ডি স্টেফানো শুনেছি। পড়েছি। ক্রিস্তিয়ানো দেখেছি। অনুভব করেছি। রিয়াল মাদ্রিদ একটি অনুভূতি। একসময় ডি স্টেফানো ছিলেন সেই অনুভূতির গভীরতার প্রতীক। গত কয়েক বছর ধরে সেই অনুভূতির তীব্রতম প্রকাশ ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো…

আমার রিয়াল মাদ্রিদ প্রেমের শুরু ১৯৯৮ সালে। রাউল গনসালেস নামের নামের এক তরুণ ফু্টবলার সম্পর্কে পত্রিকা-ম্যাগাজিনে পড়ে আর সামান্য দেখে তাকে ভালো লাগার শুরু। তার ক্লাবকে সমর্থন করা শুরু…

এমনিতে আমার প্রথম ফুটবল হিরো ছিলেন দুজন, রবার্তো ব্যাজিও আর গিওর্গি হাজি। ১৯৯৪ বিশ্বকাপ দেখে। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে কী গোলটাই না করেছিলেন হাজি! তবে ব্যাজিওকেই শেষ পর্যন্ত বেশি ভালো লেগেছিল। দা ডিভাইন পনিটেইল। অনেক কষ্টে টাকা জমিয়ে ১০ টাকা দিয়ে ব্যাজিওর পোস্টার কিনেছিলাম। জীবনের প্রথম কারও পোস্টার কেনা। তবে বিশ্বকাপ শেষের কদিন পর তাদের ভুলেও গেলাম…

ক্লাব ফুটবল অনুসরণের শুরু রাউলের জন্যই, ১৯৯৮ থেকে। ডেভর সুকের সেবার বিশ্বকাপ মাতালেন। জানলাম, খেলেন রিয়ালে। ১৯৯৭ সালে ফ্রান্সের বিপক্ষে অবিশ্বাস্য বাঁকানো সেই ফ্রি কিক গোলের পর থেকে রবার্তো কার্লোস গোটা বিশ্বে নায়ক। দেখলাম, সেও খেলে রিয়ালে। বিশ্বের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার ফার্নান্দো হিয়েরো। তার ক্লাব রিয়াল। ১৯৯৮ বিশ্বকাপের আর্জেন্টিনা দল থেকে বিতর্কিত ভাবে ফার্নান্দো রেডোন্ডোকে বাদ দিয়েছিলেন কোচ ড্যানিয়েল প্যাসারেলা। কোচ নাকি তার বড় চুল কাটতে বলেছিলেন, কাটেননি বলে দল থেকে বাদ। তুমুল হইচই হয়েছিল। ইন্টারেস্টিং লেগেছিল। খেলেন রিয়ালে। তো সব মিলিয়ে, রাউলের পর রিয়ালকে সমর্থনের আরও কারণ খুঁজে পেলাম…

ক্লাব ফুটবলের মজে উঠতে শুরু করলাম। রিয়ালের সঙ্গে সম্পর্ক ক্রমে অবিচ্ছেদ্য হয়ে উঠতে থাকল। ফার্নান্দো মরিয়েন্তেস, কী যে ভালো লাগত! মাঝে মাঝে মনে হতো রাউলের চেয়েও ভালো ফিনিশার। স্টিভ ম্যাকম্যানাম্যান এলেন, ইভান হেলগুয়েরা, ক্লদ ম্যাকেলেলে, সালগাদো, ক্যাম্বিয়াসো, সোলারি এলেন। গুতি তো ছিলই, আমাদের ঘরের ছেলে…

ফুটবল দুনিয়া কাঁপিয়ে বার্সা থেকে রিয়ালে অবিশ্বাস্য ট্রান্সফার হলো লুইস ফিগোর। রেকর্ড গড়ে এলেন জিজু। এরপর রোনালদো, দা ফেনোমেনন। আমার ক্লাব যেন পূর্ণতা পেল। একটা ক্লাব এমনও তারকাপঞ্জি হয়! গ্যালাকটিকো শব্দটির সঙ্গে পরিচয় হলো। রিয়াল ততদিনে রক্তে মিশে গেছে…

তারকার আকাশে যোগ হলো ডেভিড ব্যাকহ্যামের আলো। সম্ভাবনাময় এক গোলকিপার থেকে ইকার ক্যাসিয়াস হয়ে উঠলেন ‘সেইন্ট।’ ক্রমে হয়ে উঠলেন ক্লাবের প্রতীক। ক্যানাভারো, রবিনহো, রবেন, নিস্তলরয়, স্নেইডার, কাকা…কত কত নাম এই মুহূর্তে আনাগোণা করছে ভাবনার করিডোরে! ডি মারিয়া, হিগুয়াইন, ওজিল, পেপে, কারভালহো, আলোন্সোরা তো এই সেদিনও আমাদের ছিলেন। ওদেরকে এখনই স্মৃতির কাতারে ফেলতে কেমন যেন লাগে…

গত ৮-১০ বছরে চোখধাঁধানো শ্বেতশুভ্র এই জার্সি গায়ে একজনের এগিয়ে চলা ছিল বিস্ময়কর। অন্তত আমার কাছে। বুনো, খ্যাপাটে ফুটবলার থেকে একজন কিভাবে নেতা, অনুপ্রেরণাদায়ী, কিভাবে একজন মাদ্রিদিস্তা হয়ে উঠলেন? সার্জিও রামোস…!

রামোসের বিবর্তনের এই সময়টাতেই আরেকজন ছিলেন মহাবিস্ময়। আনন্দদায়ী মহাবিস্ময়। ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো।

ধান ভানতে শীবের গীত অনেকটুকু গাওয়া হয়ে গেছে। রোনালদোকে নিয়ে লিখতে গিয়ে কত কতজনের কথা লিখে ফেললাম। হলোই নাহয়। কোনো শ্রদ্ধাঞ্জলি লিখতে তো বসিনি। রোনালদোর রিয়াল ছাড়ার খবর নিশ্চিত হওয়ার পর থেকেই বিচিত্র সব অনুভূতির আনাগোণা ভেতরে। স্মৃতির সরণীতে হাঁটাহাঁটি চলছে নিজের। সেই অনুভূতিগুলোই কেবল বলার চেষ্টা করছি…

৮০ হাজার দর্শক যেদিন রোনালদোকে স্বাগত জানাল সান্তিয়াগো বের্নাবিউতে, আমাদের স্বপ্নের সীমানা সেদিন বেড়ে গিয়েছিল অনেক। ভাবতে পারিনি, রোনালদোর স্বপ্ন ছিল আমাদের সীমানার চেয়েও অনেক অনেক বড়! যতটা বেশি চেয়েছি, ক্লাবকে সে তার চেয়ে বেশি দিয়েছে। পরের মৌসুমে আরও বেশি চেয়েছি, সে তার চেয়েও বেশি দিয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা আকাশ ছুঁয়েছে। রোনালদো সেই আকাশ পেরিয়ে নিজেই গড়েছেন মনের মতো আকাশ। আমরা বিস্ময়ভরে দেখেছি। নিত্য নতুন উচ্চতায় নিজেকে তুলে নিয়েছেন…

সবচেয়ে ভালো যেটা পেরেছেন, চ্যালেঞ্জ জিতেছেন। লোকে যখনই কোনো সংশয় জাগিয়েছে, রোনালদো সেটি মাড়িয়ে এগিয়ে গেছেন চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞায়। হয়ে উঠেছেন আকাঙ্ক্ষা, পরিশ্রম, ইচ্ছাশক্তি আর অর্জনের প্রতীক…

তার গোলসংখ্যা, ট্রফি, ব্যালন ডি’অর, পিচিচি, পরিসংখ্যানে অবিশ্বাস্য আঁকিবুকি, সেসবের কথা বলব না একটুও। সবারই জানা। বলব রোমাঞ্চের কথা। এতটা রোমাঞ্চ, এতটা উত্তেজনা, এতটা চাওয়া নিয়ে আর কোনো ফুটবলারের খেলা দেখতে বসিনি। কখনোই না। আমার কাছে যিনি ফুটবলের শেষ কথা, যাকে মনে করি সর্বকালের সেরা, সেই জিজুর সময়টায়ও এতটা রোমাঞ্চ নিয়ে ফুটবল দেখতাম না। চাওয়া ও পাওয়ার এতটা অপূর্ব ও অবিশ্বাস্য মেলবন্ধনও আর কেউ কখনও করতে পারেনি…

নতুন মৌসুম শুরু না হওয়া পর্যন্ত হয়ত তার চলে যাওয়ার ধাক্কার তীব্রতা সহনীয়ই থাকবে। কিন্তু যখন শুরু হবে খেলা? ভাবলেই ভেতরটা ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। শূন্যতা। হাহাকার…

বল নিয়ে তার তীব্রগতিতে ছুটে চলার সময় যেভাবে বেড়ে যেত হৃদস্পনন্দন, ফ্রি কিক নেওয়ার ঠিক আগে সময়টুকুর রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা, পেনাল্টি নেওয়ার ঠিক আগে দমবন্ধ প্রতীক্ষা, তার স্টেপ ওভার, তার ব্যাক হিল, তার ওভারহেড কিক, তার অ্যান্টিসিপেশন, তার জাদুকরী ফিনিশিংয়ের ঘোর লাগা মুহুর্তগুলো মিস করব ভীষণ ভাবে…

সেলিব্রেশনে তার সঙ্গেই খ্যাপাটে হয়ে ছুটে চলা, তার সঙ্গে লাফানো, অনুনমেয় আর উদ্ভাবনী উদযাপনে চমকে যাওয়া, গোলের পর তার সঙ্গেই আনন্দ ভেলায় ভেসে চলা মিস করব সবচেয়ে বেশি…

মাঝরাতে শুয়ে শুয়ে খেলা দেখার সময় হঠাৎ তার ঝলক দেখে নিজের অজান্তেই লাফ দিয়ে উঠে পড়া, মশারি শরীরে জড়িয়ে জট পাকানো বা ছিটকে বেরিয়ে পড়া, ঝাঁকুনিতে ঘুম থেকে ধড়ফড় করে জেগে উঠে বউয়ের ভয় ও বিস্ময় মেশানো চাহনি, তার গোল দেখে একা একাই বাতাসে মুষ্টিবদ্ধ হাত ছোড়া, পাশেই শুয়ে থাকা বাচ্চাটা ঘুম থেকে জেগে উঠবে বলে গলা থেকে আওয়াজ না বের করেই ক্রমাগত আনন্দ চিৎকার করে যাওয়া, এসব কি আগের মতো আর জমবে…?

না, রোনালদোর অবসর কাব্য লিখে ফেলছি না। জানি তার ক্যারিয়ার আরও অনেক লম্বা হবে। চ্যালেঞ্জ নিতে ভালোবাসেন বলেই তো তার প্রতি সবচেয়ে বেশি শ্রদ্ধা, সমীহ আর ভালোবাসা। নতুন চ্যালেঞ্জ নিচ্ছেন, নিশ্চিত জানি নতুন উচ্চতায়ও উঠবেন। আরও ট্রফি জিতবেন, নিজের আর দলের। রেকর্ডে রাঙাবেন। মুগ্ধতা ছড়াবেন। বিস্ময় জাগাবেন। সবই হবে। তবে, আমার ক্লাবের জার্সিতে তো নয়…!

দলের চেয়ে বড় কেউই নয়। ক্লাবের প্রতি আমার ভালোবাসাও অটুট থাকবে। কিংবা আরও বাড়বে সময়ে। গলা ফাটাবো, সাফল্য আসবে। সঙ্গে আক্ষেপটাও থাকবে, আহারে, রোনালদো নেই!

রোনালদো আসার প্রায় ১১ বছর আগে থেকে রিয়াল সমর্থন করি। তবু কেবলই মনে হয়, রোনালদো ছাড়া রিয়াল যেন কখনও ছিলই না! রোনালদো রিয়ালের নন, এমন কিছু যেন কখনই ঘটেনি। এরকম কিছু ছিল না…

ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, রিয়াল মাদ্রিদ, ব্যালন ডি-অর

রিয়াল আর রোনালদো তো এক নি:শ্বাসেই বলার অভ্যাস। এখন মাঝে একটু দম ছাড়তে হবে, সেই দমটা যেন ভেতর থেকে আসতেই চায় না…!

যার জন্য রিয়ালকে সমর্থন করা শুরু, সেই রাউলকে যেতে হয়েছে। যার জন্য রিয়ালের প্রতি ভালোবাসা তীব্রতর হয়েছে, সেই ক্যাসিয়াসকে যেতে হয়েছে। সময়টা আসেই। রোনালদোর সময়ও আসবে, জানতাম। ভাবনাটাকে তবু প্রশ্রয় দিতাম না। এখন সত্যিই হয়ে গেল! একদিন তার পথচলা থামবে জানতাম। তবু থামাটা যেন বিশ্বাসই হতে চাচ্ছে না…!

চাইলে বলা যায় একটি অধ্যায় শেষ হলো। একটি ইতিহাসের পর্দা নামল। কিন্তু সেসব তো কতজনের ক্ষেত্রেই সত্যি। রোনালদো সেই সীমানা ছাড়িয়েছেন কবেই। রোনালদোর রিয়াল অধ্যায় ছিল আমার একটা জীবন। অদ্ভূত সুন্দর জীবন। আহারে, সেই জীবনটা থেমে গেল…।

জীবন থামলেও তো অনুভূতি থামে না। রোনালদো মানে তাই সবার আগে রিয়ালের রোনালদোই। শুরুতে যে লিখেছি, “রিয়াল মাদ্রিদ নামের অনুভূতির তীব্রতম প্রকাশ রোনালদো… “, খুব সতর্ক হয়েই সেখানে “ছিলেন” লিখিনি। কারণ এই অনুভূতির মৃত্যু নেই…

হয়তো এই লেখাকে মনে হতে পারে আবেগের বাড়াবাড়ি। কী করব, রোনালোদা সেই বাড়াবাড়িটা আদায় করে নিয়েছেন…!

শুরুর কথাটি আরেকবার বলছি, ডি স্টেফানো শুনেছি। পড়েছি। ক্রিস্তিয়ানো দেখেছি। অনুভব করেছি। আমার কাছে আমার ক্লাবের সবসময়ের সেরা ক্রিস্তিয়ানোই…।

সর্বকালের সেরা ক্লাবের সর্বকালের সেরা ফুটবলার। স্পেশাল শব্দটিই তার সঙ্গে জুড়ে স্পেশাল হয়ে ওঠে…!

থ্যাংকস ফর এভরিথিং, চ্যাম্প…!

Comments
Spread the love