‘Gary Chapman’- এর “The Five Love Languages” আমার মহা প্রিয় একটা বই! মূলত, বইটা লেখা হয়েছিলো সংসারী মানুষদের সংসার অটুট রাখার উদ্দেশ্যে, কিন্তু এটি আসলে যেকোনো মানবসংযোগের উপর জব্বর একটা বই! আপনি এই বইটা পড়ুন, আর আপনার যে কোন সম্পর্ক – শুধু প্রেম ভালোবাসা বিয়ের নয় – উন্নত হতে বাধ্য! পাশের মানুষটাকে আরেকটু হলেও চিনতে পারবেন ভালো, এর ভাবনাগুলো পড়লে।

এই বইটির মূল বাণী হচ্ছে, আমরা সবাই তো ভালোবাসি, কিন্তু আমাদের একেকজনের প্রকাশটা হয় একেকরকম ভাবে। সমস্যা তখনই হয়, যখন আপনি একভাবে প্রকাশ করছেন, আর আপনার সঙ্গী বুঝতে পারছেন না আপনি তাকে ভালোবাসেন, কারণ আপনার প্রকাশভঙ্গির ‘ভাষা’টা সে ধরতেই পারছে না। তাই তার আক্ষেপ থেকে যাচ্ছে, আর ভেতরে ভেতরে তীব্র ক্ষোভ দানা বাঁধছে। আপনিও হয়তো প্রত্যাখ্যাত বোধ করছেন, এতো করে ভালোবাসছি, আর এই মানুষটার সাথে তবুও এতো ঝগড়া বাঁধছে কেন? উল্টোটা আপনার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য: আপনার ভাষায় যতক্ষণ না অপরমানুষটা বলছে ‘ভালোবাসি’, আপনিও এক পর্যায়ে গিয়ে একই রকম আক্ষেপ অনুভব করা শুরু করবেন।

এই লেখকের ধারণা, মূলত পাঁচভাবে আমরা ভালোবাসা দেখাই। একেকজন যে শুধু একভাবেই দেখাই, সেটা না, ঘুরে ফিরে ৫টাই হয়তো মেশাই; কিন্তু মূল সুর সাধারণত একটা থাকে, আর সেকেন্ডারি আরেকটা থাকে। আপনি যদি নিজের ভাষাটা বুঝতে পারেন, তাহলে সেটা আপনাকে সক্রেটিসের ‘নিজেকে জানুন’-এর মতোই সাহায্য করবে আপনার সম্পর্কগুলোতে সফল হতে, যদি কখনো আক্ষেপ দানা বাঁধে, বুঝতে পারবেন কেন হচ্ছে সেটা। আপনার জীবনের মানুষগুলোর ভাষাটাও যদি পর্যবেক্ষণে শিখে নিতে পারেন, তাহলে আপনার প্রকাশটাও যথার্থ হবে; সেই সম্পর্কগুলো সুখের হবে।

#

ভাষাগুলো কি কি? – ১) গঠনমূলক কথা [words of affirmation]; ২) মানসম্মত সময় কাটানো [quality time]; ৩) সেবামূলক কাজ [acts of service]; ৪) উপহার [gifts]; এবং ৫) শারীরিক ছোঁয়া [ physical touch]

– প্রত্যেকটির উদাহরণ দিচ্ছি দৈনন্দিনের জীবনের ক্ষেত্রে; আর শেষটি দিয়ে শুরু করছি, কারণ প্রেম ভালোবাসার ক্ষেত্রে শরীরী কিছু’কে সাধারণত আমরা ‘কাম’ মনে করি, এখানে সেটির কথা বলা হচ্ছে না। আপনার কোন বন্ধু কি বান্ধবী নেই, যারা কথা বলতে বলতে আপনার হাতে হাত রাখছে; দেখা হলেই সবার আগে নিজ থেকে এসে জড়িয়ে ধরছে, কিংবা আপনার ক্লান্তি লক্ষ্য করে নিজ থেকেই আপনার চুলে বিলি কেটে দিচ্ছে? এই মানুষগুলো এইসব কাজ করে জানাচ্ছে আপনি তাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মানুষ, আপনাকে ভালো রাখতে তারা চায়।

– উপহার নিছক বিশেষ দিনের উপহার নয়, যেটা দিতে হয় বলে দেয়া। কিছু মানুষ দেখবেন, এই ব্যাপারে বরাবর এক্সট্রা মাইল যায়। হয়তো কখনো কোন দোকানের পাশ দিয়ে হাঁটবার সময় বলেছিলেন, এই দোকানের অমুক খাবার আপনার পছন্দ; একদিন অতর্কিতেই এই মানুষটা সে খাবার নিয়ে হাজির। বা কবে কোন বইয়ের ভক্ত ছিলেন ছোটবেলায়, এই মানুষটা অনেক খুঁজে আপনার জন্মদিনে পাঠিয়ে দিয়েছে ঠিক সেই বইটাই। – আপনার এই ভাষাটা মূল হলে কাউকে উপহার দেয়ার বেলায় হাজারটা জিনিস চিন্তা করেন, কি তার ভালো লাগে, কিভাবে উপহার পেলে তার ভালো লাগবে, চমক দিলে ঠিক কিভাবে দেবেন; – এই যে এতো ভাবছেন, এটাই আপনার ভালোবাসা।

– সেবামূলক কাজ এখানে সমাজসেবার অর্থে বলা হচ্ছে না। স্বামী স্ত্রীর সংসারে দুজনে মিলেই কাজ ভাগাভাগি করে নিয়েছেন; কিন্তু একটি কাজ আপনার স্ত্রীর ভাগ্যে জুটলেও, আপনি খেয়াল করেছেন সেটি করতে তার একদমই ভালো লাগে না। আপনি তখন করে দেন সেটা তার জন্য; এটাই এখানে ‘সেবামূলক কাজ’। আমাদের অনেকেরই বান্ধবী আছে কিছু, কোন দাওয়াতেই চুপ করে বসে থাকবে না, আগে এসে রান্নায় হাত লাগবে, আর সবাই চলে গেলেও সে থেকে গিয়ে রান্নাঘরটা পরিষ্কার করে যাবে। কেউ কেউ নিজে থেকে করে, কেউ কেউ দায়িত্ব ভেবেই করে; আর সাধারণত এই ভালোবাসার প্রকাশটা আমরা অনেকেই এতো সাধারণ ভাবি, কিংবা দায়িত্ব ভাবি, যে সেটা যে ভালোবাসার একটি নিগূঢ় প্রকাশ, সেটি ভুলে যাই।

– মানসম্মত সময় কাটানো এটাই, যে একই ছাদের তলে নিছকই রুমমেটের মতো সময় কাটানো না। চুপচাপ পাশাপাশি বসে থাকাও ভালোবাসা হতেই পারে, যদি ‘আমি তোমার পাশে/কাছাকাছি আছি’, এই বোধটি মনে থাকে। বা খুব ব্যস্ত আছেন, কিন্তু নিজেদের মধ্যে একটি রীতি আছে আপনাদের, সকালের নাস্তা একসাথে করার সুযোগ কিছুতেই বাদ দেবেন না। কিংবা একদঙ্গল বন্ধু আপনারা প্রত্যেক বছর অমুক দিনে অমুক স্থানে গেট টুগেদারের আয়োজন করবেনই। এই সময় বের করাটা, সেটাও ভালোবাসারই বহিঃপ্রকাশ!

– গঠনমূলক কথা হচ্ছে সেই কথাগুলো যেটি একজন মানুষকে গড়ে তোলে, তাকে আশার বাণী শোনায়। আপনার আশপাশে কিছু মানুষ আছে দেখবেন, আপনার গোমড়ামুখ দেখলে জানতে চাইবে কি হয়েছে? তারপর নিজে থেকেই আপনাকে সাধ্যমতো চেষ্টা করবে দু চার কথা বলে মন ভালো করতে। অথবা, হুট করে মাঝে সাঝে বলে বসবে, “তোমাকে যে আমি খুব পছন্দ করি, তা কি তুমি জানো?” এই সব মানুষগুলোর গভীরতম অনুভূতির প্রকাশ ঘটে শব্দে, তবুও তাদের মনে হয়, ঠিকমতো তো কিছু বলাই হলো না আসলেই কতটা ভালোবাসি!

#

এই বইটা পড়তে পড়তে আমার মনে হয়েছে আমার নিজস্ব মূল ভাষা হচ্ছে “words of affirmation”। আমি নিজে এভাবে ভালোবাসা দেখাই, আর আমার সবচাইতে কাছের মানুষগুলোর মূলভাষা এটি যদি নাও হয়, যদি হঠাৎ এই সুরে তারা মনোভাব ব্যক্ত করে ওঠে, সেই রেশটুকু দিনের পর দিন ধরে রেখে আমার দিব্যি মন ভরে যায়। ঠিক এমন ভাবে, যদি কখনোই না শুনতে পাই তো মনে দ্বিধা তৈরী হয়, মন তো খারাপ হয়ই!

না, আমাকে মুখ ফুটে ‘ভালোবাসি’ বা ‘তুমি কত ভালো’, এভাবেই যে বলতে হবে, এমনটা নয়। আমার বেস্ট ফ্রেন্ড আমার ঠিক উল্টো, এই জিনিসটা তার আসেই না! কিন্তু আমি বইটা পড়েছি বলে, এই জিনিসটা ধরতে শিখেছি বলে বুঝতে পারি, তার মানে এই নয় সে আমাকে ভালোবাসে না। তার মানে শুধু এই, যে তার প্রকাশভঙ্গিটা ভিন্ন। সেই মেয়েটার মূলভাষা হচ্ছে “acts of service” (যেটি আমার মধ্যে থাকলেও, সেটি আবার আমার লিস্টের নিচের দিকে)। তাই সে যখন হঠাৎ করে “words of affirmation” দিয়ে ফেলে, সেটি যেমন আমার মন ছুঁয়ে যায়, তেমনই আবার আমার চেষ্টা থাকে আমাদের সম্পর্কে যেন আমার দিক থেকে “acts of service” থাকে। আর যদি কোনদিন একান্তই তার কাছ থেকে আমার “words of affirmation” দরকার পড়েই যায়, আমি সেটা চাইতে শিখেছি, তার সাথে এই ব্যাপারটা নিয়ে আলাপ করতে শিখেছি; নইলে দেখা যাবে আমার মাঝে অভিমান তৈরী হচ্ছে, অথচ বেচারী বুঝতেই পারছে না সেটা।

অবশ্যই, সব সম্পর্কে আর সব সময়ের ক্ষেত্রে এই কথাগুলো প্রযোজ্য নয়। কিন্তু কেউ আপনার জীবনে দিনের পর দিন আছে, সে মানুষটা আপনার কাছে খুব প্রিয় আর খুব জরুরি, আপনি কি চাইবেন না, আপনাদের দুজনের পথচলাটা আরেকটু মসৃণ হোক, সুখের হোক? যে পাঁচটি ভাষার কথা বললাম, প্রেমের সম্পর্কগুলোর শুরুর দিকে সেগুলো আপনাতেই আসে, কিন্তু যত সময়ঘড়ির কাঁটা ঘোরে, জীবনের আশপাশটা বদলাতে থাকে, সেই পরিবর্তনগুলো সম্পর্কেও এসে পড়ে। তখন মনে হতে থাকে, আগে তো এমন হতো, এখন আর আগের মতো নেই। আর তেমন ক্ষেত্রেই যদি আমরা বুঝতে শিখে যাই প্রকাশভঙ্গির তারতম্যগুলো, তখন নিজের চাওয়াপাওয়া গুলো যেমন আরো স্পষ্ট বুঝতে পারবো, প্রিয় মানুষটিকেও তখন ভালো রাখতে পারবো।

আর এই ভালো থাকা ও ভালো রাখার নামই কি ভালোবাসা নয়?

– আমি এই বইটির কাছে কৃতজ্ঞ, সেই কবে পড়েছি, এখনো যখনই কোন মানুষ আমার কাছের হয়ে যায়, আমার চেষ্টা থাকে তার ভাষাটি বুঝতে, এবং, নিজস্ব স্বকীয়তা ও সততা বজায় রেখেই, তাকে জানাতে, “এই যে মানুষ! আপনি/তুমি/তুই আমার জন্য জরুরি, আমি তোমার বোঝার মতো করে বলতে এসেছি, আমি তোমাকে ভালোবাসি”।

Comments
Spread the love