মনের অন্দরমহলরিডিং রুম

একদিন চলে যেতে হবে…

আমিনুল ইসলাম

ছেলেটা আমার কাছ থেকে রেকমেন্ডেশন লেটার চেয়েছিল। আমি তাকে বলেছি -আমি তো তোমাকে ভালো করে জানি না, আমি কি করে তোমাকে রেকমেন্ডেশন লেটার দেব! নাইজেরিয়া থেকে আসা শান্ত প্রকৃতির ছেলেটা এরপর আমাকে একটা ই-মেইল করে লিখেছিল-আমার কোন কোর্স টিচার আমাকে রেকমেন্ডেশন লেটার দিতে চাইছে না। তারাও একই কথা বলেছে-আমাকে ভালো করে জানে না! তুমি তো ডিপার্টমেন্টের প্রধাণ, তুমি যদি একটা রেকমেন্ডেশন লেটার’টা দিতে, তাহলে আমি স্কলারশিপটার জন্য আবেদন করতে পারতাম।

আমি এরপর লিখে পাঠালাম-

ঠিক আছে, তুমি তোমার নিজের সম্পর্কে আমাকে এক পেজের মধ্যে কিছু লিখে পাঠাও। এরপর না হয় চিন্তা করা যাবে।

এইতো সপ্তাহ দুয়েক আগের কথা। এর মাঝে জরুরী কাজে গত সপ্তাহে ছেলেটাকে নাইজেরিয়াতে যেতে হয়েছে। এছাড়া সামার ভ্যাকেশনও শুরু হয়ে গিয়েছে। তাই হয়ত ছেলেটা ভেবেছে দেশ থেকে ঘুরে আসা যাক।

আজ ফাইনাল ইয়ারের ছাত্রদের থিসিস ডিফেন্স ছিল। ডিফেন্স রুম থেকে বের হয়ে নিচে নেমেছি; ছেলেটার দুই ক্লাসমেট, যারা নিজেরাও নাইজেরিয়া থেকে এসেছে, বলল, ওসামুদিয়ামেন (ছেলেটার নাম) মারা গিয়েছে এক্সিডেন্টে!

ওর ক্লাসমেট দুইজনের’ই চোখের জল। কথা আঁটকে যাচ্ছে বার বার

-ভারতে যখন পড়তাম তখন থেকেই আমরা এক সঙ্গে থাকতাম। ভারতের পড়াশুনা শেষ করে এখানে এসেছিলাম এক সঙ্গে উচ্চ শিক্ষার জন্য; থাকতামও এক সঙ্গে! ও নাইজেরিয়ায় গিয়েছিল জরুরী কাজে। গিয়েই কার এক্সিডেন্টে সব শেষ হয়ে গেল!

ছেলেটার মৃত্যুর সংবাদ শোনার পর বার বার মনে হচ্ছে- শেষবার যখন তার সঙ্গে কথা হয়েছিল, খুব জোর গলায় কী কথা বলেছিলাম? রেকমেন্ডেশন লেটার না পেয়ে ছেলেটার কী খুব রাগ হচ্ছিলো?

সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় সেই নাইজেরিয়া থেকে ভারতে গিয়ে পড়াশুনা করেছে; সেখান থেকে ইউরোপে এসেছে আরও বেশি পড়াশুনা করতে। বাবা-মা’র নিশ্চয় অনেক স্বপ্ন ছিল তাদের ছেলেকে নিয়ে। দেশ-বিদেশ থেকে ডিগ্রী নিয়ে বাবা-মা’র মুখ উজ্জ্বল করবে।

আচ্ছা, ছেলেটার কি কোন প্রিয় মানুষ ছিল? কোন ভালোবাসার মানুষ? সে কি তার ভালোবাসার কথা জানিয়ে যেতে পেরেছে? নাকি দেশ বিদেশে পড়াশুনা আর বেঁচে থাকার তাগিদে কেবলই ছুটে চলেছে?

ছেলেটার জন্য খুব খারাপ লাগছে। আমার সব সময়’ই মনে হয় মায়াময় এই পৃথিবীতে খুব কম সময়ের জন্য আমরা আসি। কার কখন ওপারের ডাক আসে, তার নেই ঠিক। এরপরও আমরা কেবল’ই ছুটে চলেছি সুন্দর ভবিষ্যতের আশায়। সেই ভবিষ্যৎ যে আমাদের সামনে এসে ধরা দেবে তার নিশ্চয়তা কোথায়!

তাই সীমার মাঝে থেকে জীবনকে যতটা সম্ভব উপভোগ করে নেয়াই ভালো।

কোথাও ঘুরতে যেতে ইচ্ছে করলে, চলে যাওয়া যেতে পারে। ভবিষ্যতে টাকা-পয়সা ভালো করে জমলে ঘুরতে যাবো, এর জন্য যদি ফেলে রাখি; দেখা যাবে এক সময় হয়ত টাকা-পয়সা হবে; কিন্তু ততদিনে শরীর আর সায় দিচ্ছে না!

কাউকে ভালো লাগলে সেটা বলে দেয়া যেতে পারে। নইলে হয়ত এক জীবনে আর বলাই হবে না। ভালো লাগা, ভালোবাসার কথা জানান দিতে তো ক্ষতি নেই। পাওয়া-না পাওয়া তো পরের বিষয়।

ভালো কোথাও খেতে ইচ্ছে করলে, সেটা পূরণ করে ফেলা ভালো। আমরা কেবলই ছুটে চলেছি। কেউ ছুটে চলেছি ভালো রেজাল্ট বা গ্রেড পাওয়ার আশায়, কেউ ভালো একটা চাকরী পাবার আশায়, কেউ বিদেশে পাড়ি জমানোর আশায়, কেউ বাড়ি-গাড়ি’র আশায়, কেউ প্রভাব-প্রতিপত্তির আশায়।

ছুটে চলতে সমস্যা নেই। কিন্তু ছুটতে গিয়ে আমরা ভুলেই যাই- সব কিছুকেই এক সময় না এক সময় থামতে হয়! আর কখন কাকে থামতে হবে, সেটা আমাদের জানা নেই।

আমি এমন অনেক মানুষকে চিনি এবং জানি, যাদের অর্থের কোন অভাব নেই। কোটি কোটি টাকার মালিক তারা। আজ আমেরিকা তো কাল ইউরোপ করে বেড়াচ্ছে। তাদের কাছে জীবন হয়ে উঠেছে স্রেফ চালিয়ে নেয়া! তারা জানেই না জীবনকে কিভাবে উপভোগ করতে হয়।

মায়াময় এই পৃথিবীর এই সৌন্দর্য যতটা সম্ভব উপভোগ করাই ভালো। আর এই এতটুকু বয়েসে উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু ঘুরে আমি যেটা উপলব্ধি করেছি, সেটা হচ্ছে- জীবনকে উপভোগ করার জন্য আপনাকে পৃথিবী ঘুরে বেড়াতে হবে না; কিংবা লক্ষ লক্ষ টাকার মালিক হবারও দরকার নেই। নিজ পাড়া কিংবা মহল্লার মাঝে থেকেও জীবনকে উপভোগ করা যায়।

এর জন্য যা দরকার, সেটা হচ্ছে আশপাশে দুই চার জন চমৎকার মানুষ এবং জীবন’কে উপভোগ করার মানসিকতা। জীবনের চলতি পথে সেই মানসিকতাই আমরা হারাতে বসেছি। জিপিএ ফাইভ পেতেই হবে, ক্লাসে ফার্স্ট হতেই হবে, বিসিএস ক্যাডার হতেই হবে; গাড়ি-বাড়ির মালিক হতেই হবে; আরও কতো কি!

এত সব কিছু অর্জন করতে করতে এক সময় জীবনটাই আমাদের কাজ থেকে হারিয়ে যায়!

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close