রিডিং রুমলেখালেখি

সাহিত্যের জন্য গঠনমূলক সমালোচনা কেন জরুরী?

বইমেলা দরজায় কড়া নাড়ছে, ফেব্রুয়ারি ২০১৮কে সামনে রেখে প্রকাশক-লেখকগন ব্যস্ত ডিসেম্বর থেকেই। নিঃশ্বাস নেবার অন্ত নেই তাদের। ইতোমধ্যে অনেকের বই প্রকাশও হয়েছে, অনেকের হচ্ছে। লেখকগণ নিজের বইয়ের সর্বোচ্চ প্রচার শুরু করবেন জানুয়ারী থেকেই। প্রচারণা অন্যায় নয়, বরং প্রচারবিহীন অনেক সমৃদ্ধ লেখাও আলোর মুখ দেখেনা। সাহিত্যে আলোর মুখ বলতে পাঠকের হাতে লেখকের সৃষ্টি পৌছানো। এসময়ে শৌখিন অথবা নিজের নামের পাশে বইয়ের সংখ্যা ভারীকরা লেখকদের সংখ্যা বাদ দিলে যারা সাহিত্যকে ছড়াতে চান তারা খেঁটে চলেছেন প্রতিনিয়ত। বইমেলায় পাঠককূল নতুন বই কিনবেন দেদারছে। পছন্দের লেখকের বই কিনবেন, পড়বেন, দুদিন পরে থেমে যাবেন। প্রকারন্তে কি হল? কিছুই না।

একজন লেখক তার লেখার বিষয়বস্তু ঠিক করেই লেখেন, যা পরে পাঠককে আনন্দ দেয় আবার কিছু লেখা পাঠকের জানার গভীরতাকে সমৃদ্ধ করে, সেটা কবিতা বা গল্প-উপন্যাস যাই হোক। একজন পাঠক লেখকের সেই সৃষ্টি নিয়ে ভাববেন, তার মনে প্রশ্ন জাগবে, লেখকের লেখার বিষয়বস্তু এমনকি লেখনশৈলী নিয়ে মন্তব্য করবেন। আর তখনই একটা লেখা বা লেখকের সৃষ্টি এমনকি লেখক নিজে আরো বেশি সমৃদ্ধ হবেন, প্রতিউত্তরে নিজের ভাবনা জানাবেন। ভুলগুলো পরবর্তিতে সুধরে নিজেকে ছাড়িয়ে যাবেন। তাতে তার ভাবনার প্রকাশ পাবে। নিজে শিখবেন তার সৃষ্টিও আলোচিত হবে, প্রচার হবে অতঃপর অন্য আরো পাঠক আগ্রহ বোধ করবেন। আর এভাবেই সাহিত্য ছড়িয়ে পড়বে। এই প্রসঙ্গে দুটো উদাহরণ দিতে চাই।

সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যখন ধারাবাহিকভাবে ‘পালামৌ’ লিখছিলেন হঠাৎ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ওনাকে চিঠি লিখে বসলেন। চিঠিটি খুব গভীরভাবে নেড়ে চেড়ে দেখলেন, হ্যাঁ স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের চিঠি। পড়ার পরে সঞ্জীবচন্দ্র দুটো বিষয় ভেবেছিলেন, এক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার লেখা পড়েন। এবং শুধু আনন্দ নিতে পড়েন না বরং তিনি তার বিস্তীর্ণ লেখালেখির ফাঁকে ‘পালামৌ’ পড়ার সময়ও বিশ্লেষণ করেই পড়েছেন এবং পরে লেখাটির সমালোচনা করেছেন। সঞ্জীবচন্দ্র তারপরে আর লেখাটি থামাননি। রবীন্দ্রনাথ পরে আবার চিঠি দিয়েছেন, সঞ্জীব তাও শুনেননি। এরপরে তিনি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কেও চিঠি দিয়েছিলেন ভাই সঞ্জীবের পালামৌ সম্পর্কে। তাতেও কাজ হয়নি, অগত্যা কী আর করার। রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং ‘পালামৌ’ উপন্যাসের প্রতি পর্বের একটা একটা সমালোচনা বা রিভিউ ধারাবাহিকভাবে পত্রিকায় প্রকাশ করতে শুরু করেন। তবে কোথাও তিনি ব্যক্তি সঞ্জীবচন্দ্রের সমালোচনা করেননি বরং প্রশংসা করেছিলেন।

সঞ্জীবচন্দ্রকে তখনো খুব বেশি পাঠক চিনত না। কিন্তু সেই সমালোচনার পরে তার ঈর্ষনীয় লেখনশৈলী নিয়ে মন্তব্য করেছেন ওই সময়কার বাংলা সাহিত্যের দিকপালগণ।

এরপরে বহুকাল গেল, সবে শুরু হয়েছে সাহিত্যের আন্দোলন হাংরি জেনারেশন। এই আন্দোলনে দলে দলে ভিড়েছেন পঞ্চাশে পরের উঠতি সাহিত্যিকরা। উদ্দেশ্য বাংলা সাহিত্যকে তারা সার্বজনীন করবেন। কাঠমোকে ভেঙে নতুন গতিপথ তৈরি করবেন। কে শোনে কার কথা, তখন ধরলেন বড় কৈ, অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনাবলীর সমালোচনা, প্রতিষ্ঠানবিরোধী আলোচনা। সাহিত্যের সমৃদ্ধ পাঠকগণ নড়ে চড়ে বসলেন। কী বলতে চায় এরা? তারা পড়া শুরু করলেন সবার লেখা। এর পরপরই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মত তরুন লেখক আরো কিছু বন্ধুবান্ধব নিয়ে শুরু করলেন কৃত্তিবাস নামে সাহিত্যের পত্রিকা। উদ্দেশ্য সাহিত্য রচনায় তরুনদের সহায়তা করা। যদিও পরে কৃত্তিবাসে অনেক গুনী লেখক লিখতেন। তখনো চলছিল রবীন্দ্র রচনাবলীর সমালোচনা। একটা সময় যখন সকল কাব্যই হত রবীন্দ্র থিমে তখন সেটা ধীরে ধীরে লোপ পেতে শুরু করে এবং সভ্যতা বিকাশের সাথে বাংলা সাহিত্য সহজ ও চলিত ভাষায় সুদ্ধ রুপ ধারন করে।

উপরক্ত দুটি উদাহরণ দুই রকম, কোথাও সমালোচনা করেছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, পরে সমালোচিত হয়েছে তার লেখাও। রবী ঠাকুর যখন সমালোচনা করেন তখন তিনি সঞ্জীবচন্দ্রের দারুণ প্রশংসাও করেছিলেন। সাথে সাথে তার লেখায় রবি ঠাকুরের অপছন্দের জায়গা নিয়েও বলেছেন। এতে দুটো জিনিস হয়েছে, সঞ্চীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে ভাবতে বাধ্য করেছে তার লেখায় কোথাও সমস্যা ছিল কিনা, তিনি তার ধারাবাহিক লেখার শেষে কিঞ্চিৎ পরিবর্তন এনেও মৌলিকতা ধরে রেখেছিলেন। কারণ লেখক ভেবেছিলেন তিনি তার জায়গায় ঠিক আর যে কিঞ্চিৎ পরিবর্তন ছিল সেখানেও তিনি বুঝেছিলেন এখানে পরিবর্তন আনা উচিৎ। ধীরে ধীরে সঞ্চীবচন্দ্রের লেখা পাঠকমহল ছাড়িয়ে লেখক শ্রেনীতেও প্রশংসা পেতে শুরু করে। রবীন্দ্রনাথ তার জায়গায় ঠিক ছিলেন তেমনি সঞ্চীবচন্দ্রও সঠিক।

হাংরী আন্দোলনের কর্মিরা ছিলেন মনেপ্রাণে সাহিত্যের ভক্ত, সংঠনের নেতৃস্থানীয় অনেকেই এখনো জীবিত আছেন, লেখালেখি করছেন আপন বলয়ে। আর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আধুনিক কথা সাহিত্যে নিজের স্থায়ী ভিত গড়েই পরলোকে গিয়েছেন। রবীন্দ্র রচনার সমালোচনায় তিনি কখনো পিছপা না হলেও রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা করেছেন তার বইয়ে। ভূয়সী প্রশংসা করেছেন, বিশেষ প্রবন্ধ রচনাও করেছেন। পাঠক মহল তার লেখাকে আলাদা ধাঁরার জ্ঞানগর্ভে নিয়েছেন কিন্তু পরিহার করেননি, লেখক হিসাবে তিনিও পরিত্যার্য্য হননি। একজন লেখক যখন আরেকজনকে সমালোচনা করে থাকেন তখন তার নিজের ভেতরে ভাল করার চরম খিদে তৈরি হয়। কারণ তিনি জানেন এমন কাজের পরে নিজের যোগ্যতা প্রমান করতে না পারলে ছিটকে পড়তে হবে। সুনীল তার প্রতি রচনায় ভেঙ্গেছেন, ধীরে ধীরে নিজেকে ছাপিয়েছেন। বলা চলে তিনি নিজে শুধু রচনা করতেন না, তিনি তার বর্ণনায় প্রতিক্ষণে জানতে ও জানাতে চেষ্টা করেছেন। সুতারং তিনিও ধারণা করতেন এমন অনেক পাঠক সৃষ্টি হবে যারা তার রচনা নিয়েও সমালোচনা করবে।

বর্তমান বাংলাদেশের লেখকগণ হাঁটছেন অন্য পথে, তারা গোত্রবদ্ধ হচ্ছেন। সংগঠন করছেন। সেখানেই মোড়ক উন্মোচন করেন পরে সদস্যরাই বই কিনে ঘর সাজান। কিন্তু তারা যে নিজেদের ভেঙে সবার পাঠক হবেন সেটা হচ্ছে না বললেই চলে। আর তাই পাঠকও বিশেষ গণ্ডি থেকে বের হয়ে নতুন বা অন্যের বই পড়েন কালেভদ্রে। যারা খুব ভাবনা থেকে কোনক্ষণে পছন্দের লেখকের বাইরে গিয়ে বই পড়ছেন তারাও সেটা সম্পর্কে মতামত জানান না, কারণ মতামত শুনবে কে? পাঠকেরও যে গোত্র রয়েছে! আবার লেখক যদি অভিজ্ঞ বা কোনক্রমে পাবলিক ফিগার হয়ে থাকেন সেখানে সমস্যা আরো প্রকট। পাঠক আক্রমণের আশংকায় চরম ভীত থাকেন। এখানে আরো এককাঠি সরেস ধর্মভিত্তিক অথবা আস্তিক-নাস্তিক বিষয়বস্তুতে লেখা বইগুলোর পাঠক। সুতরাং সর্বসাকুল্যে মৌলিক সাহিত্যের কোন আলোচনাই হয় না। সেখানে নতুন বইয়ের তো নয়ই।

সাহিত্য তখনই সমৃদ্ধ হবে যখন লেখকও পাঠক হবেন। একে অন্যের লেখা পড়বেন, আলোচনা করবেন। পাঠকও গণ্ডির বাইরে গিয়ে নতুন নতুন লেখার সাথে পরিচিত হবেন। আর এভাবেই বাংলা সাহিত্য ছড়িয়ে পড়বে পাঠকের কাঁটাতারের সীমানা ছাড়িয়ে।

সাইফুদ্দিন রাজিব
লেখক

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close