শৈশব বয়স থেকেই বই পড়ার প্রতি ছিল এক ধরনের অনীহা। কোনোমতেই পড়ার বই ছাড়া অন্য কোনো বই পড়াতে পারতো না বাসার বড়রা। প্রতি বছর বইমেলায় নিয়ে যাওয়া হতো একরকম নিয়ম করেই। কিন্তু যেসব বই কিনে দেয়া হতো সে সব বই পড়ার প্রতি কোনো আগ্রহ ছিল না। কিন্তু একদিন বইয়ের সেলফে দেখলাম হুমায়ূন আহমেদ নামের এক লেখকের বই। প্রচ্ছদটি দেখেই এতো ভালো লাগলো যে কৌতুহলী হয়ে ভাবতে লাগলাম এই বই পড়তে না জানি কত ভালো লাগবে। এরপর একদিন লুকিয়ে “আজ চিত্রার বিয়ে” নামে একটি বই পড়লাম। এত ভালো লাগলো যে এরপর থেকে নিজেকে আর থামাতে পারলাম না। এরপর আমি অন্য লেখকদের বইও পড়েছি, কিন্তু তখন থেকে এখন পর্যন্ত আমার প্রিয় লেখক হয়ে গেলেন হুমায়ূন আহমেদ।

ছোটবেলা থেকেই তাঁর লেখা বই, সিনেমা, নাটক দেখে বড় হয়েছি। “আজ রবিবার” নাটকটি এখনো প্রায় দেখি। তাঁর বই পড়ে আমি জেনেছি ভালোবাসা কি জিনিস। জোছনার রাতে কি অনুভূতি আছে, বৃষ্টি বিলাস কিভাবে আমাদের মনকে একই সাথে কাঁদায় এবং হাসায়। জেনেছি পৃথিবীতে অনেক ধরনের অত্যাচার আছে। কিন্তু ভালোবাসার অত্যাচার হচ্ছে সবচে ভয়ানক এবং কষ্টকর অত্যাচার। তাঁর বই পড়েই হয়তো ভালোবাসাকে আরও বেশী ভালোবাসতে শিখেছি। তাঁকে নিয়ে অনেক সমালোচনা হয় কিন্তু তাতে তাঁর কিচ্ছু যায় আসবে না।

তাঁর গল্পগুলো পড়ে কার না হিমু হতে ইচ্ছা করেছে? মিসির আলী কে না হতে চেয়েছে? রুপা সেজে কে না বৃষ্টিতে বিলাস করেছে? মনের গহীনে লুকানো কোনো কোণে সবাই ঠিকই তাঁর মতো হতে চেয়েছে। তিনি অদ্বিতীয়। আমরা কোনোদিন অস্বীকার করতে পারবো না উনার পর আরেকটি হুমায়ূন আহমেদ আসবে না।

১৩ই নভেম্বর, ১৯৪৮ সালে জন্মগ্রহণ করা হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, নাট্যকার এবং গীতিকার। “যদি মন কাঁদে তুমি চলে এসো এক বরষায়” অথবা “চান্নি পসর রাইতে জেনো আমার মরণ হয়” মৃত্যু যে সুখকরও হতে পারে তা হয়তো তাঁর লেখা গান গুলো না শুনলে বোঝা যেতো না। প্রতি বছর তাঁর জন্মদিন আসে আর মনে করিয়ে দিয়ে যায় জন্মদিনে আসলে খুশী হতে নেই।

আমি সবসময় নিজেকে অনেক ভাগ্যবান ভাবি কারন আমার জন্মদিনও তাঁর জন্মদিনের একদিন পরেই আসে। কিন্তু পরক্ষণে আবার মনে হয় জীবনের অধ্যায়গুলো এক এক করে শেষ হয়ে যাচ্ছে। কতটুকু হুমায়ূন আহমেদের মতো ভাবতে শিখেছি জানা নেই, তবে যতদিন উনার জন্মদিন দেখার সুযোগ আসবে ততদিন একটু করে হলেও তাঁর লেখা গল্পগুলোর মতোই নিজেকে তৈরি করবো। কারণ গল্পগুলো কারো না কারো জীবন থেকেই নেয়া। কিন্তু বড় অসময়ে তিনি চলে গেলেন। আরও কিছু দিন, কিছুক্ষণ থাকলে হয়তো জীবনবিলাস করাটাও শিখিয়ে দিয়ে যেতে পারতেন। আমাদের মতো আকাশ কুসুম চিন্তা করা মানুষগুলোকে।

আমরা অসময়ে ছেড়ে যাই, আমরা স্থানকে শুন্য করে দিতে বারবার ভুল কারণে চলে যাই। এভাবে ছেড়ে যেতে হয় না! মনেরও তো মন কাঁদে, মনেরও মন থাকে। তা কি কেউ জানে? আমি জেনেছি ঘুম হচ্ছে দ্বিতীয় মৃত্যু। সাধারণ মানুষ ঘুমায়, অসাধারণরা জেগে থাকে। আজ জাদুকর ঘুমিয়ে আছেন  অবশ্যই দ্বিতীয় মৃত্যু নয়। তবুও তিনি বেঁচে আছেন সবার প্রাণে। হয়তো হিমু বেশে, অথবা মিসির আলি হয়ে! আজও ইচ্ছে করে নতুন কোনো জাদুমন্ত্রে মুগ্ধ হতে। আজ দিনের শেষে আনন্দ বেদনার কাব্য হয়ে আমি এবং আমরা চলে যাই বসন্তের দিনে। আকাশ ঝরা মেঘ আর নীল অপরাজিতা হাতে মিসির আলী আর কাঁদবে না তোমাদের এই নগরে নন্দিত নরকে। আমি জানি এখন আপনার মেঘের উপরবাড়ি। বৃষ্টি ও মেঘমালা আপনার নিত্য দিনের সঙ্গী। আমরা কেউ আপনার স্বপ্নের বাড়িতে নেই, তবু আপনার জন্মদিনে আমি এবং কয়েকটি প্রজাপতির পক্ষ থেকে অনেক শুভেচ্ছা প্রিয় গল্পের জাদুকর!

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-