শারফিন শাহ

নীলক্ষেতে ঢুঁ মেরে মনটা খারাপ হয়ে গেল। যে ছেলেটি আমাকে পুরাতন বই কম দামে সরবরাহ করত তার খানিকটা পদোন্নতি হয়েছে! ওর সামনে এখন সেই পুরাতন বইয়ের পসরা নেই। ওখানে স্থান করে নিয়েছে ঝলমলে বিসিএসের বই! আমি জিজ্ঞেস করলাম- কী ব্যাপার তোমার গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধ-কবিতার বইগুলো কই?

ছেলেটি মৃদু হেসে বলল-ভাই ওইসব আর চলে না! কী করুম কন! বই বেইচাই বাঁচি। তাই এই গাইডের ব্যবসায় নামলাম। ভালোই চলতাছে!

ছেলেটির কথা মিথ্যে নয়। সত্যিকার অর্থেই এখন সবকিছু বিসিএসের দখলে। আপনি যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিগুলো দেখেন, দেখবেন ওখানে বিসিএসের পড়ালেখা চলছে! যদি গণগ্রন্থাগারগুলো দেখেন, দেখবেন সেখানে বিসিএস চলছে! মোটকথা দেশের সব গ্রন্থাগার এখন বিসিএস গ্রন্থাগার হয়ে গেছে! রবীন্দ্রনাথ যেমন বলেছিলেন-‌‌ ‘লাইব্রেরির মুখ্য কর্তব্য হচ্ছে বইয়ের সঙ্গে পাঠকের পরিচয় করিয়ে দেওয়া।’ কিন্তু আজকাল লাইব্রেরিয়ানরা পাঠকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন এমপিথ্রি, কিংবা ওরাকলকে!

বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েই প্রায় সব ছাত্রছাত্রীদের লক্ষ্য হয়ে যায় বিসিএস। এটা হওয়াই স্বাভাবিক। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে হাজারো স্বপ্ন মনের মধ্যে মালার মতো গাঁথা হতে থাকে। ওসব স্বপ্ন একটা সময় এসে উড়ে যায় যখন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। কারণ বিসিএস তো আর সবার হয় না! তারপরও এটার জন্য সবাই পাগল। অনেকে ভাববেন এটা এখনকার ম্যানিয়া। কিন্তু সেই ষাটের দশকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও এই ম্যানিয়া ছিল। এখন যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ের নব্বই শতাংশ তরুণীদের বিয়ের পাত্র হিসেবে এএসপি পছন্দ, তখন সেটা ছিল ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের জল-মেশানো উত্তরসূরী পরাক্রান্ত সিএসপিদের দখলে! স্নিগ্ধ, নিরঞ্জন, রুচির চর্চার বদলে অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী ওই সিএসপির দিকে ছুটত। সিএসপি হওয়া ছেলেরা বাগিয়ে নিত সব সুন্দরী রমণীদের। সেই সময়কার বিশ্ববিদ্যালয়ের আকাশে বাতাসে তাই করুণ স্বরে অনুরণিত হতো কোনো এক অখ্যাত কবির এই লাইনগুলি-

ওগো কন্যে,
তোমার জন্যে
লিখবনা আর কবিতা;
ওগো বড়লোকের ঝি
আমি হবো সিএসপি!

(সূত্র: বিদায় অবন্তী, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ)

অবশ্য সব রমণীই যে সিএসপির কাঙাল ছিল তা নয়। তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলকভাবে ব্যর্থ গোষ্ঠী হাসান হাফিজুর রহমান, সৈয়দ শামসুল হক, শামসুর রাহমান, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, রফিক আজাদ, আবুল হাসান,  নির্মলেন্দু গুণ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, আসাদ চৌধুরীসহ বর্তমানের খ্যাতিমান মানুষেরা বউ, প্রেমিকা পেতেন না!

চারপাশে যখন দেখি বিসিএস না হওয়া মানুষের দীর্ঘশ্বাস, তখন মনে মনে বলি, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে তোমরা যদি বিকল্প পথে হাঁটার চিন্তা করতে তবে এই হতাশা থাকতো না। বিসিএস নামক ভাগ্যখেলায় হেরে তোমাদের নিজের স্বপ্নের জায়গাটাকে বিবর্ণ মনে হতো না! কিন্ত কে শুনে কার কথা! এই আধুনিক যুগে সবাই পণ্ডিত!

ফিরে যাই আমার সব সময়ের প্রেম, বইয়ের দিকে।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তার ‘বাংলা ‌বইয়ের দু:খ’ নামক অভিভাষণে বলেছিলেন- ‘বিলেতে প্রতি ঘরে একটি করে লাইব্রেরি আছে। কেউ বই পড়ুক বা না পড়ুক ওটা ওদের ঘরের শোভা। আমি আমাদের দেশে অনেক বড়লোকের বাড়িতেও দেখিনি একটা বইয়ের তাক!’ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তার ‘বই পড়ার অভ্যাস’ নামক রচনায় বলেন,‌ ‘একবার আমার এক গণিতের অধ্যাপক বন্ধুর হাতে সঞ্চয়িতা বইখানা দেখে বললাম- কি পড়লে? সে সগর্বে বলল,‌ ‘আর্টসের বই! এদেশে বই পড়ার ক্ষেত্রে এই ধরনের কথাই প্রচলিত’।’ অন্নদাশঙ্কর রায়ের চমৎকার একটা বই আছে ‌’বিনুর বই’ নামে। বিনুর হাতে কেউ একজন একগুচ্ছ বই তুলে দিল। সে চলে গেলে ভিন্ন এক জগতে। সে ভাবতে লাগল, সে পত্রিকা বের করল, সে প্রেমে পড়ল, এবং সে লেখক হলো, অবশেষে সে বুঝল লেখকের ব্যর্থতা, কিন্তু এটাও বুঝল যে লেখক চিরন্তন ও চিরমধুর! আর সবার ক্ষয় আছে তার ক্ষয় নেই!

সেই অক্ষয় লেখকের সাথে কথা বলতে হলে তার শ্রেষ্ঠ বইগুলো পড়া জরুরি। আগেকার দিনে যারা বিসিএস পেয়েছেন, তারাও কিন্তু বই পড়েছেন। তা না হলে তাদের অধিকাংশই লেখালেখি করছেন কী করে? একজন লেখককে একটা বই লেখার ক্ষেত্রে অনেক রসদ আমদানি করতে হয়। নিদারুণ পরিশ্রম করতে হয়। প্রেম, দুঃখ, হাসি, কান্নার মিশেলে ভাষা ও চরিত্র নির্মাণ করেন তিনি। আপনি যখন আপনার প্রিয়তমার বাহুডোরে নধর ঘুমে মগ্ন, তখন রাত জেগে লেখক সেই প্রিয়তমাকে তার নিপুণ কলমের কালিতে স্বপ্নের নায়িকা হিসেবে গড়ে তুলেন! তাকে ছড়িয়ে দেন হাজার মানুষের কাছে! আপনি তার সেই সুন্দরের সাধনার স্পর্শ নিবেন না? জ্যাঁক দেরিদার একটা কথা মনে পড়ছে-‘সেই ছোট্টবেলা থেকে আজ পর্যন্ত এটাই জানি যে আমার শিক্ষক একমাত্র বই, বই এবং বই। আর কেউ নন।’

সুতরাং আসুন আমরা একটা হলেও বই পড়ি, কারণ বইয়ের মতো কোমল শিক্ষক পৃথিবীতে আর নেই।

Comments
Spread the love