মনের অন্দরমহলরিডিং রুম

লিজেন্ডরা আসমান থেকে আসেন না…

অধ্যাপক এনায়েতউল্লাহ স্যারের সরাসরি ছাত্র ছিলাম। এমবিবিএস শেষ করে তাঁর বন্ধুরা যখন জমজমাট চেম্বারে বসে টাকা গুনছেন, স্যার তখন ‘বিলাত’। যাপন করছেন মানবেতর জীবন। আর রয়েল কলেজে পড়ছেন মেডিসিন। তাঁর বাবা তাঁকে বলে দিয়েছিলেন, “দেশে যা-ই ঘটুক পড়াশোনা শেষ না করে ফিরবা না।” তিনি ফিরলেন না। দেশে বাবা মারা গেলেন, তিনি ফিরলেন না। মা-ও মারা গেলেন, তবুও তিনি ফিরলেন না। ফিরলেন নামের নিচে অনেকগুলো অক্ষর নিয়ে। এমআরসিপি, এফআরসিপি ইত্যাদি। এই অক্ষরগুলো তখন দেশে খুব কম ডাক্তারের নামের সাথেই আছে। দেশে আধুনিক মেডিসিন যাদের হাত ধরে চালু হয়েছিলো, এনায়েত উল্লাহ স্যার ছিলেন তাঁদের একজন। লিখেছিলেন বই- এসেনশিয়ালস অব মেডিসিন। বাংলাদেশি কোনো লেখকের লেখা প্রথম মেডিসিনের টেক্সট বই। স্যার এখনও বেঁচে আছেন। নিভৃতচারী এই কিংবদন্তীর দিনের বেশিরভাগ সময় এখনও কাটে মেডিসিন পড়ে।

অধ্যাপক সৈয়দ আকরাম হোসেন স্যারকে দেখেছি। বাংলাদেশে ক্যানসার চিকিৎসার পথিকৃত। এই দেশে যতটা আধুনিক ক্যানসার হাসপাতাল তৈরি হয়েছে, তার প্রায় সবগুলোই তৈরী হয়েছে স্যারের হাত ধরে। নতুন প্রজন্মের ক্যানসার বিশেষজ্ঞদের প্রায়ই সবাই-ই তাঁর ছাত্র। আমরা যখন ইন্টার্নি করছি, স্যার তখন নর্থ ইস্ট ক্যানসার হাসপাতালের বিভাগীয় প্রধান।

স্যার সারাদিনই পড়েন। বন্ধুদের আড্ডায়, পারিবারিক আলোচনায়, রোগী দেখার ফাঁকে সবাই যখন যে যার মতো ব্যাস্ত- স্যারের হাতে তখন ট্যাব, ট্যাবে বই। স্যার বই পড়ছেন। অন্য কোনোদিকে কোনো মন নেই।

অধ্যাপক মৃনাল কান্তি স্যারকে পেয়েছি সরাসরি শিক্ষক হিসেবে। একসময়ের এফসিপিএস পার্ট টু- এর বিপজ্জনক পরীক্ষক। তিনি মুচকি হাসি দিয়েছেন, মানে হচ্ছে পরীক্ষার্থী নির্ঘাত ফেইল। স্যার সারাদিনই পড়েন। দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিলে দেখা যায় বইতে মাথা গুজে আছেন। এই বই ছাড়া ত্রিভুবনে আর কিছুই যেন নেই।

অধ্যাপক মীর মাহবুবুল আলম স্যারকে দেখেছি। খ্যাতিমান অধ্যাপক। সারাদিনই পড়ালেখার উপর থাকেন। তাঁর সামনে এসে একবার স্ট্যাটেসটিক্স নিয়ে এক স্ট্যাটেস্টিশিয়ান কী কী জানি লেকচার দিয়ে ফেলেছিলেন। বিষয়টা তাঁর ইগোতে লাগলো। তিনি বিবিএ করলেন, এমবিএ করলেন। নিজেই হয়ে গেলেন স্ট্যাটাস্টিশিয়ান। বই-ও লিখে ফেললেন।

একবার এক ভূতত্ববিধ স্যারকে ভূমিকম্প নিয়ে ভুজং ভাজং বুঝ দিয়ে দিলেন। এটাও স্যারের ইগোতে লেগে গেলো। স্যার চলে গেলেন জাপান। গিয়ে ভূমিকম্পের উপর এক বছর পড়ালেখা করে চলে আসলেন। একবার এক আইনবিধও স্যারকে হাইকোর্ট দেখানোর চেষ্টা করলেন। স্যার এল.এল.বি-তে ভর্তি হয়ে গেলেন।

ছিলেন ওসমানি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের প্রধান, শাবি’র মেডিকেল ফ্যাকাল্টির ডিন। নর্থ ইস্ট মেডিকেল কলেজে স্যারকে পেয়েছি থার্ড ইয়ার থেকে। বয়স হয়েছে, নানাবিধ অসুখ ধরেছে শরীরকে। কিন্তু এনার্জিতে কোনো অসুখ নেই। সারাদিনই পড়েন। পড়ান থার্ড ইয়ারকে, ফোর্থ ইয়ারকে, এফসিপিএস, এমএস ছাত্রদেরকে। স্যার পরীক্ষক হিসেবে হলে ঢুকলে শ্রদ্ধায় ঘড়ির কাটাও হয়তো একটু জিরিয়ে নেয় মনে মনে।

অধ্যাপক ফয়সাল আহমেদ। মেডিসিনের পাগলাটে অধ্যাপক। জ্ঞানের কাছে জীবন পরাজিত হওয়ার পর জন্ম হয় এমন প্রফেসরের। তিনি প্রতিদিন রাতে বাড়ি ফিরেন ১২টায়। ৫ মিনিটে খাওয়াদাওয়া করেন। জুতা খুলেন, মোজা না খুলেই পড়তে বসেন। কয়েকঘন্টা পড়ালেখা করে ঘুমাতে যান। ঘন্টা দুয়েক ঘুমিয়ে ভোরে উঠে যান। উঠে আবার পড়তে বসেন। নাস্তা করে গাড়িতে উঠেন। তাঁর গাড়ির পেছনের সিটে বইয়ের স্তুপ। সেখান থেকে একটি বই টেনে নেন। পড়তে পড়তেই পৌছে যান হাসপাতালে।

হাসপাতাল শেষে বিকেলে আবার গাড়িতে উঠেন। বই পড়তে পড়তে চেম্বারে পৌছান। চেম্বারে না বলে লাইব্রেরি বলাই ভালো। টেবিলেও বই খোলা থাকে কয়েকটা। সেগুলোর ফাঁকে প্রেসক্রিপশন লিখেন। দুইতিনজন প্যাশেন্ট দেখার পর বিরতি নেন। বিরতীর সময় পড়ালেখা করেন। চেম্বার শেষে বাসায় যান। আবার পড়তে বসেন। এখন সিলেট উইমেনস মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিভাগীয় প্রধান। মাঝে মাঝেই হুট করে ছুটি নেন। কেউ জানতে পারে না তিনি কোথায়!

ষাটোর্ধ্ব এই প্রফেসর মেডিসিনের যত ফেলো তৈরী করেছেন, তাঁরা ঠিকই জানেন স্যার কোথায়। তিনি কোনো পাহাড়ের চূড়ার সৌন্দর্য্য দেখছেন না, তিনি সমুদ্রের ঢেউ দেখে বয়স অস্বীকারের চেষ্টা করছেন না। তিনি আসলে পড়ছেন। নিজের বাসায় দরজা জানালা বন্ধ করে মেডিসিন পড়ছেন।

অধ্যাপক গৌতম কুমার স্যার। মেডিসিনের উদাসী অধ্যাপক। সকাল বেলা তিনি ঢুকতেন পিজির ওয়ার্ডে, রোগী দেখতেন পড়তেন। তারপর যেতেন মিটফোর্ডের ওয়ার্ডে। রোগী দেখতেন আর পড়তেন, তারপর ঢুকতেন ঢাকা মেডিকেল ওয়ার্ডে। ঢুকতেন আর পড়তেন। বের হতেন রাত ১২ টায়।

তিনি যখন দিনাজপুর মেডিকেল কলেজের এসিসটেন্ট প্রফেসর, তখন তাঁর মনে হলো, পড়ালেখার জন্য সন্যাসব্রত নিতে হবে। চলে গেলেন ভারত। এক বছর টাটা মেমোরিয়াল হাসপাতালে কাটালেন। এবার পড়ার মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিলেন। এফসিপিএস সেকেন্ড পার্টের আগে পড়তেন ১৮ ঘন্টা। সন্যাসব্রত গ্রহন করার পর পড়ালেখা বাড়িয়ে দিলেন আরো কয়েক ঘন্টা। স্যার প্রায়ই জিজ্ঞেস করেন – কয় ঘন্টা পড়লা?

শফিকুল বারী স্যার। সহযোগী অধ্যাপক। সন্ধ্যাবেলা সবাই যখন চেম্বারে রোগী দেখছেন স্যার তখন চুপিচুপি ওসমানি মেডিকেল কলেজের মেডিসিন ওয়ার্ডে। রোগী দেখছেন, পড়ছেন আর পড়াচ্ছেন। স্যারের ট্রেইনি যারা তাঁরা জানেন স্যারের ডেইলি রুটিন। তিনি কাজ করেন পড়ার জন্য, খাবার খান পড়ার জন্য, ঘুমান পড়ার জন্য।

আজকে দেখা হলো অধ্যাপক মোখলেসুর রহমান স্যারের সাথে। ক্যানসার বিশেষজ্ঞ। চিটাগাং মেডিকেলের হেড ছিলেন। খুব ঠান্ডা মাথার এবং ঠান্ডা কথার মানুষ। কিন্তু এফসিপিএস পার্ট-টুর খুব রাগী এক্সামিনার। কথা প্রসংগে নিজেই বললেন, ‘গতকাল আমি ফ্রি হয়েছি সন্ধ্যা ৭টায়, রাত ১২টা পর্যন্ত পড়লাম। ভোর ৫ টায় উঠে নামাজ পড়ে আবার ৯ টা পর্যন্ত পড়লাম। তুমি কয় ঘন্টা পড়েছো?’

স্যারের কথার উত্তর দিতে পারিনি। লিজেন্ডরা আসমান থেকে পড়েন না। তারা পড়েন, পড়েন এবং পড়েন। এগুলো হচ্ছে বাংলাদেশের এক কোনার ছোট্ট শহর সিলেটের গল্প বা গল্পের ছোট অংশ।

সবাই ‘সেকেন্ড টু গড’ না। সেকেন্ড টু গড হন কয়েকজন। যারাই হয়েছেন, যারাই হাতকে বানিয়েছেন আলট্রাসোনো প্রোব, চোখকে বানিয়েছেন সিটি স্ক্যান এমআরআই, ব্রেইনকে বানিয়েছেন সবচেয়ে বড় বই, তাঁদের সবারই আছে জীবনকে উপেক্ষা করার নির্মম অথবা দুঃসাহসী গল্প। নিজের ভেতরের ‘ইচ্ছা মানুষ’কে গলা টিপে হত্যা করে জ্ঞানের সাগরে পাল উঠিয়ে তাঁরা বলেছেন – এই তো জীবন!

মেডিসিন গৌরবের। এ গৌরবের উত্তরাধীকার আমারও। মেডিসিনের ছাত্র – এটা ভাবলেই বুক ফুলে উঠে, বলতে দ্বিধা নেই।

কিন্তু তাঁদেরকে দেখলে, তাঁদের গল্প শুনলে নিজেকে অপরাধী মনে হয়। লিজেন্ড হওয়ার কোনো ইচ্ছা নেই, সাহস নেই, যোগ্যতাও নেই। কিন্তু যে মহাসাগরে তাঁরা জাহাজ চালিয়ে বেড়াচ্ছেন, বেড়িয়েছেন, দূরবীনে চোখ রেখে দিগন্তের ওপারে অজানা দ্বীপ সন্ধান করছেন – সেই মহাসাগরের পাড়ে নুড়ি কুড়ানোর সাধনাটা তো অন্তত করা উচিত!

কিন্তু কী যে করে বেড়াচ্ছি!

*

আরও পড়ুন-

Comments

Tags

Related Articles