লার্স লিজনবুর্গ, মানবাধিকার কর্মী, রাজনীতিবিদ; আমাদের মুক্তিযু্দ্ধের সুইডিশ বন্ধু। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় সুইডেন ও নরডিক দেশগুলোতে বাঙালির সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ, পাকিস্তানিদের সংঘটিত বাঙালি গণহত্যা ও শরণার্থীদের দুর্দশার কথা প্রচার করে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত সৃষ্টি করার কাজ করেছিলেন তিনি।

শুধু তাই-ই নয়, ১৯৭১ সালে বাঙালি গণহত্যা ও শরণার্থী বিপর্যয়ের খবর শুনে লার্স ছুটে এসেছিলেন ভারতে। ১৯৭১ সালে অক্টোবরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় লার্স ভারতের বাঙালি শরণার্থী শিবির ও বাংলাদেশের মুক্তাঞ্চলে এসেছিলেন। তখন তাঁর বয়স ছিল ২১ বছর। সুইডেনের লিবারেল পিপলস পার্টির যুব সংগঠন লিবারেল ইয়ুথের চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি। তাঁর রাজনৈতিক দল সুইডেনের লিবারেল পিপলস পার্টি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করেছিল।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লার্স এতটাই আবেগী ছিলেন যে, ১৯৭১ সালের ৩০ অক্টোবর তিনি মুক্তিযুদ্ধরত বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি ক্যাম্পে গিয়েছিলেন, যা পাকিস্তানি অবস্থান হতে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরে ছিল, সেখানে মুর্হমুর্হ গোলাগুলির শব্দ শোনা যাচ্ছিল।

সুইডেনে ফিরে গিয়ে লার্স লিবারেল পিপলস পার্টির কর্মীদের সাথে নিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গঠনে নেমে পরেন। পাকিস্তান থেকে রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার ও পাকিস্তানকে কোনধরণের সহযোগিতা না করার সুইডিশ সরকারের কাছে দাবি জানান। বাঙালি শরণার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সুইডেন ও নরডিক দেশগুলোর সরকার ও জনগণের কাছে অনুরোধ করেন। বাঙালি শরণার্থীদের সহায়তা করার জন্য তহবিল গঠন করে সংগ্রহীত অর্থ তিনি বাংলাদেশ সরকারের কাছে প্রেরণ করেছিলেন।

সুইডেনের Aftonbladet পত্রিকায় ২০০২ সালে প্রকাশিত একটি সাক্ষাৎকারে লিজনবুর্গ বলেন-

“১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পৃথিবীর বৃহত্তম একটি শরণার্থী বিপর্যয় ঘটেছিল। এক কোটি বাঙালি প্রাণ বাঁচাতে ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করে। প্রথম সুইডিশ হিসেবে আমি ১৯৭১ সালে সেখানে যাই। আমি মনে করতাম, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নরডিক দেশগুলোর সমর্থন ও সহায়তা করা দরকার।”

মুক্তিযুদ্ধের পর আরেকবার বাংলাদেশে এসেছিলেন লার্স, ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে। বাংলাদেশ নিয়ে লার্সের ভালো লাগা এতটাই বেশি ছিল যে, তাঁর ব্যাচলরের থিসিস ছিল বাংলাদেশের সংবিধানের উপর। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান নিয়ে কথা প্রসঙ্গে ২০১৬ সালে ্‌একটি সাক্ষাৎকারে বলেন-

“পাকিস্তান বর্তমানে জঙ্গিবাদ, আত্মঘাতী বোমা হামলা, সামরিকতন্ত্র -এসব নানান ভয়ংকর সমস্যায় জর্জরিত, সেখানে বাংলাদেশ ভালো অবস্থানে আছে। আমি তখন আত্মতৃপ্তি অনুভব করি, কারন- পাকিস্তানি অত্যাচারের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে আমি সমর্থন করেছিলাম, বাংলাদেশের জন্য কাজ করেছিলাম।”

লার্স লিজনবুর্গকে ২০১২ সালের ২০ অক্টোবর বাংলাদেশ সরকার মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখার জন্য ‘Friends of Liberation War Honour’ সম্মাননা প্রদান করেন। লার্স লিজনবুর্গের পুরো নাম লার্স এরিক এন্সগার লিজনবুর্গ; জন্ম ২১ নভেম্বর, ১৯৪৯ সালে সুইডেনে। ১৯৯৭-২০০৭ সাল পর্যন্ত তিনি সুইডেনের লিবারেল পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি বিভিন্ন সময় সুইডেনের শিক্ষা ও গবেষণা মন্ত্রনালয়, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা মন্ত্রনালয় এবং সংস্কৃতি মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন।

শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা মুক্তিযুদ্ধের সুইডিশ বন্ধু লার্স লিজনবুর্গ…

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-