ছোটখাটো এক ভদ্রমহিলা। বয়স ৮৭। বয়সের ভারে কুঁজো হয়ে হাঁটেন। ষাটের দশকে এদেশে এসেছিলেন বরিশাল অক্সফোর্ড মিশনে গরীব শিশুদের পড়াতে। কিন্তু পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধের সময় এদেশের মাটি ও মানুষের সাথে নতুনভাবে পরিচিত হন তিনি। প্রাণের মায়া তুচ্ছ করে এদেশে যুদ্ধাহত মানুষের সেবাশুশ্রূষা করেছেন, নিজদেশ ইংল্যান্ডে মুক্তিযুদ্ধের জন্য তুলেছেন অর্থ তহবিল। দেশ স্বাধীনের পরে সিদ্ধান্ত নেন, এদেশেই থেকে যাবেন তিনি। এখানে থেকে এদেশের অসহায় মানুষের সহায় হবেন তিনি। এরপরে কেটে গেছে জীবনের ৫৮ টি বছর! পাঠক, বলছিলাম বরিশালের মিস লুসি হেলেন ফ্রান্সিসের কথা।

১৯৩০ সালের ১৬ ডিসেম্বর ইংল্যান্ডে জন্ম নেন মিস লুসি। ইচ্ছা ছিল দুঃখী অসহায় মানুষের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করবেন। এই স্বপ্ন নিয়ে ১৯৬০ সালে মিস লুসি বাংলাদেশে আসেন। সেখানে গরীব ও অনাথ শিশুদের শিক্ষকতা শুরু করেন তিনি। বরিশাল অক্সফোর্ড মিশনের পরে যশোর ক্যাথলিক স্কুলে যোগদান করেন তিনি। ভালোই চলছিল তার শিক্ষকতা, ঠিক এমন সময়ে ১৯৭১ সালে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ।

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবার পর চার্চটি বন্ধ করে মিশনের সবাই খুলনায় নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান। কিন্তু মিস লুসি পালিয়ে না গিয়ে বরং ছুটে যান যশোরের ফাতেমা হাসপাতালে। সেখানে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা, নারী, পুরুষ, শিশুর দুর্ভোগ দেখে আপ্লুত লুসি অসহায় মানুষদের সেবা দিতে চান। ভিনদেশী দেখে সেখানকার ডাক্তাররা প্রথমদিকে সম্মতি না দিলেও তার আগ্রহ দেখে পরে সম্মতি দেন। এরপরে গোটা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেই তিনি ফাতেমা হাসপাতালে সেবা দিয়ে গেছেন।

দেশ স্বাধীনের পরেও তিনি বাংলাদেশের অসহায় মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। প্রায় চুয়াল্লিশ বছর স্বেচ্ছাসেবার পর ২০০৪ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। কিন্তু অবসরের পরও বাংলাদেশেই রয়ে যান তিনি।

অবসর নেয়ার পর মিস লুসি ভিসা নবায়ন ফি দিতে সমস্যায় পড়ছিলেন। ফি মওকুফসহ বাংলাদেশি নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করেন বরিশাল জেলা প্রশাসক বরাবর। তার সেই আবেদন জেলা প্রশাসন থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদানের কোন নথিপত্র না থাকায় সে আবেদন খারিজ করে দেয়া হয়। এরপরে ১৯৭৩ সালে তাকে লেখা শেখ রেহানার একটি চিঠি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পরে প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসে।

এরপরই গত ৮ ফেব্রুয়ারি বরিশালের ঐতিহাসিক বঙ্গবন্ধু উদ্যানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে ১৫ বছরের ভিসা ফি মুক্ত পাসপোর্ট পান মিস লুসি। এর চারদিন পরে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে তাকে পূর্ণ নাগরিকত্ব প্রদানের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। খুব শিগগিরি তাঁর হাতে নাগরিকত্বের কাগজপত্র পৌঁছে যাবে বলে জানিয়েছেন বরিশালের জেলা প্রশাসক মো. হাবিবুর রহমান।

এক সাক্ষাৎকারে তাকে জিজ্ঞেস করা হয়, এত দেশ রেখে বাংলাদেশেই কেন? তাও  আবার এতগুলো বছর!

জবাবে হেসে তিনি বলেন,

“১৯৬০ সালে যখন এদেশে আসি, তখনো কিন্তু ভাবিনি এখানেই থেকে যাব। ইচ্ছা ছিল কিছু বছর এখানে অসহায় শিশুদের জন্যে কাজ করে ফের অন্য কোন দেশে পাড়ি জমাব। কিন্তু এরপরে ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের সময় এ দেশকে, এদেশের মানুষকে আমি অন্যভাবে জানতে শিখি। আমার জন্মদিন ১৬ই ডিসেম্বর, বাংলাদেশের জন্মদিনও ১৬ই ডিসেম্বর। ব্যাপারটা কাকতালীয়, কিন্তু এই মুক্তিযুদ্ধ আর ১৬ই ডিসেম্বর আমাকে অদ্ভুত এক মায়ায় বেঁধে ফেলে। আমি চাই মৃত্যুর পর আমাকে যেন বরিশালের মাটিতেই সমাধিস্থ করা হয়।”

বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারকে খুব পছন্দ করতেন মিস লুসি। মিস লুসি প্রায়ই বলতেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার কথা জানতে পারলে অবশ্যই তাকে এদেশের নাগরিকত্ব দেবেন। মিস লুসির সে আশা রেখেছেন জননেত্রী শেখ হাসিনা। তিনি এখন তার ভালোবাসার দেশ বাংলাদেশের নাগরিক। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত এদেশেই কাটাতে চান বংলাদেশের এই ভিনদেশী বন্ধু।

Comments
Spread the love