ড. রাশেদ খান:

আমার লেখাপড়ার প্রথম হাতেখড়ি হয় আমার মায়ের হাতে। দিনটি কবে ছিল বা আমার বয়স তখন কত ছিল মনে না থাকলেও ঘটনাটা এখনও স্পষ্ট মনে আছে। সেদিন আব্বা অফিস থেকে ফেরার পথে আমার জন্য একটা “সহজ ধারাপাত” বই কিনে আনেন। আমি তখন বিছানায় শুয়ে, দুপুরের  ঘুম শেষে উঠবো উঠবো ভাবছি। তখন আমার বড় দুই বোন আমাকে উঠিয়ে বইটি দেখায়। তারা খুব উৎসাহ নিয়ে একটা খাতা আর পেন্সিল এনে বই থেকে একটা কিছু দেখিয়ে আমাকে জিজ্ঞাসা করে যে আমি ওটার মতো লিখতে পারব কিনা। আমার ঘুমের রেশ তখনও কাটেনি। ছবিটা ছিল “১”। ঐ অবস্থায় তাদের চঞ্চলতা ও “১” এর ছবি দেখে  অবাক হয়ে বললাম এ তো খুবই সোজা। খুব যত্ন করে লিখেও ফেললাম। কিন্তু ওরা দুজনই খিলখিল করে হেসে  উঠলো। আমি তখনো ওদের হাসির কারণটা বুঝলাম না। একবার বইয়ের  দিকে আরেকবার আমার লেখাটার দিকে দেখছি। মা আব্বার জন্য খাবার রেডি করছিলেন আর আমাদের কর্মকাণ্ড দেখছিলেন। ওদের হাসি দেখে আমাদের কাছে এলেন। আমি তখনো ওদের হাসির কারণ খুঁজছি। মাও আমার লেখা দেখে মুচকি হাসলেন। পরে ওদের হাসি থামিয়ে আমাকে ঐ ছবিটার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। বললেন এটার নাম হলো “এক”। আর আমি উল্টো করে “১” লিখেছি। পরে তিনি বড় করে একটা “১” লিখে দিয়ে পরম যত্ন ভরে আমার হাত ধরে ওটার উপর কয়েকবার ঘুরালেন। মায়ের হাত ধরে এই প্রথম আমার অংক শেখা আর কাঁচা হাতের লেখা শুরু। এভাবেই আমার মতো সবারই প্রাথমিক শিক্ষক আমাদের মা-বাবা। কিন্তু কখনও ভাবিনি একসময় তাদেরও আমার হাত ধরে কোনো কিছুর হাতেখড়ি হবে।

শেষবার যখন মা আমার এখানে ইংল্যান্ডে বেড়াতে এলেন, তখন তার জন্য একটা আইপ্যাড কিনে আনলাম। মা আমার অবাক্ হয়ে বললেন “এইটা দিয়ে আমি কি করব?”। বললাম সবাই যা করে আপনিও তাই করবেন। ছোটো ভাই সারাক্ষণ ওর আইপ্যাড নিয়ে পরে থাকে বলে এই জিনিস তার মোটেই পছন্দ  না। তাই একটু রাগ হয়ে বললেন এইটা একটা ফালতু আর সময় নষ্ট করার যন্ত্র। আমি বললাম আপনি অ-কাজে সময় নষ্ট করবেন না। আপনি চাইলে কোরআন শুনবেন, আমাদের সাথে অনলাইনে কথা বলবেন, আপনার নাতিকে দেখবেন। মা আমার এবার উৎসাহী হয়ে উঠলেন। তারপর তাকে খুব যত্ন নিয়ে অ্যাপ ডাউনলোড করা, সেগুলোর ব্যবহার, ভিডিও কল করা শেখালাম।

দেশে গিয়ে প্রতিদিন তিনি আমাদের ফোন দেন, তার দুই বছরের নাতির সাথে নিজেদের ভাষায় কথা বলেন, ঘন্টা ভরে নাতির ছোটাছুটি দেখেন, আমরাও তার ফেইসবুক দেয়ালে আমাদের ছবি, ভিডিও পোস্ট করি। তিনি পরম মমতা ভরে সেগুলো দেখেন আর লাইক দেন। কিন্তু কমেন্ট করার অতৃপ্তি যে ছিল তা বুঝতে পারিনি। কিছু দিন আগে জানতে চাইলেন ফেইসবুকে বাংলা কমেন্ট কিভাবে করে। ব্যস্ এবার শুরু হলো দূর-শিক্ষণ পদ্ধতি । আমার খালাতো বোন মাকে সহজ একটা বাংলা টাইপিং অ্যাপ ডাউনলোড করে দিল। আমি অনলাইনে দেখালাম কিভাবে যুক্তবর্ণ লিখতে হয়। বাকিটা আমার ষাটোর্ধো মেধাবী জননী খুব সহজেই রপ্ত করে ফেলেন। তিনি এখন সদ্য হাতেখড়ি পাওয়া শিশুর মতো আমাদের ছবি, ভিডিও বা স্ট্যাটাসে লাইক ও কমেন্ট করেন, মেসেজ দেন ফোন করার জন্য। আমি সেগুলো পড়ি আর আমার ছাত্রীর উন্নতি দেখে গর্ববোধ করি। কিন্তু ছাত্র হিসাবে আব্বা খুবই একরোখা। ছেলেমেয়েদের কাছ থেকে কিছু শেখার ইচ্ছা তার কম আর নতুন  কিছু শেখার আগ্রহ নেই বললেই চলে। শিক্ষক হিসাবে আমিও নাছোড়বান্দা। “ক্লাশের দু্র্বল ছাত্রের হাত ছাড়ার মানুষ আমি নই“।

আজ আমার দুই বছরের ছেলের দিকে তাকিয়ে ভাবি একদিন সেও তার সেকেল বাবাকে নতুন কিছু শেখাবে আর তার বৃদ্ধ মেধাবী ছাত্রের উন্নতি দেখে গর্ববোধ করবে।

ড. রাশেদ খান
ইউনিভার্সিটি অফ বোল্টন
ইংল্যান্ড

Comments
Spread the love