যেকোন ভালোবাসার সম্পর্কই, হোক সেটা বাবা-মায়ের সাথে সন্তানের, ভাইবোনের মধ্যে, প্রেমিকের সাথে প্রেমিকার কিংবা বন্ধুর সাথে বন্ধুর, কিছু অতি পরিচিত নিয়ম মেনে চলে। ভালোবাসার সম্পর্কের গতি-প্রকৃতি খুব দ্রুতই রঙ পাল্টাতে থাকে। আর তাই সম্পর্কের ব্যাপারে যারা খুব বেশি সচেতন নয়, তাদের কাছে প্রায়সই বিষয়গুলোকে অতিমাত্রায় জটিল ও ধোঁয়াটে বলে মনে হয়। আর এজন্য কম বিড়ম্বনাও পোহাতে হয় না। সেজন্যই আসন্ন ভালোবাসা দিবসকে সামনে রেখে পাঠকদের সামনে আমরা তুলে ধরছি ভালোবাসার সম্পর্কের এমনই দশটি নীতি, যা তাদের আজীবন কাজে লাগবে।

১০/ বিশ্বাস খুবই ভঙ্গুরঃ যেকোন সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো বিশ্বাস। বিশ্বাসের মাধ্যমেই গড়ে ওঠে একটি সম্পর্ক। একজন মানুষ যখন আরেকজন মানুষকে বিশ্বাস করতে শুরু করে, কেবলমাত্র তখনই তাদের মধ্যে প্রথম সম্পর্কের অন্তরঙ্গতা গড়ে ওঠে। তাই বলা হয়ে থাকে, কাউকে ভালোবাসা যতটা না কঠিন, তারচেয়েও বেশি কঠিন কাউকে বিশ্বাস করতে পারা। কিন্তু এই বিশ্বাসই আবার এক অতি স্পর্শকাতর বস্তু। যদি কখনও ভালোবাসার মানুষদের মধ্যে বিশ্বাসের খামতি দেখা দেয়, তবে তখন তা সর্ববিনাশী রূপ ধারণ করতে পারে। এই বিশ্বাসহীনতা ক্রমশই বাড়তে থাকে, এবং এক পর্যায়ে তা সম্পর্ককে শেষ পর্যন্ত করে দিতে পারে।

৯/ অনেক সময়ই বিরক্তি আসতে পারেঃ একটি সম্পর্ক তখনই জমাট বাঁধে যখন দুজন মানুষ একে অপরের সঙ্গ উপভোগ করে। কিন্তু তাই বলে এই উপভোগের বিষয়টিও আপেক্ষিক, এবং সময়ের সাথে পরিবর্তনশীল। সবসময়ই যে পরস্পরের সান্নিধ্য উপভোগ্য হবে, তেমনটি নয় মোটেই। বরং কখনও কখনও একে অপরের সঙ্গ বিরক্তিরও উদ্রেক ঘটাতে পারে। আর তখন একসাথে সময় কাটানোর চেয়ে হয়ত একা থাকতে, বই পড়তে বা মুভি দেখতে, কিংবা অন্য বন্ধুদের সাথে ঘুরতে যেতে বেশি ভালো লাগতে পারে।

৮/ সবসময়ই মতের মিল হবে নাঃ এটি অবশ্যই সত্য যে সমমনা ব্যক্তিদের মাঝেই সম্পর্কের অন্তরঙ্গতা তৈরি হয়। কিন্তু এর মানে এই নয় যে যেকোন বিষয়েই দুজন ব্যক্তি সবসময় একই সিদ্ধান্তে উপনীত হবে। মনে রাখা জরুরি, প্রতিটি মানুষেরই স্বাতন্ত্র্য ব্যক্তিসত্ত্বা আছে, নিজস্ব মতামত ও মূল্যবোধ রয়েছে। আর তাই কোন একটি বিষয়ে দুজন ব্যক্তি দ্বিমত পোষন করতেই পারে।

৭/ বিয়ে ও সন্তান কোন অপশন নয়, এগুলো চ্যালেঞ্জঃ এই বিষয়টি কেবল প্রেমিক-প্রেমিকা বা স্বামী-স্ত্রীর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। অনেক প্রেমিক-প্রেমিকাই মনে করে, তাদের মধ্যে ক্রমশ যে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে, বিয়ে করে ফেললে তা ঘুচে যেতে পারে। আবার স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বনিবনা না হলে, নিজেদের মধ্যে হারানো উষ্ণতা ফিরিয়ে আনতে তারা সন্তান নেয়ার কথা চিন্তা করে। কিন্তু মনে রাখা দরকার, বিয়ে বা সন্তান উৎপাদন কখনোই সমস্যার সমাধান হতে পারে না। সম্পর্কে যদি আগে থেকেই ফাটল ধরে থাকে, এগুলো সেই ফাটল কমাতে পারবে না, বরং আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। বিয়ে বা সন্তান উৎপাদন খুবই চ্যালেঞ্জিং বিষয়। তাই সবধরণের প্রস্তুতি নিয়ে তবেই এসব পথে পা মাড়ানো উচিৎ।

৬/ আকর্ষণ চিরস্থায়ী নয়ঃ যেকোন সম্পর্কের সূচনাতেই দুজন ব্যক্তির মধ্যে প্রবল আকর্ষণ থাকে। পারস্পরিক যেকোন বিষয়ে তারা আকৃষ্ট হতে থাকে, আর এ বিষয়টিই তাদেরকে কাছাকাছি নিয়ে আসে। কিন্তু মনে রাখা দরকার, এ আকর্ষণ খুব বেশিদিন থাকে না। দুজন ব্যক্তি যখন একে অপরকে ভালো করে চিনে ফেলে, তখন আর তাদের মধ্যে শুরুর মত আকর্ষণ থাকা সম্ভব না। বরং অনেকক্ষেত্রেই শুরুর আকর্ষণটা একঘেয়েমিতে রূপ নিতে পারে।

৫/ একাকীত্ব অস্বাভাবিক নয়ঃ কোন সম্পর্কের মাঝে থাকা মানেই যে কোন ব্যক্তি আর একাকীত্বে ভুগবে না, এটি খুবই ভ্রান্ত একটি ধারণা। একজন মানুষ চারপাশে নানান মানুষের সাথে নানান ধরণের সম্পর্ক দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকতে পারে। কিন্তু তারপরও কখনও কখনও এমন সময় আসতেই পারে যখন তার নিজেকে প্রচন্ড একা মনে হবে, কেউ তাকে বুঝতে পারে না বা বুঝতে চায় না এমন মনে হবে। আর এর ফলে মানসিকভাবে অবসাদ্গ্রস্তও হয়ে পড়াও খুবই স্বাভাবিক বিষয়।

৪/ মনে কুচিন্তার আগমন ঘটতে পারেঃ দুজন ব্যক্তির পক্ষে সারাজীবনই একে অপরকে সহ্য করে চলা সম্ভব নয়। একটা সময় আসবে যখন পরস্পরের মুখদর্শনেও প্রবল বিতৃষ্ণা জাগতে পারে মনে। আবার সেই সময়গুলিতে অতি সাধারণ সব ইস্যুতেও ঝগড়া বাধতে পারে। আর এর দরুণ মনে হতেই পারে যে এ সম্পর্ককে আর টেনে নিয়ে যাওয়ার কোন মানেই হয় না। কথা বলা বন্ধ করে দেয়া, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলা, দূরে কোথাও চলে যাওয়া, ডিভোর্স দিয়ে দেওয়া (বিবাহিতদের ক্ষেত্রে) ইত্যাদি নানা বিচিত্র চিন্তা মাথায় এসে ভর করতে পারে।

৩/ দূরত্ব সৃষ্টি হতে পারেঃ সম্পর্ক যতই ঘনিষ্ঠ হোক না কেন, একটি পর্যায়ে এসে সেখানে দূরত্ব সৃষ্টি হতে পারে। এই দূরত্ব যে কেবল পরস্পরের মনোমালিন্য বা বিবাদের কারণেই হবে তা না। কাজের ব্যস্ততা, একজনের বিদেশ গমনে, স্থান পরিবর্তন ইত্যাদি কারণেও দূরত্ব সৃষ্টি হতে পারে। এর ফলে অনেকদিন যাবত দেখাসাক্ষাৎ তো দূরে থাক, কথাবার্তাও বন্ধ থাকতে পারে। আবার অনেক সময় কোন কারণ ছাড়াই মনে হতে পারে যে কিছুদিন যোগাযোগ বন্ধ রাখা হোক।

২/ একে অন্যের কষ্টের কারণ হতে পারেঃ বলা হয়ে থাকে, একজন ভালোবাসার মানুষের পক্ষেই সম্ভব জীবনে সবচেয়ে বড় আঘাতটা দেয়া। এ আঘাত শারীরিক আঘাত নয়, মানসিক। ভালোবাসার মানুষেরা একে অপরের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম গোপন কথাও জানে। পরস্পরের ব্যাপারে কোন কিছুই তাদের অজানা নয়। তাই অনেক সময় দেখা যেতে পারে যে কোন একটি ঝগড়ার ফাঁকে একজন স্রেফ কথার মাধ্যমে অপরজনের খুব দুর্বল কোন জায়গায় আঘাত দিয়ে বসল। আর এর মাধ্যমে শুরু হতে পারে বর্ণনাতীত কষ্ট।

১/ ভালোবাসা পরিচর্যা ছাড়া বাঁচে নাঃ কারও কারও কাছে ভালোবাসা একটি বিশেষ্য, একটি অনুভূতির নাম। কিন্তু অনেকের কাছেই আবার ভালোবাসা একটি ক্রিয়াপদ, এক জটিল কর্মপ্রক্রিয়া। শুধু অনুভূতির জোরেই কোন সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা সম্ভব না। কারণ মানুষের মন খুবই বিচিত্র। ফলে খুব দ্রুতই সেখানে অনুভূতির পরিবর্তন আসতে পারে। আবার একটি গাছের যেমন বেড়ে উঠতে সঠিক পরিচর্যার প্রয়োজন, ভালোবাসার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। যে ভালোবাসার সম্পর্কে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহানুভূতি, সহমর্মিতা, বিপদে আপদে সবসময় পাশে থাকার মানসিকতা প্রভৃতি না থাকে, এক সময় সেই সম্পর্কে ভাঙন আসবেই।

ভালোবাসার সম্পর্কের যে দশটি নীতির কথা উল্লেখ করা হলো, এর কোনটিই কিন্তু সম্পর্কের শেষ পরিণতি নয়। এগুলো স্রেফ সম্পর্কের দশটি অবস্থা বা দশা। আর এই দশটি অবস্থাই সাময়িক। সমস্যাটা হয় তখনই যখন কোন ব্যক্তি এগুলোকেই চূড়ান্ত পরিণতি ভেবে নিয়ে সম্পর্কের ইতি টানতে চায়। সেটি খুবই অনুচিত একটি কাজ। সম্পর্কের মত গতিশীল একটি প্রক্রিয়ায় চড়াই উৎরাই থাকবেই। সম্পর্কের ইতিবাচক অবস্থাগুলোকে যেমন হাসিমুখে উপভোগ করা হয়, নেতিবাচক অবস্থাগুলোতেও যদি মাথা ঠান্ডা রেখে সেগুলোর মোকাবেলা করা যায়, কেবলমাত্র তবেই একটি ভালোবাসার সম্পর্ককে আজীবন টিকিয়ে রাখা সম্ভব। সকলের ভালোবাসা চিরজীবী হোক।

তথ্যসূত্র- ব্রাইটসাইড

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-