অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্যএরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

বিশাল কারাগারের এক নিঃসঙ্গ কয়েদী

বিশাল একটা দূর্গ। পর্তুগীজরা যখন ভারতে এসেছিল, তখনকার সময়ে বানানো এটা। বয়স প্রায় পাঁচশো বছর। এখানে সেখানে ক্ষয়ে গেছে, কয়েকটা দালান হয়ে গেছে নড়বড়ে। হেরিটেজ সাইট হিসেবে এটাকে ঘোষণা দেয়ার দাবী তুলেছে পরিবেশবাদীরা। তবে আপাতত দূর্গের একটা অংশ ব্যবহৃত হচ্ছে জেলখানা হিসেবে। কয়েকশো বছর আগে পর্তুগীজরা যখন এখানে ছিল, তখনও দূর্গের এই অংশটাকে জেলখানা হিসেবেই ব্যবহার করতো তারা। কিন্ত মজার বিষয় কি জানেন? প্রায় বিশ কক্ষের এই জেলখানাটায় বর্তমানে কয়েদী আছেন মাত্র একজন! আর তাকে পাহারা দেয়ার জন্যে এখানে কারারক্ষী হিসেবে কর্মরত আছেন পাঁচজন পুলিশ! আছেন একজন জেলারও!

ত্রিশ বছরের দীপ কাঞ্জির বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি স্ত্রীকে বিষপ্রয়োগে হত্যা করার চেষ্টা করেছিলেন। মামলাটা আদালতে এখনও বিচারাধীন। আটক হওয়া দীপক কাঞ্জি এখন বন্দী জীবন পার করছেন গুজরাটের দিউ জেলায় সাগরের মাঝখানে একটা দ্বীপে অবস্থিত এই কারাগারে। এটা আসলে একটা পরিত্যাক্ত পর্তুগীজ দূর্গ। শত শত বছর আগে সামুদ্রিক জাহাজকে দিকনির্দেশনা দেয়ার জন্যে লাইটহাউজ বানানো হয়েছিল এখানে, যদিও ঝড়ে সেটা ধ্বসে গেছে অনেক আগেই। বিশাল এলাকাজুড়ে এই দূর্গের অবস্থান, সেটার ভেতরেই ছোট একটা অংশে কারাগার স্থাপন করেছিল ভারত সরকার। সেই কারাগারে এখন একমাত্র কয়েদী দীপক কাঞ্জি! 

দীপক কাঞ্জি, গুজরাট, পর্তুগীজ, বন্দী, জেলখানা

কয়েক মাস আগেও ছয়জন বন্দী ছিলেন এখানে, তাদের মধ্যে দুজন ছিলেন নারী। তাদের দেখভালের জন্যে নারী পুলিশও মোতায়েন ছিল দূর্গে। তবে বাকী পাঁচজনকেই গুজরাটের আম্রেলিতে নতুন স্থাপিত হওয়া একটা কারাগারে বদলী করা হয়েছে। তারা সবাই সাজাভোগী আসামী। দীপকের মামলাটা এখনও বিচারাধীন হওয়ায় ঝুলে আছে তার ভাগ্য। আর সেকারণেই বিশাল এই কারাগারে তাকে জীবন কাটাতে হচ্ছে একদম একাকী!

একশো বর্গফুটের ছোট্ট একটা কক্ষে দিনের বাইশ ঘন্টা কাটাতে হয় দীপক কাঞ্জিকে। সেই কক্ষে টেলিভিশন আছে, তবে দূরদর্শন আর আধ্যাত্মিক টিভি চ্যানেলগুলো ছাড়া অন্য কিছুর দেখা মেলেনা সেখানে। একটা হিন্দি পত্রিকা আর গুজরাটি ম্যাগাজিন দেয়া হয় তাকে। বিকেলের সময়টাই একটু ভালো কাটে তার, চারটা থেকে ছয়টা, এই দুই ঘন্টা তাকে দুর্গের চত্বরে ঘোরাফেরার অনুমতি দেয়া হয়। পুরো কারাগারে আর কোন বন্দী না থাকায় দায়িত্বরত পুলিশেরাই সঙ্গে দেয় দীপককে। তাদের সঙ্গেই আড্ডা জমে দীপকের। ঘড়িতে ছয়টা বাজলেই আবার ঢুকে যেতে হল সেলে। সারাটা রাত সাগরের গর্জন শুনেই কাটাতে হয় বন্দী দীপক কাঞ্জিকে, একদম একাকী। 

দীপক কাঞ্জি, গুজরাট, পর্তুগীজ, বন্দী, জেলখানা

পাঁচজন গার্ড পালা করে দায়িত্ব পালন করেন। নিজেদের মধ্যে শিফট ভাগাভাগি করে নিয়েছেন তারা। এখানে খাবারের কোন ব্যবস্থা নেই, তাই কাছের একটা হোটেল থেকে কিনে আনতে হয় খাবার। দূর্গের ভেতরে দর্শনার্থীদের প্রবেশের অনুমতি আছে, তবে কারাগারের অংশটা দেয়াল তুলে আলাদা করা, সেদিকে আসতে পারেন না কেউ। জেলারের পরিবারের বসবাসের জন্যে দুর্গের ভেতরেই কয়েকটা ঘর পরিস্কার করা হয়েছিল, তবে সেখানে কেউ থাকেন না। শত শত কক্ষ আছে গোটা দূর্গে, কয়েকটা বাদে প্রায় সবগুলোই তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। পুরাতত্ত্ব অধিদপ্তর থেকে মাঝেমধ্যে লোক এসে পরিস্কার করে যায়। জেলখানার বিশটা কক্ষেরও একই অবস্থা, দীপকের সেল ছাড়া বাকীগুলো সারাবছর তালাবদ্ধই থাকে।

একা দীপককে এখানে কেন রাখা হয়েছে? এই প্রশ্নের জবাবে সহকারী জেলার চন্দ্রহাস ভজা জানিয়েছেন, দীপকের মামলাটা চলছে দিউ’র সেশন কোর্টে। একারনেই তাকে এই কারাগারে রাখা হয়েছে। আম্রেলিতে যে বড় কারাগারটা তৈরি করা হয়েছে কয়েক বছর আগে, সেটা এখান থেকে প্রায় একশো কিলোমিটার দূরে। সপ্তাহে বা পনেরো দিন পরপর একজন বন্দীকে শুনানীর জন্যে এতদূরে নিয়ে আসাটা প্রায় অসম্ভব। তাই মামলা যতোদিন চলবে, ততদিন বন্দী দীপক কাঞ্জিকে এখানেই রাখা হবে। মামলার রায়ে সাজা হলে হয়তো আম্রেলি বা অন্য কোন কারাগারে তাজে বদলী করা হবে। আর তখন দিউর এই বিশাল দূর্গে স্থাপিত কারাগারটা বন্ধ করে দেয়া হবে চিরতরে। 

দীপক কাঞ্জি, গুজরাট, পর্তুগীজ, বন্দী, জেলখানা

দিউ’র ডিস্ট্রিক্ট কমিশনার জানিয়েছেন, দীপকের মামলার রায়ের জন্যে অপেক্ষা করছেন তারাও। তাদের পরিকল্পনা আছে জায়গাটাকে ট্যুরিস্ট সাইট হিসেবে তৈরি করার। মূল স্থাপত্য ঠিক রেখে কিছু অংশের সংস্কার করা হবে জেলার পর্যটন অধিদপ্তরের তরফ থেকে। কিন্ত সেটা আপাতত সম্ভব হচ্ছে না কারাগারের কারণে। একারণেই পুরো জেলার একমাত্র বন্দী দীপক কাঞ্জির মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি চান তারাও।

রোজ বিকেলে দুর্গের ভেতরে জেলখানার চত্ত্বরে হাঁটতে বেরিয়ে পুলিশদের সঙ্গেই কথাবার্তা বলে দীপক। তাদের সঙ্গে ভালো বন্ধুত্ব হয়ে গেছে তার। প্রতিদিনই তার একটা নিয়মিত প্রশ্ন থাকেই, তার মামলাটার কি অগ্রগতি, সেটা জানতে চায় দীপক। পুলিশ সদস্যেরা নিজেরাও খুব একটা বেশি জানেন না মামলার ব্যাপারে, তারা তাই দীপককে পরবর্তী শুনানীর দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলেন। এভাবেই দিনগুলো কেটে যায়, রাত আসে। সেই রাতগুলোয় ভর করে ভীষণ একাকীত্ব। বন্দী কারাগারে পাখির ডানায় চড়ে দিন পালায় না। বিশাল এই কারাগারে একা একজন বন্দী দীপক কাঞ্জি, তার কাছে নিশ্চয়ই প্রতিটা সেকেন্ডকেই একেকটা দিনের সমান লম্বা বলে মনে হয়!

তথ্যসূত্র- হিন্দুস্তান টাইমস।

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close