছে তাঁদের মধ্য থেকে।

বড় পর্দায় ভেসে উঠল সিটি ৩-২ কিউপিআর।
মার্টিন টেইলার বলে চলেছেন- ‘I swear you will never see anything like this ever again!’

আসলেই, এমন অভূতপূর্ব ব্যাপার আর কখনো দেখা যাবেনা।

৯৫ মিনিট ৪২ সেকেন্ডের মাথায় রেফারির শেষ বাঁশি বাজল। জো হার্ট বলটিকে পাঠিয়ে দিলেন আকাশে।

ম্যানচেস্টার সিটি ইংল্যান্ডের নতুন চ্যাম্পিয়ন হিসেব স্বীকৃতি পেল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল ৪৪, ধীরে ধীরে সেটা নেমে এল ০০ তে। অর্থাৎ অপেক্ষার প্রহর শেষ, ৪৪ বছর অপেক্ষা! গ্যালারির সব দর্শক তখন মাঠে, যাকে সামনে পাচ্ছেন তাকেই জড়িয়ে ধরছেন। বারে, রাস্তায়, দোকানে, শপিংমলে, ঘরে, রেস্তোরায় কোথায় নেই সিটি সমর্থকরা! সব জায়গায় শুধু সিটি সিটি সিটি কলরব।

ম্যাচ শেষে এক বৃদ্ধ লোককে দেখা গেল রিপোর্টারের সাথে কথা বলছেন। বৃদ্ধ লোকটির মাথায় টুপি, তাঁর মাথায় কোনো চুল নেই। তিনি বললেন- ‘I watch them for 75 years, I used to be 6 foot 2 inches tall with curly head, look what it’s done to me.’

৭৫ বছর ধরে দলকে সমর্থন দিয়ে গেছেন ওই ৮৩ বছরের বুড়ো, সমর্থন দিতে ট্রফি, ইতিহাস, কিংবদন্তিদের লাগে না, লাগে একটা হৃদয়, যে হৃদয় আপনাকে সবসময় উৎসাহ জোগাবে নিজের প্রিয় দলের পাশে থাকতে, তা সে ভালো সময়ই হোক কিংবা খারাপ।

ম্যানচেস্টার সিটি হয়তো টাকা দিয়ে খেলোয়াড় কিনেছে, কিন্তু প্রিমিয়ার লিগ জিততে হয়েছে মাঠে খেলেই, সেখানে টাকা নিছকই মামুলি ব্যাপার। সিটির পুঃনুরুত্থান ইংলিশ ফুটবলকে উপহার দিয়েছিল তাঁর সবচেয়ে ঘটনাবহুল মৌসুমটি। কোটি কোটি ফুটবল সমর্থকদের পিপাসা মিটিয়েছিল ২০১১-১২ মৌসুমের প্রিমিয়ার লিগের রাউন্ড অব ৩৮।

সেই মৌসুমের থেকেই বদলে যাওয়া শুরু সিটির। তবে একটা প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে। লিগে ভালো করলেও ইউরোপের ক্লাব সেরা টুর্নামেন্ট চ্যাম্পিয়ন্স লিগে বলার মতো সাফল্য কেবল ২০১৫-১৬ মৌসুমে সেমিফাইনাল খেলা। চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিততে না পারলে কুলীন দলের মর্যাদা কখনোই পাবে না ম্যানচেস্টার সিটি। তবে অন্য যেকোনো সময়ের থেকে এবার তাদের সফল হবার সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি। একে লিগের দুরন্ত শুরু, সাথে কেভিন ডি ব্রুইনে, ডেভিড সিলভা, সার্জিও আগুয়েরো, নিকোলাস ওটামেন্ডিদের আগুনে ফর্ম এবং পেপ গার্দিওলার ট্যাকটিকস। সব মিলিয়ে রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনার আগে এবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফেভারিট হিসেবে উচ্চারিত হচ্ছে সিটির নাম।

সেটির প্রতি সুবিচারও করছে তারা, গ্রুপে এখন পর্যন্ত ৫ ম্যাচ খেলে সব কটিতেই জিতে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে নক-আউট স্টেজ নিশ্চিত করেছে। মৌসুমে এখন পর্যন্ত সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ২২ ম্যাচ খেলে ২০ টিতেই জয়, ২টি ড্র। একমাত্র বার্সেলোনাই সিটির সাথে ইউরোপে এখন পর্যন্ত অপরাজিত রয়েছে। সিটির ভাগ্যও এবার যেন একেবারে খাপেখাপ, ম্যাচের একেবারে শেষ মিনিটে এসে হলেও কিভাবে যেন জেতার উপায় বের করে ফেলছে তারা। যা অব্যাহত থাকলে বলাই যায়, ‘ইউরোপ, বি এলার্ট! ম্যানচেস্টার সিটি ইজ কামিং’।

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-