সিনেমা হলের গলি

হ্যাশট্যাগ খ্যাতির বিড়ম্বনা!

কলেজে পড়তে মাঝে মাঝে প্র‍্যাকটিক্যাল ক্লাশ করার জন্য হোস্টেলে থাকতাম। আমাদের হোস্টেলের আশেপাশে, ঢাকার কোন একটা বাসের কাউন্টার ছিলো। রাতে কিছু বাস সেখানে পার্ক করে রাখতো। প্রায় প্রতিদিন রাত দুইটা-তিনটা নাগাদ সেই বাসগুলো থেকে, একটা গান ভেসে আসতো। অতো রাতে শুনশান চারিদিক, এর মধ্যে লো-ভলিউমে ভেসে আসা গানটা কেমন মোহময় লাগতো। বিশেষ করে যখন সাবিনা ইয়াসমিন কণ্ঠে সবটুকু মিনতি আর আবেগ ঢেলে টান দিতেন, ‘তুমি ভুলনা আমারই নাম’, তখন আলতো করে ঘুম পাড়ানি মাসি-পিসি এসে চোখের পাতায় বসে, নরম ঘুম দিয়ে ভিজিয়ে দিয়ে যেতো অনুভূতির সবটুকু। এরপর যখনই দূরপাল্লার বাসে করে দূরে কোথাও রাতে জার্নি করেছি, বাসে আশির দশকের বাংলা সিনেমার কিছু অসাধারন লিরিক্সের গান বাজতো। ইভেন, মৌসুমি ভৌমিকের ‘আমি শুনেছি সেদিন’ গানটাও আমি প্রথম শুনেছিলাম চিটাগং যাওয়ার পথে। সেই সময়, যাত্রীদের কেউ কেউ তাদের পছন্দের গানের ডিভিডি দিয়ে দিতো বাজানোর জন্য। রাতের জার্নিতে বাজানো প্লেলিস্টের অন্যতম ছিলো, ‘এই মন তোমাকে দিলাম’ গানটা। সাবিনা ইয়াসমিনের বেস্ট সং কালেকশনের মধ্যেও অন্যতম গান এটি। গানটির কথা লিখেছেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার। সিনেমায় গানটা ছিলো রোজিনার লিপে।

যাই হোক সম্প্রতি এই গানটা নিয়ে মোটামাটি হইচই পরে গেছে। আমারো নিউজফিডে কয়েকদিন থেকেই ঘুরছিলো গানটা। অনেক প্রশংসা দেখে আমিও শুনতে বসলাম, ভালো লাগলো শুনতে। ভালো লাগার তিনটা কারণ ছিলো, এক নম্বর কারণ- ছেলেটা ভীষনই কিউট, স্মার্ট বাংলায় যেটাকে বলে কিউটের ডিব্বা। দুই, গানটা আগে কোন মেল ভার্সন শুনি নাই। তৃতীয় কারণ, ছেলেটার ভয়েসটা বেশ ভালো। আমি গান গাইতে পারিনা, আমি আসলে ভালো-মন্দ জাজ করছি অডিয়েন্সের ভিউ থেকে। শুরুটা যখন করলো তখনই বোঝা গেলো ছেলেটা গান শেখে, ক্ল্যাসিক্যাল একটা ব্যাকগ্রাউন্ড আছে। সে যাইহোক গানটা আমিও শেয়ার দিলাম। তারপর তিনবার শোনার পর নস্টালজিয়ার কারণেই কিনা, ওয়াল থেকে গানটা সরিয়ে ফেললাম। আসল গানটা একবার শুনলাম; ইশ কি মায়া সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠে!

মাহতিম শাকিব, সোশ্যাল মিডিয়া, ফেসবুক

এরপর ভুলেই গেছিলাম গানটার কথা। আজ সকালে আবার ফেসবুকে ঢুকেই দেখলাম সেই ছেলেটা, মাহতিম শাকিব। শিরোনামহীন এর একটা গান কাভার করেছে, ‘হাসিমুখ- তুমি চেয়ে আছো তাই’। শিরোনামহীন মনে হলেই যে গানটা আমার মাথায় প্রথম আসে। তো গত পোস্টে যেরকম সবাই ছেলেটার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছিলো, শেয়ার আর শেয়ার। এই পোস্ট তার পুরো উলটো। এইখানে ছেলেটার গায়কীর গোষ্ঠী উদ্ধার করে ছাড়ছে সবাই। তবে শেয়ার হচ্ছে এবারো।

এইখানেই শুরু হয়েছে নতুন বিপত্তি। আর সব বিষয়ের মতোই জনতা এখন, সমান দুইভাগে ভাগ হয়ে গেছেন, মাহতিম শাকিব এর ইস্যুতে। কেউ বিবেকের বাতি নিয়ে একদলকে বলছেন হুজুগে, অবিবেচক ব্লা ব্লা। আরেক দল নিজেদের মতো শেয়ার বাটন চেপে যাচ্ছেন আর বলছেন তোমাদের কি সমস্যা! এরই মধ্যে মাহতিম এর ফেসবুক রেটিং ৪.৯ থেকে ৪.৭ এ নেমে এসেছে। আহা নেটিজেন হিসেবে আমরা কতো অ্যাক্টিভ!

আমি পক্ষ-বিপক্ষের বাইরের আরেক দল, নিউট্র‍্যাল। পক্ষ-বিপক্ষ তো নয়ই, এসব ইস্যুতে কথা বলার প্রয়োজন আছে বলেই আমি মনে করিনা। কারণ আমি আমজনতা। কিন্তু এই বিষয় ঘিরে কিছু লোকের বিজ্ঞ এবং সমঝদার আচরণে মুগ্ধ হয়ে লিখতে বসা। প্রথম এবং সাধারন কথা সময়টা গ্লোবালাইজেশনের, সময়টা উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্মের। আপনি যেমন করে ইচ্ছা নিজেকে প্রকাশ করুন। তেমন কোন বাধা নেই; বাধা নেই, এই বিপত্তিটুকু ছাড়া। সারাবিশ্ব এখন আপনার হাতের মুঠোয়। সোজা কথায় স্বদইচ্ছা থাকলে একটা স্মার্ট মোবাইল ফোন দিয়ে চাইলে আপনি প্রায় যেকোন কিছু করে ফেলতে পারেন। দ্বিতীয় কথা, প্রত্যেকটা জিনিসেরই দুইটা দিক থাকে, ভালো-মন্দ। আর শেষ কথা, প্রত্যেকটা মানুষ স্বাধীন, তার মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে।

এখন সোশ্যাল মিডিয়াতে এই তিনটি বিষয় কাজ করে একই সময়ে। আপনি হাতের মুঠোয় যে বিশ্ব সভ্যতা আর আবেগ নিয়ে ঘুরছেন, তার সাথে ভালো মন্দ আর স্বাধীনতা জড়িত। এখানে যেকোন কিছুর ফলাফলটা খুব দ্রুত পাওয়া যায়। আপনি কাল একটা ভালো কাজ করেছেন, লোকে প্রশংসা করেছে। আপনার খুব ভালো লেগেছে। আজ একটা কম ভালো কাজ করেছেন, লোকে কিছু মন্দ কথা বললো, আপনার খারাপ লেগেছে। আবার দর্শকের খারাপ লেগেছে বলেই কিন্তু সমালোচনা করেছে। দর্শকের ভালো লেগেছে বলে আপনাকে তারা ভোট দিচ্ছে। এরকম দ্রুত ফলাফলের তরিকায় হঠাৎ তারকা বনে যাওয়া, এটা একটা বিশাল চ্যালেঞ্জ। যে খ্যাতি সহজলভ্য তা ধরে রাখা কঠিন।

মাহতিম শাকিবের ক্ষেত্রে যা ঘটেছে। একটা ক্র‍্যাশ খাওয়া জেনারেশন তার উপর ক্র‍্যাশ খাওয়ার পর সবার নজরে পরেছে সে। এখন নতুন গানটা নিয়ে অনেকেই ট্র‍্যাশ বানাচ্ছে তাকে। এদের অধিকাংশই তারা, যারা এই মন তোমাকে দিলাম শেয়ার দেয়নি, বা তাদের ওই গানটাও খুব একটা ভালো লাগেনি। এই নেটিজেন গ্রুপ কিন্তু তাদের জায়গায় অনেস্ট। তারা আগেরটা অতো ভাইব তৈরি করলো কেনো তার কারণ বুঝতে পারে নাই। আর এইটা হাতে পেয়ে, সবাইকে বুঝাচ্ছে যে তোমরা কিন্তু মামমা, জাতে পাগল।

দল এখন যাইহোক, এখন এতে কি খুব একটা কিছু এসে যায় মাহতিম শাকিবের? হুম মানসিক একটা চাপ পরে বটে। কিন্তু একজন তারকার প্রায়ই এই মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। যেদিন থেকে আপনি অনেকের মধ্যে থেকে আলাদা হয়ে গেলেন, বিশেষ হলেন, সেদিন থেকেই আপনার বন্ধু এবং আপনার শত্রু বেড়ে যাবে সেটাই স্বাভাবিক। বেশকিছু স্বাভাবিক জিনিস চাইলেই বদলানো যায় না।

‘কিপিং আপ উইথ কার্দাশিয়ান্স’ টিভি শো করে পৃথিবী বিখ্যাত হয়েছে যে কার্দাশিয়ান ফ্যামিলি, তাদের মেম্বারদের ছোটবেলা থেকেই শেখানো হয়, কি করে পাপারাজ্জি আর সমালোচকদের সামাল দিতে হয়। কেন্ডাল জেনারকে একবার এক শো এ জিজ্ঞাস করা হয়েছিলো, সমালোচনাকে আপনি কিভাবে নেন, ও বলেছিলো, হঠাৎ উড়ে আসা ধূলো-বালির মতো, কখনো আবর্জনার মতো। এটাই হচ্ছে ব্যাপার, সমালোচনা থাকবেই তাতে কোন কিছু আটকে যাবে না। বরং সমালোচনা কখনো কখনো পাব্লিসিটি বাড়াতে সাহায্য করে, আপনার চলার পথের ভুলগুলো শুধরাতে সাহায্য করে।

মাহতিম শাকিব যা করেছে এটা অনেক আগে থেকেই অনেকেই করে আসছে। বিখ্যাত গান কাভার করা। এর আগে বাংলাদেশেও অনেকে করেছে কাভার সং। এদের মধ্যে ভারতের সানাম পুরিকে মোটামাটি সবাই চেনে এই কাভার সিঙ্গার হিসেবে। সানামেরও ‘লাগ যা গালে’ যতোটা প্রশংসিত হয়েছে, ‘তুমি রবে নীরবে’ নিয়ে কিন্তু তেমনই সমালোচনা হয়েছে। তাতে কি সানাম পুরির কিছু হয়েছে! হয়তো ভুলগুলো শুধরে নিয়েছে কিংবা শোনেইনি সমালোচনা, ও কিন্তু গান করেই যাচ্ছে। কারো ভালো লাগলে ওর গান শুনছে, না লাগলে শুনছে না।

কিন্তু আমাদের হয়েছে এক জ্বালা! আমরা বেশ আবেগী। তাই, প্রথমে কোন একটা বিষয়ের পক্ষে বিপক্ষে দাঁড়াই। আবার সেই পক্ষে বিপক্ষের, পক্ষে বিপক্ষে দাঁড়াই। তারপর নতুন কোন ইস্যু আসার আগে পর্যন্ত তা নিয়ে চলতে থাকে আলোচনা। তারপর নতুন ইস্যু, নতুন গল্প। যে গল্পের অংশীদার একজন হিরো আলমও।

কথার শুরুটা হলো একটা বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচারিত মাহতিম শাকিবের গানটা নিয়ে। তাকে সেলিব্রিটি বানিয়েছি আমরাই, কেন আবার তাকে নিয়ে সমালোচনা করছি, এটা ঠিক না; বাঙ্গালি অদ্ভুত একটা জাতি, এসব বলার এক পর্যায়ে একজন বলেই বসলেন, বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেল চালায় সব মাথামোটা লোকজন! এমা, এতো দেখি ‘উদোর পিন্ডি বুঁদোর ঘাড়ে’! নেটিজেনরা তাকে সেলেব বানালো, আপনি তার ভক্ত ফেসবুক দেখে। ন্যায়-অন্যায় এর পক্ষে কথা বলছেন আপনি। আর বলে বসলেন, পুরো টেলিভিশন চ্যানেলের সব লোক মাথামোটা! একজনের পক্ষ নিতে যেয়ে একটা পুরো গোষ্ঠীকে যে মাথামোটা বললো, তার হাতে পুরো অদ্ভুত বাঙ্গালি জাতিকে তুলে দেয়া কতোটা নিরাপদ সেটা ভাবার সময় পরে। ওসব হাস্যকর কথা আর ন্যায়-অন্যায় বোধের দ্বন্দে সামিল হবার সময় এখন নয়।

এখন সময় অস্থিরতার। সেটা সামাজিক, রাজনৈতিক, টেকনোলজিক্যাল সব ধরণের অস্থিরতা। কেন এই অস্থিরতা, এটা চুপচাপ কেন মেনে নিবো? এসবের ব্যাখ্যা চাইলে এক লাইনে বলে দেয়া সম্ভভ নয়, সেটা আরেকটা বিস্তারিত আলোচনার বিষয়। কথা হলো এই যে মাথামোটা শব্দের মতো, যা ইচ্ছা তাই বলে দেবার স্বাধীনতা সবারই আছে। ভালোর পক্ষে দাঁড়ানো, খারাপ কিছু নিয়ে সমালোচনা করবার স্বাধীনতাও সবার আছে। তাই বলে কি আমরা যা হচ্ছে তাই হতে দিবো? না। আমরা যেটা করতে পারি নিজেদের পক্ষ নিয়েই, যথা সম্ভব নিজেকে শুধরাতে পারি। কারণ আমি-আপনিই, বাঙ্গালি জাতি। অন্যের ভুল ধরার পাশাপাশি নিজেকে শুধরালে ভুল করার আর কেউ থাকবেনা। মাহতিম শাকিবের পাশে আছি বলে হ্যাশ ট্যাগেরো দরকার হবে না।

শেষ কথা, একান্ত ব্যক্তিগত স্বাধীন কথা- প্রত্যেকটা গল্প এক একটা ধাপে ধাপে এগিয়ে যেতে হয়, তা নাহলে গল্প দাঁড়ায় না। সাবিনা ইয়াসমিন কিংবা শিরোনামহীন একরাতে সেলিব্রেটি হয়নি। মাহতিম শাকিবরাও অত্যন্ত প্রতিভাবান, ওরাও কিছু কাঠখড় পোড়াক। তাহলে একদিন ওদের গান আগামী প্রজন্ম কাভার করবে। তা নাহলে হারিয়ে যাবে শেয়ার বাটন আর হ্যাশট্যাগের স্রোতে।

হ্যাশট্যাগ#এই স্বাধীন কথার বিপরীতে আপনারও পূর্ণ স্বাধীনতা থাকলো, মতামত দেবার।

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close