বছরের প্রত্যেকটি দিন যে সব কিছু ভালো যাবে তা তো হয় না। কতটা ভালো আছি আমরা, সেটা নতুন করে বোঝাতেই জীবনের মোড়ে মোড়ে খারাপ সময় আসে। কিন্তু জীবনে আপনি কতটা ভালো কিংবা খারাপ থাকবেন সেটার নাটাইটা চাইলেই নিজের হাতে রাখা যায়। নিজেকে আমরা প্রত্যেকেই ভালবাসি, কিন্তু নিজের জীবনটাকে পরিপূর্ণভাবে ভালবাসতে জানলেই দেখবেন নিজের নাটাই দিয়ে জীবনের ঘুড়ি আপনি নিজেই ওড়াচ্ছেন।

ঘুম থেকে উঠে আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে একবার ছোট্ট হাসি দিলে কিন্তু কেউ দেখবে না, কিন্তু আপনি দেখবেন যে এই বাস্তবতা আর সেলফির যুগেও আপনার একটি মিষ্টি হাসি আছে, যা সত্যিকারের হাসি, জীবনের হাসি। ঘুম ভেঙ্গেই কেউ ক্লাসে ছুটছেন তো কেউ চাকরীতে, কাউকে বাস ধরতে হয় তো কাউকে পাঠাও ডাকতে হয়, জ্যামের এই শহরে এই ব্যস্ততা একদম সক্কাল থেকে। তবে বাসের জানালায় বসে কেউ কি সকালের সূর্যটার এক ঝলক দেখে খুশি হতে পারে না? বা মটরবাইকের পিছনে বসে সকালের বাতাসটি মুখে এসে লাগলে জীবনটা কি একটু সুখের মনে হয় না? জীবনের ৫ সেকেন্ড একটু ভেবে দেখবেন, সত্যি মনে হবে ‘বাহ! বেশ তো!’ কানে হেডফোন লাগিয়ে বাসে বসে একটি মিষ্টি গানও মাঝে মাঝে প্রশান্তি এনে দেয় এই জ্যামের বিচ্ছিরি কিন্তু মায়ার শহরে।

অফিসে বা ক্লাসে প্রতিদিন যে মানুষগুলোর সাথে দেখা হচ্ছে, নতুন প্রজেক্ট নিয়ে কাজ হচ্ছে- তাদের না হয় একদিন সক্কালবেলা এক কাপ চায়ের নিমন্ত্রণ দিলেন, এক কাপ চায়ের সাথে সাথে অফিসের ফাইলের ভারও অনেক সময় ভাগ করা যায়, ক্লাসের প্রোজেক্টটা নিয়ে খানিকটা হালকা হওয়া যায়। এই শহরের চক্রে ঘুরে বেড়ানো আমরা সবাই মানুষ, যন্ত্রে বাঁধা, ক্লান্ত কিংবা অসহায়। তবে সবাই-ই কিন্তু একই সুতায় বাঁধা, একে অন্যের জন্য।

অফিসের কাজের ভিড়ে নিজে দশ মিনিট একটু বাতাসে বসুন, নিজের মনকে অক্সিজেন দিন। অফিস বা ক্লাস শেষে এক কাপ কফিতেই না হয় চুমুক দিন সন্ধ্যার আলোয়, নিজের সাথে নিজের সম্পর্কটা একটু ঝালিয়ে নিন, প্রিয় মানুষকে খালি ফেসবুকে ইমোজি না পাঠিয়ে, চ্যাটিং-এর বক্সে না রেখে এক মিনিট ফোন করুন । আর যদি একা হন? তাহলে চলে যান কোন একটি বিশাল বইয়ের দোকানে, বই দেখুন, পাতা উল্টান বা কোন ম্যাগাজিনের ছোট্ট আর্টিকেল পড়ুন বা বাড়ি এসে মা-বাবার সাথে বসেই একটু গল্প করুন। ছোটবেলার ছবির অ্যালবাম গুলো দেখুন, রান্না শিখুন, ডাইরি লিখুন, যা ইচ্ছা হয় সেটাই করুন। যান্ত্রিকতা থেকে বের হতে মানুষের সাথে বেশি করে আড্ডা দিন, শুধু সেলফি আর চেকইন জালে আটকে না থেকে কথা বলুন, সিনেমা দেখুন এক সাথে, ঘুরতে যান নিজেদের মতো, নিজের মতো।

জানার আগ্রহ মানুষের জীবনকে সুস্থ রাখে। গান শুনে একটু নিজেই গুন গুন করুন ঘরে-বাহিরে। নিজের ব্যাকপ্যাকে একটি করে বই রাখুন। জ্যাম হোক বা চায়ের এক চুমুক, বইয়ের চরিত্রগুলো আপনার সাথেই থাকবে। খেতে ইচ্ছা করলে নিজেই চলে যান, শহরটাকে বন্ধু ভেবে ঘুরে বেড়ান। নিজের মধ্যের অন্ধকার দিকগুলোকে ধীরে ধীরে আলোতে নিয়ে আসার চেষ্টা করুন। আমরা কেউ শতভাগ সুখী না, আমরা কেউ পার্ফেক্ট না, আমরা মানুষ। তবে এই সব কিছুর জন্য নিজেকে ভালবাসতে হবে, নিজের সম্পর্কে নিজের একটি স্পষ্ট ধারনা থাকতে হবে। ছুটির দিনগুলোতে সময় পেলেই একটি দুঃস্থ শিশুদের স্কুলে গিয়ে একটু সময় কাটিয়ে আসুন, শুধু ফেসবুকের নানা ইভেন্টে ‘গোয়িং’ না দিয়ে সত্যি সত্যি একটু ঘুরে আসুন। মানুষের সাথে কথা বলুন সামনা-সামনি।

নিজের মস্তিষ্ককে বোঝান যে তার আশপাশে প্রচুর জিনিস আছে যা জানতে হবে, জানাতে হবে। যা কিছু ভালো, যা কিছু সুস্থ ও সুন্দর, তা ছড়িয়ে দিতে হবে। ভালো থাকতে টাকার দরকার নেই, দামী সব প্রসাধনী, পোষাক, গাড়ি বাড়ি দরকার নেই। শুধু ‘ভালো থাকার ইচ্ছাটা দরকার’। নিজের ভেতরটা প্রসারিত করে দেখুন, পৃথিবীটা বেঁচে থাকার জন্য খুব একটা খারাপ না। কোথায় রক্ত দিতে হবে, কোথায় কার সাহায্য দরকার সেগুলো ছড়িয়ে দিন। আপনার অজান্তেও যদি আপনাকে দিয়ে কারো জীবন সুন্দর হয় তবেই দেখবেন বেঁচে থাকাটা আনন্দের। নতুন বছরটা শুরু করুন ভালো থাকার প্রত্যাশা নিয়ে এবং অন্যকে ভালো রাখার দৃঢ় ইচ্ছা নিয়ে। জীবনটা সত্যিই সুন্দর যদি আপনি নিজে তাকে প্রতিদিন একবার করে বলেন, ‘জীবন, তুমি সুন্দর’।

ছবি- পার্থ চৌধুরী

Comments
Spread the love