আমার বন্ধুবান্ধব আমাকে প্রায়শঃই জিজ্ঞাসা করে, আমার এই সদাহাস্য মুখ কিভাবে আমি বজায় রাখি। গুলশান থেকে খাগড়াছড়ি- সম্পূর্ণ দুই প্রান্তের দুই জায়গাতেও এই অধমের সেই একই হাসি হাসি মুখ দেখতে দেখতে সবাই সম্ভবত বিরক্ত! কি মুশকিল বলুন তো, হাসিখুশি থাকাও দোষ!

যেহেতু আমার ফোন নম্বর সবার জন্যে উন্মুক্ত, কিছু কিছু ফোন কল আমি পাই এমন অনেকের কাছ থেকে যারা ভয়াবহ রকমের ডিপ্রেশনে ভুগছেন। “আপনি তো পুলিশে আছেন, সবচাইতে সহজ মৃত্যুর উপায় কি বলুন তো?”- এরকম অন্ততঃ হাফ ডজন ফোন কল আমি পেয়েছি। শুনে হাসি পাচ্ছে? বিশ্বাস করুন,ব্যাপারটা মোটেও হাস্যকর নয়। কতটা অসহায় অনুভব করলে একজন মানুষ পুলিশের কাছে এটি জিজ্ঞাসা করতে পারে ভেবে দেখুন, অতটা হাসি পাবে না।

প্রিয় পাঠক, ডিপ্রেশন বা হতাশা একটি ভয়াবহ রোগ। এর ভয়াবহতা যিনি নিজে প্রত্যক্ষ করেন নি, তার পক্ষে এটি অনুভব করা কখনও সম্ভব নয়। আমি নিজে সাইকিয়াট্রিস্ট নই, তাই কাউকে হতাশা থেকে উদ্ধার করার উপায় বাতলে দেয়াটা আমার পক্ষে একেবারেই অনধিকার চর্চা, সেটি করার ধৃষ্টতাও আমি দেখাচ্ছি না।

বাংলাদেশ তো বটেই, পৃথিবীর সব দেশেই পুলিশের চাকুরি প্রচন্ড রকমের মানসিক চাপে পরিপূর্ণ। খুন, হত্যা, রাহাজানি আর যাবতীয় রকমের ভায়োলেন্স নিয়ে আমাদের কারবার। এই সমাজের পোশাকি রূপের অন্তরালে যে ভয়াবহ রকমের অন্ধকার আরেকটা জগৎ আছে, সেখানেই আমাদের বিচরণ। এই জগতে বিচরণ করতে করতে আমরা অনেকেই মুখোমুখি হই তীব্র বিষাদ ও মনোবৈকল্যের। অনেকটা আল পাচিনোর ডায়ালগের মত-“We become what we prey”। এখনো যেহেতু এটি মোকাবেলা করার কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আমাদের নেই, আমরা একেক জন একেকভাবে এর মুখোমুখি হই। কঠোর পুলিশি পোশাকের ভেতরে আমরাও কিন্তু আর দশজন মানুষের মতই লড়াই করে চলেছি। আমাদের জীবনেও রয়েছে শত আক্ষেপ, ব্যর্থতার তিক্ততম স্বাদ আমাদের ভেতরটাকেও দুমড়ে মুচড়ে দেয় কখনও কখনও।

আমি আমার জীবনের এই সমস্যাগুলো সমাধান করে থাকি ছোট্ট একটি গল্পের মাধ্যমে। গল্পটি একটি বৌদ্ধ উপকথা, ব্রিটিশ বংশদ্ভূত বৌদ্ধ সন্যাসী আজান ব্রহ্মের আলাপচারিতায় পেয়েছিলাম এটি, একেবারেই আকস্মিকভাবে। যেহেতু এটি আমার ক্ষেত্রে কাজ করে, সাহস করে আপনাদের সাথে আর শেয়ার করছি। বলা তো যায় না, আপনাদের কারো কাজে লেগে যেতেও পারে!

বনের ভেতর দিয়ে এক লোক যাচ্ছিল-হঠাৎ বেচারা চোখে পড়ল হিংস্র এক বাঘের। বাঘ বিপুল বিক্রমে তাড়া করা করা শুরু করল লোকটিকে, আর লোকটিও প্রাণভয়ে শুরু করল দৌড়। দৌড়াতে দৌড়াতে তার সামনে একটি শুকিয়ে যাওয়া পানির কূপ এল, আর সে-ও সাত পাঁচ না ভেবে কূপের ভেতরে দিল ঝাঁপ।

কিন্তু হায়!অভাগা যেদিকে যায়, সাগর শুকিয়ে যায়। ঝাঁপ দিয়েই লোকটি দেখে কূপের নীচে হাঁ করে আছে ইয়া বড় এক অজগর সাপ। বাঘের খপ্পর থেকে আরো বড় বিপদ-সরাসরি সাপের পেটে যেতে হবে শেষে! প্রাণ বাঁচানোর দাগিদে কূপের দেয়ালে যে ছোটখাটো গাছের শিকড় বেরিয়ে থাকে, লোকটি সেটির একটি ধরে ঝুলতে থাকল। মাথার ঠিক এক ইঞ্চি উপরে বাঘের থাবা, আর পায়ের ঠিক এক ইঞ্চি নীচে সাপের বিষাক্ত নিঃশ্বাস। মুহূর্তের জন্যে সাময়িকভাবে বিপদের হাত থেকে রক্ষা পেয়ে সে তার হাতের শিকড়ের দিকে তাকিয়ে দেখে সর্বনাশ! দুটো ইঁদুর, একটা সাদা আরেকটা কালো- খুটখাট করে শিকড়টা চিবিয়ে খাচ্ছে, আর মাত্র কয়েকটা মিনিট আয়ু বাকি ওটার।

পাঠক, বুঝুন! মাথার উপরে বাঘের থাবা, পায়ের নীচে অজগর সাপের হাঁ- একমাত্র যেটা অবলম্বন সেই শিকড়টা দাঁত দিয়ে কেটে নিচ্ছে সাদা-কালো দুই ইঁদুর। এই লোকটার অবস্থা ঢাকাইয়া ভাষায় যাকে বলে-“কেরোসিন”! 

এবার বলুন তো, ওই লোকটার জায়গায় আপনি হলে কি করতেন? প্রশ্নটা খুব কঠিন হয়ে গেল?

আচ্ছা, বলে দিচ্ছি। কূপের পাশে একটা গাছে ছিল বিশাল এক মৌচাক। বাঘের ঝাঁপাঝাঁপিতে ওই গাছ ভীষণভাবে দুলে ওঠায় মৌচাক ভেঙ্গে টপ টপ করে মধু ঝরতে লাগল-সরাসরি কূপের ভেতরে। আর ওই লোকটা, ঠিক সেই “অবস্থা কেরোসিন” ভাবেই জিহবাটা বাড়িয়ে দিলো ঝরে পড়া মধুর ফোঁটায়। জিহবা দিয়ে সেই মধু যতটুকু সম্ভব চেটেপুটে দারুণ তৃপ্তির সাথে সে বলে উঠল- বাহ! দারুণ মিষ্টি তো!

গল্পটা এখানেই শেষ।

উঁহু, দাঁড়ান। কষ্ট করে এতদূর যখন এসেছেন, রূপক এই গল্পটির মর্মার্থ শুনবেন না?

পেছন থেকে তাড়া করা বাঘ হচ্ছে আমাদের অতীতের ভুলভ্রান্তি, জীবনের শুরুতে করে আসা ভুল থেকে বেরিয়ে আসা দীর্ঘশ্বাসগুলো। অজগর সাপের হাঁ করা মুখটি হচ্ছে আমাদের অজানা ভবিষ্যত, আগামী দিনে যেসব বিপদ ঘটতে পারে তার না জানা ভয়াল রূপ। আর হাত দিয়ে ধরে থাকা একমাত্র অবলম্বন ওই শিকড় হচ্ছে আমরা যে আয়ু নিয়ে পৃথিবীতে এসেছি সেটির প্রতীক। সাদা আর কালো ইঁদুর হচ্ছে দিন আর রাতের রূপক। অতীতের দীর্ঘশ্বাস আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা- এই দুয়ের চিন্তায় যখন আমরা হতবিহবল হয়ে আছি, আমাদের অজান্তেই দিন আর রাত কেটে যাচ্ছে, ধীরে ধীরে ফুরিয়ে আসছে সময়।

আমাদের প্রত্যেকের জীবনই কিন্তু এরকম। অতীতের হতাশা আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা- এই দুয়ের বেড়াজালে আমরা প্রত্যেকে আটকে আছি, ভিখারী থেকে রাজা- সব্বাই। নিশ্চয়ই বুঝে গিয়েছেন এই অবস্থায় একমাত্র করনীয় কি?

জ্বি, ঠিক ধরেছেন। হাঁ করে জিহবা বের করুন, দেখুন কোথায় মধু ঝরে পড়ছে। ছিঁটেফোঁটা যেটুকু মধু পারেন চেখে নিতে থাকুন। তারপর ওই পড়ন্ত অবস্থায় একমুখ হাসি নিয়ে বলে উঠুন- বাহ, দারুণ মিষ্টি তো!

এ ছাড়া আর কিছু করার আছে কি?

গুলশানের মেট্রোপলিটন পরিবেশ থেকে খাগড়াছড়ির বিদ্যুতবিহীন ক্যাম্পে এই গল্পটির কারণে আমার জীবন হয়ে উঠেছে মধুর থেকে মধুরতম। গভীর জঙ্গলে প্যাট্রোল শেষে ক্যাম্পে ফেরার পথে যখন দেখি আমার পোষা কুকুর কালাপাহাড় আর কাল্লু মিয়া দৌড়ে আসছে আমাকে স্বাগত জানাতে- আমি হেসে উঠে বলি, বাহ, দারুণ মিষ্টি তো!

অতীতের ডিমভাজাকে আমি “আনফ্রাই এ্যান এগ” করতে পারবোনা, পারবোনা ভবিষ্যতে কি ঘটবে সেটাকে আগে থেকেই নিয়ন্ত্রণ করতে। কিন্তু ঠিক এই মুহূর্তে, বিদ্যুতবিহীন ক্যাম্পের অন্ধকারে প্রিয় কুকুর কালাপাহাড়ের জ্বলে ওঠা চোখে প্রভুভক্তির চিহ্ন অনুভব তো করতে পারব! ওটাই আমার জন্যে জীবনের অমৃতবিন্দু, গাছ থেকে ঝরে পড়া বিন্দু বিন্দু মধুর মত।

প্রিয় পাঠক, আপনার ক্ষেত্রে ওই মধু কোনটি? আশেপাশে চোখ বুলিয়ে দেখুন তো! পেয়েছেন?

“বাহ, দারুণ মিষ্টি তো!”

প্রথম প্রকাশিত- ১২ই সেপ্টেম্বর, ২০১৪

লেখক- মাসরুফ হোসেন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, বাংলাদেশ পুলিশ।

Comments
Spread the love