খেলা ও ধুলা

ভালোবাসা, নাকি শো-অফ?

বাংলাদেশ-জিম্বাবুয়ে টেস্ট দিয়ে দেশের অষ্টম টেস্ট ভেন্যু হিসেবে অভিষেক হয়েছে সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট স্টেডিয়ামের। স্বাভাবিক একটা টেস্ট ভেন্যুর মতোই চলছে সবকিছু; ব্যাটসম্যানরা রান পেয়েছেন, বোলারেরা পেয়েছেন উইকেট। তবে এমন একটা ব্যাপারও সিলেটে নিয়মিত ঘটে চলেছে, যেটা আসলে ঘটা উচিত নয়। প্রতিদিনই দর্শল গ্যালারী থেকে কেউ না কেউ নিরাপত্তাবেষ্টনী ভেদ করে ঢুকে পড়ছে মাঠে, ছুটে যাচ্ছে খেলোয়াড়দের দিকে। সিলেট টেস্টে তিনদিন খেলা হয়েছে, এরমধ্যে দুই দিনই এমন কাণ্ড ঘটিয়েছে দুই দর্শক। প্রতিপক্ষ জিম্বাবুয়ে বলে খুব বেশি হইচই হচ্ছে না ঘটনাগুলো নিয়ে, এই জায়গায় ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার কেউ থাকলে তোলপাড় হয়ে যেতো এতক্ষণে। নিরাপত্তা ঝুঁকির অজুহাত তুলে সিরিজ স্থগিত করা হলেও অবাক হবাত কিছু থাকতো না বোধহয়!

সিলেট টেস্টের প্রথম দিনে লাঞ্চের ঘন্টাখানেক পরে এক কিশোর দর্শক হুট করে মাঠে ঢুকে ছুটে গিয়েছিল মুশফিকের দিকে। শুরুতে খানিকটা চমকে গেলেও, মুশফিক পরে জড়িয়ে ধরেছেন ওই ক্ষুদে সমর্থককে। ছুটে আসা নিরাপত্তাকর্মীদের কাছ থেকেও আগলে রেখেছেন তাকে। দর্শক বয়সে ছোট হোক কিংবা বড়, এভাবে কাউকে গ্যালারী ছেড়ে মাঠে ছুটে আসতে দেখলে ক্রিকেটারেরা স্বাভাবিকভাবেই একটু নার্ভাস বোধ করবেন, কার মনে কি আছে বলা তো যায় না। সেদিন বাংলাদেশের হয়ে সংবাদ সম্মেলনে আসা আবু জায়েদ রাহীও স্বীকার করেছেন, এমন ঘটনায় ভড়কে গিয়েছিলেন তারা। 

ভাইরাল, দর্শক, সিলেট টেস্ট

সবশেষ ঘটনাটা গতকালের। পিটার মুরকে সবে আউট করেছেন তাইজুল, বাংলাদেশ দল তখন উদযাপনে ব্যস্ত, গ্যালারীতেও আনন্দের ঢল। হুট করেই তখন জিম্বাবুয়ের ড্রেসিংরুমের পাশ দিয়ে এক দর্শক ঢুকে পড়লো মাঠে, যেন গ্যালারীতে আনন্দ করে তার পোষাচ্ছিল না, শখ হয়েছিল মাঠে নেমে খেলোয়াড়দের সঙ্গে কোলাকুলি করে উদযাপন করার! সেই শখ পূরণ করতেই এই বাঁকা রাস্তা বেছে নেয়া!

সিলেট স্টেডিয়ামের এই হাস্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, কতটা অনিরাপদ আমাদের খেলোয়াড়েরা। এই কিশোর ছেলেটি, বা গতকাল ঢুকে পড়া যুবকের জায়গায় তো উন্মাদ ফ্যানাটিক টাইপের কেউও থাকতে পারতো। জঙ্গীবাদ তো এখনও দেশ থেকে নির্মূল হয়নি, কোমরে অস্ত্র গুঁজে রেখে এভাবেই কেউ তো গ্যালারী থেকে নেমে যেতে পারতো মাঠে। ‘পাগলাটে সমর্থকের কাণ্ড’ বলে উপেক্ষা করার চেষ্টা করে লাভ নেই, সামান্য সুঁই যে কখন বুলেট হয়ে ঢুকবে, সেটা কেউ আগে থেকে বলতে পারে না।

আর নিরাপত্তাকর্মীদের কথা কিইবা বলা যায়। রোগী মরিয়া যাওয়ার পরে যেমন ডাক্তার আসে, আসামী পালাইয়া যাওয়ার পরে যেমন পুলিশ আসে, তেমনই লঙ্কাকাণ্ড ঘটে যাওয়ার পরেই মাঠে তারা ঢোকেন। হম্বিতম্বি করেন মাঠে ঢুকে পড়া দর্শকের সঙ্গে, এমন একটা ভাব দেখান, যেন এই মূহুর্তে তাকে সরিয়ে নিতে না পারলে বিশ্বযুদ্ধ বেঁধে যাবে! অথচ সেই দর্শক যখন তাদের নাকের ডগার ওপর দিয়ে মাঠে প্রবেশ করেছিল, তখন তারা ঠিকই নাকে তেল দিয়ে ঘুমিয়েছিলেন! এই ঘটনার দায় নেয়ার বেলাতেও তাদের তীব্র অনীহা! বিসিবি দায়ী করে স্টেডিয়ামের স্থানীয় নিরাপত্তারক্ষীদের, স্থানীয়রাও আবার বিসিবির নিজস্ব কর্মীদের ঘাড়ে দোষ চাপায়। ক্রিকেটের চাইতে ব্লেম গেমটাই বেশি খেলা হচ্ছে যেন সেখানে! 

ভাইরাল, দর্শক, সিলেট টেস্ট

শুরুর ঘটনাটা মনে আছে? ২০১৬ সাল, আফগানিস্তান সিরিজ। সপ্তাহখানেক পরেই ইংল্যান্ড দল আসবে বাংলাদেশে, নানা টালবাহানার পরে। এর আগে কয়েক দফা নিরাপত্তাহীনতার অজুহাত দেখিয়ে সিরিজ স্থগিত করেছে অস্ট্রেলিয়া। আফগানিস্তানের বিপক্ষে সিরিজটা তাই ইংল্যান্ড সিরিজের ড্রেস রিহার্সেল ছিল। মিরপুরে তখন নিরাপত্তাব্যবস্থার ভীষণ কড়াকড়ি। সেই কড়া সিকিউরিটি সিস্টেমকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েই গ্যালারী থেকে এক দর্শক নেমে গেল মাঠে! সেই দর্শককে মাশরাফির আগলে ধরে রাখার ছবিটা ভীষণ জনপ্রিয়, ম্যাচ শেষে মাশরাফি অনুরোধও করেছিলেন, সেই তরুণকে যেন কিছু করা না হয়।

মাশরাফি ভালোমানুষ, তিনি ঔদার্য দেখিয়ে সেটা বলতেই পারেন। অনেকের কাছেই হয়তো এগুলো দর্শক-সমর্থকদের ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। কিন্ত বাস্তবতা হচ্ছে, আইসিসি এগুলো মানবে না। ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার মতো দলগুলো এসব ঘটনাকে হালকাভাবে দেখবে না মোটেও, যেভাবে আমরা দেখি। তারা এটাই চিন্তা করবে, সাধারণ একজন দর্শক যদি ফাঁকফোকর গলিয়ে মাঠে ঢুকে যেতে পারে, প্রশিক্ষিত একটা টেরোরিস্টের পক্ষে তো ম্যাসাকার ঘটিয়ে ফেলা সম্ভব এখানে। আমরা হয়ত অনেককিছুই আমলে নেই না, পাত্তা দেই না। কিন্ত ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলো নিজেদের দলকে কোথাও পাঠানোর আগে প্রতিটা খুঁটিনাটি ঘটনাও বিশ্লেষণ করে। আমরা তো আবেগে ভেসে বলে ফেলি, ওরা আমাদের দেশে খেলতে আসতে ভয় পায়। বাস্তবতাটা কিন্ত ভিন্ন। 

ভাইরাল, দর্শক, সিলেট টেস্ট

ভাইরাল হবার নেশাটা একটা বড় নেশা। আপনার কি ধারণা, এই যে লোকজন হুটহাট মাঠে ঢুকে যাচ্ছে সবার চোখ এড়িয়ে, এটা নিখাদ ভালোবাসা থেকে করছে তারা? মিরপুরের শেরে বাংলায় ঢুকে পড়া সেই তরুণ তো এর আগেও মাশরাফিকে কাছে পেয়েছেন, ছবি তুলেছেন তার সঙ্গে। তাছাড়া মাশরাফি দূর আকাশের নক্ষত্রও নন। ট্রেনিং সেশনের আগে-পরে মিরপুরে গেলে শুধু মাশরাফি নয়, সব ক্রিকেটারেরই দেখা পাওয়া যায়। অনুরোধ করলে তারা সেলফি তুলতেও অমত করেন না।

তাহলে একটা আন্তর্জাতিক ম্যাচ চলাকালে এভাবে মাঠে ঢুকে পড়ার কারণ কি? কারণ একটাই, ভাইরাল হওয়া। বন্ধুবান্ধব, পরিচিতজন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মূহুর্তের মধ্যে আলোচিত একজনে পরিচিত হবার নেশায় পড়েই এই মানুষগুলো প্রলুব্ধ হচ্ছে এমন কাজ করতে। কিন্ত সেটা যে বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্যে ভালো কিছু নয়, সেটা এদের কে বোঝাবে? ওই কিশোর ছেলেটার কথা বাদ দিলাম, পঁচিশ-ত্রিশ বছরের যুবকেরা যারা এসব রাস্তা বেছে নিচ্ছে, তাদের কি ভালো-মন্দের জ্ঞানটা নেই? এই জিনিসটা যে খুব সেনসেটিভ, এটার ফলাফল যে খারাপ কিছু হতে পারে, এইটুকু বোধশক্তি না থাকলে তো সমস্যা।

তিনদিনের মধ্যে দুইদিনই দর্শক ঢুকে পড়েছে সিলেটের মাঠে। এটা নিয়ে বিসিবির কোন মাথাব্যাথা আছে বলে বোঝা যাচ্ছে না। মাথাব্যাথা নেই দর্শকদেরও। তাদের কেউ হয়তো আজও ‘ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ’ ঘটাতে ফাঁকফোকর খুঁজে নিয়ে ঢুকে পড়বে মাঠে। কাল যদি আইসিসি সিলেটের টেস্ট স্ট্যাটাসই বাতিল করে দেয় নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে, সেটার দায়টা কে নেবে? বিসিবির সচেতন হবার দরকার আছে, নিরাপত্তাকর্মীদের সচেষ্ট হওয়াটা জরুরী, তারচেয়ে বেশি জরুরী বোধহয় দর্শকদের আরেকটু সেন্সিবল হওয়াটা। কমনসেন্স জিনিসটা কাজে লাগানো তো প্রত্যেক মানুষের অবশ্যকর্তব্য।

আরও পড়ুন- 

Comments

Tags

Related Articles