অনুপ্রেরণার গল্পগুচ্ছতারুণ্য

অন্যরকম এক লেমোনেড বিক্রেতার গল্প!

একবার ভাবুন তো, কোন এক মানুষের জীবনের ব্যাপ্তি মাত্র আট বছর। কিন্তু সেই আট বছর আয়ু নিয়েই সে হাজার হাজার মানুষের মনে ঠাঁই করে নিয়েছে। অর্জন করেছে সবার হৃদয় নিংড়ানো ভালবাসা। আট বছর বেঁচে থেকেই সে মানবতার খাতায় স্বর্ণাক্ষরে তার নাম লিখিয়েছে। ব্যাপারটা দারুণ না? 

আলেক্সান্দ্রা এ্যালেক্স স্কট জন্মেছিল ১৯৯৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কানেক্টিকাটে। জন্মের সময় তার সঙ্গী হয় নিউরোব্লাস্টোমা নামের এক ধরণের ক্যান্সার। লিজ এবং জ্যা স্কট দম্পতির দ্বিতীয় সন্তান হিসেবে এ্যালেক্স এই দুরারোগ্য ব্যাধি নিয়ে পৃথিবীতে আসে। এ্যালেক্সের প্রথম জন্মদিনেই ডাক্তার স্কট দম্পতিকে জানান তাদের কন্যাসন্তান ক্যান্সারে আক্রান্ত। আর ক্যান্সারের হাত থেকে মুক্তি পেলেও তাদের সন্তান কোনদিন পারবে কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে। যথারীতি এ্যালেক্সের চিকিৎসা শুরু হয়। সে তার দ্বিতীয় জন্মদিনে হামাগুড়ি এবং পদ বন্ধনী (Leg brace)-এর সাহায্যে দু’পায়ে ভর করে দাড়াতে সক্ষম হয়। ডাক্তারের সন্দেহকে জয় করে এ্যালেক্স হাঁটতে পারে এবং সেই দু’বছর বয়সেই আত্মপ্রত্যয়ী ও সাহসী মনোভাবের পরিচয় দেয়। ২০০০ সালে এ্যালেক্সের স্টেম সেল ট্রান্সপ্ল্যান্ট করা হয়। তার কিছু দিন পরেই সে তার মাকে তার ইচ্ছার কথা জানায়। তার ইচ্ছা ছিল হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাবার পর সে তাদের বাড়ীর উঠোনে একটা লেমোনেড স্ট্যান্ড দেবে। সহজ বাংলায় বলতে গেলে লেবুর শরবত বিক্রি করবে এবং সেখান থেকে প্রাপ্ত অর্থ তার মতো যেসব শিশু ক্যান্সারে আক্রান্ত তাদের সাহায্যার্থে ব্যয় হবে। পরিবারের সবার সহযোগিতায় এ্যালেক্স তার স্বপ্নে বাস্তবে রূপদান করতে সক্ষম হয়। সেই বছর অর্থাৎ ২০০০ সালে এ্যালেক্স তার লেমোনেড স্ট্যান্ডের মাধ্যমে দুই হাজার ডলার উপার্জন করে। সে একজন সাহসী যোদ্ধার মত ক্যান্সারের সাথে যুদ্ধ করতে থাকে প্রতিবছর একবার করে বাড়ীর উঠোনে লেমোনেড স্টল দিয়ে স্বপ্নকে বাচিয়ে রাখে।

২০০৪ সালে এই সাহসী যোদ্ধা মাত্র আট বছর বয়সেই বিদায় নেয় পৃথিবী থেকে! মৃত্যুর কিছু দিন আগে তার নিজের জবানীতে তার সম্পর্কে কিছু কথা বলে। নিচে সেটাই হুবুহু তুলে দেওয়া হলো –

পুরো নাম – Alexandra Flynn Scott

জন্ম – ১৯৯৮ সালের জানুয়ারি মাসে।

আমার সম্পর্কে – আমি এ্যালেক্স। আমার বয়স আট বছর। আমি ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুদের সহায়তা করি আমার লেমোনেড স্ট্যান্ডের মাধ্যমে। এবং ক্যান্সারের নিরাময় আবিষ্কারের জন্য গবেষণাকেও উৎসাহিত করি।

আমি যাদের সাথে থাকি – আমার বাবা-মা। আমার তিন ভাই এবং আমার পোষা কুকুর Shammy.

আমি যেখানে বাস করি – পেনসিল্ভেনিয়া।

প্রিয় রঙ – নীল এবং বেগুনী।

প্রিয় প্রাণী – পেঙ্গুইন।

কোন ক্লাসে পড়ি – সেকেন্ড গ্রেড।

প্রিয় খাবার – ফ্রেঞ্চ ফ্রাই।

প্রিয় খেলা – সকার।

প্রিয় সিনেমা – স্কুবিডু।

বড় হয়ে যা হতে চাই – ফ্যাশন ডিজাইনার

যেখানে অবশ্যই যেতে চাই – ফ্রান্স।

এ্যালেক্সের পরিবার ২০০৫ সালে এ্যালেক্সের স্বপ্নের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আরো বড় পরিসরে আয়োজন করেন লেমোনেড স্টলের। ক্রমেই বিশ্ববাসী অবহিত হন এ্যালেক্সের এই মহৎ কীর্তি সম্পর্কে। গড়ে ওঠে ALSF (ALEX LEMONADE STALL FOUNDATION)। এ্যালেক্সের ছোট্ট মনে লালিত স্বপ্ন সংক্রামকের মত সারাবিশ্বে ছড়িয়ে যেতে থাকে। সারা বিশ্ব থেকে ডোনেশন আসতে শুরু করে। ALSF ২০১৪ সাল পর্যন্ত ৪৫০টিরও বেশী ক্যান্সা্র গবেষণার কাজে অর্থ প্রদান করেছে। পাশাপাশি ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুদের পরিবারের পাশে দাড়িয়েছে। তাদের আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি জুগিয়েছে মানসিক প্রেরণাও।

এ্যালেক্সের তিনভাই তাদের দ্য স্কটস (The Scotts) নামেই পরিচয় দেয়। তারা বলেন ,” আমরা আমাদের অকালপ্রয়াত বোনের স্বপ্নকে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দিতে বদ্ধপরিকর।“ আরও বলেন, “ফাউন্ডেশনের বেশীর ভাগ অর্থ ব্যয় হয় ক্যান্সার সংক্রান্ত গবেষণার কাজে। এছাড়াও চাইল্ডহুড ক্যান্সারে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা খরচও আমরা বহন করি।“

এ্যালেক্সের এই মহৎ কর্মে অনুপ্রাণিত হয়ে অনেক শিশুরাও এই ফাউন্ডেশনের হয়ে কাজ করে বলে জানান এ্যালেক্সের মা লিজ। পি.জে.বার্টোস তাদেরই একজন। পাঁচ বছর বয়স থেকেই সে এই ফাউন্ডেশনের সাথে যুক্ত। তার একটা লক্ষ্যমাত্রাও আছে, সে হাইস্কুল গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করবার পূর্বেই ফাউন্ডেশনের হয়ে পঞ্চাশ হাজার ডলারের বেশি ফান্ড রেইজ করতে চায়।

এ্যালেক্সের মৃত্যু আক্ষরিক অর্থে হয়েছে হয়তো! কিন্তু তার স্বপ্নের মৃত্য ঘটেনি। বরং সময়ের সাথে তার স্বপ্নের পরিধি বেড়েছে। তার স্বপ্নের মাধ্যমে সে অসংখ্য শিশুকে প্রতিনিয়ত বাঁচার প্রেরণা দিয়ে যাচ্ছে। এ্যালেক্স দেহত্যাগ করলেও তার ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে যেসব বাচ্চা ক্যান্সার থেকে বেঁচে ফিরেছে তাদের সবার মধ্যে সে বিরাজ করবে আরও বহু বহু বছর! 

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close