আধুনিক শহুরে জীবনে দৈনন্দিন এলিভেটর এবং এস্কেলেটর ব্যবহার করা আমাদের অপরিহার্য হয়ে গেছে। রাস্তা ঘাটে চলতে ফিরতে যেভাবে আমরা সচেতনতা অবলম্বন করি ঠিক তেমনিভাবে লিফট এবং এস্কেলেটরও ব্যবহার করা উচিৎ। এখন আমরা জেনে নেবো আমাদের ব্যবহৃত লিফট নিরাপদ আছে কিনা, কিংবা কিভাবে সঠিক মেইন্টেনান্সের মাধ্যমে লিফটের ত্রুটি খুঁজে পাওয়া যায়, এবং এর ব্যবহারকালীন সচেতনতা প্রসঙ্গে বিস্তারিত। নিম্নে উল্লেখিত বিষয়গুলোর মধ্যে যেগুলো বোধগম্য নয়, সেগুলো জানতে এবং নিশ্চিত হতে সংশ্লিষ্ট লিফট সার্ভিস প্রোফাইডারের সাহায্য নিন।

১। কেন ভালো কোম্পানি এবং ভালো ব্র্যান্ডের লিফট ইন্সটল করা উচিৎ? কারণ ভালো কোম্পানির মেইন্টেন্যান্স সিস্টেম অনেকটা আন্তর্জাতিক মানের হয়। আর ভালো ব্র্যান্ডের লিফটে থাকে অসংখ্য সেফটি ব্যবস্থা, যা অনাকাংখিত দুর্ঘটনা এড়াতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশে এই ধরণের এলিভেটর কোম্পানির সংখ্যা খুবই কম।

২। থ্রি-ফেজ লাইন বা বিদ্যুতের সঠিক সরবরাহ নিশ্চিত করা। ভবনে নিজস্ব সাবস্টেশন থাকলেও লিফটের জন্য আলাদা AVR (অটোমেটিক ভোল্টেজ রেগুলেটর) যুক্ত করা। ভোল্টেজ আপ-ডাউন লিফটের জন্য ক্ষতিকর। ক্ষতিকর হতে পারে এর ব্যবহারকারীদের জন্য।

৩। লিফট যতগুলো ফ্লোরে ডোর ওপেন/ক্লোজ হয় ঠিক ততগুলো ফ্লোরের ডোরে রয়েছে সেফটি লাইন। এটি কেবিন ডোরেও রয়েছে। যদি এই সেফটি লাইনের কোন একটি ডোর যে কোন সমস্যার কারনে পুরোপুরি ক্লোজ না হয় তাহলে লিফট রানিং হবেনা। ডোরের এই সেফটি লাইন বাইপাস করা থাকলে যে কোন সময় ঘটতে পারে ভয়াবহ দুর্ঘটনা।

৪। কেবিন ডোরে দুই টাইপের সেন্সর আছে। একটা ফুল হাইট সেন্সর আরেকটা স্পট সেন্সর। এর পাশাপাশি রয়েছে ওপেন লিমিট সেন্সর এবং ক্লোজ লিমিট সেন্সর। যেই টাইপেরই সেন্সর হোক না কেন, তা সঠিকভাবে কাজ করে কি না চেক করুন। চেক করবার সময় যদি দেখেন টাইম লিমিট শেষ হবার পর ডোর স্লোলি ক্লোজ না হয়ে হাই স্পীডে ক্লোজ হচ্ছে, সে ক্ষেত্রে ডোর ইনভার্টার বা অন্য কোন সমস্যা থাকতে পারে। বেশীরভাগ লিফটেই কেবিন ডোরে ATL বার থাকেনা। যেগুলোতে আছে তা কাজ করে কি না চেক করুন। ডোরে সেন্সর আছে কিন্তু কখনোই কাজ করেনা, মানে সেটি বাইপাস করা আছে। দ্রুত চেঞ্জ করতে হবে। এই সেন্সরের পাশাপাশি যদি ডোর সেফটিও বাইপাস থাকে সে ক্ষেত্রে মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা শতভাগ।

৫। লিফট শ্যাফটের বোটম এবং টপে রয়েছে কমপক্ষে ছয়টি সেফটি লিমিট সুইচ। স্পীড বিবেচনায় এই লিমিট সুইচের সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে। এই গুরুত্তপুর্ন সেফটি সুইচগুলো বাইপাস করা আছে কি না চেক করে নিন।

৬। যদি কখনো কোন কারনে লিফট গ্রাউণ্ডে অথবা রুফটপে আঘাত করে সে ক্ষেত্রে শ্যাফটের পিটে হাইড্রোলিক বাফার, স্প্রিং বাফার এবং রাবার বাফার ফিক্স করা থাকে প্রটেক্ট দেবার জন্য। এই বাফারগুলো ঠিক আছে কি না চেক করে নিন। যদি হাইড্রোলিক বাফার হয় তাহলে ওয়েল থাকা বাধ্যতামূলক। সাধারণত দেড় মিটারের বেশি স্পীডের লিফটের হাইড্রোলিক বাফার গুলো সেফটি সুইচ আছে, সেটি কাজ করে কিনা চেক করে নিন।

৭। লিফটের কেবিন থেকে মেশিনরুম এবং রিসিভশন পর্যন্ত অ্যালার্ম + ইন্টারকম সিস্টেম আছে কি না। থাকলে সেটি ইলেক্ট্রিসিটি থাকা আর না থাকা অবস্থায় কাজ করে কি না তা চেক করে নিন। লিফট রানিং অবস্থায় ইলেকট্রিসিটি চলে গেলে কেবিনে অটোম্যাটিক ইমার্জেন্সি লাইট জলে কি না দেখুন।

৮। স্পীড গভর্নর ইমার্জেন্সি সেফটি গিয়ার, এটি লিফটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেফটিগুলোর মধ্যে অন্যতম। ধরেন আপনার ব্যবহৃত লিফট এক মিটার স্পীডের। এখন যদি কোন অনাকাংখিত দুর্ঘটনাজনিত কারনে অথবা লিফটের সবগুলো রুপ ছিঁড়ে গিয়ে আপনার লিফট সেই এক মিটার স্পীড লিমিট ক্রস করে দেড় দুই বা তারও অনেক বেশি স্পীডে চলতে শুরু করে, তাহলে তাৎক্ষনিকভাবে মেকানিক্যাল মেকানিজমের মাধ্যমে এই সেফটি এমনভাবে কাজ করবে আপনার মনে হবে কেউ হাইড্রোলিক ব্রেক চেপে ধরলো। সুতরাং এই সেফটি ওকে থাকলে রুপ ছিঁড়ে গেলেও লিফট সহ আপনি একেবারে নিচে পড়বেন না। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য এই দেশে অসংখ্য নিন্মমানের লিফটে এই অতি গুরুত্বপুর্ন সেফটি ব্যবস্থা নেই। আবার অনেকগুলোতে আছে কিন্তু সঠিকভাবে অ্যাডজাস্ট করা নেই, কাজ করে না।

৯। স্পীড গভর্নরের মেশিনরুম সেফটি, পিট সেফটি এবং কার সেফটি সুইচ কাজ করে কি না তা চেক করে নিন।

১০। অনেক লিফটে রুপ জাম্প গার্ড থাকে। যেসব লিফটে এটি আছে তা সঠিকভাবে কাজ করে কি না চেক করে নিন।

১১। মেইন রুপের স্লিপিং যদি ওভার মনে হয় সে ক্ষেত্রে রুপ ক্লিনিং এর ব্যাপারে সচেতন হোন। ওভার স্লিপিং মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে।

১২। লিফটের ডোর পুরোপুরি ওপেন না হলে কেবিনে ঢোকা বা বের হওয়া থেকে বিরত থাকুন।

১৩। ডোর ক্লোজ হয়ে যাচ্ছে ঠিক এমন মুহুর্তে দৌড়ে এসে ডোরের মাঝে হাত বা পা দিয়ে ওপেন করবার চেষ্টা করা থেকে বিরত থাকুন। কারন আপনি অনেক সময়ই জানেন না সেই লিফটের সেন্সর কাজ করে কি না, বা করবে কি না। সে ক্ষেত্রে পুশ বাটনে প্রেস করাই উত্তম। না হলে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা থাকে।

১৪। লিফটের ওভারলোড সিস্টেম একটিভ করা আছে কি না তা চেক করুন। এটি ইন-একটিভ থাকলে অতিরিক্ত লোডের ফলে মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

১৫। যদি গিয়ারবক্স গিয়ার ওয়েল যুক্ত জয় সে ক্ষেত্রে বছরে এক বা একাধিকবার গিয়ার ওয়েল চেঞ্জ করুন। মোটর বাইক বা গাড়িতে যেমন হাজার কিলোমিটার (+-) এর মধ্যে লুব্রিকেটিং চেঞ্জ করতে হয়, লিফটের খেত্রেও ঠিক তেমনি। গিয়ার ওয়েলে রয়েছে ভিস্কোসিটি বা সান্দ্রতা, এটি একটি নির্দিষ্ট তার কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে যা দৃশ্যমান নয়।

১৬। লিফটের কেবিনে COP বক্সে অ্যাটেন্ডেন্স, ইন্ডিপেনডেন্ট, স্টপ সেফটি এবং বাহিরে পার্কিং সিস্টেম কাজ করে কি না চেক করে নিন। ফায়ার সিস্টেম থাকলে সেটিও চেক করে দেখুন কাজ করে কিনা।

১৭। দেশে সেন্সরবিহীন অসংখ্য লিফট রয়েছে। কোন সময় সেন্সরবিহীন লিফটে ডোরের মাঝে পড়লে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করুন। হয়তোবা সামান্য চাপ অনুভব করতে পারেন। কারণ দৃশ্যমান এই সেন্সর ছাড়াও আরো আরো একাধিক বা ততোধিক সেফটি আছে যার কারণে ডোর চাপ দিলেও আপনার ক্ষতি হবার সম্ভাবনা কম। কিন্তু সেই সেফটিগুলোও যদি বাইপাস করা থাকে শুধু সেই ক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা শতভাগ।

১৮। লিফটের ব্রেকিং সিস্টেম খুবই গুরুত্তপুর্ন। এটি সঠিকভাবে অ্যাডজাস্ট করা আছে কি না তা চেক করে নিন। এলোমেলো অ্যাডজাস্টমেন্টের কারণে মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা শতভাগ।

১৯। লিফটের ত্রুটিপুর্ন যে কোন স্পেয়ার পার্টস থাকলে অবহেলা না করে তা দ্রুত রিপেয়ারিং বা পরিবর্তন করে ফেলুন।

২০। ছোট বাচ্চাদেরকে লিফটের কেবিন ডোর এবং বাহিরের ডোরে হাত দিয়ে আঁচড়া-আঁচড়ি বা ধাক্কা-ধাক্কি করবার সুযোগ দেবেন না। শপিং সেন্টার বা মার্কেটে এস্কেলেটরে চলার সময় ছোট বাচ্চাদের হাত ধরে রাখুন। এস্কেলেটরে উঠা-নামার সময় সাবধানতা অবলম্বন করুন। স্পেশালি নামার সময় এস্কেলেটরের সিঁড়ি যেখানে গিয়ে মিশে যাচ্ছে সে যায়গায় পৌঁছার আগে একটা ধাপ দিয়ে নিজে নামুন এবং বাচ্চাদেরকেও নামতে অভ্যস্ত করে তুলুন। সতর্কতার সাথে এস্কেলেটর ব্যবহার না করলে ঘটতে পারে মারাত্মক।

২১। চলন্ত লিফট যে কোন কারণে আঁটকে যেতেই পারে। স্পীডের উপর নির্ভর করে এতে কম বা বেশি ঝাঁকুনি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ভয় পাবার কিছু নেই। ইন্টারকমে অথবা ফোনে বাহিরে যোগাযোগ করবার চেষ্টা করুন। ভুলেও কেবিনের কিংবা বাহিরের ডোর ধরে টানা হ্যাঁচড়া করবেন না, বা জোর করে ডোর ফাঁকা করে ফ্লোর আন-লেভেল অবস্থায় বের হবার চেষ্টাও করবেন না। ধৈর্য সহকারে অপেক্ষা করুন তার জন্য, যিনি এসে লিফট লেভেল করে আপনাকে নিরাপদে উদ্ধার করবেন।

২২। লিফটের দায়িত্ব পালন করা ইঞ্জিনিয়ার, টেকনিশিয়ান এবং অপারেটরগণ যদি সঠিকভাবে নিরাপদে উদ্ধার করবার মত পর্যাপ্ত দক্ষ না হয়, সে ক্ষেত্রে তাদেরকে বাস্তব প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে গড়ে তুলুন। সেফলি রেসকিউ করতে পারে না এমন লোককে কখনোই লিফটের দায়িত্ব দিয়ে নিজেরা নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে থাকবেন না।

২৩। লিফট উভয় ফ্লোরের মাঝামাঝি আঁটকে গেলে কখনোই কারো কথায় বের হয়ে আসার চেষ্টা করবেন না। আপনি তাকে বলুন লিফট ফ্লোর লেভেল করে তারপর যেন আপনাকে বের করে। এভাবে বের হয়ে আসতে গিয়ে খুবই মর্মান্তিকভাবে পৃথিবীতে অসংখ্য মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে।

২৪। রানিং লিফটে কেউ আঁটকে গেলে, ইন্টারকমের মাধ্যমে সর্ব প্রথম জরুরী হলো তার সাখে যোগাযোগ করে কোন ভয় নেই মর্মে তাকে আশ্বস্ত করে উদ্ধার কাজ শুরু করা।

২৫। মনে রাখবেন, লিফটের নিরাপত্তা ব্যবস্থা যত উন্নত থাকবে আপনি তত বেশি স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে তা ব্যবহার করতে পারবেন। এই দেশে এখন বছরে শত শত নিন্মমানের স্বল্প সেফটি সিস্টেমের লিফট ইন্সটল হচ্ছে, অদূর ভবিষ্যৎ যার পরিণতি হতে পারে খুবই ভয়াবহ।

২৬। এটি সেফটি ইস্যু নয় তবুও বলি, লিফটের মধ্যে জরুরী না হলে ফোনে অথবা লিফটেই অবস্থান করা আরেকজনের সাথে জোরে জোরে কথা বলা পরিহার করুন। কারন বেশিরভাগ মানুষের কাছেই একটি প্রচণ্ড বিরক্তিকর।

এই সেক্টরে বিশেষ করে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ সেফটি মেইন্টেইন করে চলে এমন দুটি কোম্পানির সাথে ইন্সটুলেশন, কমিশনিং এবং মেইন্টেন্যান্স বিভাগে কাজের অভিজ্ঞতা থেকে আমার কাছে মনে হয়েছে এর চেয়ে বেশি অতিগুরুত্তপুর্ন আর তেমন কিছু নেই। এছাড়াও আর যে সেফটিগুলো রয়েছে তা নিয়মিত মেইন্টেন্যান্স সার্ভিসে ভালোভাবে নজর দিলেই হবে। লিফট হোক সবার জন্য নিরাপদ।

এনামুল হক (ইলিয়াস আহমেদ)
সার্ভিস ইঞ্জিনিয়ার
মেইন্টেন্যান্স বিভাগ
থিসেনক্রুপ এলিভেটর বাংলাদেশ।

Comments
Spread the love