দৃশ্যটা একবার কল্পনা করুন তো! লন্ডনের মাটিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী কমনওয়েলথ সম্মেলনে যোগ দিতে গেছেন, এমন গুরুত্বপূর্ণ এক আয়োজনের ভেতর সম্মেলনকেন্দ্রের বাইরে একদল মানুষ ঠান্ডা মাথায় ব্যান্ড বাজিয়ে বিচিত্র আর কুৎসিত ভঙ্গিতে নাচা-কুঁদো করছেন আর চরম সাম্প্রদায়িক ও নির্লজ্জ স্লোগান দিচ্ছেন এইভাবে: “হরে কৃষ্ণ হরে রাম, শেখ হাসিনার বাবার নাম!”

না পাঠক, আপনাকে কষ্ট করে কল্পনা করতে হবে না। এমন ভয়ংকর সাম্প্রদায়িক উসকানি ও নির্লজ্জ কুৎসিত ঘটনাটা সত্যিই ঘটেছে, ফেসবুকে ইতিমধ্যে ভাইরাল হয়ে গেছে এই ভিডিওটি। এতে দেখা যাচ্ছে বিএনপির নেতাকর্মীরা জাতীয় পতাকাটা পেছনে রেখে একের পর এক কুৎসিত আর জঘন্য সব স্লোগান দিয়ে যাচ্ছে, যার ভেতর চরম সাম্প্রদায়িক উসকানি দেওয়া ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের সেই কুখ্যাত স্লোগানটিও আছে। সেই একাত্তরের আগে থেকেই মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামীসহ ধর্মান্ধ মৌলবাদী দলগুলো আওয়ালীলীগকে মালাউনদের দল গালাগালি করতো এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ভারতের চর হিসেবে মিথ্যাচার চালাতো। সেই মিথ্যাচার পঁচাত্তরের পর থেকে রুপ নেয় চরম জঘন্য আর বিকৃত অপপ্রচার আর প্রোপাগান্ডায়।

হরে কৃষ্ণ, হরে রাম, শেখ হাসিনার বাপের নাম—এই স্লোগানটি দিয়ে আসলে ধর্মান্ধ মৌলবাদী রাজাকারেরা বোঝাতে চাইতো যে বঙ্গবন্ধু হিন্দু ছিলেন, একাত্তরে কোন মুক্তিযুদ্ধ হয়নি, হয়েছিল পাকিস্তান ভাঙ্গার ষড়যন্ত্র এবং বঙ্গবন্ধু ভারতের এজেন্ট হিসেবে মুসলমানের দেশ পাকিস্তান ভেঙ্গে দেন। এই জঘন্য মিথ্যাচারটা রাজাকার ও রাজাকারদের উত্তরসূরিরা চালাতো মুলত এদেশের ধর্মপ্রাণ জনগণকে বিশেষ করে মুসলিম জনগোষ্ঠীকে বিভ্রান্ত করতে। আজ এতো বছর পর লন্ডনের মত অভিজাত ও সুসভ্য একটি শহরে দাঁড়িয়ে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীরা নেচেকুঁদে এই পুরনো অপপ্রচারটা চালিয়ে বুঝিয়ে দিল যে, তারা একবিন্দু পাল্টায়নি, গত ৪০ বছর ধরে যে অসংখ্য রাজাকার এবং যুদ্ধাপরাধীরা দেশ ছেড়ে পালিয়ে লন্ডনে ঘাঁটি গেড়েছে, এরা তাদেরই উত্তরসূরী। বুক ঠুকে বিএনপি-জামায়াতের কর্মীরা এটা প্রমাণ করলো যে তারা নির্লজ্জ কুখ্যাত রাজাকারের সন্তান, বাপের নাম উজ্জ্বল করা বংশধর!

অনেকেই হয়তো ভাবছেন, বিএনপি-জামায়াতের কর্মীরা তাদের রাজাকার বাপ-দাদার পরিচয় চিৎকার করে জানাতে চাইছে, তাতে আমাদের মাথাব্যাথা কেন হবে? আমাদের মাথাব্যাথা হবে এই কারণে যে তারা এখানে নিজেদের দেশের পরিচয় দিতে ব্যবহার করছে দেশের লাল-সবুজ পতাকা।বাংলাদেশের কিছু নাগরিক ভিনদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে জাতির জনকের বিরুদ্ধে চরম সাম্প্রদায়িক আর উগ্র ধর্মান্ধের মত উসকানি দেবে, এটা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য ভয়ংকর লজ্জার। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই তীব্র রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকে, সেটা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক, আলোচনা-সমালোচনা সবই হয়, কিন্তু কোন দেশের নাগরিক কখনো এভাবে নিজের দেশকে, জাতির জনককে ভিনদেশের মাটিতে অপমান করে না, অপদস্থ করে না। অথচ এরা রাজনৈতিক প্রতিবাদের অজুহাত দেখিয়ে ভিনদেশের মাটিতে খুব ঠাণ্ডা মাথায় নেচেগেয়ে অপমান করছে জাতির জনককে। বুঝিয়ে দিচ্ছে যে সেই একাত্তরে তাদের বাপ-দাদারা যেমন বাংলাদেশ চায় নাই, বেইমানী করেছে এই দেশের মাটির সাথে, মানুষের সাথে, তারাও ঠিক সেই একই উদ্দেশ্য আর লক্ষ্যে কাজ করছে, পার্থক্য শুধু এই যে কাজটা করতে তারা ব্যবহার করছে দেশের পতাকা, বাংলাদেশী পরিচয়, চরমভাবে অপমান করছে দেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদী পরিচয়কে!

খুব অদ্ভুত হলেও সত্য, এই যে হিন্দু ধর্ম এবং ভারতকে উদ্দেশ্য করে এতো জঘন্য আর কুৎসিত উসকানি দিল এরা, এতে কিন্তু কার ধর্মানূভুতিতে আঘাত লাগেনি। কেউ এর প্রতিবাদ করেনি। অথচ কয়েকদিন পর পর এই দেশে কিছু মানুষ ধর্মানুভুতিতে আঘাত হানার মিথ্যা অজুহাত তুলে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী সংখ্যালঘুদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে, সম্পদ লুটপাট করে, মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে উগ্র সাম্প্রদায়িক উসকানি ছড়িয়ে অত্যাচার করে। মিথ্যা অজুহাত তুলে উসকানী দিয়ে অত্যাচার চালানোর সময় এদের প্রথম সারিতে পাওয়া গেলেও ভিনদেশের মাটিতে উগ্র ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক উসকানী দিয়ে বাংলাদেশকে অপমান করার পরেও এখন পর্যন্ত সেসব ধর্মের স্বঘোষিত হেফাজতকারীরা একটা টু শব্দও করেনি। এমনকি সুশীলেরাও চুপ! এই জঘন্য সমাবেশের নেতৃত্ব দেওয়া যুক্তরাজ্য বিএনপি’র সভাপতি এম এ মালেকের বিরুদ্ধে তার নিজের দল তো দূরে থাক, লন্ডনের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও কোন ব্যবস্থা নেয়নি। কি অদ্ভুত না?

চলুন এবার দু’মাস আগে ফিরে যাই। এতিমের টাকা নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পাঁচ বছরের কারাদন্ড এবং তারেক জিয়াসহ অন্যান্য আসামীদের ১০ বছরের কারাদন্ড সাথে দুর্নীতি করে সরানো টাকার সমপরিমাণ অর্থদন্ডের রায় ঘোষণার পর লন্ডনে বিএনপির নেতাকর্মীরা কি করেছিল, মনে আছে? রায় হয়েছিল ঢাকায়, কিন্তু এই রাজাকারের বংশধরেরা প্রতিবাদের নামে লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনে ন্যাক্কারজনক হামলা চালিয়েছিল। শুধু তাই নয়, পুরো হাইকমিশনে তাণ্ডব চালিয়ে আসবাবপত্র ভাংচুর করেছিল এবং বাঁধা দিতে গেলে দূতাবাসের কর্মচারীদের উপর আক্রমণ চালিয়ে মারধর করে দূতাবাসের সম্পত্তি ভাঙচুর করেছিল। এরপর বঙ্গবন্ধুর ছবি টেনে বাইরে নিয়ে গিয়ে একযোগে জুতা দিয়ে ছবির উপর মেরেছিল, পদদলিত করেছিল। এই জঘন্যরকমের ভয়াবহ ঘটনার নেতৃত্বেও ছিল যুক্তরাজ্য বিএনপি’র সভাপতি এম এ মালেক। কি, এবার কিছু বোঝা যাচ্ছে?

পৃথিবীর প্রত্যেকটা দেশেই ভিনদেশের হাইকমিশন বা অ্যাম্বাসী সেই দেশের প্রতিনিধিত্ব করে।! তাই দূতাবাসের সম্পত্তি ধ্বংস করা মানে রাষ্ট্রের সম্পত্তি ধ্বংস করা এবং দূতাবাসে আক্রমণ করার বাংলাদেশকে আক্রমণ করার শামিল। সুতরাং যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের হাইকমিশনে আক্রমণ চালানো বাংলাদেশের উপর আক্রমণ চালানোর শামিল। এমন জঘন্য আর গর্হিত কাজ করার পরেও, জাতির জনকের ছবিকে এভাবে অপমানের স্পর্ধা দেখানোর পরেও এম.এ মালেক কিংবা অভিযুক্ত বিএনপি নেতাকর্মীদের কিছুই হয়নি। ঠিক যেভাবে গত ১০ বছর ধরে লন্ডনে রাজকীয় হালে বসবাস করছে আদালতে স্বীকৃত অপরাধী বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান তারেক জিয়া। সুতরাং বিএনপি এই আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে এই চিন্তাটাই হাস্যকর। আর যেহেতু এই প্রমাণিত অপরাধী ও যুদ্ধাপরাধীদের বংশধরদের যুক্তরাজ্য সরকার রাজকীয় হালে লালনপালন করছে, সুতরাং লন্ডনের মাটিতে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে এমন আক্রমণ এবং বাংলাদেশের জাতির জনককে এতো জঘন্য অপমান করার পরেও লন্ডন কর্তৃপক্ষ এর বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেবে, সেটাও দুরাশামাত্র। মুখে মুখে সারাবিশ্বের গণতন্ত্র আর অসাম্প্রদায়িকতার ধ্বজাধারী সাজা এই ব্রিটিশরা যে কত বড় ভন্ড আর ক্রিমিনাল জাতি, চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী আর সর্বোচ্চ আদালতে প্রমাণিত অপরাধীদের লালনপালন তার অন্যতম বড় এক প্রমাণ!

কিন্তু যেটা খুবই অদ্ভুত লাগলো সেটা হচ্ছে ভিনদেশের মাটিতে এমন নির্লজ্জ উগ্র সাম্প্রদায়িক উসকানির পরেও তাবৎ সুশীল সমাজ ও বুদ্ধিজীবীরা এর প্রতিবাদ জানাচ্ছেন না, কথা বলছেন না। চুপচাপ এড়িয়ে যাচ্ছেন। লন্ডনে বাংলাদেশের দূতাবাসের উপর ভয়ংকর হামলা, ভাংচুর, লুটপাট, দূতাবাসের কর্মীদের আহত করার পরেও তারা কোন কথা বলেননি। বিদেশের মাটিতে বিএনপির মত একটা রাজনৈতিক দলের কর্মীরা দেশের প্রায়ই দেশকে এভাবে অপমান করছে, ছোট করছে অথচ এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার, বিচার দাবী করার ক্ষেত্রে তাদের পাওয়া যায় না।

যে জাতিগত পরিচয়ে এই লোকগুলো বসবাস করছে, সেই বাংলাদেশী পরিচয়টা এনে দেওয়ার জন্য যে মানুষটা তার সারাটা জীবন আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে কাটিয়ে দিলেন, জীবনের সাড়ে ১২ বছর জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দী থাকলেন, এই দেশের নাম বাংলাদেশ হিসেবে যিনি ঘোষণা করেছিলেন ১৯৬৯ সালে, নিজের জনগণকে সন্তানের মত ভালোবাসার অপরাধে, তাদের অন্ধের মত বিশ্বাস করার অপরাধে যাকে সপরিবারে ব্রাশফায়ার করে ঝাঁজরা করে ফেলা হলো, নিজের জনগণের জন্য, বাংলাদেশের জন্য নিজের জীবনটা পর্যন্ত দিয়ে গেলেন, সেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে এরা আজো, স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরেও নিরলসভাবে অপপ্রচার আর মিথ্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে। ভাবতে কষ্ট হয়, ঘৃণার মাথায় আগুন ধরে যায়।

ভিনদেশের মাটিতে সাম্প্রদায়িক ও উগ্র ধর্মীয় উসকানী ছড়িয়ে জাতির জনককে অপমান করা এবং রাষ্ট্রীয় দূতাবাস অর্থাৎ রাষ্ট্রের উপরেই হামলা চালিয়ে দেশের ভাবমূর্তি ধ্বংস করা এবং বঙ্গবন্ধুর ছবি ভাংচুর করে, জুতা ছুড়ে মেরে অপমান করা যুক্তরাজ্য বিএনপি’র সভাপতি এম এ মালেক এবং তার মত কুলাঙ্গার দেশদ্রোহীগুলোকে অবিলম্বে বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনে দ্রুত এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবী জানাই সরকারের কাছে!সরকার যেন এই বিষয়টি গুরুত্ব দেয়, অতি দ্রুত যথাযথ পদক্ষেপ নেয়। যেন আর কেউ কখনো রাজনৈতিক প্রতিবাদের অজুহাতে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার নামে এমন জঘন্য কাজ করার সাহস না পায়!

ভিডিও দেখুন এখানে ক্লিক করে।

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-