কলেজের শেষ বর্ষে থাকতে লিলির দাদা মারা যান। দাদার সাথে খুবই সখ্যতা ও ঘনিষ্ঠতা ছিল লিলির। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে দাদাকেই সবচেয়ে বেশি আপন মনে হতো তার। সেই দাদাই যখন পরলোকগমন করেন, প্রচন্ড রকমের ডিপ্রেশনের মধ্যে চলে যায় লিলি। বেশ কয়েকমাস নিজেকে সামাজিক সকল কার্যক্রম থেকে গুটিয়ে নেয় সে। আর ক্রমশ নিজের মধ্যে গুমড়ে মরতে থাকে। কিন্তু তারপর যখন ডিপ্রেশনের একেবারে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যায় লিলি, তার জীবনের প্রতিটি সম্ভাবনাই একে একে ফিকে হয়ে উঠতে শুরু করে, তার মধ্যে বোধোদয় ঘটে যে এভাবে তো বেশিদিন চলতে দেয়া যায় না। তখন গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে সে। চিন্তা করে নতুন কিছু শুরু করার, যা তাকে নতুন চ্যালেঞ্জের স্বাদ দেবে, এবং ভুলিয়ে দেবে সকল ডিপ্রেশন।

ছোটবেলা থেকেই তার স্বপ্ন ছিল একজন সংগীতশিল্পী ও র‍্যাপার হিসেবে মানুষকে আনন্দ দানের। কিন্তু বড় হয়ে উঠতে উঠতে অন্য আরও অনেক স্বপ্নের মত এই স্বপ্নও একসময় অধরা থেকে যায়। পড়ালেখার চাপে এসব আর করা হয়ে ওঠে না। কিন্তু জীবনের চরম দুঃসময়ে উপনীত হয়ে আবারও নতুন করে এই স্বপ্নই দেখতে শুরু করে সে। এবং এবার নিজেকে প্রকাশের বেশ ভালো একটা প্ল্যাটফর্মও পেয়ে যায় সে। সেটা হলো ইউটিউব। নিজের সঙ্গীত প্রতিভা ও মানুষকে বিনোদিত করতে পারার বিরল মেধাকে কাজে লাগিয়ে সে শুরু করে ভিডিও তৈরি করা। আর সেগুলো আপলোড করতে থাকে নিজের ইউটিউব চ্যানেলে। এ কাজে তার বাবা-মা তাকে অনেক উৎসাহ যোগান। আর বাবা-মাকে পাশে পেয়ে তার মনোবলও এক লাফে কয়েকগুণ বেড়ে যায়।

কিন্তু তাই বলে ভিডিও বানানোর কাজটা নেহাত সহজ ছিল না। নতুন নতুন কনটেন্টের আইডিয়া ভাবতে ভাবতে গলদঘর্ম অবস্থা হতো তার। আক্ষরিক অর্থেই দিনের অধিকাংশ সময় তাকে ব্যয় করতে হতো নতুন ধরণের কনটেন্ট আইডিয়া খুঁজে বের করতে, আর সে অনুযায়ী নিজেকে গড়ে তোলার প্রস্তুতি নিতে। এই প্রবল কাজের চাপে ডিপ্রেশন হয়ত অনেকটাই দূর হয়েছিল তার জীবন থেকে। কিন্তু সে এবার আক্রান্ত হয় নতুন এক মানসিক সমস্যার, সেটি হলো স্ট্রেস।

কর্মজীবী মানুষ মাত্রই জানেন অতিরিক্ত কাজের চাপ জীবনকে কতটা দুর্বিষহ করে তুলতে পারে। এবং সেই একই রকমেরই অবস্থা তৈরি হয়েছিল লিলির মনোজগতেও। কিন্তু তাই বলে সে হাল ছেড়ে দেয়নি। নিজের এইসব মানসিক সমস্যাকে জয় করার এক অদম্য জেদ ভর করে তার মনে। সে চিন্তা করে, এইসব মানসিক ব্যধির কাছে মাথা নোয়ানোর কোন মানেই হয় না।

এদিকে পড়াশোনায় একদমই মন বসছিল না তার। তার বিষয় ছিল সাইকোলজি, এবং এ বিষয়ে মাস্টার্স করছিল সে। কিন্তু এক পর্যায়ে সে উপলব্ধি করে, তার পক্ষে আর পড়াশোনা অব্যহত রাখা সম্ভব না। এবং নিজের মনের বিরুদ্ধে গিয়ে কোন কাজ করে যে সফলতা মিলবে না, সেটাও এতদিনে বেশ ভালোই বুঝে গিয়েছিল সে। তাই পড়াশোনার পাট একেবারে চুকিয়ে ফেলে সে পরিপূর্ণ মনোনিবেশ করে ভিডিও তৈরির কাজে।

ডিপ্রেশান, বিষণ্ণতা, লিলি সিং, ইউটিউবার

নিজের প্রতিটা ভিডিওর শেষে সে দর্শকদের কাছে প্রতিশ্রুতি দিত যে পরের সোমবার বা বৃহস্পতিবারই নতুন কোন ভিডিও নিয়ে হাজির হবে। আর ঠিক ঠিকই তা করত সে। এখন পর্যন্ত একবারের জন্যেও নিজের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেনি সে। কেননা তার কাছে দর্শকদের কাছে নিজের ইতিবাচক ইমেজ ধরে রাখাটাই হলো ‘নাম্বার ওয়ান’ প্রায়োরিটি। আর সেজন্য যেকোন ধরণের কষ্ট মুখ বুজে সহ্য করতে রাজি সে।

আর এই কষ্টের কেষ্টও কিন্তু মিলেছে বেশ ভালোভাবেই। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ইন্টারনেট দুনিয়ায় এক সেনসেশনে পরিণত হয় সে। তার ভিডিওগুলো ভাইরাল হতে থাকে, আর সে পৌঁছে যায় জনপ্রিয়তার শীর্ষে। এবং সেই জনপ্রিয়তা এতটাই বেশি যে এখন পর্যন্ত তার ভিডিওতে মুখ দেখিয়ে গেছেন এমনকি মিশেল ওবামা, মাধুরী দীক্ষিত, সেলিনা গোমেজ, ডোয়েইন ‘দ্য রক’ জনসনের মত অনেক নামজাদা ব্যক্তিত্বও।

যে লিলি ইউটিউবে ভিডিও বানানো শুরু করার আগে ভেবেছিল সর্বোচ্চ ১০০০ সাবস্ক্রাইবারও হয়ত জুটবে না তার কপালে, সেই লিলিরই সাবস্ক্রাইবারের সংখ্যা ২০১৬ সালের শেষ নাগাদ পৌঁছে যায় দশ মিলিয়নের কোঠায়। এবং শুধু ২০১৬ সালেই ৭.৫ মিলিয়ন ডলার আয় করে সে বনে যায় ওই বছরের সবচেয়ে বেশি আয় করা নারী ইউটিউবার, আর সম্মিলিত তালিকায় তার অবস্থান তৃতীয়। 

এভাবেই ডিপ্রেশনকে জয় করে সাফল্যের শিখরে পৌঁছায় লিলি। অন্য আরও অনেক সংগ্রামী ব্যক্তিত্বের মত তাকে হয়ত দারিদ্র্যতা ভোগ করতে হয়নি। কিন্তু তাই বলে সে যে চরম মানসিক দুরাবস্থার মধ্য দিয়ে গিয়েছে, সেটাও কিন্তু যেন তেন কোন বিষয় নয়। আজকের তরুণ প্রজন্মের অনেককে দেখা যায় কেবল ডিপ্রেশনে ভুগে ভুগেই নিজেদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে গলা টিপে মেরে ফেলছে। কিংবা অসৎ সঙ্গে পড়ে, মাদকের নেশায় বুঁদ হয়ে, বিভিন্ন অনৈতিক ও অপরাধমূলক কর্মকান্ডে লিপ্ত হয়ে জীবনের বারোটা বাজিয়ে ফেলছে। তাই ডিপ্রেশনকে খাটো করে দেখার কোন সুযোগ নেই।

বরং যতই দিন যাচ্ছে, আজকের তরুণ প্রজন্মের কাছে ডিপ্রেশনই হয়ে উঠছে সবচেয়ে বড় সমস্যা। আর সেজন্য লিলির জীবনের এই কাহিনী শুধু অনুপ্রেরণাদায়কই নয়, একাধারে শিক্ষামূলকও বটে। এ থেকে আমরা সহজেই অনুধাবন করতে পারি, প্রিয়জন হারানোর বেদনায় ব্যথিত হয়ে কিংবা অন্য যেকোন কারণেই হোক, জীবনে ডিপ্রেশন আসতেই পারে। কিন্তু সেই ডিপ্রেশনকে ঝেড়ে ফেলা সম্ভব নতুন কোন চ্যালেঞ্জ গ্রহণের মাধ্যমে, নিজের প্যাশনকে প্রফেশনে রূপান্তরিত করার মাধ্যমে, এবং সর্বোপরি নিজেই নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার অদম্য ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে।

অর্থাৎ ডিপ্রেশনকে পেছনে ফেলে, কণ্টকাকীর্ণ পথ পাড়ি দিয়ে সাফল্যের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর ক্ষেত্রে ইচ্ছাশক্তিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ডিপ্রেশন যেমন একটি মনোগত সমস্যা, তেমনি মানুষের ইচ্ছাশক্তির উৎসও তার মন। তাহলে পাঠক এখন নিজেই সিদ্ধান্ত নিন, আপনি আপনার মনে কোনটির চাষাবাদ করবেন – ডিপ্রেশনের নাকি ইচ্ছাশক্তির?

তথ্যসূত্র- কেনফলিওস.কম

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-