ইনসাইড বাংলাদেশ

এই কদিন ঘুমিয়েছেন কীভাবে বুবু?

প্রিয় হাসিনা বু,

আমার একটা অভিযোগ আছে! আপনি যখন বাচ্চাদের চিঠির উত্তর দেন মাঝেমাঝে তখন খুব ভালো লাগে। এই চিঠিটা মনে করেন বাচ্চাদের পক্ষ থেকেই পাঠানো হয়েছে। আমি সবসময়ই দেখেছি আপনি বাচ্চাদের সাথে খুব হাসিখুশি থাকেন। সাধারণ শিশুদের সাথে মিশে যেতে পারেন খুব সহজেই। যখন আমি বাচ্চা তখন থেকেই দেখেছি আপনার এই মিশে যাওয়াটা। আপনার সাথে ছোটবেলায় দেখা হয়েছিল তাদেরই একজন ধরে নিন আজ কলেজে পড়ে। মাঝেমাঝেই যখন সরকারের কোন কাজ সমালোচনা করা হয় বাসায় তখন আপনার কথা মনে করে সে হয়তো বলে ওঠে- আব্বু ওনাকে নিয়ে এগুলা বলবা না। বাবাটা হেসে ওঠে তাগাদা দেয়- আচ্ছা বাবা বলবো না, তুই রেডি হ, কলেজে যাবি না? এদিকে দ্রুত রেডি হতে গিয়ে সেফটি পিনে হঠাৎ আঙুল ফুটে রক্ত বের হয় তার, মা দ্রুত দেখে দৌড়ে এসে আঁচল দিয়ে আঙুল চেপে ধরে। মেয়েটা হেসে ওঠে বলে- ধুর আম্মু, এটুকু রক্ত বের হলে কিছু হয় না। মা চোখ গরম করে ওঠে আর মনে মনে বলে- তুই কি বুঝবি, কতো রক্ত পানি করে তোকে এই দুনিয়ায় এনেছি। মেয়ে চলে যায় কলেজে, বাবা-মা’র মন নিয়ে উড়ে চলে যায়। দুপুরে হুট করে ফোন আসে যে তাদের মেয়ে হাসপাতালে, দ্রুত চলে আসতে। বাবা-মা দুজন আর হাসপাতালে যাবেন কী ওখানেই যেন তারা নিঃশেষ হয়ে যায়। যেয়ে দেখেন তারা হাসপাতালের বিছানা ভেসে যাচ্ছে সন্তানের রক্তে, শখ করে কিনে দেয়া সেলো পেনে ছোপ ছোপ রক্ত। যার মুখের দিকে তাকিয়ে বাবাটা দিনকে রাত করে দিতো তারই আজ চিনতে কষ্ট হয়। এই মেয়ের জায়গায় ছেলে, ছেলের জায়গায় বাবা, বাবার জায়গায় মা, মায়ের জায়গায় স্ত্রী, স্ত্রীর জায়গায় স্বামী, স্বামীর জায়গায় বন্ধু, বন্ধুর জায়গায় প্রেমিক, প্রেমিকের জায়গায় প্রেমিকা সব সম্পর্কই বসিয়ে নেয়া যায় চাইলে। কারণ বছরে এরকম নানান সম্পর্কের গড়ে প্রায় ১০ হাজার মানুষ নিহত হয়। ১০ হাজার মানুষের ১০ হাজার পরিবার আছে, সে পরিবারগুলোতে আরও লাখখানেক মানুষ আছে। ১৬ কোটি মানুষের দেশে লাখখানেক মানুষ প্রতি বছর প্রিয়জন হারাচ্ছে।

বাংলাদেশ পুলিশ, ছাত্রলীগ, নিরাপদ সড়ক চাই

এসব কথা এতোদিন হয়েছে বু; লাখ লাখ মানুষ বলেছে। ২০ লক্ষ টাকা দেয়া হয়েছে পরিবারগুলোকে। কারণ তাদের লাশ নিয়ে আন্দোলন হয়েছে। শুক্রবার মগবাজারে বাস বাইককে পিষে দিলো তার লাশ আন্দোলনে সামিল হল না, গতকাল গুজব আর ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় হারিয়ে গেল থক থকে রক্তের মাঝে ডুবে থাকা একটা ২ বি পেন্সিল আর রেডলিফ কলমটাও। কয়জনকে ২০ লক্ষ টাকা দেয়া যায় বলুন! কয়জনের লাশ নিয়ে আন্দোলন করা যায়! আপনি কিছু ব্যবস্থা নিয়েছেন ছাত্রদের আন্দোলন দেখে, সময় লাগবে সেগুলো বাস্তবায়ন করতে জানি। কিন্তু এই যে পরিবহন মালিকরা নিজেদের ইচ্ছায় এই কদিন বাস-ট্রাক সব বন্ধ করে সাধারণ মানুষকে হয়রানির শেষ সীমায় নিয়ে গেল সেটা নিয়ে কোন টু শব্দ হচ্ছে না কেন বলতে পারেন? একজন মানসিক বিকৃত মন্ত্রীকে পদত্যাগ করাতে পারছেন না আপনি কেবল তার কাছে পুরো পরিবহন ব্যবস্থা জিম্মি বলে। ছাত্রছাত্রীরা আন্দোলন করেছে, রাস্তা সামাল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে কিন্তু তাই বলে একসিডেন্ট থেমে যায়নি। কারণ মনের মাঝে ভয় না থাকলে বেপরোয়াভাব থাকবেই। এই ভয়ের জন্য দরকার শাস্তির বিধান কিন্তু শাস্তি বাড়ালে পরিবহন শ্রমিকরা একেবারেই পরিবহন ব্যবস্থা বন্ধ করে দেবে। ছাত্রছাত্রীরা দিনের পর দিন রাস্তায় থেকে দাবী আদায় করতে না পারলেও শ্রমিকদের দাবী আদায় করতে বেশি সময় লাগবেনা। দুইদিন ঢাকার ভেতর গাড়ি না ঢুকলে ঢাকা শহরের অর্ধেক মানুষ না খেয়ে মরবে। রাস্তায় কিছুই না চললে অফিস-আদালত স্থবির হয়ে যাবে। কী পরিমাণ পাওয়ার আপনি দিয়ে রেখেছেন এদের একবার ভেবে দেখুন। এই দুর্বার আন্দোলনের মাঝেও তারা কিন্তু এই পাওয়ার প্র্যাকটিস থামিয়ে রাখেননি, দু একটা ডেমো দেখিয়েও যাচ্ছেন।

এই যে দুইদিন ধরে ছাত্র-সাধারণ মানুষ-সাংবাদিক নির্বিশেষে মার খেয়ে যাচ্ছে। শত শত ছেলে মেয়ে আহত হচ্ছে এটা নিয়ে আপনার কি কোন মাথাব্যথা নেই? ভিসির ভবনে হামলা হলে আপনাকে দেখেছি কী ক্ষোভের সাথে ঘৃণা ব্যক্ত করতে! ছেলেমেয়েরা বাইরে ছিল বলে আপনার ঘুম হয়নি সারারাত। এই কদিন ঘুমিয়েছেন কীভাবে বুবু? বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েগুলোর একটা ছবিও কি আপনার চোখের সামনে আসেনি? পাবলিক প্যানিক হবে তাই গুজব নিয়ে কী জোর অবস্থান আপনার সরকারের, কয়েক কোটি টাকার ম্যাসেজ পাঠালেন মোবাইল অপারেটরদের দিয়ে অথচ কী নির্লজ্জভাবে হতাহতের ঘটনাকেও গুজব বলে সবচেয়ে বড় গুজব ছড়ালেন আপনার মন্ত্রী। ডিজিট্যাল বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়ে ২জির দিনগুলোতে ফেরত নিয়ে যেতে একটুও দ্বিধা করেন নি আপনার অধীনস্ত মন্ত্রী-আমলারা। বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েদের মার দেয়া যে ঠিক কাজ হয়েছে সেটা নিয়ে সাধারণ সম্পাদক বলেই ফেললেন- ওদের চুমু দেবে নাকি! যে যাই বলুক না কেন আমি তাকিয়ে ছিলাম আপনার দিকেই, যে কবে আপনি কিছু বলবেন। কিন্তু আপনি বললেন না, মুখে কুলুপ এঁটে বসে রইলেন। আপনার সরকার নাকি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী, অথচ স্বৈরশাসনের চূড়ান্তটা করে দেখালো এই কদিনেই। হাতে রড, চাপাতি, গাছের ডাল, ইত্যাদি নিয়ে কীভাবেই না মারলো আপনার দলের ছেলেরা শত শত ছেলে মেয়েকে। আপনার দলকেই ভোট দিয়েছে এমন অনেক পিতামাতা তাদের সন্তানকে নিয়ে মেডিকেলে লুকিয়ে থেকেছে আপনার পেটোয়া বাহিনীর ভয়ে। এরা কি আর ভোট দেবে আপনাদের? এই যে বাচ্চাগুলো যারা আর দু-তিন বছর পর প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে যাবে তারা কি তাদের বাকি জীবনে আপনাদের কাছে ঘেঁষবে? শাহ্‌বাগের রাজাকার বিরোধী প্রজন্ম থেকে শুরু করে ঝামেলামুক্ত থাকা সাধারণ মানুষ কি আর কখনোই আপনাদের ওপর আস্থা রাখবে?

জিগাতলা, সায়েন্সল্যাব, হামলা, ছাত্রলীগ, পুলিশ, ছাত্র আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক চাই

বিগত দুটি আন্দোলনে আপনি তেমন কিছুই হারাননি, কেবল একটা শিক্ষিত জনগোষ্ঠী আপনাদের কাছ থেকে পুরোপুরিভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। আপনাদের ভোটব্যাংকের হয়তো ৫%ও হবে না এরা। কিন্তু এই শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর একটা ক্ষমতা আছে। এরা ভাসমান ভোটারদের প্রভাবিত করার দারুণ ক্ষমতা রাখে। এই জনগোষ্ঠী মানে আমরা যারা শিবিরের রগ কাটাকে স্ট্যাবলিশ করে তাদের প্রায় নিষিদ্ধ সংগঠন করে দিয়েছি, যারা রাজাকারদের ইতিহাস জেনে আন্দোলন করে বিচার ত্বরান্বিত করেছি, যারা শেখ মুজিবের ফিলসফি আর দূরদর্শী মনোভাব ও তাজউদ্দিনের ড্যামকেয়ার ইতিহাসকে নিয়মিত নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে পারি তারা যে আপনাদের পুরোপুরি বিপক্ষে চলে গেল সে অভিযোগটাই করতে এসেছি আপনার কাছে। এখন তাহলে শুধু ভেবে দেখুন প্রিয় হাসিনা বু, আমাদের অপ্রিয় হলে কী হতে পারে তার কনসিকোয়েন্স আর ৫ টা বছর পরে গিয়ে।

ইতি,
একজন সাধারণ বাঙালি

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close